রায়: জবাবদিহির নতুন যুগ
২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল তাইওয়ানের মেধাস্বত্ব ও বাণিজ্যিক আদালত এমন এক রায় দেন, যা বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) সাবেক প্রকৌশলী চেন লি-মিংকে কোম্পানির উন্নত ২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনপ্রক্রিয়াসংক্রান্ত বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। তাইওয়ানে করপোরেট গুপ্তচরবৃত্তির কোনো মামলায় এ পর্যন্ত দেওয়া সবচেয়ে কঠোর শাস্তি এটি। গুরুত্বপূর্ণ চিপ প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব চুরির বিচারে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের ঘটনাও এটিই প্রথম।
সূচিপত্র
সেমিকন্ডাক্টর খাতের নিরাপত্তা তাইওয়ান কীভাবে পরিচালনা করে, তার নির্দেশক হিসেবে মামলাটির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখা হয়েছে। এই খাত বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের সরবরাহব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত এক দশকে সংবেদনশীল তথ্য চুরির ঘটনা বেড়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে প্রসিকিউটররা সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও বাণিজ্যিক গোপন তথ্য আইনের লঙ্ঘনের দায়ে চেনের সাজা হয়েছে। আদালতের মতে, তাঁর কর্মকাণ্ডে টিএসএমসির মালিকানাধীন তথ্য এবং তাইওয়ানের বৃহত্তর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্কের নেপথ্যে
তদন্তে ২০২৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সক্রিয় থাকা শিল্পখাতের এক জটিল গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্কের তথ্য বেরিয়ে আসে। চেন লি-মিং আগে টিএসএমসির ফ্যাব ১২ কারখানার উৎপাদন-দক্ষতা প্রকৌশল বিভাগে কাজ করতেন। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার পর তিনি টোকিও ইলেকট্রন তাইওয়ানের বিপণন বিভাগে যোগ দেন। জাপানের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জাম নির্মাতা এবং টিএসএমসির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী টোকিও ইলেকট্রন চেনকে তাঁর সাবেক নিয়োগকর্তার কাছ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহের সুযোগ ও প্রেরণা দেয়।
প্রসিকিউটররা জানান, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে চেন টিএসএমসির বর্তমান দুই প্রকৌশলী উ পিং-চুন ও কো ই-পিংকে নিয়োগ করেন। দুজনই ন্যাশনাল সিং হুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং চেন তাঁদের সঙ্গে থাকা সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সংবেদনশীল কারিগরি তথ্য সংগ্রহ করেন। চুরি করা তথ্যের মধ্যে ছিল ২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত এচিং সরঞ্জামসংক্রান্ত তথ্য। টোকিও ইলেকট্রন যাতে সরঞ্জামের কার্যক্ষমতা যাচাই ও উন্নত করতে পারে, সে জন্য প্রকৌশলীরা সেগুলোর ছবি তোলেন এবং পুনরুৎপাদন করেন। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: টিএসএমসির সবচেয়ে উন্নত উৎপাদনপ্রক্রিয়ার জন্য সরঞ্জাম সরবরাহের আরও লাভজনক চুক্তি পেতে টোকিও ইলেকট্রনকে এগিয়ে রাখা।
টিএসএমসির চতুর্থ কর্মী চেন ওয়েই-চিয়ে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পৃথক, তবে সংশ্লিষ্ট আরেকটি তথ্য ফাঁসের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। টিএসএমসির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো অন্য আসামিদের বিপরীতে, চেন ওয়েই-চিয়ে অননুমোদিতভাবে কোম্পানির ডেটাবেজে প্রবেশ করে ১৪ অ্যাংস্ট্রম উৎপাদনপ্রক্রিয়াসংক্রান্ত নথির ছবি তোলেন এবং সেগুলো চেন লি-মিংকে পাঠান। অনুতাপের লক্ষণ না দেখানো এবং টিএসএমসির ক্ষমা না পাওয়ায় আদালত তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেন।
২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ
মামলাটির গুরুত্ব বুঝতে হলে ২ ন্যানোমিটার সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। চিপ উৎপাদনে ন্যানোমিটার পরিমাপ বলতে সিলিকন ওয়েফারের ওপর খোদাই করা ট্রানজিস্টরের আকার বোঝায়। ট্রানজিস্টর ছোট হলে কম জায়গায় বেশি প্রক্রিয়াকরণক্ষমতা রাখা যায় এবং শক্তিও কম খরচ হয়। বাণিজ্যিক চিপ উৎপাদনের একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে ২ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়া। এ প্রযুক্তিকে ব্যাপক উৎপাদনের উপযোগী করে তুলতে টিএসএমসি স্যামসাং ও ইন্টেলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।
এই মামলায় চুরি হওয়া এচিং সরঞ্জামের বৈশিষ্ট্যগুলো চিপ তৈরির পদ্ধতির মূল রেসিপি। চিপের নকশার মতোই মূল্যবান এই তথ্য। এসব প্রক্রিয়ায় নিজস্ব রাসায়নিক মিশ্রণ, গ্যাস প্রবাহ এবং সরঞ্জামের ক্যালিব্রেশন জড়িত, যা তৈরি করতে বিলিয়ন ডলার এবং বছরের পর বছর গবেষণা লাগে। প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এ ধরনের গোপন তথ্য চলে গেলে টিএসএমসির প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা মুছে যেতে পারে এবং বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। তাইওয়ান সরকার এ ধরনের প্রযুক্তিকে জাতীয় মূল গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। কারণ, উন্নত চিপ উৎপাদনে নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর দ্বীপটির অর্থনৈতিক টিকে থাকা নির্ভর করে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের প্রথম প্রয়োগ
তাইওয়ানের আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে এই বিচার একটি মাইলফলক। সংশোধিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা এটি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চুরির বিষয়টি করপোরেট বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আইনটি বিশেষভাবে দেশের বাইরে জাতীয় মূল গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহার ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে। এতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যে উন্নত চিপ তৈরির সক্ষমতা এখন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
নিউইয়র্কে আইন পেশার যোগ্যতাসম্পন্ন এবং মিশন ইন্টারন্যাশনাল পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিসের ম্যানেজিং অ্যাসোসিয়েট মোনা শিয়েহ রায়টির গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে উচ্চপ্রযুক্তির বাণিজ্যিক গোপন তথ্য সুরক্ষায় বিচার বিভাগের অঙ্গীকার মামলাটি তুলে ধরেছে। প্রথমত, শাস্তি এখন শুধু পেশাগত বিপর্যয়ে সীমাবদ্ধ নেই; দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক গোপন তথ্যের সুরক্ষা দেওয়ার আগে কোম্পানিগুলো যুক্তিসঙ্গত গোপনীয়তা ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, আদালত এখন কঠোরভাবে তা যাচাই করছে। তৃতীয়ত, দ্বৈত শাস্তির ব্যবস্থায় কর্মীদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়োগকর্তারাও দায়ী হবেন, যদি না তাঁরা প্রমাণ করতে পারেন যে নতুন কর্মী নিয়োগের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং আইনি প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন।
আদালতের মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন, চেন ওয়েই-চিয়ে ছাড়া সব আসামিই নথিভুক্ত প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপরাধ স্বীকার করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র টোকিও ইলেকট্রনে চেন লি-মিংয়ের কাজের মূল্যায়নের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অভ্যন্তরীণ কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিদ্যমান গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করে পেশাগত বিচার-বিবেচনায় সহায়তা করা এবং সহজে পাওয়া যায় না এমন তথ্যে প্রবেশের জন্য চেন লি-মিংয়ের প্রশংসা করা হয়েছিল।
আদালত জানায়, এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, টোকিও ইলেকট্রনের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি হয়তো সেই আচরণে উৎসাহ জুগিয়েছিল, যার পরিণতিতে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হতে হয়েছে।
টোকিও ইলেকট্রনের করপোরেট দায়
ব্যক্তিগত সাজা ছাড়াও আদালত তাইওয়ানের করপোরেট খাত ও আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কঠোর বার্তা দিয়েছে। টোকিও ইলেকট্রন তাইওয়ানকে ১৫ কোটি তাইওয়ানি ডলার (প্রায় ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার) জরিমানা করা হয়েছে। টিএসএমসিকে ১০ কোটি তাইওয়ানি ডলার এবং জাতীয় কোষাগারে পাঁচ কোটি তাইওয়ানি ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে সাজা তিন বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। কর্মীদের তদারকিতে করপোরেট সামাজিক দায় যথাযথভাবে পালন করতে কোম্পানিটি ব্যর্থ হয়েছে এবং আইন লঙ্ঘন ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল না বলে আদালত রায় দেন।
তদন্তকারীরা টোকিও ইলেকট্রনের ক্লাউড স্টোরেজে টিএসএমসির বাণিজ্যিক গোপন তথ্য খুঁজে পান। এর মধ্যে ছিল ১৪ ন্যানোমিটারের নিচের প্রযুক্তিতে সমন্বিত সার্কিট উৎপাদনের প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া। কোম্পানিটির প্রাথমিক দাবি, প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, এই তথ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। রায়ের পর এক বিবৃতিতে টোকিও ইলেকট্রন পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি।
কোম্পানিটি আরও জানায়, চেনের সংগ্রহ করা বাণিজ্যিক গোপন তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার তদারকি জোরদারে পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে তারা।
প্রমাণ নষ্ট করার দায়ে টোকিও ইলেকট্রনের ব্যবস্থাপক লু ই-ইনকে ১০ মাসের স্থগিত কারাদণ্ড ও ১০ লাখ তাইওয়ানি ডলার জরিমানা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে তিনি কোম্পানির ক্লাউড সিস্টেমে থাকা ছবির ফাইল মুছে দেন। ফৌজদারি মামলায় সেগুলো প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বুঝতে পেরে তদারকির ব্যর্থতার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
তথ্য শনাক্ত থেকে বিচার
টিএসএমসির অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থায় ডেটা ব্যবহারের ধরনে অনিয়ম ধরা পড়ার পর মামলাটির জট খুলতে শুরু করে। কোম্পানিটি ব্যাপক তদন্ত শুরু করে এবং ২০২৫ সালের ৮ জুলাই কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। তাইওয়ানের হাই প্রসিকিউটরস অফিসের মেধাস্বত্ব শাখার প্রসিকিউটররা দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং ২৫ থেকে ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ চালান। চেন লি-মিং, উ ও কোকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটক রাখার অনুমোদন আদালতের কাছ থেকে নেন তাঁরা, যাতে তাঁরা নিজেদের বক্তব্য মিলিয়ে নিতে বা আরও প্রমাণ নষ্ট করতে না পারেন।
তিন ধাপে এই মামলার বিচার এগোয়। ২০২৫ সালের আগস্টে কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও বাণিজ্যিক গোপন তথ্য আইনে তিন প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। চেন লি-মিংয়ের ১৪ বছর, উর নয় বছর এবং কোর সাত বছরের কারাদণ্ড চাওয়া হয়। তদন্ত আরও গভীরে এগোলে চেনের কর্মকাণ্ডের জন্য তদারকির দায় টোকিও ইলেকট্রনের ওপর বর্তায় বলে প্রসিকিউটররা সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর ফলে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয় এবং ১২ কোটি তাইওয়ানি ডলার জরিমানা চাওয়া হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে কোম্পানির ক্লাউড স্টোরেজে বাকি বাণিজ্যিক গোপন তথ্য পাওয়ার পর প্রসিকিউটররা অভিযোগের পরিধি বাড়িয়ে চেন ওয়েই-চিয়ে, লু ই-ইন এবং টোকিও ইলেকট্রনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রধান বিচারক চাং মিং-হুয়াং সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রসিকিউটরদের চাওয়া ১৪ বছরের তুলনায় চেন লি-মিংয়ের সাজা কম হওয়ার প্রধান কারণ, তিনি পুরোপুরি অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং সহযোগীদের শনাক্ত করতে সহায়তা করেছেন। টোকিও ইলেকট্রন টিএসএমসির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতি মাফ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে—এ বিষয়টিও আদালত বিবেচনায় নিয়েছে। তবে সাজাগুলোর কঠোরতা তাইওয়ানে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
চিপের নিরাপত্তায় বৈশ্বিক প্রভাব
এই রায় বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থাকে জানিয়ে দিচ্ছে, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার তথ্য ফাঁস এখন আর নিছক করপোরেট ঝামেলা নয়, বরং গুরুতর ও পুরো ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলা হুমকি। বিনিয়োগকারী ও শিল্প পর্যবেক্ষকদের কাছে মামলাটি সরবরাহকারীদের নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের তথ্যপ্রবেশ নীতি এবং উৎপাদন দক্ষতা বজায় রেখে তথ্য ফাঁস ঠেকানোর ব্যয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে শিল্প যখন ২ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে, তখন সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং অংশীদারদের সঙ্গে আরও কঠোর চুক্তির কারণে কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রযুক্তির জ্ঞান কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়েও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই রায়। বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির ক্ষেত্রে তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ থেকে বোঝা যায়, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর সক্ষমতাকে এখন শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে নয়, ক্রমেই ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় দেখা হচ্ছে। মেধাস্বত্ব যাতে প্রতিষ্ঠানের বাইরে পাচার না হয়, সে জন্য বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিয়ম কঠোর করছে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি চিপ শিল্পে আন্তসীমান্ত সহযোগিতাকে জটিল করে তুলতে পারে।
টিএসএমসি জানিয়েছে, বাণিজ্যিক গোপন তথ্য লঙ্ঘনের বিষয়ে তাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি রয়েছে এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগামিতা সুরক্ষায় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে। এনভিডিয়া, অ্যাপলসহ প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা হিসেবে টিএসএমসির নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্ভবত শিল্পের মানদণ্ড হয়ে উঠবে। তাইওয়ানের সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পসম্পদের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন করার কথা ভাবছে—এমন যেকোনো কর্মী বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৭ এপ্রিলের রায় কঠোর সতর্কবার্তা।
মূল তথ্য
- টিএসএমসির সাবেক উৎপাদন-দক্ষতা প্রকৌশলী চেন লি-মিং ২ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়াসংক্রান্ত বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির দায়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
- গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্কে ভূমিকার জন্য টিএসএমসির আরও তিন প্রকৌশলী দুই থেকে ছয় বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
- তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা আইনে প্রথম করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয়ে টোকিও ইলেকট্রন তাইওয়ান ১৫ কোটি তাইওয়ানি ডলার (৪৬ লাখ মার্কিন ডলার) জরিমানা পেয়েছে।
- চিপ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট জাতীয় মূল গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চুরির বিচারে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগের প্রথম ঘটনা এটি।
- চুরি করা তথ্যের মধ্যে ছিল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ব্যবহৃত এচিং সরঞ্জামসংক্রান্ত মালিকানাধীন তথ্য।
- ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টিএসএমসি তথ্যপ্রবেশে অনিয়ম শনাক্ত করার পর তদন্ত শুরু হয়; ওই মাসের শেষ দিকে তল্লাশি ও আটক অভিযান চালানো হয়।
- আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার সব আসামির রয়েছে।






