সমুদ্রের নিচে রেকর্ড
২০২৬ সালের এপ্রিলে, দক্ষিণ চীনের ব্যস্ততম জলপথগুলোর একটির নিচে কাজ করা একটি বিশাল চীনা টানেল বোরিং মেশিন এমন এক মাইলফলক অর্জন করে, যা এ ধরনের কোনো প্রকল্প আগে ছুঁতে পারেনি। দেশীয়ভাবে তৈরি খননযন্ত্র শেনজিয়াং-১ পার্ল রিভার মোহনার সুড়ঙ্গকে সমুদ্রতলের ১১৩ মিটার গভীরে নিয়ে যায়। এর ফলে নির্মিত সুড়ঙ্গগুলোর মধ্যে এটি হয়ে ওঠে বিশ্বের গভীরতম পানির নিচের উচ্চগতির রেলপথের সুড়ঙ্গ। এই অর্জন ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ শেনজেন-জিয়াংমেন উচ্চগতির রেলপথ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। প্রকল্পটির লক্ষ্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গুয়াংডং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের পূর্ব ও পশ্চিম তীরকে একসূত্রে বাঁধা। রেলপথটি চালু হলে শেনজেন ও জিয়াংমেনের মধ্যে যাত্রার সময় এক ঘণ্টারও কমে আসবে। শেনজেনের ছিয়ানহাই ও গুয়াংঝৌর নানশার মধ্যবর্তী পথ পাড়ি দিতে লাগবে প্রায় ৩০ মিনিট।
সূচিপত্র
সুড়ঙ্গটি ডংগুয়ান ও গুয়াংঝৌর মধ্যবর্তী মোহনার নিচ দিয়ে ১৩.৬৯ কিলোমিটার বিস্তৃত, যার প্রায় ১১.০৫ কিলোমিটার সরাসরি পানির নিচে। প্রকৌশলীদের ধারণা, সুড়ঙ্গটি বিপরীত তীরের দিকে উঠতে শুরু করার আগে খননকাজ সর্বোচ্চ ১১৬ মিটার গভীরতায় পৌঁছাবে। এই গভীরতায় প্রকল্পটিকে প্রায় ১১ বার জলচাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা সমুদ্রের অত্যন্ত গভীরে ডুবুরিরা যে বিপর্যয়কর চাপের মুখে পড়েন, তার কাছাকাছি। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের পক্ষে খননমুখে নিরাপদে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলে পুরো খননকাজ দূরনিয়ন্ত্রণ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে চালাতে হচ্ছে। এখানে ভুলের কোনো অবকাশ নেই: চাপের ভারসাম্য নষ্ট হলে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়তে পারে, মাটি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং কাঠামোর ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে।
কাজে ব্যস্ত ‘ইস্পাতের ড্রাগন’
এই প্রকৌশল সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে শেনজিয়াং-১, চায়না রেলওয়ে গ্রুপের ১৪তম ব্যুরোর তৈরি স্লারি শিল্ড টানেল বোরিং মেশিন। যন্ত্রটি প্রায় ১৩০ মিটার লম্বা, ওজন ৩,৮০০ টন এবং এর কাটারহেডের কাটার ব্যাস প্রায় ১৩.৪২ মিটার। ফলে বিশ্বজুড়ে পানির নিচের রেলপথ প্রকল্পে বর্তমানে ব্যবহৃত বৃহত্তম ব্যাসের টিবিএমগুলোর একটি এটি। এর কাটারহেডে গুয়াংডং প্রদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন হিসেবে নৃত্যরত সিংহের একটি নকশা রয়েছে, যদিও যন্ত্রটির কাজ পুরোপুরি শিল্পকারখানার। এটি সম্পূর্ণভাবে চীনে নকশা ও নির্মাণ করা হয়েছে এবং এর মেধাস্বত্বও পুরোপুরি দেশটির। সর্বোচ্চ ১২ বার চাপ সহ্য করার উপযোগী নকশার কারণে গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলা চরম জলচাপের মধ্যেও এটি কাজ করতে পারে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে যাত্রা শুরুর পর থেকে শেনজিয়াং-১ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে একটানা কাজ করে চলেছে। টানেল বোরিং মেশিনের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে প্রতিকূল ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতিগুলোর কিছু পেরিয়ে এটি চার কিলোমিটারেরও বেশি এগিয়েছে। দিনে গড়ে মাত্র দুই মিটার অগ্রগতির হার বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে ধীর মনে হতে পারে। তবে এই গতি যন্ত্রের ক্ষমতার ঘাটতির নয়, বরং ভূখণ্ডের চরম প্রতিকূলতার পরিচায়ক। নরম সামুদ্রিক কাদা থেকে শুরু করে ১২৪ মেগাপ্যাসকেলের বেশি সংকোচন-শক্তির কঠিন গ্রানাইটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় যন্ত্রটিকে ক্রমাগত ঘূর্ণনের গতি, কাদার চাপ এবং অগ্রগতির হার সমন্বয় করতে হয়। প্রতিটি মিটার খননের জন্য নিখুঁতভাবে সেটিং ঠিক করতে হয়, কারণ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ভূতাত্ত্বিক স্তর নরম পলি থেকে কঠিন স্ফটিকাকার শিলায় বদলে যেতে পারে।
গভীরতা কেন সবকিছু বদলে দেয়
পার্ল রিভার মোহনায় দক্ষিণ চীনের অন্যতম জটিল ভূতাত্ত্বিক বিন্যাস রয়েছে। সুড়ঙ্গের পথটি ১৩টি স্বতন্ত্র ভূতাত্ত্বিক স্তর, পাঁচ ধরনের মিশ্র শিলা এবং লক্ষ লক্ষ বছরে সৃষ্টি হওয়া ছয়টি ফল্ট জোন অতিক্রম করেছে। ৩,৮০০ টনের একটি যন্ত্র খনন করে এগোলে প্রতিটি স্তরের প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়। কাটারহেডের চাপে নরম সামুদ্রিক কাদা সরে যেতে পারে, আর সূক্ষ্ম বালিতে দীর্ঘক্ষণ কম্পনের কারণে তরলীকরণের ঝুঁকি থাকে। ফাটলধরা শিলা হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে; অন্যদিকে, ১২৪ মেগাপ্যাসকেলের বেশি সংকোচন-শক্তির গ্রানাইট কাটতে গিয়ে কাটার সরঞ্জাম দ্রুত ক্ষয় হয়। অসম শিলাস্তর ও বিশেষভাবে উচ্চ জলচাপসহ ৪৯০ মিটার দীর্ঘ ফল্ট জোন নির্মাণের আগের পর্যায়গুলোতে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছিল। খননমুখ স্থিতিশীল রাখা এবং সুড়ঙ্গের ওপরের মাটির বসে যাওয়া ঠেকাতে তখন বারবার সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতি ১০ মিটার গভীরতায় জলচাপ প্রায় এক বার করে বাড়ে। বর্তমান রেকর্ড গভীরতা ১১৩ মিটারে, চারপাশের পানি ও মাটি সুড়ঙ্গের কাঠামোর ওপর প্রায় ১১ বারের কাছাকাছি চাপ সৃষ্টি করছে। সুড়ঙ্গটি সর্বোচ্চ ১১৬ মিটার গভীরতায় পৌঁছালে চাপ দাঁড়াবে ১.০৬ মেগাপ্যাসকেল। তুলনার জন্য বলা যায়, এতে একটি নখের সমান জায়গার ওপর ১০ কিলোগ্রামেরও বেশি ওজনের সমান বল পড়ে। এমন চাপে প্রতিটি কাঠামোগত উপাদানকে সাধারণ রেলপথের সুড়ঙ্গের তুলনায় বহুগুণ বেশি বল সহ্য করতে হয়। প্রকল্প শুরুর আগে এ ধরনের প্রকৌশল অভিজ্ঞতা বা নকশার মানদণ্ড দেশে ছিল না। ফলে কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে দলগুলোকে নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে হয়েছে। উচ্চচাপ ও অনিশ্চিত ভূতত্ত্বের এই সমন্বয়ই ব্যাখ্যা করে, কেন একটানা পুরো দিন কাজ করেও শেনজিয়াং-১ কখনো মাত্র দুই মিটার এগোয়: সামনে যাওয়ার আগে প্রতিটি পর্যায়ে স্থিতিশীলতা যাচাই করেন অপারেটররা।
স্লারি, কংক্রিট ও মিলিমিটার-নির্ভুলতা
এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নির্মাণকর্মীরা স্লারি শিল্ড পদ্ধতিতে খনন করছেন। পানিতে সম্পৃক্ত মাটির গভীর তলদেশি সুড়ঙ্গ নির্মাণে এ পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরি। এতে শোষণক্ষম একধরনের কাদা বেন্টোনাইট মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করা হয়, যা খননমুখকে ঠেস দিয়ে ধরে এবং পানি ও মাটির প্রবল স্রোত সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়া ঠেকায়। শেনজিয়াং-১-এ পরস্পর-সংযুক্ত দুটি স্লারি সার্কিট রয়েছে, যা যন্ত্রটির সংবহনতন্ত্রের মতো কাজ করে। প্রথম সার্কিট কাটারহেডের পেছনের চাপযুক্ত চেম্বারে নতুন বেন্টোনাইট স্লারি সরবরাহ করে। এতে এমন একটি সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি হয়, যার চাপ বাইরের পানি ও মাটির চাপের সঙ্গে নিখুঁতভাবে ভারসাম্য রাখে। চাপ খুব কমে গেলে সামনের অংশ অস্থিতিশীল হয়ে হঠাৎ ধসে পড়তে পারে বা প্লাবিত হতে পারে। চাপ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে চারপাশের মাটি বিকৃত হয়ে পুরো কাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
দ্বিতীয় সার্কিট পাইপের নেটওয়ার্ক দিয়ে ধ্বংসাবশেষ মেশানো স্লারি ভূপৃষ্ঠে ফিরিয়ে আনে। পৃথকীকরণ কেন্দ্রে কর্মীরা খনন করা শিলা ও কাদা ছেঁকে বের করেন; পরে বেন্টোনাইট শোধন করে সুড়ঙ্গে পুনর্ব্যবহার করা হয়। একটানা কাজের প্রতি ঘণ্টায় যে পরিমাণ উপাদান সরানো হয়, তা প্রায় একটি ট্যাংকার ট্রাক ভর্তি করার সমান। এদিকে, খনন চেম্বারের পেছনে একটি রোবটিক সংযোজনযন্ত্র মিলিমিটার-নির্ভুলতায় আগে থেকে তৈরি কংক্রিটের আস্তরণের খণ্ড বসায়। সুড়ঙ্গের প্রতিটি রিং নয়টি বাঁকানো খণ্ড দিয়ে তৈরি, প্রতিটির প্রস্থ প্রায় দুই মিটার। ১০০ বছর টেকার উপযোগী জলরোধী কাঠামো গড়তে খণ্ডগুলোকে নিখুঁতভাবে জোড়া লাগাতে হয়। একই সঙ্গে এগুলোকে ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে চলা উচ্চগতির ট্রেনের রেললাইনও বহন করতে হবে। ১৩.৬৯ কিলোমিটারজুড়ে জমতে থাকা সামান্য অমিলও রেলপথের জ্যামিতি বিকৃত করতে পারে, কম্পন তৈরি করতে পারে এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন নিরাপত্তা—দুটোকেই হুমকিতে ফেলতে পারে।
নিজেই মেরামত করতে পারে যে যন্ত্র
গভীরতা, চাপ ও জটিল ভূতত্ত্বের অনন্য সমন্বয় চীনা প্রকৌশলীদের প্রচলিত টানেল-খনন সরঞ্জামের সীমা ছাড়িয়ে সমাধান খুঁজতে বাধ্য করেছে। প্রথম বড় উদ্ভাবনটির ফলে শেনজিয়াং-১ চরম উচ্চচাপে ক্ষয়প্রাপ্ত কাটার সরঞ্জাম বদলাতে পারে, চেম্বারে কোনো মানুষ না পাঠিয়েই। প্রচলিত যন্ত্রে এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণে সাধারণত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডুবুরি এবং দীর্ঘ সময়ের চাপমুক্তকরণ প্রক্রিয়া লাগে, ফলে কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকে। দ্বিতীয় অগ্রগতি হলো সুড়ঙ্গের ভেতরেই যন্ত্রটি খুলে ফেলার ব্যবস্থা। সমুদ্রতলের নিচে সীমিত জায়গায় কর্মীরা যন্ত্রটি খুলে ফেলতে পারেন, কারণ মোহনার সব জায়গায় প্রচলিত পদ্ধতিতে যন্ত্র তোলার উপযোগী শ্যাফট নির্মাণ সম্ভব নয়। পথজুড়ে ভূতাত্ত্বিক অবস্থা ব্যাপকভাবে বদলায় বলে এ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। যন্ত্রটি এমন জায়গায় তুলতে বা পরিবর্তন করতে হতে পারে, যেখানে প্রচলিত শ্যাফট নির্মাণ অসম্ভব অথবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
অন্যান্য অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে অস্থিতিশীল মাটিতে তাৎক্ষণিক ভূমি-অবনমন নিয়ন্ত্রণ, স্থাপিত সেন্সরের মাধ্যমে খনন-সংক্রান্ত পরামিতির নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ, চাপযুক্ত চেম্বারের তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, চরম গভীরতায় কাজ করা বিকল্প যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং হঠাৎ পানি ঢুকে পড়া বা চাপ বেড়ে যাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত ভূতাত্ত্বিক ঘটনার জরুরি মোকাবিলা-পদ্ধতি। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন এসব প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ পানির নিচের প্রকল্পে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। চীনা পরিকল্পনাবিদেরা পার্ল রিভার সুড়ঙ্গকে বিচ্ছিন্ন একটি সাফল্য হিসেবে দেখছেন না; বরং বিশ্বের অন্যান্য জটিল মোহনায় রেল, সড়ক ও সরবরাহ করিডরে কাজে লাগতে পারে—এমন নতুন প্রজন্মের পানির নিচের সংযোগপথের জন্য একে শিল্প গবেষণাগার হিসেবে দেখছেন। ১১৩ মিটার গভীরে চাপের ভারসাম্য বজায় রাখার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আরও গভীর বা দীর্ঘ সমুদ্রতলীয় পথ সামলাতে যন্ত্রগুলোকে সাহায্য করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কঠিন শিলার মুখোমুখি
শেনজিয়াং-১ খননের মূল শক্তি জোগালেও, একগুচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থা এর বুদ্ধিমত্তার কাজ করছে। চীনের গভীরতম ও সর্বোচ্চ জলচাপের রেলপথের সুড়ঙ্গ নির্মাণ পরিচালনায় চায়না রেলওয়ে টানেল গ্রুপ তাদের ‘আটটি বুদ্ধিমান ব্যবস্থা’ মোতায়েন করেছে। এগুলো বুদ্ধিমান সুড়ঙ্গ খনন, খণ্ড সংযোজন, সমন্বয়, ত্রুটি নির্ণয়, পর্যবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, উপকরণ ব্যবস্থাপনা এবং বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। একটি স্মার্ট ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, সহায়ক খনন নির্দেশনা ও বিগ ডেটা বিশ্লেষণ একীভূত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে শেনজেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব টানেল কংগ্রেসে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বাস্তব চরম পরিস্থিতিতে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা দেখতে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন।
বুদ্ধিমান সুড়ঙ্গ খননব্যবস্থা নিউরাল নেটওয়ার্ক, মেশিন লার্নিং ও পূর্বাভাস-নির্ভর অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কাটারহেডের সামনে থাকা ভূতাত্ত্বিক আচরণ আগাম অনুমান করে। এজ ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যন্ত্রটি এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরামিতি সমন্বয় করতে পারে। সেন্সরে অস্বাভাবিক চাপ বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি ধরা পড়লে জরুরি ফিউজ নিয়ন্ত্রণ সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দিতে পারে। চায়না রেলওয়ে টানেল গ্রুপের প্রধান প্রকৌশলী হং কাইরং ব্যাখ্যা করেন, এই প্রকল্পের বাইরেও বৃহত্তর লক্ষ্য রয়েছে।
বুদ্ধিমান সুড়ঙ্গ নির্মাণের গবেষণা ও উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ ও পরিচালনার মধ্যকার তথ্যের ব্যবধান ঘোচানো এবং এ ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করাই আমাদের অঙ্গীকার।
সাম্প্রতিক সময়ে সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো খাতের জন্য বিশেষভাবে তৈরি চীনের প্রথম ভার্টিক্যাল লার্জ মডেলের পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবেও প্রকল্পটি ব্যবহৃত হয়েছে। ন্যাশনাল কি ল্যাবরেটরি ফর টানেল বোরিং মেশিনস প্রকাশিত এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ৭৭৩টি প্রকৌশল প্রকল্প এবং নির্মাণ-সংক্রান্ত ১২০ বিলিয়ন রেকর্ডের তথ্য কাজে লাগিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণকে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করে। মডেলটি ইতিমধ্যে পার্ল রিভার মোহনার সুড়ঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ডিজিটাল সুড়ঙ্গ নির্মাণ পরিচালনার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দূরত্ব কমানো
শেনজেন-জিয়াংমেন রেলপথ কেবল প্রকৌশলগত একটি উদ্যোগ নয়। বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলকে একীভূত করার চীনের জাতীয় কৌশলে এটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। এ অঞ্চলে প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ মানুষের বসবাস, আর সম্মিলিত মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে পার্ল রিভার মোহনা একটি বড় ভৌগোলিক বাধা। এর কারণে পূর্ব তীরের শেনজেন ও হংকং এবং পশ্চিম তীরের গুয়াংঝৌ, জিয়াংমেন ও ঝংশানের মধ্যে যাতায়াতকারীদের ফেরি পার হতে হয়, অথবা সড়কপথে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। নতুন রেলপথ চালু হলে শেনজেন ও জিয়াংমেনের যাত্রা এক ঘণ্টারও কমে আসবে। শেনজেন বিমানবন্দরের পূর্ব অংশ থেকে নানশা যেতে লাগবে প্রায় আধঘণ্টা।
এই রেলপথে সাতটি স্টেশন যুক্ত হবে: শিলি, শেনজেন বিমানবন্দরের পূর্ব অংশ, বিনহাই বে, নানশা, ঝংশান উত্তর, হেংলান এবং জিয়াংমেন। এর মধ্যে শিলি ও শেনজেন বিমানবন্দরের পূর্ব অংশের স্টেশন দুটি ভূগর্ভস্থ হবে। পরের স্টেশনটির নির্মাণ এলাকা ৪৮৭,৫০০ বর্গমিটার। সেখানে যাত্রীরা পাঁচ মিনিটের মধ্যে উচ্চগতির রেল, মেট্রো ও আকাশপথের যাত্রার মধ্যে বদল করতে পারবেন। চারটি স্টেশন হবে উড়ালপথে, আর জিয়াংমেন স্টেশন থাকবে ভূমির সমতলে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশের প্রধান জনবসতিগুলোকে যুক্ত করার লক্ষ্যে তৈরি চীনের ‘আট উল্লম্ব ও আট অনুভূমিক’ জাতীয় উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের পূর্ব উপকূলীয় অংশে এই পথটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত সংযোগ পূরণ করবে।
যাতায়াতের সময় কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূগোল বদলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জিয়াংমেন বা ঝংশানে বসবাসকারী কর্মীরা শেনজেনের কর্মসংস্থানকেন্দ্রগুলোতে সহজে পৌঁছাতে পারবেন। নির্মাতারাও মোহনার দুই পাশের উৎপাদন শৃঙ্খল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে সহজে সংযোগ গড়ে তুলতে পারবেন। এমন ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে যাতায়াতের প্রতিটি মিনিট সাশ্রয় সরাসরি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং শ্রমবাজারের পরিসর বিস্তৃত করে। আগামী কয়েক দশকে কোম্পানিগুলো কোথায় কারখানা গড়বে, পরিবারগুলো কোথায় বাড়ি কিনবে এবং চীনের অন্যতম উৎপাদনশীল অঞ্চল কীভাবে শহরগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধি বণ্টন করবে—সুড়ঙ্গটি এসব সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
২০২৮ সালের দিকে শেষ পর্যায়ের অগ্রযাত্রা
শেনজেন-জিয়াংমেন রেলপথের নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয় ২০২৪ সালে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা। পার্ল রিভার মোহনার সুড়ঙ্গ পুরো করিডরের মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে কঠিন একক অংশ, আর এর অগ্রগতিই কার্যত পুরো পথের সময়সীমা নির্ধারণ করছে। শেনজিয়াং-১ ইতিমধ্যে ১১৩ মিটারের রেকর্ড গভীরতা পেরিয়েছে। তবে পশ্চিম তীরের দিকে বাঁক নিয়ে ওপরে ওঠা শুরুর আগে আরও এগিয়ে সুড়ঙ্গটিকে ১১৬ মিটারের গভীরতম বিন্দুতে পৌঁছাতে হবে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে একটানা কাজ করে টিবিএমটি প্রমাণ করেছে, আগে কোনো রেলপথের সুড়ঙ্গে পরীক্ষিত না হওয়া পরিস্থিতিতেও চীনে নকশা করা যন্ত্র নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে।
সুড়ঙ্গের বাইরেও প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্য মেধাস্বত্ব তৈরি করেছে। প্রকল্প দলটি পাঁচটি উদ্ভাবন পেটেন্ট ও সাতটি ইউটিলিটি মডেল পেটেন্টের আবেদন করেছে। পাশাপাশি প্রকাশিত ১৭টি কারিগরি গবেষণাপত্র একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। এসব অবদান যান্ত্রিক উদ্ভাবন থেকে শুরু করে স্মার্ট নির্মাণ প্রযুক্তি পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত ভূতাত্ত্বিক পূর্বাভাসের সরঞ্জাম এবং কঠিন ভূগর্ভস্থ পরিবেশেও মান বজায় রাখা স্বয়ংক্রিয় ওয়েল্ডিং রোবট। সমুদ্রতলের ১১৩ মিটার নিচে সংগৃহীত নথি ও তথ্য চীনের ভেতরে এবং সম্ভাব্যভাবে বিদেশে অন্যান্য জটিল মোহনায় পানির নিচের সংযোগপথ নির্মাণের পরিকল্পনাকারীদের জন্য তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করবে।
রেলপথটি চালু হলে চীনে ইতিমধ্যে চালু থাকা ৪৫,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চগতির রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা বিশ্বের বৃহত্তম নেটওয়ার্ক। তবে এই বিশাল ব্যবস্থার মধ্যেও পার্ল রিভার মোহনার সুড়ঙ্গটি আলাদা। এটি উচ্চচাপে সুড়ঙ্গ খননের শিল্পগত সীমা আরও এগিয়ে নিচ্ছে এবং দেশীয়ভাবে তৈরি নতুন প্রজন্মের যন্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ও নির্মাণপদ্ধতির কার্যকারিতা প্রমাণ করছে। বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জন্য সুড়ঙ্গটির অর্থ দ্রুত যাতায়াত এবং আরও দৃঢ় অর্থনৈতিক বন্ধন। আর বৈশ্বিক প্রকৌশল অঙ্গনের জন্য এটি পানির নিচে রেলপথ নির্মাণের নতুন মানদণ্ড।
মূল কথা
- ২০২৬ সালের এপ্রিলে পার্ল রিভার মোহনার সুড়ঙ্গ সমুদ্রতলের ১১৩ মিটার গভীরে পৌঁছে বিশ্বরেকর্ড গড়ে, যা এটিকে নির্মিত সুড়ঙ্গগুলোর মধ্যে বিশ্বের গভীরতম পানির নিচের উচ্চগতির রেলপথের সুড়ঙ্গে পরিণত করে।
- দেশীয়ভাবে তৈরি শেনজিয়াং-১ টানেল বোরিং মেশিন চার বছরে ১৩টি ভূতাত্ত্বিক স্তর, পাঁচ ধরনের শিলা ও ছয়টি ফল্ট জোন পেরিয়ে চার কিলোমিটারেরও বেশি সুড়ঙ্গ খনন করেছে।
- সর্বোচ্চ গভীরতায় জলচাপ ১.০৬ মেগাপ্যাসকেলে পৌঁছাবে। এই চাপ সামলাতে দূরনিয়ন্ত্রিত স্লারি শিল্ড প্রযুক্তি এবং ১০০ বছর টেকার উপযোগী আগে থেকে তৈরি কংক্রিটের আস্তরণ প্রয়োজন।
- মেশিন লার্নিং ও নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আটটি বুদ্ধিমান ব্যবস্থা খননকাজ পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি সুড়ঙ্গ নির্মাণের জন্য চীনের প্রথম ভার্টিক্যাল লার্জ মডেলও ব্যবহৃত হচ্ছে।
- ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ শেনজেন-জিয়াংমেন রেলপথ ২০২৮ সালে চালু হলে দুই শহরের যাত্রার সময় এক ঘণ্টারও কমে আসবে এবং গুয়াংডং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।






