বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের রূপরেখা
প্রচলিত উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জীবপ্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে মালয়েশিয়া।
সূচিপত্র
- বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের রূপরেখা
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগের শক্ত ভিত্তি
- সেমিকন্ডাক্টর কেন কেন্দ্রে
- চিপ বিনিয়োগের পাশাপাশি এগোচ্ছে এআই ও ডিজিটাল দক্ষতা
- হালাল পণ্যে ভিন্ন ধরনের সুযোগ
- বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি শিল্পে বিস্তৃত হচ্ছে সম্পর্ক
- পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সহযোগিতায় কঠিন সিদ্ধান্তও রয়েছে
- নতুন খাতগুলোতে সহায়তা করতে পারে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
- কৌশলটির সাফল্য নির্ধারণে যা ভূমিকা রাখতে পারে
- মূল কথা
এই উদ্যোগে দুই দেশ তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে যেভাবে দেখছে, তাতে পরিবর্তনের আভাস রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং মেমোরি চিপ, ব্যাটারি, ডিজিটাল সেবা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির মতো খাতে অভিজ্ঞতা। মালয়েশিয়ার রয়েছে ক্রমবর্ধমান উৎপাদনভিত্তি, প্রতিষ্ঠিত হালাল সনদ ব্যবস্থা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিগুলোর সংস্থার (আসিয়ান) বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এমআইডিএ) পরিচালক রেদজুয়ান আবদ রহমান বলেন, কয়েক দশকে দুই দেশের মধ্যে টেকসই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখন ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করবে এমন শিল্পে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
গত কয়েক দশকে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। আমরা মনে করি, আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে এমন শিল্পে সহযোগিতা গভীর করার মধ্যেই সবচেয়ে বড় সুযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত উত্তেজনা, উৎপাদনঝুঁকি বৃদ্ধি এবং এশিয়া জুড়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারের প্রয়োজনের কারণে কোম্পানিগুলো যখন সরবরাহব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করছে, তখনই এই সম্প্রসারণের প্রস্তাব এসেছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের শক্ত ভিত্তি
এমআইডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ মালয়েশিয়ায় ৪০০টির বেশি প্রকল্পে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এসব প্রকল্পে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রকল্পগুলো রাসায়নিক, পরিবহন সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং মৌলিক ধাতু খাতের।
মালয়েশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ইয়ো স্যুং বে-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যও রেকর্ড ২৭.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। মালয়েশিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার ১১তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে, ইয়ো দেশটিতে আসার সময়ের তুলনায় দুই ধাপ এগিয়ে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার সপ্তম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার দক্ষিণ কোরিয়া।
বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি পণ্য এবং সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ এই বাণিজ্যের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। বিদ্যমান শিল্পভিত্তি নতুন প্রকল্পের জন্য কোম্পানিগুলোকে একটি মঞ্চ দিচ্ছে, কারণ সরবরাহকারী, দক্ষ কর্মী, সরবরাহ নেটওয়ার্ক ও রপ্তানি চ্যানেল আগে থেকেই রয়েছে।
মালয়েশিয়া নিজেকে আঞ্চলিক প্রবেশদ্বার হিসেবেও তুলে ধরছে। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিষ্ঠিত বন্দর এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতে অংশগ্রহণের ফলে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন কয়েকটি স্থানে ভাগ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
সেমিকন্ডাক্টর কেন কেন্দ্রে
দুই দেশের মধ্যে বিনিময় হওয়া পণ্যের শীর্ষ বিভাগ হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর। স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের মতো কোম্পানির মাধ্যমে মেমোরি চিপে বিশ্বনেতা দক্ষিণ কোরিয়া। চিপ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপগুলোতে, বিশেষ করে সংযোজন, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ে, মালয়েশিয়া শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে।
সংযোজন ও পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে চিপকে চূড়ান্ত প্যাকেজে বসানো এবং কঠোর কারিগরি মান অনুযায়ী সেগুলো কাজ করছে কি না যাচাই করা। চিপ নকশাকারীরা ডেটা সেন্টার, যানবাহন ও এআই ব্যবস্থায় ব্যবহৃত পণ্যে উন্নত কর্মক্ষমতা, কম বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং আরও বেশি সমন্বয় চাইছেন। ফলে উন্নত প্যাকেজিংয়ের মূল্য বাড়ছে।
ইয়ো বলেন, দুই দেশের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। মালয়েশিয়া আরও উন্নত প্যাকেজিং, চিপের উপকরণ ও সরঞ্জাম খাতে এগোতে চায়। দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলো এ ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতা এবং বৈশ্বিক উৎপাদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ দিতে পারে।
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত সেমিকন সাউথইস্ট এশিয়া ২০২৬ সম্মেলনে ২৯টি কোরীয় কোম্পানি অংশ নেয়। তাদের অনেকেই মাঝারি আকারের প্রযুক্তি কোম্পানি, যারা পরীক্ষার ব্যবস্থা, পরিস্রাবণ সরঞ্জাম ও শীতলীকরণ প্রযুক্তি তৈরি করে। আধুনিক চিপ কারখানায় এসব পণ্য অপরিহার্য, কারণ পরিষ্কার পরিবেশ ও সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সংবেদনশীল উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখে।
সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও কোম্পানিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতেও কোরিয়া-মালয়েশিয়া সেমিকন্ডাক্টর সহযোগিতা কেন্দ্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য, মালয়েশিয়ার শিল্প সক্ষমতা সম্পর্কে কোরীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং মালয়েশীয় কোম্পানিগুলোকে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও নতুন গ্রাহক পেতে সহায়তা করা।
চিপ বিনিয়োগের পাশাপাশি এগোচ্ছে এআই ও ডিজিটাল দক্ষতা
এআই সেমিকন্ডাক্টর খাতের সুযোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। উন্নত এআই ব্যবস্থা প্রশিক্ষণে বড় ডেটা সেন্টার, উচ্চক্ষমতার প্রসেসর, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণ অবকাঠামো লাগে। তাই এআই স্থাপনা আকর্ষণ করতে চাওয়া কোনো দেশের শুধু সফটওয়্যার ডেভেলপার থাকলেই চলে না। প্রয়োজন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, সুরক্ষিত ডেটা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ।
নিউ ইন্ডাস্ট্রিয়াল মাস্টার প্ল্যান ২০৩০ এবং ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে মালয়েশিয়া তার নীতিকাঠামো গড়ে তুলছে। এসব কর্মসূচির লক্ষ্য, অর্থনীতিকে উচ্চমূল্যের উৎপাদন, গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। ন্যাশনাল এনার্জি ট্রানজিশন রোডম্যাপে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নিঃসরণ কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকারি খাতের প্রশিক্ষণও ইতিমধ্যে সহযোগিতার অংশ হয়েছে। ডিজিটাল সরকার ও এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন মালয়েশিয়ার সরকারি কর্মচারীরা। ডিজিটাল সরঞ্জাম কীভাবে সরকারি সেবার উন্নতি ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে উদাহরণ তুলে ধরেছে কোরীয় সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
অন্যান্য কর্মসূচিতে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তরুণদের এআই ও ডিজিটাল দক্ষতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রশিক্ষিত কর্মীর জোগান কোম্পানিগুলো কত দ্রুত সম্প্রসারণ করতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে। কারখানা ও ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, তবে এসব প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানসম্পন্ন প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, গবেষক ও ব্যবস্থাপকও প্রয়োজন।
হালাল পণ্যে ভিন্ন ধরনের সুযোগ
খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, অর্থায়ন ও ভোগ্যপণ্যে প্রবেশের পথ তৈরি করছে হালাল অর্থনীতি। হালাল সনদ নিশ্চিত করে যে পণ্য ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ইসলামী বিধান মেনে চলে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সনদ ও বাজার সহায়তা ব্যবস্থাগুলোর একটি গড়ে তুলেছে মালয়েশিয়া। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও তার বাইরের মুসলিম ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে চায় এমন কোম্পানির জন্য দেশটি আকর্ষণীয় ভিত্তি।
খাদ্য উৎপাদন, ওষুধ, জীবপ্রযুক্তি, প্রসাধনী ও ভোক্তা ব্র্যান্ড গড়ে তোলায় দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী সক্ষমতা রয়েছে। মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব সক্ষমতার সঙ্গে মালয়েশিয়ার সনদ ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে।
বিশ্বের ইসলামী অর্থনীতিতে মালয়েশিয়ার অবস্থানও এই প্রস্তাবের পক্ষে সহায়ক। ২০২৫-২৬ সালের গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি ইন্ডিকেটরে দেশটি প্রথম স্থান পেয়েছে এবং হালাল খাদ্য, ইসলামী অর্থায়ন, হালাল ওষুধ ও হালাল প্রসাধনী বিভাগে শীর্ষে রয়েছে। মালয়েশিয়ার হালাল-সংশ্লিষ্ট আমদানি ৩০.৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৯ সাল নাগাদ ইসলামী অর্থনীতিজুড়ে বৈশ্বিক ব্যয় ৩.৫৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
২০২৫ সালের মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক হালাল প্রদর্শনীতে বিক্রি হয় ৪.৯৭ বিলিয়ন রিঙ্গিতের পণ্য, যা ৪.৫ বিলিয়ন রিঙ্গিতের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৮০টি দেশের ২,৪০০টি স্টল ও প্রদর্শক এতে অংশ নেন। কোরীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো হালাল সনদপ্রাপ্ত খাদ্য প্রদর্শন এবং মালয়েশীয় খুচরা বিক্রেতা, পরিবেশক ও উৎপাদনকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজতে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
ভবিষ্যতে ডিজিটাল সনদ ও পণ্যের উৎস অনুসরণেও সহযোগিতা হতে পারে। ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় উপকরণের চলাচলের রেকর্ড রাখতে পারে। এআই সরঞ্জাম নিরীক্ষকদের নথি পরিচালনা ও সম্ভাব্য বিধি-অনুবর্তিতার ঝুঁকি শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থাকে বিশ্বস্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠিত সনদ পদ্ধতির সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
বৈদ্যুতিক যান ও ব্যাটারি শিল্পে বিস্তৃত হচ্ছে সম্পর্ক
বৈদ্যুতিক যানবাহন আরেকটি খাত, যেখানে দুই দেশের অর্থনীতি যুক্ত হতে পারে। যানবাহন উৎপাদন, ব্যাটারির উপকরণ ও জ্বালানি সঞ্চয়ে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলোর দক্ষতা রয়েছে। মালয়েশিয়া বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করছে এবং এর ব্যাপক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলছে।
এসকে নেক্সিলিস সাবাহতে একটি কপার ফয়েল কারখানা পরিচালনা করে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কপার ফয়েল, কারণ এটি ব্যাটারি সেলের ভেতরে বিদ্যুৎ প্রবাহ বহন করে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যাটারির যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নেগেরি সেম্বিলানেও বিনিয়োগ করেছে স্যামসাং এসডিআই।
কেদাহর কুলিমে গাড়ি উৎপাদনসহ নতুন করে বিক্রি ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে মালয়েশিয়ায় ফিরেছে হুন্দাই। ব্যাটারি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, চার্জিং সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সেবার স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে মালয়েশিয়া। এ প্রচেষ্টা এগোলে আরও প্রকল্প আসতে পারে।
বৈদ্যুতিক যান শিল্পে শুধু কম খরচের সংযোজন কেন্দ্র হিসেবে কাজ না করে এর মাধ্যমে আরও বেশি মূল্য অর্জন করতে চায় মালয়েশিয়া। দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলোর জন্য মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারের কাছাকাছি একটি উৎপাদনকেন্দ্র হতে পারে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সহযোগিতায় কঠিন সিদ্ধান্তও রয়েছে
জ্বালানি রূপান্তরও দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান একটি অংশ। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্য রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার। পারমাণবিক শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন ধারণ এবং কার্বন ধারণ, ব্যবহার ও সংরক্ষণে দেশটির অভিজ্ঞতা রয়েছে। কারখানা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও কীভাবে নিঃসরণ কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখছে মালয়েশিয়া।
বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিগুলোর একটি পরিচালনা করে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। মালয়েশিয়া তার জ্বালানি মিশ্রণে পারমাণবিক শক্তি রাখবে কি না, তা এখনো মূল্যায়ন করছে। এ বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য নতুন আইন, স্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি পরিকল্পনা এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের বড় একটি দল প্রয়োজন হবে।
ইয়ো বলেন, মালয়েশিয়া এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উন্নয়নে সাত বা আট বছর লাগতে পারে। কেন্দ্র চালু হওয়ার অনেক আগেই কর্মী প্রশিক্ষণ শুরু করতে হবে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থাপনা ও কার্বন ধারণে সহযোগিতা আরও দ্রুত এগোতে পারে, কারণ এসব খাত পরীক্ষামূলক প্রকল্প ও শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব।
চিপ ও এআই পরিকল্পনার সঙ্গেও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি যুক্ত। চিপ কারখানা ও ডেটা সেন্টারে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে, তাই স্থিতিশীল ও কম কার্বন নিঃসরণকারী বিদ্যুতের প্রাপ্যতা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
নতুন খাতগুলোতে সহায়তা করতে পারে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
মালয়েশিয়া-দক্ষিণ কোরিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সহযোগিতার জন্য আরও স্থিতিশীল কাঠামো দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ধরনের চুক্তিতে শুধু শুল্ক নয়, ডিজিটাল বাণিজ্য, সেবা, বিনিয়োগের নিয়ম, তথ্য, জীব-অর্থনীতির প্রকল্প এবং আধুনিক ব্যবসায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ম্যাট্রেড ও কোরিয়া ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজিত সাম্প্রতিক এক ব্যবসায়িক ফোরামে প্রায় ২০টি কোরীয় কোম্পানি অংশ নেয়। এ আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, কোম্পানিগুলো বাস্তবসম্মত অংশীদারত্ব খুঁজছে। তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নিয়মকানুন, ব্যয়, কর্মীর দক্ষতা, অবকাঠামো ও বাজারের চাহিদার মতো বিষয়ের ওপর।
মালয়েশিয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো আগ্রহকে এমন প্রকল্পে রূপ দেওয়া, যা স্থানীয় সরবরাহকারী ও কারিগরি দক্ষতা গড়ে তুলবে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাজ হলো মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের নিয়ম ও শিল্পাঞ্চল সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা। কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি সংস্থার মধ্যে উন্নত যোগাযোগ এই ব্যবধান কমাতে সহায়তা করতে পারে।
কৌশলটির সাফল্য নির্ধারণে যা ভূমিকা রাখতে পারে
দুই দেশের সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক হলেও সহযোগিতার জন্য সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে দীর্ঘ প্রস্তুতি, নির্ভরযোগ্য পরিষেবা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ দরকার। এআই প্রকল্পে তথ্যের নিরাপত্তা, বিদ্যুতের ব্যবহার ও দক্ষ কর্মীর প্রাপ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হালাল ব্যবসায় তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা উপকরণসহ উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে সনদ বজায় রাখতে হবে।
মালয়েশিয়ার নীতিগত কর্মসূচিগুলো শিল্পের উন্নয়নের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলো আনছে মূলধন ও কারিগরি অভিজ্ঞতা। শুধু সরঞ্জাম আমদানি ও প্রস্তুত পণ্য রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ বিনিয়োগের চেয়ে মালয়েশীয় সরবরাহকারী, গবেষণা অংশীদারত্ব ও প্রশিক্ষণ যুক্ত প্রকল্প থেকেই সবচেয়ে ভালো ফল আসার সম্ভাবনা বেশি।
বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুই সরকারেরও যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নত প্রযুক্তি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট খাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বানুমানযোগ্য নিয়মকানুন ও স্পষ্ট অনুমোদনপ্রক্রিয়া চায়।
মূল কথা
- সেমিকন্ডাক্টর, এআই, বৈদ্যুতিক যানবাহন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও হালাল পণ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বিস্তৃত সহযোগিতা চাইছে মালয়েশিয়া।
- ২০২৫ সাল নাগাদ দক্ষিণ কোরীয় কোম্পানিগুলো মালয়েশিয়ায় ৪০০টির বেশি প্রকল্পে ১১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে, এতে প্রায় ৫০ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে।
- ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য রেকর্ড ২৭.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
- মেমোরি চিপ, ব্যাটারি, যানবাহন, জীবপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তি রয়েছে।
- চিপ প্যাকেজিং সক্ষমতা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং শীর্ষস্থানীয় হালাল সনদ ব্যবস্থা রয়েছে মালয়েশিয়ার।
- জ্বালানিতে সম্ভাব্য সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন ধারণ এবং পারমাণবিক শক্তির প্রস্তুতি।
- প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ডিজিটাল সেবা, এআই, জীব-অর্থনীতির প্রকল্প ও অন্যান্য উদীয়মান শিল্পে বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে।






