অপারেশন সিন্দুরের এক বছর পর স্টেলথ যুদ্ধবিমানের পথে পাকিস্তান
অপারেশন সিন্দুরের আকাশযুদ্ধে পাকিস্তান ও ভারতের বাহিনীর সংঘর্ষের এক বছর পর পাকিস্তান বিমানবাহিনী উচ্চাভিলাষী আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজি নিশ্চিত করেন, চীনের শেনইয়াং জে-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান কেনার জন্য বাহিনীটি প্রাথমিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে। গাজি আধুনিকায়নের বিস্তৃত পরিকল্পনার কথা জানান এবং বলেন, কয়েকটি বড় কর্মসূচির প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
সূচিপত্র
- অপারেশন সিন্দুরের এক বছর পর স্টেলথ যুদ্ধবিমানের পথে পাকিস্তান
- রপ্তানিযোগ্য জে-৩৫এই যুদ্ধবিমানের কারিগরি বিবরণ
- চুক্তিটি শুধু যুদ্ধবিমানে সীমাবদ্ধ নয় কেন
- আসন্ন স্টেলথ-সক্ষমতার ঘাটতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
- অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাধা এখনো রয়েছে
- প্রথম ক্রেতা হওয়ার প্রতিযোগিতা
- দক্ষিণ এশিয়ার আকাশশক্তিতে নতুন অধ্যায়
- মূল বিষয়গুলো
দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র, পরবর্তী প্রজন্মের প্ল্যাটফর্ম, আরও জে-১০সি বিমান এবং ব্যাপকভাবে উন্নত জেএফ-১৭সহ উন্নত সক্ষমতা অর্জনের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
জে-৩৫ চুক্তির পরিধি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঘোষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইসলামাবাদ বর্তমান চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বহর ছাড়িয়ে এগোতে চায়।
চীনের সরবরাহ করা যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র যে সংঘাতে বড় ধরনের ভারতীয় বিমান হামলা প্রতিহত করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল, তার প্রথম বার্ষিকী পালনের সময় এ ঘোষণা এল। গাজির সংবাদ সম্মেলন এই বার্তাই জোরালো করেছে যে একাধিক ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় ইসলামাবাদ।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) গত সপ্তাহে জে-৩৫-এর সম্পূর্ণ কার্যকর রপ্তানি সংস্করণের ফুটেজ প্রচার করার পর শিগগিরই বিমান সরবরাহের জল্পনা বেড়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকেরা লক্ষ করেছেন, বিমানটিতে চীনা বিমানবাহিনীর চিহ্নের বদলে চায়না অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের লোগো ছিল। এ থেকে জোরালোভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশি কোনো ক্রেতার জন্য বিমানটি তৈরি হয়েছে। এ পর্যন্ত নিশ্চিত একমাত্র বিদেশি ক্রেতা পাকিস্তান হওয়ায়, ফুটেজটি এ বছরের শেষ নাগাদ জে-৩৫-এর প্রথম চালান পৌঁছানোর প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।
রপ্তানিযোগ্য জে-৩৫এই যুদ্ধবিমানের কারিগরি বিবরণ
এই চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে জে-৩৫এই—চীনা বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ব্যবহৃত স্থলভিত্তিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান জে-৩৫এ-এর রপ্তানির জন্য তৈরি সংস্করণ। শেনইয়াং এয়ারক্রাফট করপোরেশনের তৈরি জে-৩৫ পরিবারটি চীনে উৎপাদনে যাওয়া দ্বিতীয় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান; এর আগে রয়েছে আকারে বড় চেংদু জে-২০। বেইজিং জে-২০ রপ্তানি বাজারে ছাড়েনি। বিপরীতে, জে-৩৫ শুরু থেকেই দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহার ও বিদেশে বিক্রির কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
নকশার দিক থেকে জে-৩৫এই-তে রয়েছে আধুনিক রাডারে কম ধরা পড়া উড়োজাহাজের বৈশিষ্ট্যসূচক জোড়া ইঞ্জিন, অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবাহী খোপ এবং রাডার শোষণকারী উপাদান। বিমানটির ডানা ও দেহের সমন্বিত নকশা, ডাইভার্টারবিহীন সুপারসনিক বায়ুপ্রবেশপথ এবং রাডারের প্রতিফলন কমানোর উদ্দেশ্যে সাজানো ধারযুক্ত পৃষ্ঠ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ খোপে স্টেলথ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে পিএল-১৫-এর মতো আকাশ-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়। অপেক্ষাকৃত কম চাহিদার অভিযানে বাড়তি নমনীয়তার জন্য রয়েছে বাইরের অস্ত্র সংযোজনের স্থানও। প্ল্যাটফর্মটিতে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত করতে সক্ষম সক্রিয় ইলেকট্রনিকভাবে স্ক্যান করা অ্যারে রাডার রয়েছে। পাশাপাশি, বাইরের পডে বসানোর বদলে বিমানের কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত ইলেকট্রো-অপটিক্যাল লক্ষ্য নির্ধারণব্যবস্থাও আছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের প্রচারিত কর্মক্ষমতার হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিমানটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১.৮ ম্যাক হতে পারে। এর যুদ্ধব্যাসার্ধ প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার এবং কার্যকর উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা প্রায় ১৬ হাজার মিটার। বলা হচ্ছে, চীন উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক রাখতে পেরেছে; প্রতিটি বিমানের সম্ভাব্য দাম ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৮ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে। তুলনায়, মার্কিন এফ-৩৫ লাইটনিং টু-এর প্রতিটির দাম সাধারণত অনেক বেশি। পশ্চিমা স্টেলথ প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই এমন দেশগুলোর কাছে এ কারণে চীনা বিমানটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
সিসিটিভি জানিয়েছে, শেনইয়াংয়ের সংযোজন কারখানা প্রতি ৭২ ঘণ্টায় একটি নতুন জে-৩৫ তৈরি করতে পারে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রাজনৈতিক ও আর্থিক চুক্তি চূড়ান্ত হলে রপ্তানি সরবরাহে উৎপাদন সক্ষমতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
চুক্তিটি শুধু যুদ্ধবিমানে সীমাবদ্ধ নয় কেন
বেইজিং ও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, জে-৩৫ কেনার পরিকল্পনা আরও বড় একটি প্যাকেজের অংশ হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা মূল্যায়নের ইঙ্গিত অনুযায়ী, ইসলামাবাদ কেজে-৫০০ আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণকারী বিমান এবং এইচকিউ-১৯ উচ্চ-উচ্চতার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। এসব ব্যবস্থা একত্রে শুধু বহরের পুরোনো বিমান প্রতিস্থাপনের বদলে একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
কেজে-৫০০ উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। এর নিজস্ব সক্রিয় ইলেকট্রনিকভাবে স্ক্যান করা অ্যারে রাডার দিয়ে দূরের হুমকি শনাক্ত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আকাশসীমায় থাকা স্টেলথ যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য পাঠানো যাবে। অন্যদিকে, এইচকিউ-১৯ ব্যবস্থায় বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা রয়েছে, যা ধারণাগতভাবে মার্কিন টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। এতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত আকাশ প্রতিরক্ষার আরেকটি স্তর যুক্ত হবে। জে-৩৫-এর কম রাডার-দৃশ্যমানতা ও দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতার সঙ্গে এই তিন ব্যবস্থা যুক্ত হলে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো প্রকৃত নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক যুদ্ধের সক্ষমতা পাবে।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন সুলতান এম. হালি সম্ভাব্য এ অধিগ্রহণকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধব্যবস্থাসহ পাকিস্তানের পঞ্চম প্রজন্মের যুগে প্রবেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ইসলামাবাদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে আরেকটি যুদ্ধবিমান কেনা নয়, বরং সমন্বিত নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক যুদ্ধ। এ মতবাদগত পরিবর্তন এমন একটি বাহিনীর জন্য গুণগত রূপান্তর হবে, যারা ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন এফ-১৬ ও ফরাসি মিরাজ বিমানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
২০২৫ সালের জুনে পাকিস্তান সরকারের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সংক্ষেপে দাবি করা হয়েছিল, চীন প্রায় ৪৬০ কোটি ডলারের চুক্তিতে ৪০টি জে-৩৫ যুদ্ধবিমান, কেজে-৫০০ বিমান ও এইচকিউ-১৯ ব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। তবে এতে থাকা তথ্য পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়নগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।
আসন্ন স্টেলথ-সক্ষমতার ঘাটতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ
আগামী দুই বছরের মধ্যে পাকিস্তানের জে-৩৫ স্কোয়াড্রন আকাশে ওড়ার সম্ভাবনা ভারতের সামনে উদ্বেগজনক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে বর্তমানে চতুর্থ ও সাড়ে চার প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধবিমান রয়েছে। এর মধ্যে আছে ফরাসি রাফাল, রুশ সু-৩০এমকেআই এবং উন্নত করা মিরাজ ২০০০। তবে নয়াদিল্লির হাতে কার্যকর কোনো পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নেই। দেশীয় অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এএমসিএ) কর্মসূচি ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝির আগে কার্যকর হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে না।
এ সময়সীমায় এমন একটি সম্ভাব্য সক্ষমতার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, যখন চীন ও পাকিস্তান—উভয় দেশই স্টেলথ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে পারে, আর ভারত প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। সামরিক বিশ্লেষকেরা একে দুই দিকের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ভারতীয় পরিকল্পনাবিদদের একই সময়ে উত্তর সীমান্তে চীনা জে-২০ এবং পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানি জে-৩৫ মোকাবিলা করতে হতে পারে। এ সময় প্রতিপক্ষেরা রাডারে কম ধরা পড়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে আকাশে আগাম সতর্কতাদানকারী বিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার এবং স্থলভিত্তিক রাডার স্টেশনের মতো ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে প্রথম আঘাত হানতে পারে।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের অন্তর্বর্তী সমাধান বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। কেউ কেউ সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে রুশ সু-৫৭ কেনার পক্ষে, আবার অন্যরা রাফাল যুদ্ধবিমানের বিদ্যমান ক্রয়াদেশ বাড়ানোর এবং রাডারে কম ধরা পড়া লক্ষ্য শনাক্ত করতে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করার ওপর জোর দিচ্ছেন। ভারতীয় বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার বিজয়িন্দর কে. ঠাকুর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হাতে প্রায় ৪০টি জে-৩৫ থাকতে পারে, অথচ ভারতীয় বিমানবাহিনীর হাতে কোনো স্টেলথ যুদ্ধবিমানই থাকবে না। তাঁর মতে, এই ব্যবধানের কারণে ভারতকে আক্রমণাত্মক অভিযানের বদলে প্রতিরক্ষামূলকভাবে শনাক্ত ও প্রতিহত করার কাজে যুদ্ধবিমানের বড় অংশ নিয়োজিত করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতিযোগিতায় এরই মধ্যে একটি স্পষ্ট ধরন দেখা গেছে। ভারত রাফাল যুদ্ধবিমান যুক্ত করার পর পাকিস্তান জে-১০সি কেনে এবং চীনা ওই প্ল্যাটফর্মটির প্রথম ও একমাত্র বিদেশি ব্যবহারকারী হয়। এখন ভারতের পরিকল্পিত আরও ১১৪টি রাফাল কেনার উদ্যোগের জবাবে, গুণগত সমতা ধরে রাখতে ইসলামাবাদ স্টেলথ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে বলে মনে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাধা এখনো রয়েছে
ইসলামাবাদ যে অধিগ্রহণের পথে এগোচ্ছে, তার প্রমাণ বাড়লেও অর্থায়ন, সরবরাহের সময়সূচি এবং আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। পাকিস্তান গুরুতর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে, যা ব্যয়বহুল পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বহর সচল রাখা কঠিন করে তুলতে পারে। স্টেলথ বিমান পরিচালনার জন্য আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রিত হ্যাঙ্গার, সুরক্ষিত বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, রাডারে কম ধরা পড়ার বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্র এবং নিরাপদ ডেটালিংক ব্যবস্থা—এমন বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। এসব সহায়ক খাতে বিনিয়োগের ব্যয় অনেক সময় বিমানগুলোর নিজেদের দামের চেয়েও বেশি হয়।
কর্মসূচি নিয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারাও পরস্পরবিরোধী সংকেত দিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ প্রকাশ্যে জে-৩৫ কেনার খবর নাকচ করে বলেন, এ জল্পনা শুধু গণমাধ্যমেই রয়েছে এবং এর প্রধান উদ্দেশ্য চীনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রিতে সুবিধা করা। কয়েকশ কোটি ডলারের অস্ত্র প্যাকেজের বিবরণ দেওয়া ২০২৫ সালের জুনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টটি মুছে ফেলার পর তাঁর এ মন্তব্য আসে। তবে অন্যান্য তথ্য এই অস্বীকৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০২৫ সালের জুনে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সূত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জে-৩৫ বহরে যুক্ত করার প্রস্তুতি হিসেবে পাকিস্তানি পাইলটরা ইতিমধ্যেই চীনে প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। এ ছাড়া পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রকাশ্যে অধিগ্রহণের প্রস্তুতির কথা নিশ্চিত করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো—২০২৬ বা ২০২৭ সালে প্রথম ধাপে চার থেকে ১২টি বিমান সরবরাহ করা হবে। এরপর অর্থায়ন ও অবকাঠামো প্রস্তুতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বহরটি ধীরে ধীরে বাড়বে। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত পুরো ৪০টি বিমান কিনলে, তা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বিনিয়োগগুলোর একটি হতে পারে। এর জন্য উপসাগরীয় অংশীদারদের আর্থিক সহায়তা অথবা বেইজিংয়ের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধার ঋণ প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথম ক্রেতা হওয়ার প্রতিযোগিতা
জে-৩৫এই পাওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের নামই সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ বিকল্প সম্ভাবনার কথা বলেছেন। চীনা সামরিক বিমান নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত আন্দ্রেয়াস রুপপ্রেখটের ধারণা, কোনো অপ্রকাশিত ক্রেতা শুরু থেকেই জে-৩৫ রপ্তানি কর্মসূচির অর্থায়নে সহায়তা করে থাকতে পারে। সম্ভাব্য প্রথম ক্রেতা হিসেবে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে কংগ্রেসে দেওয়া এক প্রতিবেদনে মার্কিন পেন্টাগন আমিরাত, সৌদি আরব ও মিসরকে আগ্রহী ক্রেতা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল।
আমিরাত এর আগে মার্কিন এফ-৩৫ কেনার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি কঠোর রপ্তানি বিধির কারণে তা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা স্টেলথ প্রযুক্তি কিনতে না পেরে আবুধাবি চীনা প্ল্যাটফর্মটিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখতে পারে। রুপপ্রেখট উল্লেখ করেছেন, উচ্চক্ষমতার যুদ্ধবিমান কেনার আগে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত শক্তিশালী বিক্রয়োত্তর সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করতে চায়। তাঁর মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের কঠোর শর্তের ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে চীনকে পূর্ণাঙ্গ গ্রাহকসেবা দেওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত শেষ পর্যন্ত জে-৩৫এই কিনলেও প্রথম কার্যকর রপ্তানি বিমান পাওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকেই সবচেয়ে এগিয়ে মনে হচ্ছে। পাকিস্তান বিমানবাহিনী এরই মধ্যে চীনা জে-১০সি ও জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চালায়। ফলে তাদের রয়েছে প্রতিষ্ঠিত রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা, পাইলটদের নতুন বিমানে রূপান্তরের অভিজ্ঞতা এবং সরবরাহশৃঙ্খলে সম্পর্ক—যা নতুন বিমান যুক্ত করার ঝুঁকি কমায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতিই ইসলামাবাদকে চীনের নতুন যুদ্ধব্যবস্থা গ্রহণের স্বাভাবিক প্রাথমিক ব্যবহারকারী করে তুলেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার আকাশশক্তিতে নতুন অধ্যায়
পাকিস্তানে জে-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য আগমনকে নিয়মিত সরঞ্জাম হালনাগাদের চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে আকাশযুদ্ধ পরিচালনার ধরনে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত এটি। পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এমনভাবে তৈরি, যাতে সেগুলো কঠোরভাবে সুরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারে, শনাক্তকরণ এড়িয়ে যেতে পারে এবং প্রতিপক্ষ কার্যকরভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। আকাশপথে আগাম সতর্কতাদানকারী প্ল্যাটফর্ম ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার সঙ্গে নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে, এসব বিমান একটি প্রচলিত বিমানবাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা, সমন্বিত সেন্সরনির্ভর যুদ্ধবাহিনীতে রূপান্তরিত করে।
পাকিস্তান ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও বিমানশক্তির ভৌগোলিক পরিসর বাড়াতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে, আগের বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান বিমানবাহিনী জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানসহ একটি স্কোয়াড্রন সৌদি আরবে মোতায়েন করে। স্টেলথ যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরে শক্তি প্রয়োগের ইসলামাবাদের সক্ষমতা বাড়বে। এ উন্নয়ন মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ রয়েছে এমন আঞ্চলিক রাজতন্ত্রগুলো ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ঘনিষ্ঠ মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
বেইজিংয়ের জন্য সফল জে-৩৫ রপ্তানি কর্মসূচি প্রমাণ করবে, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের প্রথম শক্তি হিসেবে চীন একটি পূর্ণাঙ্গ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধব্যবস্থা বিক্রি করতে সক্ষম। এ ধরনের সাফল্য চীনা প্রতিরক্ষা শিল্পের সুনাম বাড়াবে এবং আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন বাজারের দরজা খুলে দিতে পারে। ভারতের বিপরীতে কৌশলগত ভারসাম্য সৃষ্টির পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব অন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে চীনা মহাকাশ ও বিমান প্রযুক্তির সরাসরি প্রদর্শনী হিসেবেও কাজ করছে।
মূল বিষয়গুলো
- চীনের পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান কিনতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রাথমিক চুক্তি করেছে; ২০২৬ সালের শেষ দিকে সরবরাহ শুরু হতে পারে।
- চীন সম্প্রতি জে-৩৫এই রপ্তানি সংস্করণটি প্রদর্শন করেছে। দুই ইঞ্জিনের স্টেলথ যুদ্ধবিমানটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১.৮ ম্যাক; এতে উন্নত রাডার ও অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবাহী খোপ রয়েছে।
- বিশ্লেষকদের ধারণা, চুক্তিতে কেজে-৫০০ আকাশপথে আগাম সতর্কতাদানকারী বিমান ও এইচকিউ-১৯ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকতে পারে, যা একটি সমন্বিত যুদ্ধ নেটওয়ার্ক তৈরি করবে।
- ভারতের হাতে বর্তমানে কোনো পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান নেই। দেশীয় এএমসিএ কর্মসূচি ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝির আগে কার্যকর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না।
- অধিগ্রহণ নিয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন; কেউ চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন, আবার কেউ প্রাথমিক প্রস্তুতির কথা নিশ্চিত করেছেন।
- প্রথম বিকল্প ক্রেতা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম আলোচনায় থাকলেও, বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানকেই সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রথম ব্যবহারকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- বিক্রি নিশ্চিত হলে পাকিস্তান চীনা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রথম বিদেশি ব্যবহারকারী হবে এবং তা আঞ্চলিক বিমানশক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।






