বৃষ্টিভেজা বিকেল এবং অনাকাঙ্ক্ষিত এক সিদ্ধান্ত
ভারতের পুনেতে ভিএফএস গ্লোবালের একটি ভিসা কেন্দ্রে পৌঁছানোর সময় বৃন্দা আগে থেকেই ক্লান্ত। লাঠিতে ভর দিয়ে চলা ৭১ বছর বয়সী এই নারী টানা বৃষ্টির মধ্যে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন এবং যানজটে কাটিয়েছিলেন এক ঘণ্টা। ছেলের সঙ্গে দেখা এবং নতুন নাতনিকে দেখতে বেলজিয়ামের ভিসার আবেদন করার অ্যাপয়েন্টমেন্টে তিনি ১৫ মিনিট দেরিতে পৌঁছান। দেরি ও পিঠের সমস্যার কথা বলার পর কর্মকর্তা তাঁকে দুটি বিকল্প দেন: বাড়ি ফিরে আরেকটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা, অথবা প্রিমিয়াম পরিষেবা ফি হিসেবে ৩৫ ইউরোর সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া। বৃন্দার ক্ষেত্রে ওই অর্থে প্রায় এক মাসের বাজার খরচ চলে। পরে তিনি স্মরণ করে বলেন, “তারা বলল, না, অন্যদিন ফিরে আসতে পারেন, নয়তো টাকা দিন। আমি বেশ হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা যা বলেছিল, আমাকে তা-ই করতে হয়েছে।”
সূচিপত্র
অন্তত ১৯ জন আবেদনকারীর একজন বৃন্দা, যাঁরা তদন্তকারীদের বলেছেন, তাঁদের অতিরিক্ত ফি দিতে চাপ দেওয়া হয়েছে, বিভ্রান্ত করা হয়েছে, কিংবা টাকা দেওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প রাখা হয়নি। বর্তমান ও সাবেক ১০ জন কর্মী নিশ্চিত করেছেন, এ ধরনের চর্চা ব্যাপক। তাঁরা এমন এক ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে কম বেতনের কর্মীদের ঐচ্ছিক অতিরিক্ত সেবা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চাপ দেওয়া হয়; কখনও কখনও সম্মতি ছাড়াই ফি যোগ করা হয়। অন্যদিকে, যেসব মৌলিক কাজের জন্য ভিএফএসকে নিয়োগ দেয় ইউরোপীয় সরকারগুলো, সেগুলোতেই প্রতিষ্ঠানটির বারবার ব্যর্থতার প্রমাণ নথিবদ্ধ হয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে তথ্য সুরক্ষার ত্রুটি, অ্যাপয়েন্টমেন্টে অনিয়ম এবং নিম্নমানের পরিষেবার কথা উঠে এসেছে। এসব তথ্য সামনে আসার পরও প্রতিষ্ঠানটি সীমিত পরিণতির মুখে পড়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় সব সদস্যরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপে প্রবেশের অদৃশ্য দ্বাররক্ষী
বেশির ভাগ ইউরোপীয় ভিএফএস গ্লোবালের নাম কখনো শোনেননি। বিশ্বের অনেক দেশে ভিসা ছাড়া ভ্রমণে অভ্যস্ত হওয়ায় তাঁদের কারও ভিসা কেন্দ্রের লাইনে দাঁড়ানো বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পোর্টাল ব্যবহার করার সম্ভাবনাও কম। কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটি সুপরিচিত, এবং প্রায়ই ক্ষোভের কারণ। ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করা শিক্ষার্থী, কর্মী, পর্যটক ও পরিবারের কাছে ভিএফএস প্রায়ই সীমান্তের সঙ্গে প্রথম অনিবার্য যোগাযোগের মাধ্যম: একটি বেসরকারি চেকপয়েন্ট, যেখানে কনস্যুলেটে যাওয়ার পথ শুরু হয় বুকিং ফর্ম ও ফি-র তালিকা দিয়ে।
ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান কুওনির তৎকালীন নির্বাহী জুবিন কারকারিয়া ২০০১ সালে ভিএফএস প্রতিষ্ঠা করেন। দূতাবাসগুলোকে ক্রমবর্ধমান ভিসার চাহিদা সামলাতে হিমশিম খেতে দেখে তিনি এ উদ্যোগ নেন। জরথুস্ত্রী পুরোহিত ও উদ্যোক্তা কারকারিয়া মুম্বাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসকে একটি পরীক্ষামূলক আউটসোর্সিং ব্যবস্থা পরিচালনার অনুমতি দিতে রাজি করান। মডেলটি সফল হয়। বর্তমানে ১৬৭টি দেশে ৭০টিরও বেশি সরকারের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে ভিএফএস গ্লোবালের; তাদের আবেদন কেন্দ্রের সংখ্যা ৩,৫০০-এর বেশি। খাতটির বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান এটি; এর পর রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএলএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএলএস কন্ট্যাক্ট। দুবাইয়ে সদর দপ্তর এবং বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন ভিএফএস কনস্যুলার কাগজপত্রের কাজকে বড় বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ দিয়েছে।
আউটসোর্সিংয়ের পদ্ধতিটি সহজ। কোনো আবেদনকারী ভিসা পাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত ভিএফএস নেয় না; সেই ক্ষমতা সরকারের হাতেই থাকে। বরং প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক প্রশাসনিক কাজগুলো করে: অ্যাপয়েন্টমেন্ট পরিচালনা, আবেদন গ্রহণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং কনস্যুলেটে কাগজপত্র পাঠানো। ইইউ ভিসা কোড অনুযায়ী, এসব মূল প্রশাসনিক কাজের জন্য ভিএফএস বাধ্যতামূলক পরিষেবা ফি নিতে পারে। আবেদনকারীরাই পুরো খরচ বহন করেন বলে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর সরাসরি কোনো ব্যয় হয় না। ভ্রমণের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং ২০০১ সালের পর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত আরও জটিল হওয়ায় বাজেট নিয়ে চাপে থাকা অভিবাসন বিভাগগুলোর কাছে বেসরকারি মডেলটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, অভিবাসীদের পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে; সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যের বিপুল ভাণ্ডার সামলানোর পাশাপাশি করপোরেশনগুলো ব্যয়বহুল অতিরিক্ত সেবা বিক্রিতে চাপ দিচ্ছে।
চাপ, মুনাফা এবং ঐচ্ছিক অতিরিক্ত সেবা
অতিরিক্ত পরিষেবার ওপর ভিত্তি করে ভিএফএস গ্লোবাল অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলেছে। এসএমএস নোটিফিকেশন, কুরিয়ারে নথি পৌঁছে দেওয়া, নথি স্ক্যান, প্রিমিয়াম লাউঞ্জ এবং বাসায় গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্টের মতো সেবা থেকে বিপুল আয় হয়। লুক্সেমবার্গে দাখিল করা আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ১৬টি দেশের সুইডিশ ভিসার রসিদের একটি নমুনায় এসব মূল্য সংযোজিত সেবা গড়ে মোট আয়ের ৩০ শতাংশ জুগিয়েছে। শুধু এসএমএস সতর্কবার্তা থেকেই এসেছে প্রায় ৫ শতাংশ আয়। কেনিয়ায়, যেখানে সাবেক কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে প্রায়ই অনুমতি ছাড়াই বিলে ফি যোগ করা হতো, ৯০ শতাংশের বেশি আবেদনকারী এসএমএস সেবার জন্য অর্থ দিয়েছেন। এতে স্থানীয় আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে।
বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক কর্মীরা এমন কর্মপরিবেশের কথা বলেছেন, যেখানে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রাই মুখ্য। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দিল্লি কেন্দ্রে ভিসা কার্যক্রম কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা রোহিত তানেজা বলেন, অতিরিক্ত সেবা বিক্রির জন্য কর্মীদের ওপর অবিরাম চাপ ছিল। তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি কৌশলগুলোর ব্যাখ্যা দেন। “এসএমএস ও কুরিয়ার সেবার জন্য আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আবেদনকারী না বললেও আমাদের প্রস্তাব দিতে হতো, বোঝানোর চেষ্টা করতে হতো। মানুষ মনে করে আমরা দূতাবাসের লোক, তাই আমরা যা বলছি তা-ই ঠিক—বিশেষ করে যাঁরা প্রথমবার আসেন। তাই প্রত্যাখ্যান খুব কমই হতো।” তানেজা আরও জানান, কর্মীদের বিক্রির কৌশল শেখানো হতো এবং কেনাকাটায় রাজি করাতে আবেদনকারীদের আবেগগত দুর্বলতা চিহ্নিত করতে বলা হতো।
নাইজেরিয়ায় প্রতিশোধের আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করা একজন বর্তমান ভিসা কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাজ্যের ভিসার অতিরিক্ত সেবা বিক্রির বোনাস ঠিকাদারদের মূল বেতনের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে; তাঁদের মাসিক আয় মাত্র ১২৫ ইউরোর কিছু বেশি। ২০২০ সালে চাকরি ছেড়ে যাওয়া এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই ব্যবস্থাকে চরম শোষণমূলক বলে বর্ণনা করেন এবং জানান, কম বেতন আগ্রাসী আচরণে উৎসাহ জোগায়। বর্তমান ওই কর্মকর্তা বলেন, “ঐচ্ছিক অতিরিক্ত সেবা বিক্রির তাগিদ সব সময়ই থাকে। আবেদনকারীকে কেন এগুলো কেনা উচিত, তা দেখানোর জন্য আপনাকে বারবার চেষ্টা করতে হবে।” পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক সাবেক কর্মী জানান, গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই বিলে এসএমএস বা কুরিয়ার সেবা যোগ করা কর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কেনিয়ার এক সাবেক কর্মী বলেন, বেশির ভাগ গ্রাহকই এসব মেনে নিতেন। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও এসব প্রবণতার সমর্থন মেলে। ২০২৪ সালে চেক কর্তৃপক্ষের এক পরিদর্শনে দেখা যায়, ভিএফএস অতিরিক্ত সেবা প্রচারে অত্যধিক চাপ দিচ্ছিল; ফলে কিছু আবেদনকারীর ধারণা হয়, এসব সেবা কিনলে ভিসা পাওয়া নিশ্চিত হবে। সুইডিশ কর্তৃপক্ষ একাধিক বছর ধরে উল্লেখ করেছে, মূল্য সংযোজিত সেবাগুলো ঐচ্ছিক—এ কথা ভিএফএস সব সময় স্পষ্ট করে জানায়নি।
তথ্য সুরক্ষার ঝুঁকি ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট কেলেঙ্কারি
অতিরিক্ত সেবা মুনাফা বাড়ালেও, সরকারি অভ্যন্তরীণ নথিতে মৌলিক দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতার তথ্য রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন ও শেনজেনভুক্ত ২২টি দেশের পরিদর্শকেরা সাধারণ তথ্য সুরক্ষা বিধিমালা (জিডিপিআর) অনুযায়ী ভিএফএসের ব্যক্তিগত তথ্য সামলানোর ক্ষেত্রে ২১টি অনিয়ম শনাক্ত করেছেন। ২০২২ সালে লুক্সেমবার্গ জানায়, আবেদনকারীদের বায়োমেট্রিক তথ্য এনক্রিপশনবিহীন একটি সিডিতে করে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নেওয়া হয়েছিল। নরওয়ে দেখতে পায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই কিছু কেন্দ্র আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। সুইডিশ পরিদর্শকেরা দেখেছেন, জিডিপিআর সম্পর্কে কর্মীদের জ্ঞান অপর্যাপ্ত। পাসপোর্ট, আঙুলের ছাপ, আর্থিক নথি ও ভ্রমণের ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট একটি প্রক্রিয়ায় এমন ত্রুটি লাখ লাখ মানুষকে পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকিতে ফেলে।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাও বিতর্কের কারণ হয়ে উঠেছে। ইইউর বিধিমালায় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বিক্রি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় কমিশনের ২০২২ সালের এক পরিদর্শনে দেখা যায়, ইতালীয় কনস্যুলেটের সঙ্গে চুক্তির আওতায় সেনেগালে ভিএফএস পদ্ধতিগতভাবে ফি নিয়ে অতিরিক্ত স্লট দিত। লাতভিয়া জানায়, ইস্তাম্বুলে নিয়মিত স্লটের কোনো প্রাপ্যতা না দেখালেও প্রিমিয়াম অ্যাপয়েন্টমেন্ট কেনা যেত। পাঁচটি ইইউ দেশ জানিয়েছে, বট বা বাইরের এজেন্টরা বিনা মূল্যের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আটকে রেখে পরে বিক্রি করে দেয়, ফলে প্রকৃত আবেদনকারীরা বিপাকে পড়েন। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হিউম্যানের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার মাইকেল টিফানি বলেন, ক্যাপচা-র মতো বট ঠেকানোর সাধারণ ব্যবস্থা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কালোবাজারি বিক্রেতাদের থামাতে তেমন কাজে আসে না। “বটবিরোধী ব্যবস্থা ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। লাভজনক বটনেটকে নিষ্ক্রিয় করতে নিষ্ঠা ও দক্ষতা দরকার।”
ভিএফএসের পোর্টালে সফটওয়্যার সমস্যার কারণে আবেদনকারীরা অর্থের বিনিময়ে বিকল্প সেবা নিতে বাধ্য হয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক আইনজীবী জানান, একটি বারবার দেখা দেওয়া ত্রুটিতে একাধিক নথি জোড়া দেওয়া ফাইলকে ভুল করে ভাইরাস আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। ফলে নিজে ফাইল আপলোড করার বদলে তাঁকে ক্লায়েন্টদের ভিএফএসের স্ক্যানিং সেবার জন্য অর্থ দিতে বলতে হতো। কেপটাউনের এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী ব্রিটিশ ভিসার আবেদনের সময় একই ধরনের ত্রুটির কথা জানান। তিনি বলেন, “আমি জানি, ফাইলগুলোতে কোনো ভাইরাস নেই। আমি প্রতিদিনই সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করি, এটাই আমার পেশা।” প্রতিষ্ঠানটি ওয়ানভাস্কো নামে কনসিয়ার্জ প্রতিষ্ঠানের একটি সমান্তরাল শৃঙ্খলও পরিচালনা করে, যেগুলোর অনেকগুলোই সরকারি কেন্দ্রের পাশে অবস্থিত। ভারতে ওয়ানভাস্কোর মুনাফার হার ২০২৪ সালে ৫৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। একাধিক সরকার উদ্বিগ্ন যে ভ্রমণকারীরা এই বাণিজ্যিক সহায়তাকারীদের সরকারি কনস্যুলার চ্যানেল বলে ভুল করছেন। এক ফরাসি কূটনীতিক জানান, চুক্তিবদ্ধ সেবা থেকে ওয়ানভাস্কোকে স্পষ্টভাবে আলাদা করার জন্য কর্তৃপক্ষ একটি কর্মপরিকল্পনা দাবি করেছে।
শ্রীলঙ্কা থেকে নাইজেরিয়া: বিশ্বজুড়ে একই চিত্র
বিতর্ক ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত। শ্রীলঙ্কায় ২০২৪ সালের এক সরকারি সিদ্ধান্তে ইলেকট্রনিক ভিসা ও পৌঁছানোর পর ভিসা প্রক্রিয়াকরণে ভিএফএসকে ১২ বছরের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়। এতে সহজ সরকারি ব্যবস্থার বদলে এমন জটিল পোর্টাল চালু হয়, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য ও অতিরিক্ত নথি দিতে হয়। আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর পর্যটকদের ফি ২০ ডলার থেকে বেড়ে ৭৫ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত, চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের ভ্রমণকারীরা ভিসামুক্ত সুবিধা হারিয়ে এখন ২৫.৭৭ ডলারের প্রক্রিয়াকরণ ফি দিচ্ছেন। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ সংস্থা একই ধরনের সহায়তা প্রতি ভিসার জন্য মাত্র ১ ডলারে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানা গেছে। বিরোধী রাজনীতিকেরা দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। জনপ্রিয় এক অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতার ব্যক্তিগত ইমেইলে অন্য পর্যটক আবেদনকারীদের তথ্য আসতে শুরু করলে তিনি সম্ভাব্য তথ্য ফাঁসের বিষয়টি সামনে আনেন।
নাইজেরিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক থিওফিলাস আব্বাহ পরে জানতে পারেন, তিনি যে অর্থ দিয়েছেন তা দক্ষিণ আফ্রিকার ভিসার সরকারি ফির তিন গুণেরও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে আবুজা ও লাগোসের আবেদনকারীরা ভোর হওয়ার আগে কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করা, ব্যাখ্যাহীন অতিরিক্ত ফি এবং মৌখিক দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থী ভিসাপ্রত্যাশীরা জানিয়েছেন, দালালেরা বিনা মূল্যের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আটকে রেখে চড়া দামে বিক্রি করে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সৈয়দ নূহ সতর্ক করে বলেন, সময়মতো অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা দেরিতে পৌঁছাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভর্তি শুরুর সময়সীমা বাড়াতে হচ্ছে। তিনি যানজটের মতো বাধা দূর করতে সরকারগুলোকে একাধিক আউটসোর্সিং সেবাদাতা নিয়োগের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, ভিসা আবেদনকারীদের যক্ষ্মা পরীক্ষায় একই ধরনের সংস্কার আগে জট কমিয়েছিল।
বায়োমেট্রিক তথ্য জালিয়াতি কানাডা কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর ২০২৩ সালে ভারতের পুলিশ আহমেদাবাদে ভিএফএসের দুই কর্মী ও এক সাবেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ, সন্দেহভাজনরা ২৮ জন আবেদনকারী উপস্থিত না থাকলেও তাঁদের আঙুলের ছাপ নথিভুক্ত করেন এবং ভুয়া অ্যাপয়েন্টমেন্টপত্র দেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ রুপি নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এসব ঘটনা দেখায়, তদারকি দুর্বল হলে এবং মুনাফার উদ্দেশ্য প্রাধান্য পেলে ভিসা প্রশাসন বেসরকারি খাতে দেওয়ার ফলে জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারগুলোর পদক্ষেপ নিতে এত সমস্যা কেন
ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ এসব সমস্যা উপেক্ষা করেনি। প্রশ্নের জবাব দেওয়া ইইউর নয়টি সরকার জানিয়েছে, যথাযথ ক্ষেত্রে তারা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং আগ্রাসীভাবে অতিরিক্ত সেবা বিক্রির অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সাতটি সরকার জানিয়েছে, তারা সাধারণভাবে আউটসোর্সিং নিয়ে সন্তুষ্ট; এর মধ্যে দুটি বিশেষভাবে ভিএফএসের সেবায় সন্তুষ্টির কথা বলেছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ নথিতে আরও সমস্যাজনক চিত্র উঠে এসেছে। ভারতে ইইউর ২০২৩ সালের এক কর্মীগোষ্ঠী তথ্য প্রবেশে ধারাবাহিক ব্যর্থতা, স্ক্যানিংয়ের সমস্যা, দুর্বল আইটি অবকাঠামো এবং ভিএফএসের ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় কার্যালয়ের মধ্যে হতাশাজনক যোগাযোগের কথা নথিবদ্ধ করে। চেক প্রজাতন্ত্র জানায়, তারা বারবার সমস্যাগুলো তুললেও সাময়িক উন্নতির পর আবার আচরণ খারাপ হয়েছে। সুইজারল্যান্ড স্বীকার করেছে, ভিএফএসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই, কারণ তাদের নিজস্ব কনস্যুলেট একা কখনোই এত আবেদন সামলাতে পারবে না।
আউটসোর্সিং ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানোর বিকল্প তৈরি করতে ইউরোপীয় কমিশন এখন ভিসা আউটসোর্সিং নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা শুরু করেছে। কিছু দেশ ভিএফএসকে জরিমানা করেছে বা চুক্তির মেয়াদ শেষে সেবাদাতা বদলেছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে স্পেনই একমাত্র ইইউ সদস্যরাষ্ট্র, যারা ভিসা প্রক্রিয়াকরণে ভিএফএস ব্যবহার করে না। তবে বিকল্প আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে টিএলএস কন্ট্যাক্ট ও বিএলএস ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে আগ্রাসীভাবে অতিরিক্ত সেবা বিক্রি এবং জিডিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। ফলে বেসরকারি ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ সরকারের হাতে নেই।
অন্তত একটি স্থানে বেলজিয়াম এই প্রবণতা প্রতিরোধ করেছে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বেলজিয়ামের কূটনীতিক জোরিস সালডেন ভিসা প্রক্রিয়াকরণ দূতাবাসের ভেতরেই রেখেছেন, আউটসোর্স করেননি।
অন্যান্য দেশে আমরা দেখছি, তৃতীয় পক্ষের অংশীদার থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। আউটসোর্স করলে সমস্যার ওপর আপনার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আর থাকে না। আর তৃতীয় পক্ষের অংশীদার বিনা মূল্যে কাজ করে না।
তাঁর অবস্থান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ—রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব—নাগরিকদের কাছে নয়, বরং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করা প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত কি না।
মূল তথ্য
- ব্ল্যাকস্টোনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন ভিএফএস গ্লোবাল ১৬৭টি দেশে ৭০টিরও বেশি সরকারের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ নিয়ন্ত্রণ করে; এর মধ্যে ইইউর প্রায় সব সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে।
- তদন্ত ও সরকারি অভ্যন্তরীণ নথিতে কথিত ঐচ্ছিক সেবা আগ্রাসীভাবে বিক্রির তথ্য উঠে এসেছে; বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার চাপে কর্মীরা সম্মতি ছাড়াই ফি যোগ করেছেন।
- আবেদনের সংখ্যা ১৫ শতাংশ বাড়লেও ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালন মুনাফা চার গুণ হয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে উচ্চ মুনাফার অতিরিক্ত সেবা, যেমন এসএমএস সতর্কবার্তা ও কুরিয়ার ফি।
- ইউরোপীয় পরিদর্শকেরা জিডিপিআরের ২১টি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন; এর মধ্যে এনক্রিপশনবিহীন ডিস্কে বায়োমেট্রিক তথ্য পরিবহন এবং সময়মতো নথি মুছে না ফেলার ঘটনা রয়েছে।
- দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট কালোবাজারে বিক্রি, অর্থের বিনিময়ে স্ক্যানিং সেবা নিতে বাধ্য করে এমন সফটওয়্যার ত্রুটি এবং বিনা মূল্যের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আটকে রাখার প্রতারণা আবেদনকারীদের ভোগান্তিতে ফেলেছে।
- ব্যর্থতার তথ্য নথিবদ্ধ হলেও ইইউ সরকারগুলো ভিএফএসের ওপর নির্ভরশীল, কারণ কনস্যুলেটগুলোর পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই এবং বিকল্প আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
- আউটসোর্সিংয়ের অপব্যবহার খতিয়ে দেখতে ইউরোপীয় কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা শুরু করেছে। অন্যদিকে, সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বেলজিয়াম কিছু স্থানে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ নিজেদের অধীনে রেখেছে।






