নতুন বাজারের সন্ধানে চা শিল্প, ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ম্যাচা উৎপাদন আসামে

পড়তে 9 মিনিট
নতুন বাজারের সন্ধানে চা শিল্প, ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ম্যাচা উৎপাদন আসামে

আসামের চায়ের নতুন অধ্যায়

ভারত বাণিজ্যিক ম্যাচার বাজারে প্রবেশ করেছে। ২০২৬ সালের ৩ জুলাই আসামের গুয়াহাটি টি অকশন সেন্টারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রথম চালানটি বিক্রি হয়। চা এসেছে তিনসুকিয়া জেলার ছোট টিংরাই টি এস্টেট থেকে। সেখানে একটি পারিবারিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আসামের স্থানীয় চা-গাছের সঙ্গে জাপানি পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি মানিয়ে নিতে বছরের পর বছর কাজ করেছে।

সূচিপত্র
  1. আসামের চায়ের নতুন অধ্যায়
  2. সাধারণ গ্রিন টি থেকে ম্যাচা কেন আলাদা
  3. জাপানি দক্ষতা কীভাবে আসামের উপযোগী করা হয়েছে
  4. ম্যাচা আসামিকা নিজের স্বাতন্ত্র্য গড়ছে
  5. দেশে ও বিদেশে বাড়ছে বাজার
  6. ভারতের চা-বাগানের জন্য বহুমুখীকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
  7. পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে মান ও স্বাতন্ত্র্য
  8. মূল বিষয়গুলো

প্রথম চালানে ছিল পাঁচ কেজি চা, যা নিলামকারী প্রতিষ্ঠান J Thomas & Co. Pvt Ltd-এর মাধ্যমে প্রতি কেজি ৩,০০০ রুপিতে বিক্রি হয়। গুয়াহাটিভিত্তিক Sheosons Chai Co. চালানটি কিনেছে। এস্টেটটির ম্যাচার বর্তমান নিলামমূল্য প্রতি কেজি ৩,০০০ থেকে ৩,৮০০ রুপির মধ্যে বলে জানা গেছে।

এই বিক্রি এমন একটি রাজ্যের জন্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যা বিশ্বজুড়ে কড়া স্বাদের কালো চায়ের জন্য পরিচিত। পাশাপাশি, সম্প্রতি ক্যাফে, বেকারি ও সুস্থতাবিষয়ক ব্যবসায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি পণ্যের জন্য ভারতীয় উৎস তৈরি করেছে এটি। ভারতের শহরগুলোতে ম্যাচা লাটে, মিষ্টান্ন ও অন্যান্য খাবার ছড়িয়ে পড়েছে; আগে এসবের বেশির ভাগ সরবরাহ আসত পূর্ব এশিয়া থেকে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই উদ্যোগকে রাজ্যের চা-ইতিহাসের নতুন পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং প্রকল্পটির সঙ্গে জাপানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সহযোগিতার সম্পর্ক যুক্ত করেছেন। উৎপাদনের এই মাইলফলক এমন সময়ে এসেছে, যখন ভারতীয় চা-বাগানগুলো বাড়তি ব্যয়, পুরোনো চা-গাছ, অনিশ্চিত আবহাওয়া এবং কম দামের আমদানির চাপের মুখে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণ গ্রিন টি থেকে ম্যাচা কেন আলাদা

ম্যাচা হলো মিহি করে গুঁড়ো করা গ্রিন টি। সাধারণ গ্রিন টির ক্ষেত্রে গরম পানিতে চা-পাতার উপাদান নির্যাস হিসেবে বের করে নেওয়া হয়, এরপর পাতা ফেলে দেওয়া হয়। ম্যাচা পানিতে সরাসরি ফেটিয়ে মেশানো হয়, ফলে পানকারী পুরো পাতাটিই গ্রহণ করেন।

এই পার্থক্যের কারণে উৎপাদনপ্রক্রিয়াটি আরও সূক্ষ্ম। জাপানে ফসল তোলার কয়েক সপ্তাহ আগে সাধারণত চা-গাছ ঢেকে রাখা হয়। এতে সূর্যালোক কমে এবং ক্লোরোফিল ও এল-থিয়ানিনের মাত্রা বাড়ে। এর ফলে ম্যাচার উজ্জ্বল সবুজ রং, মসৃণ গঠন ও মুখরোচক স্বাদ তৈরি হয়, যাকে প্রায়ই ‘উমামি’ বলা হয়।

ফসল তোলার পর জারণ বন্ধ করতে পাতাগুলো ভাপে সেদ্ধ করা হয়। ডাঁটা ও শিরা সরিয়ে যে উপাদান পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় তেনচা। তেনচা শুকিয়ে খুব মিহি গুঁড়ো করা হয়; ঐতিহ্যগতভাবে এ কাজে ধীরে ঘোরা পাথরের কল ব্যবহার করা হয়। তৈরি চা এরপর গরম পানিতে ফেটিয়ে পান করা হয়, অথবা পানীয়, মিষ্টান্ন ও রান্না করা খাবারে ব্যবহার করা হয়।

পুরো পাতাটিই খাওয়া হয় বলে তিক্ততা ও প্রক্রিয়াজনিত ত্রুটি চা জ্বাল দিয়ে পান করার তুলনায় বেশি স্পষ্ট হয়। ছোট টিংরাইয়ের মালিক পরিবারটির সদস্য মৃগেন্দ্র জালান ব্যাখ্যা করেন, স্বাদ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পটির জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ম্যাচাই চায়ের একমাত্র ধরন, যেখানে পুরো পাতাটিই খাওয়া হয়; তাই চা অতিরিক্ত তেতো হলে চলবে না।

আসামের স্থানীয় ক্যামেলিয়া সিনেনসিস আসামিকা কালো চায়ে যে জোরালো স্বাদ আনে, তার জন্য মূল্যবান। তবে গুঁড়ো করে পুরো পাতা খেলে সেই তীব্রতা রুক্ষ হয়ে উঠতে পারে। তাই রং ও উপকারী উপাদান ধরে রাখার পাশাপাশি চায়ের কষভাব কমাতে পারে, এমন একটি জাত ও প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হয়েছে এস্টেটটিকে।

জাপানি দক্ষতা কীভাবে আসামের উপযোগী করা হয়েছে

ছোট টিংরাইয়ের ম্যাচা প্রকল্পটি জাপানি চা প্রস্তুতকারক, কৃষিবিদ, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ও চা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক দশক ধরে চলা অংশীদারত্ব থেকে গড়ে উঠেছে। স্থানীয় চা-ফসলের উপযোগী যন্ত্রপাতিসহ জাপানি ধাঁচের একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কারখানা স্থাপন করেছে এস্টেটটি। কারিগরি কাজে যুক্ত অংশীদারদের মধ্যে ছিল জাপানি চা-যন্ত্রপাতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Kawasaki Kiko।

জাপানি চা পরামর্শক ও সনদপ্রাপ্ত চা প্রশিক্ষক মাসানোরি ইয়ানাগাওয়া তিন বছরের বেশি সময় জালান পরিবারের সঙ্গে কাজ করেছেন। গ্রিন টি উৎপাদন দিয়ে এই অংশীদারত্ব শুরু হয় এবং ২০১৭ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক ম্যাচার চালান তৈরি হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, পানীয়টির সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত ছোট পাতার জাপানি গাছের বদলে ভারতীয় চায়ের জাত থেকেও ম্যাচা তৈরি করা সম্ভব।

বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য এস্টেটটি তিনালি ১৭ জাত বেছে নিয়েছে; এতে পলিফেনল ও অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি এবং সবুজ রং উজ্জ্বল। প্রতিবেদনে বিস্তৃত ম্যাচা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত আসামের স্থানীয় জাতগুলোর একটি হিসেবে টিভি৯-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তাজা পাতাগুলো ভাপে সেদ্ধ করে গ্যাসচালিত ড্রায়ারে কয়েক ধাপে শুকানো হয়। প্রতিটি ধাপে পাতা রোল করার সময় তাপমাত্রা কম রাখা হয়। ধীরে ধীরে আর্দ্রতা কমানো এবং রং, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষতি কমানোই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। শুকনো তেনচা ঠান্ডা করার পর ছোট ছোট চালানে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গুঁড়ো করা হয়, যাতে চূড়ান্ত গুঁড়ো তৈরি হয়।

এস্টেটটি জাপানের অন্যতম পরিচিত চায়ের জাত ইয়াবুকিতাও পরীক্ষা করে দেখেছিল। আসামের গরম আবহাওয়ায় জাতটি ভালো ফল দেয়নি এবং স্থানীয় পোকামাকড়ের বিরুদ্ধেও স্থানীয় গাছের তুলনায় কম প্রতিরোধী ছিল। এই অভিজ্ঞতা ভিন্ন জলবায়ুতে জাপানি চাষপদ্ধতির অনুকরণ করার বদলে আসামের নিজস্ব চা-জিনগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর গুরুত্ব আরও জোরালো করেছে।

বিজ্ঞাপন

ম্যাচা আসামিকা নিজের স্বাতন্ত্র্য গড়ছে

ছোট টিংরাই তাদের পণ্যকে জাপানি ম্যাচার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন না করে ‘ম্যাচা আসামিকা’ নামে পরিচিত করছে। গাছের ধরন, মাটি, জলবায়ু ও চাষপদ্ধতির পার্থক্যই এই নামের পেছনে রয়েছে। জাপানি ম্যাচা সাধারণত ক্যামেলিয়া সিনেনসিস সিনেনসিস থেকে তৈরি হয়, যা ছোট পাতার গাছ এবং শীতল অঞ্চলে জন্মে। আসামিকা বড় পাতার জাত, যা আসামের উষ্ণ ও কম উচ্চতার চা-বাগানের উপযোগী।

এই পার্থক্যে পানীয়ের স্বাদও আলাদা হয়। এস্টেটটির চতুর্থ প্রজন্মের মালিক মৃত্যুঞ্জয় জালান বলেন, জাপানি ম্যাচায় প্রায়ই উমামির স্বাদ প্রবল থাকে এবং ঘাসের মতো স্বাদও স্পষ্ট। আসামের পণ্যেও উদ্ভিজ্জ স্বাদ আছে, তবে এটিকে কম কষযুক্ত এবং পান করার পর মিষ্টি স্বাদ থাকে বলে বর্ণনা করা হয়।

জালান মনে করেন, এই স্বাদ এমন ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে পারে, যাঁরা ম্যাচা সম্পর্কে আগ্রহী, কিন্তু প্রচলিত ধরনগুলোকে অতিরিক্ত তীব্র মনে করেন। তাঁর ধারণা, নতুন পানকারীরা শুরুতে এই চা পান করে পরে আরও কড়া স্বাদের গ্রেডে যেতে পারেন।

মানুষকে ম্যাচার হালকা একটি ধরন দিয়ে পান শুরু করানোর, পরে হয়তো আরও কড়া গ্রেডে নিয়ে যাওয়ার প্রবেশপথ হতে পারে এটি।

প্রকল্পে যুক্ত জাপানি চা বিশেষজ্ঞদের কাছে এই পণ্যের বাজারে আলাদা অবস্থান রয়েছে। ইয়ানাগাওয়া বলেন, জাপানি জাত ও জাপানি চাষপদ্ধতিতে তৈরি ম্যাচা আসামে হুবহু পুনরুৎপাদন করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, অন্য কোথাও তৈরি ম্যাচা-ধাঁচের গ্রিন টি পণ্যও চাহিদা মেটাতে পারে, যদি সেগুলো ধারাবাহিক মান এবং গুঁড়ো গ্রিন টি থেকে ভোক্তাদের প্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য দিতে পারে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি আসামের পণ্যটিকে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। জাপানি আনুষ্ঠানিক ম্যাচার সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে, ম্যাচা আসামিকা লাটে, ঠান্ডা পানীয়, আইসক্রিম, কেক ও অন্যান্য রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য বাজারজাত হতে পারে, যেখানে এর জোরালো স্বাদ ভালো মানায়।

দেশে ও বিদেশে বাড়ছে বাজার

জাপানি চা-অনুষ্ঠানের বাইরেও ম্যাচার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাফেগুলো এখন গরম ও ঠান্ডা পানীয়ে এটি ব্যবহার করে; খাদ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডোনাট, চকলেট, বিস্কুট ও স্বাস্থ্যপণ্যে যোগ করে। ভারতে লাড্ডু, দোসা এবং বিশ্বজোড়া প্রবণতার সঙ্গে পরিচিত স্থানীয় খাবারের মেলবন্ধনে তৈরি অন্যান্য পণ্যেও এই গুঁড়ো দেখা যাচ্ছে।

সরবরাহ করা শিল্পবিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ম্যাচার চাহিদা প্রায় ১৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। প্রচলিত সরবরাহকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদনের চেয়ে বিশ্বব্যাপী চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, ফলে ঘাটতি ও দাম বেড়েছে। জাপান এখনো প্রধান উৎপাদক ও ভোক্তা; পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

ছোট টিংরাইয়ের প্রথম বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিমাণ সীমিত। ২০২৬ সালে এস্টেটটি প্রায় ২৫০ কেজি ম্যাচা উৎপাদন করেছে এবং মাসে ২০০ থেকে ৩০০ কেজিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের বাগানে বছরে প্রায় ৩০ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কেজি গ্রিন টি। ম্যাচা এখনো ব্যবসাটির ছোট অংশ, তবে এর দাম ও বাজারের আগ্রহ এটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এস্টেটটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়াকে সম্ভাব্য রপ্তানি বাজার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ম্যাচার অন্যান্য প্রধান আমদানিকারক গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া। উৎপাদনের পরিমাণ ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সময়ে দেশীয় ক্যাফে এবং খাদ্যপ্রস্তুতকারীরা আগেই ক্রেতাভিত্তি তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের চা-বাগানের জন্য বহুমুখীকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের চা-ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো, তবু উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্রে রয়েছে কালো চা। আসামের প্রচলিত উৎপাদনের মধ্যে রয়েছে অর্থোডক্স চা এবং সিটিসি চা; এই পদ্ধতিতে শক্ত স্বাদের পানীয় তৈরির জন্য পাতা গুঁড়ো করে, ছিঁড়ে ও রোল করে ছোট টুকরো করা হয়।

এই ব্যবসা নানা চাপে রয়েছে। শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, অনেক চা-গাছ পুরোনো হয়ে গেছে, কিছু বাগানে ফলন কমেছে এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে। নিলামমূল্য প্রায়ই ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি, আর কম দামের আমদানি প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে।

বিশেষায়িত চা বিকল্প হতে পারে, কারণ এতে শুধু পরিমাণ নয়, স্বাদ, উৎপত্তিস্থল ও প্রক্রিয়াকরণের ভিত্তিতেও বিক্রি হয়। আসাম ও প্রতিবেশী মণিপুরে ইতিমধ্যে পুয়ের-ধাঁচে অনুপ্রাণিত গাঁজন করা ও কাঁচা চা তৈরি করছেন কিছু উৎপাদক। দার্জিলিংয়ের বাগানগুলোও ইয়াবুকিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, যেখানে জাপানি উদ্ভিদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ভারতীয় চাষের পরিবেশ যুক্ত হয়েছে।

জালান পরিবার তাদের গ্রিন টি ও ম্যাচা কারখানায় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। কারখানাটির দৈনিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা প্রায় ৮০০ কেজি বলে জানা গেছে। যে পণ্যের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়েছে পাঁচ কেজির একটি নিলাম চালান দিয়ে, তার জন্য এটি বড় বিনিয়োগ। ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত অর্ডার পাওয়া, ধারাবাহিক মান বজায় রাখা এবং ভারতীয় ম্যাচাও যে প্রতিষ্ঠিত জাপানি পণ্যের পাশে নিজের জায়গা পাওয়ার যোগ্য, তা ক্রেতাদের বোঝানোর ওপর।

চা-শ্রমিক ও চাষিদের জন্য বহুমুখীকরণ সফল হলে ভিন্ন ধরনের দক্ষতা, যন্ত্রপাতি ও পাতার মানদণ্ডের চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর ফলে অধিকাংশ ফসল কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগে উৎসাহিত হতে পারে বাগানগুলো। তবে এই সুফল নির্ভর করবে সতর্ক পরিকল্পনার ওপর, কারণ ম্যাচা উৎপাদনে সুনির্দিষ্ট সময়জ্ঞান, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও কঠোর মান যাচাই প্রয়োজন।

পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করবে মান ও স্বাতন্ত্র্য

প্রথম নিলাম প্রমাণ করেছে, আসামে বাণিজ্যিক ম্যাচা উৎপাদন ও বিক্রি সম্ভব। তবে প্রতিটি চালানে একই রং, স্বাদ ও গঠন বজায় রেখে বড় পরিসরে উৎপাদন করা যাবে, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। রপ্তানি চুক্তি এবং ক্যাফে চেইন ও খাদ্যপ্রস্তুতকারীদের আস্থা অর্জনে ধারাবাহিক মান হবে মূল বিষয়।

ঐতিহ্য ও নতুনত্বের মধ্যে ভারসাম্যও রাখতে হবে চাষিদের। জাপানি ম্যাচার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে; এর প্রতিষ্ঠিত গ্রেড, প্রস্তুতপ্রণালি ও আঞ্চলিক পরিচিতিও আছে। নিজস্ব স্বতন্ত্র ভারতীয় পরিচিতি গড়ে তোলার পাশাপাশি আসামের পণ্যটির গাছের জাত ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকতে হবে।

এই স্বাতন্ত্র্যই সুবিধা হয়ে উঠতে পারে। মসৃণ ও কম তেতো গুঁড়ো দুধভিত্তিক পানীয় ও রেসিপিতে ভালো কাজ করতে পারে, আর আসামের সমৃদ্ধ চা-ঐতিহ্য পণ্যটিকে স্পষ্ট উৎপত্তি-পরিচিতি দিতে পারে। স্থানীয় জাত, জাপানি যন্ত্রপাতি ও ভারতের প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশের সমন্বয়ে এমন একটি পণ্যশ্রেণি তৈরি হয়েছে, যা ম্যাচার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও জাপানি আসলের সঙ্গে অভিন্ন বলে দাবি করে না।

গুয়াহাটির নিলাম এই পণ্যশ্রেণিকে প্রথম প্রকাশ্য বাণিজ্যিক মূল্য এবং প্রথম ক্রেতা এনে দিয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষা হবে পুনরায় বিক্রি, ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া এবং মাসিক উৎপাদন লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এস্টেটটির সক্ষমতা। এসব ধাপ সফল হলে ভারতের অন্যান্য চা-বাগানও ম্যাচা-ধাঁচের নিজস্ব পণ্য তৈরির পরীক্ষা শুরু করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • আসামের ছোট টিংরাই টি এস্টেট ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ম্যাচার চালান উৎপাদন করেছে।
  • পাঁচ কেজির চালানটি গুয়াহাটি টি অকশন সেন্টারে প্রতি কেজি ৩,০০০ রুপিতে বিক্রি হয়েছে।
  • গুয়াহাটিভিত্তিক Sheosons Chai Co. প্রথম বাণিজ্যিক চালানটি কিনেছে।
  • এই চায়ে তিনালি ১৭-সহ আসামের স্থানীয় জাত ব্যবহার করা হয়েছে; প্রক্রিয়াকরণে কাজে লেগেছে জাপানি যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সহায়তা।
  • প্রচলিত জাপানি ম্যাচা থেকে আলাদা পরিচিতি দিতে এস্টেটটি পণ্যটির নাম দিয়েছে ম্যাচা আসামিকা।
  • উৎপাদন মাসে ২০০ থেকে ৩০০ কেজিতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
  • কালো চায়ের দাম ও বাড়তি ব্যয়ের চাপে থাকা ভারতের চা শিল্পে প্রকল্পটি নতুন একটি বিশেষায়িত চা-পণ্য যোগ করছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে