শান্তিবাদ থেকে শক্তির পথে: জাপানের কৌশলগত পরিবর্তন
গত এক দশকে জাপান যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী পরিচয় থেকে দৃঢ়ভাবে সরে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যূনতম সামরিক বাহিনী বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর, টোকিও এখন সত্যিকার অর্থে সক্ষম সশস্ত্র বাহিনী এবং উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তুলছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দেশটি তাদের ইজুমো শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারগুলো এমনভাবে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যাতে সেগুলো এফ-৩৫বি যুদ্ধবিমান পরিচালনা করতে পারে। এর ফলে কার্যত ১৯৪৫ সালের পর জাপান প্রথমবারের মতো একটি বিমানবাহী রণতরির অধিকারী হয়। সরকার ১৪৭টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার প্রতিশ্রুতিও দেয়। ২০২৩ সালে টোকিও তাদের কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু আক্রমণাত্মক অস্ত্র ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বিক্রি শুরুর অনুমতি দেয়। গত মাসে জাপানি কর্তৃপক্ষ অস্ত্র রপ্তানির অবশিষ্ট অধিকাংশ বিধিনিষেধ তুলে নেয়, ফলে ডেস্ট্রয়ার, ক্ষেপণাস্ত্র ও জেট বিমান বিদেশে বিক্রির পথ খুলে যায়। এসব পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তায় জাপানের ভূমিকা নতুন করে কল্পনা করার মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
- শান্তিবাদ থেকে শক্তির পথে: জাপানের কৌশলগত পরিবর্তন
- তাকাইচি মতবাদ ও তাইওয়ান প্রশ্ন
- বর্ধমান অস্ত্রভান্ডার ও বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজার
- লেনদেননির্ভর পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোট
- নতুন যুগের জন্য কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়
- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা
- প্রতিরোধ, চীন-ফ্যাক্টর ও অর্থনৈতিক জবরদস্তি
- রাজস্বের বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধা
- মূল কথা
এই পরিবর্তন ২০১৫ সালে প্রকৃত গতি পায়, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে আইন পাস করান। ওই আইন অনুযায়ী, সীমিত কিছু ক্ষেত্রে—যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালে—জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীকে সমষ্টিগত আত্মরক্ষার স্বার্থে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়। তখন এই সংস্কারের বিরুদ্ধে জনরোষ ও বিক্ষোভ দেখা দিলেও এটি কার্যকর হয় এবং পরবর্তী পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। ২০১৭ সালে আবে ইঙ্গিত দেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির এক শতাংশে রাখার অনানুষ্ঠানিক সীমাকে টোকিও আর স্থির বলে বিবেচনা করবে না। ২০১৮ সালে জাপান উভচর দ্রুত মোতায়েন ব্রিগেড গঠন করে। দূরবর্তী দ্বীপগুলো রক্ষা ও পুনর্দখলের জন্য নৌসেনাদের আদলে তৈরি এই ইউনিট। জাপানের ২০২২ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গঠন কর্মসূচিতে পাল্টা হামলার সক্ষমতা অর্জনের অঙ্গীকার করা হয়, যার মধ্যে এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম অধিক পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
আজ টোকিওর অধিকাংশ রাজনীতিকের মধ্যে বিতর্ক আর জাপানের নিজের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত কি না, তা নিয়ে নয়। বরং কত দ্রুত তা করা উচিত, সেটিই মূল প্রশ্ন। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় দুই শতাংশে পৌঁছানোর কথা, এবং প্রান্তিক পর্যায়ে বিধিনিষেধ শিথিল করার বদলে পুরো প্রতিরক্ষা অবস্থানই বদলে ফেলা হচ্ছে। এই গতিপথ উল্টাতে হলে বহু বছরের ক্রয়চুক্তি বাতিল, উৎপাদন লাইন সংকুচিত, নতুন রপ্তানি বিধি প্রত্যাহার এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে গড়ে তোলা ইউনিট ও ঘাঁটিগুলো দুর্বল করতে হবে। এসব সংস্কারের জনপ্রিয়তা বিবেচনায়, এগুলো উল্টে দিতে চান এমন নেতাদের নির্বাচিত করার সম্ভাবনা কম।
তাকাইচি মতবাদ ও তাইওয়ান প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির চেয়ে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত করতে আর কেউ বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হয় না। আবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাকাইচি ২০২৫ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানের সামরিক অবস্থান সম্প্রসারণে বেশি সময় নেননি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি আগাম নির্বাচনের ডাক দেন এবং প্রতিনিধি পরিষদে ৩১৬ আসনের সুপারমেজরিটি অর্জন করেন, যা যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে তাঁর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সবচেয়ে বড় বিজয়। ‘জাপান ফার্স্ট’—শক্তিশালী এই বয়ানের ওপর দাঁড়ানো তাঁর নির্বাচনী কর্মসূচি এমন এক তরুণ প্রজন্মের উদ্বেগকে ধারণ করে, যারা যুদ্ধের স্মৃতির বদলে চীনের জবরদস্তিমূলক আচরণ এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মুখে বড় হয়েছে।
২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর জাপানের পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেন, চীনের তাইওয়ানে হামলা জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি আগের যেকোনো নেতার চেয়ে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেন যে দ্বীপটিতে হামলা হলে ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইনের আওতায় টোকিও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তাকাইচির বিরুদ্ধে জাপানকে ঔপনিবেশিক অতীতে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তোলে এবং গুরুতর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেয়। চীন তার নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে, সামুদ্রিক খাদ্য আমদানি স্থগিত করে, জাপানি সামরিক সংস্থাগুলোর কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং পরে কয়েক ডজন জাপানি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করে। ডিসেম্বরে চীনা যুদ্ধবিমান জাপানি সামরিক উড়োজাহাজের দিকে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ রাডার তাক করেছিল বলে খবর পাওয়া যায়।
তাকাইচি পিছু হটতে অস্বীকার করেন। তাঁর অবস্থান দেশে জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে বলে মনে হয়, যা চীনের জবরদস্তিমূলক নীতির এক বৈপরীত্য তুলে ধরে। বেইজিং যত কঠোরভাবে দমন করতে চায়, টোকিওতে ততই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে। তাকাইচি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ জাপানের তিনটি মূল জাতীয় নিরাপত্তা নথি সংশোধনের অঙ্গীকারও করেছেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির দুই শতাংশে উন্নীত করার সময়সীমা এগিয়ে ২০২৬ করেছেন। তিনি সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের সম্ভাব্য উদ্যোগের ভিত্তিও তৈরি করছেন। এই অনুচ্ছেদে আইনত যুদ্ধ পরিত্যাগ করা হয়েছে এবং সামরিক বাহিনী বজায় রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বর্ধমান অস্ত্রভান্ডার ও বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজার
জাপানের প্রতিরক্ষা রূপান্তর বাজেটের পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দ্বীপগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদের ডিপো, জ্বালানি মজুত, সুরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্র এবং এমন স্থাপনা বাড়িয়ে টোকিও নিরাপত্তা জোরদার করছে, যেগুলোর সাহায্যে রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জজুড়ে উড়োজাহাজ ও স্থল ইউনিট ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। দেশটি গোলাবারুদের মজুত বাড়াতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে, চালকবিহীন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে এবং টমাহক স্থল-লক্ষ্যবস্তুতে হামলাকারী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পাল্টা হামলার সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। আগামী বছর থেকে ডেস্ট্রয়ারে এসব ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন শুরু হবে। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি মোতায়েনের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য ও ইতালির সঙ্গে মিলে দেশটি পরবর্তী প্রজন্মের একটি যুদ্ধবিমানও তৈরি করছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে জাপান কয়েক দশকের মধ্যে প্রতিরক্ষা রপ্তানি বিধির সবচেয়ে বড় সংস্কার ঘোষণা করে। সরকার পাঁচটি শ্রেণির বিধিনিষেধ তুলে দেয়, যেগুলোর কারণে অধিকাংশ সামরিক রপ্তানি উদ্ধার, পরিবহন, নজরদারি ও মাইন অপসারণ সরঞ্জামের মধ্যে সীমিত ছিল। এখন মন্ত্রীরা প্রতিটি প্রস্তাবিত বিক্রি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবেন। তবে সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ এবং কঠোর যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক—এমন নীতিগুলো বহাল থাকবে। এই পরিবর্তনে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার নতুন পথ খুলেছে। রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান নেভির জন্য যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে ৬৫০ কোটি ডলারের চুক্তিতে অস্ট্রেলিয়া জাপানের মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজকে বেছে নিয়েছে। পোল্যান্ড থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ সরঞ্জাম কেনার সুযোগ খতিয়ে দেখছে। ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, উচ্চমানের জাপানি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার সুযোগ দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করবে এবং প্রতিরোধ সক্ষমতার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।
একক কোনো দেশের পক্ষে এখন আর একা নিজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব নয়—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি নতুন নীতির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
একক কোনো দেশের পক্ষে এখন আর একা নিজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব নয়, আর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে একে অপরকে সমর্থন করে এমন অংশীদার দেশগুলো অপরিহার্য।
প্রতিরক্ষা রপ্তানি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে, প্রতিটি ইউনিটের খরচ কমিয়ে এবং সামরিক সংকটে কাজে লাগানো যাবে এমন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করে শিল্পভিত্তিকে শক্তিশালী করবে বলে টোকিও আশা করছে। কয়েক দশক ধরে মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের মতো ঠিকাদাররা একক ক্রেতা, আত্মরক্ষা বাহিনীর কাছ থেকে আসা ছোট অর্ডারের ওপর নির্ভর করেছে। নতুন বিধি জাপানি কোম্পানিগুলোকে শুধু বিদেশি অংশীদারদের কাছ থেকে কেনার বদলে তাদের সঙ্গে মিলে উৎপাদনের সুযোগ দিচ্ছে। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দ্রুত বাড়ায় জাপানি শিল্পের সক্ষমতার ওপর ইতিমধ্যে চাপ পড়েছে, আর প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে দেশটি বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের চেয়ে পিছিয়ে। সম্পদের অদক্ষ বণ্টনের ফলে খরচ বেড়ে যেতে পারে অথবা সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
লেনদেননির্ভর পরীক্ষার মুখে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোট
ওয়াশিংটনে জাপানের এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ব্যাপকভাবে স্বাগত পাওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার ধনী পূর্ব এশীয় মিত্রকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও ব্যয় করতে চাপ দিয়ে এসেছে। এসব পদক্ষেপ জোটকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, আর জাপানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষদের সঙ্গে অংশীদারত্বে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছেন। তবে টোকিওর প্রচেষ্টা সত্যিই অংশীদারত্বকে শক্তিশালী করবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার ওপর। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র জোটগুলোকে ক্রমেই বেশি লেনদেননির্ভর দৃষ্টিতে দেখেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প জাপানি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। পরে দুই পক্ষের চুক্তিতে অধিকাংশ পণ্যের শুল্কহার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের আতিথ্য দিতে থাকার বিনিময়ে জাপানকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় চার গুণ বেশি অর্থ দিতে হবে বলেও ট্রাম্প দাবি করেন। ৩০-৪০ বছর ধরে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি দেশটিকে ‘নষ্ট’ বলেছেন।
পেন্টাগনের ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে মিত্র ও অংশীদারদের নিজেদের প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নথিটিতে চীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের হুমকিকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আর পশ্চিম গোলার্ধের অগ্রাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আর তাইওয়ান নিয়ে তাকাইচির মন্তব্যের জেরে বেইজিং জবরদস্তিমূলক অভিযান শুরু করলে জাপানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সমর্থন ছিল সীমিত।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপত্তার অঙ্গীকারকে দ্বিপক্ষীয় শুল্ক বা সম্পর্কহীন বাণিজ্যিক ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত করলে মিত্রদের এমন বাজার, অর্থায়নের মাধ্যম ও সরবরাহপথ খুঁজতে উৎসাহিত করা হয়, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে যায় না। ওয়াশিংটন যদি টোকিওর সমালোচনা চালিয়ে যায়, জাপান তার বাড়তি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আরও কঠোর দরকষাকষি করতে পারে এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ ও যৌথ উন্নয়নের আরও কাজ অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের দিকে সরিয়ে নিতে পারে। এসব পদক্ষেপ জাপানকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী করে তুলবে না, তবে টোকিওর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দেবে।
নতুন যুগের জন্য কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়
সামরিক কার্যক্রমের সমন্বয় এখন জরুরি অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও টোকিও জাপানে মার্কিন বাহিনীকে যৌথ কার্যকরী সদর দপ্তরে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যা ২০২৫ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত জাপানের যৌথ অভিযান কমান্ডের সমকক্ষ হিসেবে কাজ করবে। ধূসর-অঞ্চলের পরিস্থিতি থেকে শুরু করে প্রকাশ্য সংঘাত পর্যন্ত বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে দ্রুততর ও আরও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর সামরিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দুই সরকার জোটের কমান্ড কাঠামো উন্নত করার প্রচেষ্টা আবারও নিশ্চিত করে।
এই অগ্রগতি সত্ত্বেও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের পর থেকে জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ২+২ বৈঠক হয়নি, আর জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক পর্যায়ে যথেষ্ট সম্পৃক্ততা ছাড়াই কর্মপর্যায়ের বৈঠক চলছে। নতুন মার্কিন যৌথ বাহিনী সদর দপ্তর বাস্তবে জাপানের যৌথ অভিযান কমান্ডের সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের এখনও স্পষ্টতা দরকার। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পাল্টা হামলা অভিযানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সমন্বয় এবং সামরিক দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়গুলোতে। শুধু কমান্ড কর্তৃত্বকে সম্মুখসারির কাছাকাছি নিয়ে গেলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
কিছু প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে, ধাপে ধাপে সংস্কার আর যথেষ্ট নয়। তাঁদের যুক্তি, কার্যকরী পরিকল্পনা একীভূত করতে এবং জোটকে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে লড়াই করতে সক্ষম করতে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া মডেলের মতো যৌথ বাহিনী কমান্ড কাঠামো দরকার। এটি গড়তে কয়েক বছর ধরে আইনি প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন হবে। তবে সংকট শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা কৌশলগতভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। ইতিহাস তার মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলো সচরাচর আগেভাগে জানায় না, আর এমন কাঠামো গড়ার সুযোগ অনির্দিষ্টকাল খোলা নাও থাকতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা
নিরাপত্তার জন্য জাপান শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে না। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইউরোপীয় দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ এবং এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও টোকিও ধারাবাহিকভাবে অংশীদারত্ব জোরদার করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সাধারণত উত্তেজনাপূর্ণ। এসব সম্পর্ক যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সরবরাহশৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনার আরও সুযোগ তৈরি করে। চীনের জন্য জাপানকে একঘরে করা কঠিন করে তোলে এই সম্পর্কগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন অনিয়মিত হলে এগুলো অতিরিক্ত স্থিতিস্থাপকতাও জোগায়।
অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক এই প্রবণতার উদাহরণ। গত এক দশকে তিন দেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচেয়ে উন্নত ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সম্পর্কগুলোর একটি গড়ে তুলেছে, যার আওতায় রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, উন্নত সামুদ্রিক অভিযান ও যৌথ মহড়া। আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকলেও অস্ট্রেলিয়া ও জাপান এখন কার্যত মিত্র হিসেবে কাজ করছে। ক্যানবেরা ও টোকিও সাইবার, মহাকাশ, রসদ এবং সরবরাহশৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন কাঠামো চালু করেছে। জাপানে নকশা করা মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট কেনার অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা শিল্পে একীভূত হওয়ার পথে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
জাপান কোয়াডের মতো ছোট পরিসরের বহুপক্ষীয় জোটেরও কেন্দ্রীয় সদস্য। এতে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত রয়েছে। ফিলিপাইনকে নিয়ে গঠিত স্কোয়াডেও জাপান অংশ নেয়। টোকিও ধারাবাহিকভাবে তার অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের ধারণাকে এগিয়ে নিচ্ছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং অবাধ বাণিজ্য রক্ষা। আঞ্চলিক কৌশলের নীতিনির্ভর দিকগুলোতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ ওঠানামা করলেও বাণিজ্য, সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় আঞ্চলিক অংশীদারত্ব টিকিয়ে রাখতে জাপান সহায়তা করতে পারে।
প্রতিরোধ, চীন-ফ্যাক্টর ও অর্থনৈতিক জবরদস্তি
চীনের দ্রুত সামরিক আধুনিকায়ন এবং পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরজুড়ে ক্রমবর্ধমান জবরদস্তিমূলক আচরণ জাপানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের বাহিনী নয়, সুসজ্জিত জাপানি বাহিনীও রয়েছে—এমন জোটের মুখোমুখি হতে বেইজিংয়ের আগ্রহ কম থাকার কথা। তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো সংঘাতে জাপানি ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং রসদ নেটওয়ার্ক জড়িয়ে পড়বে, ফলে চীনের পক্ষে দ্রুত জয় অর্জন কঠিন হবে। এখন বেইজিংকে ধরে নিতে হবে, এমন সংঘাত হলে টোকিও তাতে যোগ দেবে। অর্থাৎ কৌশলগত হিসাব বদলে গেছে।
তাইওয়ান সংকট শুরু হতে পারে এমন চীনা প্রচেষ্টার মাধ্যমে, যার লক্ষ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শিল্প উপকরণের সরবরাহ বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। বিরল মৃত্তিকা, বিশেষায়িত উপকরণ, সেন্সর, ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং সেমিকন্ডাক্টর-সম্পর্কিত সরঞ্জাম—সবই চাপ সৃষ্টির উপায় হয়ে উঠতে পারে। তাইওয়ান বা পূর্ব চীন সাগর ঘিরে ‘ফেইট অ্যাকম্পলি’ বা একতরফাভাবে বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া ঠেকাতে এবং নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় টোকিও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য বোধ করতে পারে। অন্যদিকে, হস্তক্ষেপে মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দ্বিধায় পড়তে পারেন। জাপানের বর্তমান উদ্যোগ এই সমস্যার জবাব দেওয়ার জন্যই নেওয়া হয়েছে। তাইওয়ানের প্রতি প্রকাশ্য অঙ্গীকার এবং সামরিক শক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে টোকিও সংকেত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন দ্বিধা করলেও তারা পিছিয়ে থাকবে না।
সমালোচকদের আশঙ্কা, জাপানের নতুন সক্ষমতা উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এসব সক্ষমতার সমন্বয় ঠিকমতো না হলে, শক্তি প্রয়োগের নিয়ম অস্পষ্ট থাকলে বা দায়িত্ব ভাগাভাগি যথাযথ না হলে বিপদ তৈরি হতে পারে। তবে জাপান যত দিন মার্কিন শক্তির বিকল্প হিসেবে নয়, পরিপূরক হিসেবে নিজের বাহিনী গড়ে তুলবে, তত দিন এই সামরিক সম্প্রসারণ বেইজিংকে হামলায় প্ররোচিত করার সম্ভাবনা কম। শক্তির চেয়ে দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতাই সংঘাত ডেকে আনার সম্ভাবনা বেশি।
রাজস্বের বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধা
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে জাপান গুরুতর বাধার মুখে। উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বোচ্চ, যা প্রায় ২৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। ইয়েনের দর দুর্বল থাকায় প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ জোগাতে কর বৃদ্ধি রাজনৈতিকভাবে কঠিন প্রমাণিত হয়েছে, আর সাম্প্রতিক প্রণোদনা ব্যয় দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব উদ্বেগ খুব একটা কমাতে পারেনি। জনসংখ্যা হ্রাস, নিয়োগসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে শ্রমিকের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কোমেইতোর সঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ২৬ বছরের জোট ভেঙে পড়ায় প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণে একটি প্রচলিত বাধা সরে গেছে। তবে জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে নতুন জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সামান্য। তাকাইচির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তাঁর দলের চেয়ে বেশি, আর বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ কত দিন টিকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোমেইতো আবার জোটে ফিরলে রক্ষণশীলদের প্রতিরক্ষা-উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন করে বাধার মুখে পড়তে পারে। তবে আপাতত জনমত চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে, যা তাকাইচিকে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
মূল কথা
- জাপান যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী বিধিনিষেধ পরিত্যাগ করেছে এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্ব গড়ে তুলে নিজের সামরিক বাহিনীকে সক্ষম ও বহির্মুখী শক্তিতে রূপান্তর করছে।
- প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির দুই শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ ত্বরান্বিত করেছেন এবং জাপানের নিরাপত্তাকে সম্ভাব্য তাইওয়ান সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছেন, যার জেরে চীন তীব্র প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
- টোকিও কয়েক দশক পুরোনো অস্ত্র রপ্তানি বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে, ফলে অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনসহ মিত্রদের কাছে যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
- শুল্ক আরোপ এবং জাপানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিনিময়ে বেশি অর্থ দেওয়ার দাবি—জোট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের লেনদেননির্ভর মনোভাব জাপানকে আরও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
- নতুন কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাহিনীর কার্যকরী সমন্বয় এগোচ্ছে, তবে জোটের এখনও স্পষ্ট যৌথ যুদ্ধকালীন কাঠামো নেই।
- যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা মোকাবিলা ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোরদার করতে জাপান অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গভীর করছে।






