হঠাৎ কোটা পূরণ, অনিশ্চয়তায় রেস্তোরাঁ শিল্প
জাপান আরেকটি গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলো রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থীর অপেক্ষায় রয়েছে। তবে দেশটির জনপ্রিয় অনেক খাবারের দোকান কর্মীসংকটে পড়েছে, যার সঙ্গে ক্রেতার চাহিদার তেমন সম্পর্ক নেই; বরং অভিবাসন নীতিই এর মূল কারণ। ১৩ এপ্রিল জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ খাদ্যসেবা খাতে টাইপ ১ নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী ভিসার নতুন আবেদন গ্রহণ বন্ধ করে। ২০২৯ সালের মার্চে শেষ হতে যাওয়া পাঁচ বছরের জন্য খাতটিকে এ ধরনের ৫০ হাজার ভিসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল; সেই সীমা প্রায় পূরণ হয়ে আসায় এ স্থগিতাদেশ জারি হয়। এ পদক্ষেপে চেইন রেস্তোরাঁগুলোকে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে হয়েছে, চাকরির প্রস্তাব পাওয়া শিক্ষার্থীদের আশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদেশি কর্মীদের জন্য প্রবেশপথ এবং আগত পর্যটকদের কাছে জাপানের পরিচিতি তুলে ধরার মাধ্যম হয়ে ওঠা এই খাতের জন্য এ স্থগিতাদেশ তীব্রভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে, বাজারের চাহিদার তুলনায় নীতি প্রণয়নের গতি অনেক ধীর হতে পারে।
সূচিপত্র
জাপানি কর্মীরা যেসব শিল্পে আর কাজ করতে চান না, সেসব খাতে বিদেশি কর্মীদের যুক্ত করতে ২০১৯ সালে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচি চালু হয়। এর টাইপ ১ ভিসায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কাজ করা যায়, তবে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাসের সুযোগ নেই। টাইপ ২ ভিসায় দীর্ঘমেয়াদে থাকা যায় এবং আলাদা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে স্থায়ী বসবাসের পথ খুলতে পারে। ২০২৪-২০২৯ মেয়াদের শেষে ১৯টি খাতে আট লাখের বেশি বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার; খাদ্যসেবা খাতের জন্য সীমা ৫০ হাজার। অভিবাসন পরিষেবা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে খাদ্যসেবা খাতে টাইপ ১ ভিসাধারী কর্মী ছিলেন প্রায় ৪৬ হাজার। মে মাসের মধ্যে নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই ১৩ এপ্রিল থেকে নতুন যোগ্যতার সনদ দেওয়া স্থগিত করে সংস্থাটি।
রেস্তোরাঁ চেইনগুলোর জন্য এ ঘোষণা এসেছিল উদ্বেগজনকভাবে অল্প সময়ের নোটিশে। প্রায় ২০০টি শাখার একটি রামেন প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের পূর্ণকালীন কর্মীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদেশি; সংখ্যায় ৭৫ জন। নির্ধারিত সময়সীমার আগে তড়িঘড়ি করে আরও ২০ জনকে নিয়োগ দিলেও, পড়াশোনা শেষে যোগ্য হবেন বলে আশা করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের চাকরির প্রস্তাব আগেই দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই প্রস্তাবগুলো অনিশ্চিত। নুডলস চেইন ইউদেতারোর ৬৬০ জন পূর্ণকালীন কর্মীর মধ্যে প্রায় ৫০০ জনেরই এসএসডব্লিউ ভিসা রয়েছে। ফাস্ট ফুড প্রতিষ্ঠান মোস ফুড সার্ভিস প্রকাশ্যে বলেছে, কার্যক্রম সচল রাখতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পারিবারিক রেস্তোরাঁ পরিচালনাকারী স্কাইলার্ক হোল্ডিংস মিয়ানমারের মতো দেশের ৩২ জন বিনিময় শিক্ষার্থীকে খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে এবং জুনে অনুষ্ঠেয় টাইপ ১ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তাদের সহায়তা করছিল। প্রতিষ্ঠানটি এখন আশঙ্কা করছে, ওই কর্মীরা দেশে ফিরে গেলে আর নাও ফিরতে পারেন।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক নাকাগাওয়া তাকাহিরো সতর্ক করে বলেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানকে বার্ষিক নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
পুরো শিল্পেই কর্মী পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে, আর নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচি প্রস্তুত কর্মী নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক স্থগিতাদেশের কারণে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে ওই পরিকল্পনা নতুন করে বিবেচনা করতে হতে পারে।
কারখানার মেঝে থেকে রামেনের কাউন্টার
চিবা প্রিফেকচারের একটি রামেন শাখায় কর্মরত ভিয়েতনামি কর্মী হ্যাংয়ের মতো মানুষের কাছে এ স্থগিতাদেশ কোনো বিমূর্ত নীতিগত বিতর্ক নয়। প্রায় দশ বছর আগে আইচি প্রিফেকচারের একটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় কারিগরি ইন্টার্ন প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে তিনি জাপানে আসেন। ভালো বেতন এবং ছেলেকে সহায়তা করার সুযোগ থাকায় ২০২২ সালে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী মর্যাদায় তিনি আবার জাপানে ফেরেন। ভিয়েতনামের অনলাইন চাকরির বাজারে জাপানের খাদ্যসেবা খাত জনপ্রিয়, কারণ শহরের রেস্তোরাঁগুলোতে বিপুলসংখ্যক কর্মী দরকার এবং কারখানা বা নির্মাণকাজের তুলনায় এ কাজকে নিরাপদ ও কম কষ্টসাধ্য মনে করা হয়। হ্যাং বলেন, প্রতিদিন জাপানি ভাষা চর্চার সুযোগকে তিনি মূল্য দেন।
রেস্তোরাঁয় কাজ করতেই আমার বেশি ভালো লাগে, কারণ এখানে জাপানি ভাষা বেশি ব্যবহার করতে পারি। কারখানায় কাজ করার সময় তেমন সুযোগ ছিল না।
তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, এই ভিসা কীভাবে কর্মী ও নিয়োগকর্তা—দুই পক্ষেরই অবলম্বন হয়ে উঠেছে। অভিবাসীদের জন্য এটি বৈধ মর্যাদা, নিয়মিত বেতন এবং ভাষাদক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ দেয়। জাপানি কর্মীর সংখ্যা ক্রমে কমে আসা অর্থনীতিতে রেস্তোরাঁগুলোকে প্রস্তুত কর্মী জোগায় এটি। হ্যাংয়ের মতো কর্মীরা কেন খাদ্যসেবা খাতের কোটা সবার আগে পূরণ করেছে, তাও তাঁদের আগমন ব্যাখ্যা করে। অন্য খাতগুলো কারিগরি ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় কর্মী নিতে পারলেও রেস্তোরাঁগুলো সে সুযোগ পায় না। ফলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের কয়েকটি বৈধ পথের একটি হলো নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী ভিসা।
কোটা কেন আগেভাগে শেষ হলো
কর্মসূচির প্রথম ধাপে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত, মহামারির কারণে রেস্তোরাঁর চাহিদা কমে যায় এবং নিয়োগও সীমিত থাকে। ওই ধাপে রেস্তোরাঁ খাতে ৫৩ হাজার কর্মীর প্রয়োজন হবে বলে সরকার প্রথমে ধারণা করেছিল, কিন্তু প্রকৃত চাহিদা নেমে আসে প্রায় ৩৫ হাজারে। বিভিন্ন খাতের উদ্বৃত্ত ও ঘাটতির মধ্যে ভারসাম্য রাখে এই ব্যবস্থা; তাই দ্বিতীয় ধাপেও খাদ্যসেবা খাতের সীমা ৫০ হাজার রাখা হয়। সীমান্ত বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর আগত পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে গেলে চাহিদা হু হু করে বাড়ে। পাঁচ বছরে নয়, মাত্র দুই বছরেই কোটা শেষ হয়ে যায়।
বিদেশি কর্মী নিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরামর্শ দেওয়া কনসালট্যান্ট শোইচিরো ইকেবে বলেন, মহামারির পর পুনরুদ্ধারের কথা মাথায় রেখে কখনোই এই সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
৫০ হাজার কর্মীর সীমা খাদ্যসেবা খাতের বিপুল চাহিদা যথাযথভাবে প্রতিফলিত করেনি।
তিনি আরও বলেন, মহামারি না হলে সীমাটি আরও আগেই পূরণ হয়ে যেত।
জাতীয় জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইউ কোরেকাওয়া আরেকটি দিক তুলে ধরেন। নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচিতে নিয়োগকর্তাদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কাগজপত্রের জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। তাই আবেদনের দ্রুত বৃদ্ধি বিদেশি কর্মী নিয়োগের নিছক পছন্দের চেয়ে প্রকৃত চাহিদাই বেশি নির্দেশ করে।
কতজন কর্মী নেওয়া হবে, তার পূর্বাভাস দিতে সরকার ভুল করেছে। সম্ভাব্য সংখ্যাকে অনমনীয় সীমা হিসেবে না দেখে, কর্মী নেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ওই সংখ্যাকে সাধারণ লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
অন্য যোগ্য খাতগুলোর চিত্র ভিন্ন। নির্মাণ ও সেবাযত্ন খাত এখনো তাদের নির্ধারিত সীমা থেকে অনেক নিচে রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যা বিদেশি কর্মীর সার্বিক ঘাটতি নয়; বরং অনমনীয় কোটা এবং প্রতিটি শিল্পের প্রকৃত চাহিদার মধ্যে অমিল।
রাজনৈতিক চাপ ও অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা
জাপানের অভিবাসন রাজনীতিতে লক্ষণীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সময়েই এই স্থগিতাদেশ এসেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রশাসন অভিবাসনকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বিষয় হিসেবেও দেখেছে। নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী কর্মসূচির তদারকির দায়িত্বে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত আইনপ্রণেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী কিমি ওনোদা ও হায়াতো সুজুকি। ২০২৫ সালের উচ্চকক্ষ নির্বাচনের পর কট্টর ডানপন্থী সানসেইতো দলের প্রভাব বেড়েছে। এতে বিদেশিদের বিষয়ে আরও কঠোর বক্তব্য দেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওপর চাপ বেড়েছে। রক্ষণশীল ভোটারদের কণ্ঠ আরও জোরালো হওয়ায় কোটায় সামান্য পরিবর্তন করাও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিছু ডানপন্থী রাজনীতিকের দাবি, এসএসডব্লিউ কর্মসূচি স্থায়ী বসবাসের জন্য পেছনের দরজা হিসেবে কাজ করছে। যদিও টাইপ ১ ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং এ ভিসায় সরাসরি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা যায় না। টাইপ ২-এ যেতে হলে এমন একটি পরীক্ষায় পাস করতে হয়, যার পাসের হার প্রায় ৫০ শতাংশ। পরীক্ষায় পাস করলেও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিশ্চিত হয় না।
জাতিগত সংখ্যালঘু উদ্যোক্তাদের জন্য ভিসার আলাদা ফাঁদ
কঠোরতা কর্মীদের ভিসার বাইরেও ছড়িয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাপান ব্যবসা ব্যবস্থাপক ভিসার নিয়ম সংশোধন করে। এতে মূলধনের শর্ত ৫০ লাখ ইয়েন থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি ইয়েন করা হয় এবং একজন পূর্ণকালীন জাপানি, স্থায়ী বাসিন্দা বা দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দা কর্মী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়। আবেদনকারী বা কর্মীদের জেএলপিটি এন২ স্তরের জাপানি ভাষাদক্ষতাও দেখাতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীর তিন বছরের ব্যবসা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকতে হবে। পরিবর্তনের পর প্রতি মাসে গড় আবেদনসংখ্যা প্রায় ১,৭০০ থেকে কমে প্রায় ৭০-এ নেমেছে বলে জানা গেছে; পতন ৯৬ শতাংশ।
নতুন নিয়মে জাতিগত সংখ্যালঘুদের রেস্তোরাঁ মালিকেরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বছরের মে মাসে টোকিওর এক সমাবেশে সাইতামা প্রিফেকচারে ভারতীয় রেস্তোরাঁর মালিক মণীশ কুমার তাঁর ভিসা নবায়নের ব্যর্থ চেষ্টার কথা জানান। তিনি ৩০ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন। তাঁর রেস্তোরাঁটি ১৮ বছর ধরে চালু ছিল।
আমার সন্তানদের জন্ম জাপানে, তারা এখানেই বড় হয়েছে। তারা শুধু জাপানি ভাষায় কথা বলে, তাদের সব বন্ধুই জাপানি। কিন্তু আমাদের বলা হচ্ছে ভারতে ফিরে যেতে।
এদোগাওয়া ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জগমোহন চন্দ্রানি সতর্ক করেছেন, কয়েক দশক ধরে গড়ে তুলতে সহায়তা করা সম্প্রদায়টি ভেঙে পড়তে শুরু করতে পারে। ভিসাকে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করা কাগুজে প্রতিষ্ঠান ঠেকাতেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে সরকার যুক্তি দিয়েছে। মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে কিমি ওনোদা বলেন, নতুন নিয়মে অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ দূর হয়েছে।
ব্যবসা ব্যবস্থাপকের মর্যাদাকে অভিবাসনের উপায় হিসেবে অপব্যবহার করা হচ্ছে—এমন উদ্বেগ আমরা কিছুটা হলেও দূর করতে পেরেছি।
সমালোচকেরাও মানেন, অপব্যবহার ঠেকানো বৈধ লক্ষ্য। তবে তাঁদের যুক্তি, সবার জন্য একই মূলধনের শর্ত একটি ভোঁতা হাতিয়ার, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা স্থানীয় রেস্তোরাঁ এবং কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে বিবেচনা করে। বেসরকারি খাতের জরিপে দেখা গেছে, গত বছর বিদেশি মালিকানাধীন খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার সংখ্যা প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। ২৯৯টি বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর করা এক জরিপে ৪৫ শতাংশের বেশি জানিয়েছে, নতুন নিয়ম তাদের কার্যক্রমে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
কঠোর নীতির অদৃশ্য মূল্য
খাদ্যসেবা খাতে স্থগিতাদেশ জারির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শ্রমবাজারে টান পড়তে শুরু করে। শ্রমবাজারের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যসেবা খাতে নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী ভিসাধারী খুঁজে চাকরির বিজ্ঞাপন দুই মাসে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এসব কর্মীর জন্য দেওয়া গড় বার্ষিক বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার ইয়েন বেড়ে ৩৩ লাখ ৪০ হাজার ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। অনেক নিয়োগকর্তা যা আশা করেছিলেন, ফল হয়েছে তার উল্টো: একই সঙ্গে কর্মীর প্রাপ্যতা কমেছে এবং শ্রমব্যয় বেড়েছে।
এ ঘাটতি বিশেষভাবে বেদনাদায়ক, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা শুধু শিক্ষানবিশ পর্যায়ের থালা-বাসন ধোয়ার কর্মী নন। তাঁদের অনেকে মূল কর্মীবাহিনীর অংশ; উপকরণ অর্ডার করা, কাজের পালা নির্ধারণ এবং নতুনদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব সামলান। তা সত্ত্বেও তাঁরা প্রায়ই জাপানি সহকর্মীদের চেয়ে কম বেতন পান। প্রযুক্তির সাহায্যে ঘাটতি পূরণের চেষ্টাও আগেই করেছে এই শিল্প। শিল্প সংগঠনগুলো খাবার পরিবেশনের রোবট, মোবাইল অর্ডার এবং স্বয়ংক্রিয় বিল পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর প্রচার করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্যতামূলক অবসরের বয়স তুলে দিয়েছে এবং আরও বয়স্ক কর্মী নিয়োগ করেছে। তবু এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট হয়নি।
কিছু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, বৈধ পথ বন্ধ থাকলে রেস্তোরাঁগুলো অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে অভিবাসী কর্মীরা শোষণের শিকার হবেন এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হবে। খাদ্যসেবা খাতে এসএসডব্লিউ কর্মসূচি তদারককারী কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আপাতত সরকার সর্বোচ্চ সীমা সংশোধন করবে না, কারণ উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। রেস্তোরাঁ পরিচালকেরা এর সঙ্গে জোরালোভাবে দ্বিমত পোষণ করছেন।
জাপান একা নয়: বিশ্বজুড়ে কর্মীসংকট
জাপানের এই সংকট বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ। বিশ্বজুড়ে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পর্যটনের পুনরুত্থানে আতিথেয়তা খাতে কর্মীসংকট তৈরি হচ্ছে। জার্মানি ‘মেক ইট ইন জার্মানি’ প্রচারের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করছে এবং সরবরাহব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি পেশার কর্মীদের জন্য আসার পথ সহজ করেছে। স্পেন ইতিমধ্যে দেশে থাকা অভিবাসীদের নিয়মিত মর্যাদা দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য পর্যটন, কৃষি ও নির্মাণ খাতে তাঁদের যুক্ত করা। আতিথেয়তা শিল্পের খাদ্য সরবরাহশৃঙ্খল সচল রাখতে মৌসুমি কৃষিশ্রমিক আনার জন্য গ্রিস মিসরের মতো দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে কর্মী নেওয়ার বার্ষিক কোটা নির্ধারণকারী ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে ইতালি আরও বেশি পর্যটন ও সেবামূলক চাকরিকে এর আওতায় এনেছে।
২০২৫ সাল নাগাদ জাপানে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি এবং আরেকটি রেকর্ড। রাজনৈতিক আবহ কঠোর হয়ে উঠলেও অর্থনীতি বিদেশি শ্রমের ওপর কতটা নির্ভরশীল, এই সংখ্যা তা তুলে ধরে। চ্যালেঞ্জ হলো, পর্যটনের সাফল্যই কর্মীর চাহিদার ওপর চাপ তৈরি করে। প্রতিটি নতুন ফ্লাইট, হোটেল ও রামেনের দোকানের জন্য কর্মী দরকার; আর জনসংখ্যা কমতে থাকা সমাজে তাঁদের ক্রমেই বিদেশ থেকে আসতে হচ্ছে।
ধনী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকসংকট অভিবাসন নীতিকে নতুন রূপ দিচ্ছে। ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোতে পর্যটন খাতের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার অসম রয়ে গেছে। ভ্রমণের চাহিদা ফেরার পরও অনেক গন্তব্যে কর্মী নিয়োগে সমস্যা হচ্ছে। আতিথেয়তা শিল্প বিশেষভাবে ঝুঁকিতে, কারণ এটি বিপুলসংখ্যক সম্মুখসারির কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। কর্মীর ঘাটতি সেবার মান, পরিচালন দক্ষতা ও দর্শনার্থীদের সন্তুষ্টিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এশিয়ার অন্য অর্থনীতিগুলোও একই চাপের মুখে। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর—সবাই আতিথেয়তা, বয়স্কদের সেবাযত্ন ও নির্মাণ খাতে বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। জনমতের উদ্বেগ সামলে কীভাবে সেবা সচল রাখা যায়, তা নিয়ে এসব দেশও হিমশিম খাচ্ছে। জাপানের সিদ্ধান্তের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হবে, কারণ এর প্রভাব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন বাজারে পড়বে এবং দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে সুশৃঙ্খল, যদিও সীমাবদ্ধতাপূর্ণ, অভিবাসন ব্যবস্থাপনার আদর্শ হিসেবে দেখা হয়েছে।
আরও কার্যকর ব্যবস্থা কেমন হতে পারে?
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে নন। তবে তাঁরা বলেন, মহামারির সময় নির্ধারিত স্থির কোটা মহামারি-পরবর্তী অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। কোরেকাওয়া ও অন্যরা অনমনীয় সীমার বদলে চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। আরও সাড়াদানক্ষম ব্যবস্থায় এ কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে খাদ্যসেবার মতো কিছু খাতে অন্যদের তুলনায় অনেক জরুরিভাবে কর্মী দরকার।
একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে, ধীরগতির খাতের অব্যবহৃত কোটা সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া খাতে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া। আরেকটি উপায় হলো, ব্যবসা ব্যবস্থাপক ভিসার আবেদনকারীদের বিচার করতে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের রেকর্ড, কর পরিশোধ ও কর্মসংস্থানের চর্চা বিবেচনা করা; শুধু তিন কোটি ইয়েনের মূলধনসীমার ওপর নির্ভর না করা। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত ছোট জাতিগত রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে আরও উপযোগী পর্যালোচনা পদ্ধতি থাকলে কাগুজে প্রতিষ্ঠান ঠেকানোর পাশাপাশি সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাবও এড়ানো যেতে পারে।
শিল্প খাতের কিছু পর্যবেক্ষক জাপানের বর্তমান সংকটকে ‘অসম্ভব ত্রয়ী’ বলে বর্ণনা করেন: জনসংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকলে সস্তা দৈনন্দিন সেবা, বাড়তে থাকা মজুরি এবং কঠোর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি একসঙ্গে বজায় রাখা যায় না। ১৯৯০-এর দশকের পর দীর্ঘ স্থবিরতার সময় জাপান কার্যত কম দাম ও কম অভিবাসনকেই বেছে নিয়েছিল। মজুরি মোটামুটি স্থবির থাকলেও দৈনন্দিন সেবা সাশ্রয়ী থাকায় জীবনযাত্রার মান স্বস্তিকর ছিল। মূল্যস্ফীতি ফিরে আসা, উপকরণের খরচ বৃদ্ধি এবং কর্মীবাহিনী সংকুচিত হওয়ায় সেই ভারসাম্য এখন ভেঙে পড়ছে। বিদেশি কর্মীদের শুধুই সহজে বাদ দেওয়া যায় এমন শ্রমশক্তি হিসেবে না দেখার ভবিষ্যতের জন্যও রেস্তোরাঁ শিল্পকে প্রস্তুত হতে হবে। ব্যবস্থাপকদের প্রশিক্ষণ, ভালো বেতন এবং উন্নত কর্মপরিবেশ জাপানি ও বিদেশি—উভয় ধরনের কর্মীর কাছেই এই খাতকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। বর্তমান স্থগিতাদেশ দীর্ঘস্থায়ী হলে, জাপানের যখন বিশ্বকে স্বাগত জানাতে কম নয়, আরও বেশি কর্মী দরকার, তখনই এই শিল্পকে পিছিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সারকথা
- ২০২৪-২০২৯ মেয়াদের জন্য নির্ধারিত ৫০ হাজারের কোটা প্রায় পূরণ হওয়ায় জাপান ১৩ এপ্রিল ২০২৬ থেকে খাদ্যসেবা খাতে টাইপ ১ নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী ভিসার নতুন আবেদন স্থগিত করেছে।
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্যসেবা খাতে টাইপ ১ ভিসাধারী কর্মী ছিলেন প্রায় ৪৬ হাজার; মে মাসের মধ্যে কোটা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
- হঠাৎ স্থগিতাদেশে রেস্তোরাঁ চেইনগুলো নিয়োগ স্থগিত, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দেওয়া চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
- মহামারির সময় কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল; আগত পর্যটনের দ্রুত পুনরুদ্ধার তখন হিসাবে নেওয়া হয়নি।
- তাকাইচি প্রশাসন সামগ্রিকভাবে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা এনেছে। এর মধ্যে ব্যবসা ব্যবস্থাপক ভিসার নিয়মও রয়েছে, যা দীর্ঘদিনের জাতিগত সংখ্যালঘুদের রেস্তোরাঁকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
- স্থগিতাদেশের পর এসএসডব্লিউ ভিসাধারীদের জন্য চাকরির বিজ্ঞাপন ও রেস্তোরাঁর পদে বেতন দ্রুত বেড়েছে; ফলে কর্মীসংকটের পাশাপাশি খরচও বেড়েছে।
- জার্মানি, স্পেন, গ্রিস ও ইতালিসহ অন্য দেশগুলোও পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের কর্মীসংকট মেটাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়াচ্ছে।






