‘অ্যানিমে প্রভাব’ বদলে দিচ্ছে ফিলিপাইনের ভ্রমণপ্রবণতা
টানা স্ট্রিমিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের উন্মাদনা এবং প্রিয় গল্পের জগতে পা রাখার আকাঙ্ক্ষায় ফিলিপিনো ভ্রমণকারীরা এখন এশিয়ায় অ্যানিমে-প্রভাবিত পর্যটনের অন্যতম উৎসাহী চালিকাশক্তি। অনলাইন ভ্রমণ বুকিং প্ল্যাটফর্ম ট্রিপ ডটকমের ১৮ মে তারিখের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অ্যানিমে, মাঙ্গা ও এ-সংশ্লিষ্ট কমিকে দেখানো গন্তব্য খুঁজতে ফিলিপিনোদের অনুসন্ধান আগের বছরের তুলনায় ১৫৫ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়াজুড়ে বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ এই পরিসংখ্যান। একই সময়ে অ্যানিমে ও কমিকস-সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে সামগ্রিক অনুসন্ধান বেড়েছে ১৯৫ শতাংশ।
সূচিপত্র
‘অ্যানিমে পর্যটন’ বলে পরিচিত এই খাতের শীর্ষ উৎসবাজার হিসেবে এখন দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, তাইওয়ান ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি রয়েছে ফিলিপাইনও। ট্রিপ ডটকম দেশটিকে এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল বহির্মুখী ভ্রমণবাজারগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই পরিবর্তনে যেমন জাপানি অ্যানিমেশনের সাংস্কৃতিক বিস্তারের প্রতিফলন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তরুণ ও ডিজিটাল সংযোগে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতারও পরিচয়।
ট্রিপ ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ করে ফিলিপাইন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে উৎসাহী অ্যানিমে-ভক্ত সম্প্রদায়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। তরুণ ও ডিজিটাল সংযোগে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠী এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন ভক্ত-সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।’
এই ঘটনা আর অনলাইন ফোরাম বা ভক্তদের আঁকা ছবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাস্তব ভ্রমণসূচি, ট্রাভেল এজেন্সির প্যাকেজ ও হোটেল বুকিং বৃদ্ধিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফিলিপাইনে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত কাজুয়া এন্দো পরিবর্তনটি সরাসরি দেখেছেন। তিনি বলেন, গত বছর প্রায় ৯ লাখ ফিলিপিনো জাপান ভ্রমণ করেছেন, যা এক দশকেরও বেশি আগে প্রায় ১ লাখের তুলনায় অনেক বেশি। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে অ্যানিমে একমাত্র কারণ না হলেও, এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক সংযোগ ভ্রমণের শক্তিশালী প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে।
স্ট্রিমিং পর্দা থেকে অ্যানিমের পবিত্র স্থান
‘সেইচি জুনরেই’ কথাটির মোটামুটি অর্থ ‘পবিত্র স্থানে তীর্থযাত্রা’। প্রিয় শো ও মাঙ্গায় দেখা যায় এমন স্থান ঘুরে আসা অ্যানিমে-ভক্তদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। একসময় মূলত জাপানের ভেতরে সীমিত এই নীরব উপসংস্কৃতি এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ভক্তরা ধর্মীয় স্থান খুঁজছেন না। বরং তাঁরা নির্দিষ্ট রাস্তা, রেলস্টেশন, ক্যাফে ও প্রাকৃতিক দৃশ্যে যাচ্ছেন, যা অ্যানিমেটেড চরিত্রদের সেখানে দেখা যাওয়ার কারণে পরিচিতি পেয়েছে।
এর অন্যতম প্রতীকী উদাহরণ টোকিওর দক্ষিণে উপকূলীয় শহর কামাকুরার কামাকুরা কোকোমায়ে রেলক্রসিং। সাধারণ দেখতে এই মোড়টি ‘স্ল্যাম ডাঙ্ক’–এর মাধ্যমে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ১৯৯০-এর দশকে বাস্কেটবলভিত্তিক এই মাঙ্গা ও অ্যানিমে সিরিজটি ফিলিপাইনসহ এশিয়াজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল। এখন দর্শনার্থীরা অ্যানিমের সূচনাদৃশ্যটি আবার ধারণ করতে সেখানে সারিবদ্ধ হন। দৃশ্যটিতে মূল চরিত্রকে পেছনে সমুদ্র রেখে রেলক্রসিং পার হতে দেখা যায়। বিদেশি ভক্তদের জন্য জায়গাটি অবশ্যদ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে; তাঁদের অনেকেই ফিলিপাইন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য এলাকার।
টোকিওতে আকিহাবারা ইলেকট্রিক টাউন ও ইকেবুকুরো এলাকায় হোটেল বুকিং বাড়ছে। ইলেকট্রনিকস, অ্যানিমে পণ্যসামগ্রী ও ‘ওতাকু’ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে আকিহাবারা বিখ্যাত। অন্যদিকে, অ্যানিমে-ভিত্তিক অনুষ্ঠান, দোকান ও নারীভক্তদের সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইকেবুকুরো। ট্রিপ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকং ও তাইওয়ানের ভ্রমণকারীদের কারণে এসব এলাকায় হোটেল বুকিং বছরে গড়ে ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই পণ্যসামগ্রী, থিমভিত্তিক ক্যাফে ও ছবি তোলার সুযোগের টানে ফিলিপিনো ভক্তরাও এই যাত্রায় যোগ দিচ্ছেন।
এই চাহিদার জবাবে খাতটি বাছাই করা অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। ট্রিপ ডটকম এখন অ্যানিমে ও মাঙ্গাভিত্তিক ভ্রমণ আয়োজন করছে; এর মধ্যে রয়েছে ‘স্ল্যাম ডাঙ্ক’ তীর্থযাত্রা এবং কামাকুরায় এক দিনের ভ্রমণ। জনপ্রিয় সিরিজের অনুপ্রেরণায় তৈরি থাকার ব্যবস্থাও প্রচার করছে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো। এতে ভক্তরা দিনের বেলায় দর্শনীয় স্থান ঘোরার পাশাপাশি যে জায়গায় রাত কাটান, সেখানেও প্রিয় কাহিনির আবহ উপভোগ করতে পারেন। ট্রিপ ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ভক্তরা এখন আর শুধু অনলাইনে অ্যানিমে দেখছেন না। প্রিয় গল্পের জগৎ নিজের চোখে দেখতে তাঁরা ভ্রমণ করছেন।’
পাসপোর্টের গন্তব্য হয়ে উঠছে কনভেনশন
একসময় স্থানীয় পর্যায়ের সপ্তাহান্তের আয়োজন হিসেবে বিবেচিত ভক্তদের কনভেনশন এখন আন্তর্জাতিক ভ্রমণের প্রেরণা হয়ে উঠেছে। ট্রিপ ডটকমের প্রতিবেদনে মার্চে টোকিওতে অনুষ্ঠিত অ্যানিমেজাপান ২০২৬-এর কথা তুলে ধরা হয়েছে। আয়োজকেরা একে বিশ্বের বৃহত্তম অ্যানিমে উৎসব বলে দাবি করেন। আয়োজনটির একমাত্র বিদেশি টিকিট বিক্রয় সহযোগী হিসেবে ট্রিপ ডটকম জানিয়েছে, অ্যানিমেজাপান ২০২৬-এর আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৬৯৭ শতাংশ বেড়েছে। ৮২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ভ্রমণকারীরা উৎসবে যোগ দেন; তাঁদের মধ্যে মূল ভূখণ্ড চীন, হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের প্রতিনিধিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য।
টিকিট বিক্রির তথ্য অনুযায়ী, অ্যানিমেজাপানের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী এবং তাঁদের অধিকাংশই পুরুষ। এ আয়োজন দেখিয়েছে, অ্যানিমে উৎসবগুলো কীভাবে ফ্লাইট বুক করা, হোটেল সংরক্ষণ করা এবং ছুটিকে জাপানজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণসূচিতে রূপ দেওয়ার কারণ হয়ে উঠেছে।
কনভেনশনের প্রভাব টোকিওর বাইরেও বিস্তৃত। ২৯ থেকে ৩১ মে হওয়ার কথা হংকং কমিক কন ২০২৬। এতে মূল ভূখণ্ড চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বিদেশি ভক্তরা এসেছেন। ট্রিপ ডটকমের তথ্য দেখায়, টিকিট ক্রেতাদের ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন জেনারেশন জেড বা মিলেনিয়াল প্রজন্মের ভ্রমণকারী; আর টিকিট বিক্রির ৮০ শতাংশের বেশি ছিল নারীদের। জাপানে বছরে দুবার অনুষ্ঠিত কমিকেট কনভেনশনে ২০২৬ সালের আগস্টে ওদাইবায় বিপুলসংখ্যক অনুরাগীর সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আয়োজন চলাকালে এলাকায় হোটেল বুকিং ইতিমধ্যেই আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। মোবাইল গেমটির ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পোকেমন গো ফেস্ট ২০২৬-ও ওদাইবায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ট্রিপ ডটকমের তথ্যনির্ভর প্রবণতা পর্যবেক্ষক ট্রিপ.পালসে এটি ৬ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ভিউ পেয়েছে।
স্থানীয় আবাসন খাতে এসব আয়োজনের পরিমাপযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ট্রিপ ডটকম দেখেছে, অ্যানিমে উৎসবের স্থান থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে হোটেল বুকিং আয়োজনের সময় সাধারণত বেড়ে যায়। টোকিও, হংকং ও ব্যাংককের মতো শহরের জন্য এর অর্থ হলো, অ্যানিমে কনভেনশন কেবল সাংস্কৃতিক সমাবেশ নয়; হোটেল, রেস্তোরাঁ ও গণপরিবহনকে সহায়তা করা অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিও।
কারা ভ্রমণ করছেন? তরুণ, ডিজিটাল প্রজন্ম
অ্যানিমে পর্যটনের উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে মিলে যাওয়া দুটি গোষ্ঠী: জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়ালরা। এসব ভ্রমণকারী অনলাইন স্ট্রিমিং, ভক্ত-সম্প্রদায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে বড় হয়েছেন। মূলধারার টেলিভিশন সূচিতে জায়গা পাওয়ার অনেক আগেই এসব মাধ্যম অ্যানিমেকে সহজলভ্য করে তুলেছিল। অ্যানিমে স্ট্রিমিংয়ের বড় প্ল্যাটফর্ম ক্রাঞ্চিরোলের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা অ্যানিমে সম্পর্কে ইতিবাচক মত দিয়েছেন। জনপ্রিয়তার হিসাবে তারা ব্যাড বানি, ব্ল্যাকপিঙ্ক ও বিটিএসের মতো বিশ্বতারকাদেরও ছাড়িয়ে গেছে। মিলেনিয়ালদের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অ্যানিমে অনুসরণ করছেন।
অ্যানিমের আকর্ষণ একাধিক প্রজন্মের মধ্যেও বিস্তৃত। ক্রাঞ্চিরোলের প্রতিবেদনে অ্যানিমেকে ‘জেনারেশন জেডের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি নির্ধারক অনুষঙ্গ’ বলা হয়েছে; পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে যে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে এটি ভাগাভাগি হয়। মিলেনিয়াল ভক্তদের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং জেনারেশন এক্স ভক্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, তাঁরা সন্তানদের সঙ্গে অ্যানিমের প্রতি নিজেদের আগ্রহ ভাগ করে নেন। কিছু ভক্তের ভাষায়, ‘প্রজন্ম নির্বিশেষে এটি সরাসরি তাঁদের সঙ্গে কথা বলে, অন্য যেকোনো ধারার চেয়ে বেশি।’
বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাজারগুলোর একটি হওয়ায় ফিলিপাইনে এই জনতাত্ত্বিক প্রভাব আরও জোরালো। ফিলিপিনো ভক্তরা অনলাইন সম্প্রদায়ে জড়ো হন, পর্দার ছবি ও ভ্রমণের পরামর্শ ভাগ করে নেন এবং কনভেনশন ঘিরে মিলনমেলার আয়োজন করেন। নেটফ্লিক্স, ক্রাঞ্চিরোল ও স্থানীয় সেবার মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে দিনরাত অ্যানিমে দেখা যায়; আর স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও অ্যাপ বিভিন্ন স্থানের ক্লিপকে ভাইরাল অনুপ্রেরণায় পরিণত করে। ফলে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায়ই শুরু হয় পর্দায় দেখা একটি দৃশ্য দিয়ে, আর শেষ হয় বিমানের টিকিট বুক করার মধ্য দিয়ে।
অ্যানিমে পর্যটনের ব্যবসা
অ্যানিমে পর্যটনের উত্থানে ভ্রমণশিল্পের একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। থিমভিত্তিক থাকা ও আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা দিতে হোটেল, রিসোর্ট ও থিম পার্ক অ্যানিমে সিরিজের সঙ্গে অংশীদারত্ব করছে। জাপানের কাতোরি এলাকার গ্রামীণ অবকাশকেন্দ্র দ্য ফার্মে সম্প্রতি চালু করা থিমভিত্তিক গ্ল্যাম্পিং কক্ষে দর্শনার্থীরা জনপ্রিয় অ্যানিমে ও মাঙ্গা সিরিজ ‘ফ্রিরেন: বিয়ন্ড জার্নিস এন্ড’-এর কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে পারেন। প্রাঙ্গণে রয়েছে ছবির জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে গল্পের স্মরণীয় দৃশ্যগুলো আবার তৈরি করা হয়েছে।
এশিয়ায় এ বছর ট্রিপ ডটকমে সবচেয়ে বেশি বুক হওয়া আকর্ষণগুলোর একটি ইউনিভার্সাল স্টুডিওস জাপান পাঁচটি ব্লকবাস্টার সিরিজের সঙ্গে কাজ করে দর্শনার্থীদের অ্যানিমে অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্রিরেন: বিয়ন্ড জার্নিস এন্ড’ অবলম্বনে নিমগ্নকারী স্টোরিওয়াক এবং ‘ডিটেকটিভ কোনান: দ্য ওয়ার্ল্ড’ অবলম্বনে তিনটি আকর্ষণ। এসব অংশীদারত্ব দেখায়, অ্যানিমে কীভাবে বিশেষায়িত বিনোদনধারা থেকে গন্তব্য বিপণনের বড় সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান ভ্রমণের বৃহত্তর আচরণেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রিপ ডটকমের উদ্ধৃত এক গবেষণা অনুযায়ী, এশিয়াজুড়ে ৭০ শতাংশ ভ্রমণকারী জানিয়েছেন, তাঁরা যা দেখেছেন তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো গন্তব্যে যাওয়ার কথা ভেবেছেন। জাপান পর্যটন সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, সিনেমা ও অ্যানিমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানে বিদেশি দর্শনার্থীর হার ২০১৯ সালের ৪.৬ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৭.৫ শতাংশে উঠেছে। মহামারি-পরবর্তী ভ্রমণ বিধিনিষেধ থেকে জাপানের পুনরুদ্ধার চলার মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা প্রবণতাটির দীর্ঘস্থায়ী গতি থাকার ইঙ্গিত দেয়।
উল্টো স্রোত: কমিকস যখন ভ্রমণলিপ্সার বদলে ভয় জাগায়
অ্যানিমে ও মাঙ্গাকে সাধারণত পর্যটন বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে দেখা হলেও, একই মাধ্যম উল্টোভাবেও ভ্রমণের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে সম্পর্কহীন আরেকটি ঘটনা ২০২৫ সালে শিরোনাম হয়েছিল, যখন জাপানি শিল্পী রিও তাতসুকির একটি মাঙ্গা ভূমিকম্পের আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালে প্রথম প্রকাশিত কমিক ‘দ্য ফিউচার আই স’ নজর কাড়ে, কারণ এর প্রচ্ছদে ‘২০১১ সালের মার্চে ভয়াবহ বিপর্যয়’-এর উল্লেখ ছিল। ওই মাসে জাপানের তোহোকু অঞ্চলে ৯.০ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও সুনামি আঘাত হেনেছিল। ২০২১ সালে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সংস্করণে সতর্ক করা হয়েছিল, পরবর্তী বড় ভূমিকম্পটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আঘাত হানতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণীটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জাপান ভ্রমণ না করার সতর্কতা দিয়ে প্রকাশিত ভিডিও ও পোস্ট লাখ লাখবার দেখা হয়। হংকং ও এশিয়ার অন্য বাজারের ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বুকিং বাতিল ও পিছিয়ে দেওয়ার কথা জানায়। হংকংভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সি ডব্লিউডব্লিউপিকেজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সি এন ইউয়েন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইস্টার ছুটিতে জাপানগামী বুকিং অর্ধেকে নেমে এসেছিল এবং আরও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। মূল ভূখণ্ড চীন ও হংকংয়ের ভ্রমণকারীদের মধ্যে ভয়টি সবচেয়ে বেশি ছিল, তবে মাঙ্গাটির পাঠক ছিল এমন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য বাজারেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
ভূকম্পবিদ ও জাপানি কর্মকর্তারা এসব দাবির বিরোধিতা করেন। জাপানের মন্ত্রিসভার কার্যালয় জানায়, আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে নির্ভুলভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। ২০১১ সালে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত মিয়াগি প্রিফেকচারের গভর্নর ইয়োশিহিরো মুরাই পর্যটনে অবৈজ্ঞানিক গুজবের প্রভাবের সমালোচনা করেন। বাতিল হওয়া ভ্রমণ নিয়ে জানতে চাইলে তাতসুকি নিজে বলেন, তাঁর কাজের প্রতি আগ্রহ মানুষকে দুর্যোগের জন্য আরও প্রস্তুত করেছে—এটি তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন। তবে তিনি পাঠকদের নিজের স্বপ্নে ‘অতিরিক্ত প্রভাবিত’ না হয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান।
এই ঘটনা ভ্রমণসংস্কৃতিতে মাঙ্গা ও অ্যানিমের দ্বিমুখী ক্ষমতার দিকটি তুলে ধরে। যে মাধ্যম তীর্থযাত্রা ও উৎসবভ্রমণে অনুপ্রাণিত করতে পারে, পাঠকেরা কাল্পনিক বা প্রতীকী বিষয়কে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সেটিই উদ্বেগ ছড়াতে পারে। এ ঘটনা এটিও দেখায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কত দ্রুত একটি প্রকাশনাকে আঞ্চলিক ভ্রমণসংক্রান্ত আলোচনায় পরিণত করতে পারে।
জাপান ও ফিলিপাইনের ভ্রমণের জন্য এর অর্থ কী
অ্যানিমে পর্যটনের এই উত্থান এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন জাপানে ইতিমধ্যেই রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থী আসছেন। দুর্বল ইয়েন, বিমান সংযোগের সুবিধা এবং নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সুনামের কারণে দেশটি এশীয় ভ্রমণকারীদের পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এই আকর্ষণে আবেগের একটি স্তর যোগ করেছে অ্যানিমে। অনেক ফিলিপিনো ভ্রমণকারীর কাছে জাপান ভ্রমণ এখন আর শুধু কেনাকাটা বা দর্শনীয় স্থান ঘোরার মধ্যে সীমিত নয়। প্রিয় চরিত্রের মতো একই জায়গায় দাঁড়ানো, হাজারো একই রকম আগ্রহের ভক্তের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেওয়া এবং কল্পনার জগৎকে বাস্তবে নিয়ে আসাই এর অংশ।
ফিলিপাইনের ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটন খাতের জন্য এই প্রবণতা তরুণ ভ্রমণকারীদের উপযোগী প্যাকেজ তৈরির সুযোগ। অ্যানিমেভিত্তিক ট্যুর, কনভেনশন প্যাকেজ ও নির্দিষ্ট সিরিজ ঘিরে সাজানো জাপান ভ্রমণসূচি ক্রমবর্ধমান পণ্যশ্রেণিতে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে এই প্রবণতা দেখায়, স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাংস্কৃতিক প্রভাব কীভাবে সরাসরি অন্য একটি দেশের ভোক্তাদের ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য আরও বড় হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো অ্যানিমে যদি গন্তব্য বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে থাকে, তাহলে জাপানের শহর ও ছোট জনপদগুলোর দর্শনার্থীদের ধরন বদলে যেতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের একটি অ্যানিমের কারণে কামাকুরার গ্রামীণ রেলক্রসিং বিশ্বপরিচিত স্থানে পরিণত হতে পারে। ওদাইবার কনভেনশন সেন্টার ঘিরে কয়েক মাস আগেই হোটেল পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। মাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা ফ্লাইট বাতিল করতে পারেন। এসব ঘটনা দেখায়, অ্যানিমে আর উপসংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বৈশ্বিক ভ্রমণ অর্থনীতির একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
মূল তথ্য
- ট্রিপ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অ্যানিমে ও কমিকস-সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ নিয়ে ফিলিপিনোদের অনুসন্ধান আগের বছরের তুলনায় ১৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
- এশিয়াজুড়ে অ্যানিমে-সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ অনুসন্ধান বছরে ১৯৫ শতাংশ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের ভ্রমণকারীরা এগিয়ে ছিলেন।
- অ্যানিমেজাপান ২০২৬-এর আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৬৯৭ শতাংশ বেড়েছে; ৮২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীরা এসেছেন।
- জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘স্ল্যাম ডাঙ্ক’-এ দেখা কামাকুরা কোকোমায়ে রেলক্রসিং এবং টোকিওর আকিহাবারা ও ইকেবুকুরো এলাকা।
- জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়াল ভ্রমণকারীরাই অ্যানিমে পর্যটনে প্রাধান্য বিস্তার করছেন। অ্যানিমেজাপানের টিকিট ক্রেতাদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী।
- জাপানের রাষ্ট্রদূত কাজুয়া এন্দো বলেন, গত বছর প্রায় ৯ লাখ ফিলিপিনো জাপান ভ্রমণ করেছেন; এক দশকেরও বেশি আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ।
- ২০২৫ সালে ভূমিকম্প নিয়ে মাঙ্গার একটি পৃথক ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে এশিয়ার কিছু ভ্রমণকারী জাপান সফর বাতিল করেন। এতে ভ্রমণ আচরণে কমিকসের মিশ্র প্রভাব দেখা যায়।






