মস্কোর নতুন প্রভাববলয় হয়ে উঠছে স্কুলগুলো
মধ্য এশিয়াজুড়ে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে রাশিয়া। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে আঞ্চলিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত করছে দেশটি। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান যখন নিজেদের জাতীয় পরিচয় জোরদার করছে, তখনই চীন, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোও নিজেদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
সূচিপত্র
- মস্কোর নতুন প্রভাববলয় হয়ে উঠছে স্কুলগুলো
- রাশিয়ার কাছে শিক্ষার গুরুত্ব কেন
- কিরগিজস্তান গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র
- দেশভেদে রুশ ভাষানীতি ভিন্ন
- কাজাখস্তান
- উজবেকিস্তান
- তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান
- জাতীয় পরিচয় বদলে দিচ্ছে শ্রেণিকক্ষ
- চীন ও তুরস্ক কীভাবে প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাচ্ছে
- ভাষাবিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব
- সুযোগ ও স্বায়ত্তশাসনের ভারসাম্য
- মূল কথা
তাজিকিস্তানে এই কৌশল সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০২২ সালে দেশটিতে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের একটি রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের আওতায় রাশিয়ার অর্থায়নে পাঁচটি স্কুল চালু হয়। এর একটি দক্ষিণের শহর বোখতারের স্কুলটির নাম রাখা হয়েছে ১৮ শতকের রুশ বিজ্ঞানী মিখাইল লোমোনোসভের নামে। তিনতলা ভবনটিতে রয়েছে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা এবং চত্বরজুড়ে রাশিয়া ও তাজিকিস্তানের পতাকা।
বোখতারের স্কুলটিতে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। বেশির ভাগ পাঠদান হয় রুশ ভাষায় এবং অনুসরণ করা হয় রাশিয়ার শিক্ষাগত মানদণ্ড। স্কুলের অনুষ্ঠান, প্রতীক ও পাঠ্যক্রমের কিছু অংশেও রুশ সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে।
অনেক পরিবারের কাছে স্কুলগুলোর আকর্ষণ বাস্তব সুবিধায়। রুশ শিক্ষার মাধ্যমে রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাজিকিস্তান বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের ওপর, বিশেষ করে রাশিয়ায় কর্মরতদের ওপর, ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অভিবাসীদের পাঠানো অর্থও দীর্ঘদিন ধরে দেশটির আয়ের বড় অংশ।
মুখতার নামে পরিচয় দেওয়া স্থানীয় এক নির্মাণশ্রমিক সাংবাদিকদের বলেন, তিনি তাঁর মেয়ে ও ছেলেকে বোখতারের স্কুলে ভর্তি করাতে চান, কারণ এতে উচ্চশিক্ষা ও ভালো চাকরির পথ খুলতে পারে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন। পরিবারগুলো সামাজিক অগ্রগতির সুযোগ হিসেবে স্কুলগুলোকে দেখতে পারে, আর মস্কো এগুলোকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার উপায় হিসেবে দেখে, যারা আগামী বছরগুলোতে মধ্য এশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দেবে।
রাশিয়ার কাছে শিক্ষার গুরুত্ব কেন
বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার তুলনামূলক সাশ্রয়ী উপায় হলো শিক্ষা। সড়ক বা জ্বালানি প্রকল্প ভৌত সংযোগ তৈরি করে, আর একটি স্কুল ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা গড়ে তুলতে পারে। বিদেশি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত শিক্ষার্থীরা পরে সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় বা গণমাধ্যমে কাজ করতে পারে এবং সেই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত থাকে।
রুশ কর্মকর্তারা ভাষাটিকে অভিন্ন ইতিহাসের সূত্রে তৈরি সেতু হিসেবে তুলে ধরেন। ব্যবসা, বিজ্ঞান, কূটনীতি ও কারিগরি ক্ষেত্রে রুশ ভাষার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। মধ্য এশিয়ার লাখ লাখ নাগরিক রাশিয়ায় পড়াশোনা বা কাজ করেছেন। তাই জাতিগত রুশ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাইরেও ভাষাটির গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন মধ্য এশীয় রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, কারণ ওই দেশগুলোর জাতীয় ভাষা সব সময় পরস্পরের বোধগম্য নয়।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত গবেষণায় বলা হয়েছে, দুই লাখের বেশি মধ্য এশীয় শিক্ষার্থী রাশিয়ায় পড়াশোনা করে। মস্কো সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পেশাগত কোর্স এবং তরুণ বিশ্লেষক ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের জন্য কর্মসূচিও সমর্থন করে। আলেকসান্দর গরচাকভ পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি ফান্ডের আয়োজনে ‘স্কুল ফর সেন্ট্রাল এশিয়া’ উদ্যোগে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার তরুণ বিশেষজ্ঞরা আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে বক্তৃতা ও আলোচনায় অংশ নেন।
এই কর্মসূচিগুলো এমন প্রভাব তৈরি করে, যাকে নীতিবিশেষজ্ঞরা ‘সফট পাওয়ার’ বলেন। সামরিক চাপ বা সরাসরি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বদলে সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সুনামের মাধ্যমে অন্যদের পছন্দকে প্রভাবিত করার সক্ষমতাকে এই শব্দে বোঝানো হয়। সোভিয়েত আমলের উত্তরাধিকার রাশিয়ার শিক্ষা নীতিকে শক্তি জোগায়। তখন গোটা অঞ্চলে প্রশাসন, উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান ভাষা ছিল রুশ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিরও জবাব দিচ্ছে এই নীতি। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, অবকাঠামো প্রকল্প ও চীনা ভাষার কর্মসূচির মাধ্যমে বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে চীন। তুর্কিভাষী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তুরস্ক। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে ক্রমেই বৈশ্বিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। তাই রাশিয়ার স্কুল নির্মাণ প্রকল্পগুলো মধ্য এশিয়ার নতুন প্রজন্ম বাইরের বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে, তা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ।
কিরগিজস্তান গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র
অঞ্চলে রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অংশীদার হয়ে উঠেছে কিরগিজস্তান। দেশজুড়ে নয়টি আধুনিক কিরগিজ-রুশ স্কুল নির্মাণে সহায়তা করছে মস্কো। এর মধ্যে বিশকেক, ওশ, বাতকেন ও কারাকোলে পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। প্রথম তিনটি ২০২৫ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল।
স্কুলগুলোতে দুই দেশের পাঠ্যক্রম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে পাঠদানের প্রধান ভাষা হবে রুশ। স্নাতকেরা কিরগিজস্তান ও রাশিয়া—দুই দেশেই স্বীকৃত সনদ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের রাশিয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বা দুই দেশের পেশাগত নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া সহজ হতে পারে।
বিশকেকে কিরগিজ-রুশ স্লাভিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পিত ক্যাম্পাস সম্প্রসারণেও অবদান রাখছে রাশিয়া। প্রকল্পটির মূল্য প্রায় ২০ কোটি ডলার। কিরগিজ উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, বিশেষ করে যেসব বিষয়ে পাঠদানের প্রধান ভাষা এখনো রুশ।
বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের তুলনায় রুশ শিক্ষার প্রতি কিরগিজস্তান বেশি উন্মুক্ত। রুশ ভাষার সরকারি মর্যাদা রয়েছে এবং শহুরে কর্মক্ষেত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও জনপ্রশাসনে এর প্রচলন এখনো ব্যাপক। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক সম্পর্কও দৃঢ়। বিপুলসংখ্যক কিরগিজ নাগরিক সেখানে কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারগুলোর আয় ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল কর্মসূচিটি রুশ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাইরেও পৌঁছায়। কিরগিজস্তানের জনসংখ্যায় জাতিগত রুশদের অংশ ছোট হলেও, অনেক জাতিগত কিরগিজ পরিবার রুশ ভাষায় পাঠদানের স্কুল বেছে নেয়, কারণ তারা এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, অভিবাসন ও পেশাগত সম্ভাবনাকে যুক্ত করে দেখে। এই ব্যাপক আবেদন মস্কোকে সংখ্যালঘুদের অধিকারকেন্দ্রিক নীতির চেয়ে বড় পরিসরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়।
দেশভেদে রুশ ভাষানীতি ভিন্ন
প্রতিটি মধ্য এশীয় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে রাশিয়া তার শিক্ষা কৌশল সাজায়। কিছু দেশে ভাষাটির অবস্থান শক্তিশালী, অন্যদিকে কোথাও কোথাও জনজীবনের বড় অংশ থেকে তা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কাজাখস্তান
মধ্য এশিয়ায় রুশভাষী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি কাজাখস্তানে, আর দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। রুশ ও কাজাখ—দুই ভাষারই সরকারি ভূমিকা রয়েছে, যদিও সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজাখের ব্যবহার বাড়িয়েছে। ২৮ মে আস্তানা সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, প্রায় ৬০ হাজার কাজাখ শিক্ষার্থী রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে। তিনি কাজাখস্তানে চালু থাকা রাশিয়ার আটটি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কথাও উল্লেখ করেন।
কাজাখ ভাষার জন্য সিরিলিক বর্ণমালা থেকে ধীরে ধীরে লাতিন হরফে যাওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে আস্তানা। সমর্থকদের মতে, এই সংস্কার জাতীয় উন্নয়নের অংশ। অন্যদিকে রুশ রাজনীতিকেরা কখনো কখনো এ ধরনের পরিবর্তনকে রুশ সংস্কৃতির প্রতি বৈরিতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে উত্তরের যেসব অঞ্চলে রুশ ভাষার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, সেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ভাষা সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার ভারসাম্য সরকারকে রক্ষা করতে হয়।
উজবেকিস্তান
জনজীবনের কেন্দ্রীয় ভাষা হিসেবে উজবেককে প্রতিষ্ঠা করেছে উজবেকিস্তান এবং সরকারি প্রশাসন ও স্কুলে রুশ ভাষার ভূমিকা কমিয়েছে। তা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও অন্যান্য কারিগরি ক্ষেত্রে রুশ ভাষায় শিক্ষার জনপ্রিয়তা রয়েছে। দেশটিতে রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় চালু আছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় শিক্ষার্থী বিনিময় ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
অভিবাসনও ভাষাটির চাহিদা ধরে রাখতে সহায়তা করে। বিপুলসংখ্যক উজবেক নাগরিক কাজের জন্য রাশিয়ায় যান। ফলে কর্মসংস্থান, আইনি প্রক্রিয়া ও দৈনন্দিন জীবনে রুশ ভাষা কাজে লাগে। পরিবারগুলো উজবেক ভাষা প্রসারের নীতিকে সমর্থন করেও অর্থনৈতিক কারণে রুশ ভাষায় শিক্ষা চাইতে পারে।
তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান
মধ্যম অবস্থানে রয়েছে তাজিকিস্তান। তাজিক দেশটির রাষ্ট্রভাষা, আর রুশ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা। গণমাধ্যমে রুশ ভাষার ব্যবহার ব্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এর গুরুত্ব রয়েছে, যদিও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী রুশ ভাষায় পড়াশোনা করে। নতুন পাঁচটি স্কুল এমন একটি দেশে মস্কোর দৃশ্যমান ভূমিকা বাড়িয়েছে, যেখানে শিক্ষা অবকাঠামোতে প্রায়ই পর্যাপ্ত অর্থায়ন হয় না।
রুশ ভাষা থেকে সবচেয়ে বেশি সরে এসেছে তুর্কমেনিস্তান। স্বাধীনতার পর দেশটি লাতিন বর্ণমালা গ্রহণ করে এবং বিদেশি শিক্ষা উদ্যোগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে রুশ ভাষার পাঠদান মূলত রাষ্ট্র অনুমোদিত ব্যবস্থার মধ্যে সীমিত। তুর্কমেন শিক্ষার্থীদের রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগও রয়েছে।
জাতীয় পরিচয় বদলে দিচ্ছে শ্রেণিকক্ষ
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকে মধ্য এশিয়ার প্রতিটি সরকারই জাতীয় ভাষাকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্র গঠন, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং মস্কোর ওপর নির্ভরতা কমানোর আকাঙ্ক্ষা জড়িত। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে নয়, বরং প্রাচীন স্থানীয় সভ্যতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিটি দেশকে তুলে ধরতে জাতীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়।
এই পরিবর্তনে অনেক এলাকায় রুশ ভাষার শিক্ষা কমেছে। তুর্কমেনিস্তানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় রুশ ভাষা প্রায় নেই বললেই চলে। জনপ্রশাসন ও সম্প্রচারে উজবেক ভাষার ব্যবহার বাড়িয়েছে উজবেকিস্তান। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান তুলনামূলক ধীরগতির নীতি নিয়েছে, কারণ বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ও অভিবাসনের ক্ষেত্রে রুশ ভাষা এখনো কার্যকর।
সম্পদের অসমতার কারণে এই রূপান্তর জটিল। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার চেয়ে রুশ ভাষায় পাঠ্যবই ও বিশেষায়িত পরিভাষা বেশি উন্নত। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, আইন ও সাংস্কৃতিক প্রশাসনের কিছু ক্ষেত্রে রুশের প্রাধান্য এখনো রয়েছে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ দেয়, আর বাণিজ্য ও বিনিয়োগের কারণে চীনা ভাষার গুরুত্ব বাড়ছে। তবে কোনো ভাষাই রুশের মতো ব্যাপকভাবে শেখার সুযোগ পায় না।
এর ফলে অঞ্চলের কিছু অংশে ভাষার তিন স্তরের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। জাতীয় ভাষাগুলো পরিচয় ও সরকারি মর্যাদা বহন করে। প্রশাসন, শিক্ষা ও সীমান্তপারের যোগাযোগে রুশ এখনো ব্যবহারিক ভাষা। ইংরেজি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বৈশ্বিক ব্যবসা এবং পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ খুলে দেয়। ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তবে প্রতিটি দেশে পরিবর্তনের গতি আলাদা।
সরকার খুব দ্রুত পরিবর্তন আনলে ভাষানীতিতে সামাজিক ক্ষতিও হতে পারে। রুশ ভাষায় শিক্ষিত বয়স্ক নাগরিকেরা প্রশাসনে আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে পারেন। গ্রামীণ এলাকায় জাতীয় ভাষায় পাঠদানের জন্য শিক্ষক ও উপকরণের ঘাটতি থাকতে পারে। রাশিয়ায় কাজের জন্য রুশ ভাষার ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকেরা ভাষাগত বিধিনিষেধকে সাংস্কৃতিক সংস্কার না ভেবে আয়ের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারেন।
চীন ও তুরস্ক কীভাবে প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাচ্ছে
মধ্য এশিয়ার ভবিষ্যৎ সংযোগ নিয়ে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার মধ্যে এগোচ্ছে রাশিয়ার স্কুল প্রকল্পগুলো। চীনের পদ্ধতির কেন্দ্রে রয়েছে অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি ও অভিন্ন উন্নয়নের ধারণা। চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথকে বেইজিং আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও বৃহত্তর ইউরেশীয় বাণিজ্যের পথ হিসেবে তুলে ধরে। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃত্তি ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটও চীন সম্পর্কে পরিচিতি বাড়াচ্ছে।
কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কের ওপর ভর করে তুরস্ক। নিজেদের দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগ থাকা আধুনিক অংশীদার হিসেবে তুরস্ককে দেখে এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা কর্মসূচি প্রভাব তৈরি করেছে।
পশ্চিমা সরকার ও সংস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম কর্মসূচি, নাগরিক সমাজ প্রকল্প ও ইংরেজি ভাষার শিক্ষায় সহায়তা করে। শহরের বহু তরুণের কাছে ইংরেজি বৈশ্বিক কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও বিদেশে পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত। রুশ ভাষার শিকড় গভীর হলেও, ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর অবস্থান আর প্রশ্নাতীত নয়।
বর্তমান সুযোগকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পর্কের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাশিয়ার বড় সুবিধা। মধ্য এশিয়ার অভিবাসীরা ইতিমধ্যেই রাশিয়ায় যাতায়াত করেন, আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মস্কোর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে এবং অনেক পরিবার ঘরে বা কর্মক্ষেত্রে রুশ ভাষা ব্যবহার করে। চীনের শক্তি তার বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ অবকাঠামোতে মনোযোগ। মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে বৃত্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আদায়ে এই প্রতিযোগিতা কাজে লাগাতে পারে।
ভাষাবিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব
মস্কোতে রুশ ভাষা নিয়ে বিতর্ককে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ ভাষানীতির চেয়েও বড় বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিরগিজস্তানে সোভিয়েত আমলের নাম থাকা বিশকেকের জেলাগুলোর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের পর রুশ আইনপ্রণেতা ও ভাষ্যকারেরা অভিযোগ করেন, দেশটি অভিন্ন ইতিহাস মুছে ফেলছে এবং রুশভাষীদের প্রতি বৈষম্য করছে।
জনপ্রশাসনে কিরগিজ ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর আলোচনা হলেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কাজাখস্তানে লাতিন হরফে যাওয়ার পরিবর্তন নিয়েও রুশ রাজনীতিকেরা সমালোচনা করেছেন। এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র গঠনের নিয়মিত পদক্ষেপগুলো আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যেসব সরকার রুশ বাণিজ্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল।
মধ্য এশিয়ার নেতাদের চ্যালেঞ্জ হলো, রুশভাষী নাগরিকদের রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না করে জাতীয় ভাষার প্রসার ঘটানো। ধীরগতির পদ্ধতিতে কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক, তুর্কমেন ও উজবেক ভাষার সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমে ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।
এই বিতর্কে রুশভাষীদের একক রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পায়। অনেক পরিবার ব্যবহারিক কারণে রুশ ভাষার শিক্ষা বেছে নেয়, কিন্তু নিজেদের রাশিয়ার রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ মনে করে না। নতুন স্কুলে সন্তানের জন্য আসন চাওয়া কোনো অভিভাবকের ভাবনায় ভূরাজনীতির বদলে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ, অভিবাসন বা পেশাগত প্রশিক্ষণ থাকতে পারে।
তবে ভাষা মানুষের কাছে পৌঁছানো তথ্য ও তারা যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখে, সেগুলোকেও প্রভাবিত করে। টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও শিক্ষাসহ বৃহৎ গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মস্কোর প্রবেশাধিকার তৈরি করে রুশ ভাষা। মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করলেও, এই প্রবেশাধিকার ইতিহাস ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে রাশিয়ার বয়ানকে সমর্থন জোগাতে পারে।
সুযোগ ও স্বায়ত্তশাসনের ভারসাম্য
মধ্য এশিয়ার স্কুলগুলোতে রাশিয়ার বিনিয়োগ প্রকৃত জনচাহিদা পূরণ করে। অনেক পরিবার আধুনিক ভবন, ভালো শিক্ষক, শক্তিশালী বিজ্ঞান কর্মসূচি এবং উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার নির্ভরযোগ্য পথ চায়। বিশেষ করে যেখানে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থ বা বিশেষায়িত উপকরণের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে রুশ প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সুযোগ দিতে পারে।
একই প্রকল্পগুলোর কৌশলগত উদ্দেশ্যও রয়েছে। রুশ ভাষায় পড়ানো ও রাশিয়ার মানদণ্ড অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে মস্কো মধ্য এশিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখা অভিন্ন পেশাগত পরিসর বজায় রাখতে সহায়তা করে। এসব শিক্ষার্থীর কেউ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা বা বিশ্লেষক হতে পারে, আর তাদের শিক্ষা ও যোগাযোগ সেই সম্পর্ককে সক্রিয় রাখে।
মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো শিগগিরই রুশ ভাষা ছেড়ে দেবে না। অভিবাসন, বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ ও কারিগরি শিক্ষার কারণে এর চাহিদা বেশি। তবে শিক্ষা ও জনযোগাযোগে রাশিয়ার স্থায়ী একচেটিয়া কর্তৃত্বও তারা মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় ভাষার উত্থান স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে, আর ইংরেজি, চীনা ও তুর্কি ভাষা মস্কোর সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিকল্প দিচ্ছে।
সম্ভবত ভবিষ্যতের মডেল হবে প্রতিযোগিতামূলক বহুভাষিকতা। বিশেষ করে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানে রুশ ভাষা কার্যকর থাকবে, পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় ভাষার কর্তৃত্ব বাড়বে। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক পড়াশোনার সুযোগ যেখানে তৈরি হবে, সেখানে ইংরেজি ও চীনা ভাষার প্রসার ঘটবে। জনসংখ্যার ধরন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা অনুসারে দেশভেদে এর ফল ভিন্ন হবে।
মূল কথা
- প্রায় ১৫ কোটি ডলারের একটি প্রকল্পের আওতায় তাজিকিস্তানে রুশ ভাষার পাঁচটি স্কুল চালু করেছে রাশিয়া।
- তাজিকিস্তানের পাঁচটি স্কুলে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী পড়ে। স্কুলগুলো রাশিয়ার শিক্ষাগত মানদণ্ড অনুসরণ করে।
- কিরগিজস্তানে রুশ ভাষার নয়টি নতুন স্কুল এবং বিশকেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় একটি ক্যাম্পাস নির্মাণে সহায়তা করছে মস্কো।
- ভ্লাদিমির পুতিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ হাজার কাজাখ শিক্ষার্থী রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে।
- অভিবাসন, কারিগরি শিক্ষা, ব্যবসা ও মধ্য এশিয়াজুড়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রুশ ভাষা এখনো মূল্যবান।
- স্বাধীনতা ও স্থানীয় পরিচয় জোরদার করতে সরকারগুলো উদ্যোগ নেওয়ায় জাতীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ছে।
- চীন, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বাইরের শক্তি নিজেদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি বিস্তৃত করছে।
- রাশিয়ার স্কুল নেটওয়ার্ক পরিবারগুলোকে ব্যবহারিক সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মস্কোর দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক প্রভাবও ধরে রাখছে।






