এজেএক্স০০২ প্রদর্শন করল বেইজিং
দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের অবসানের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে চীন এমন একটি অস্ত্র উন্মোচন করেছে, যা প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযুদ্ধের ধরন বদলে দিতে পারে। অতিরিক্ত বড় আকারের চালকবিহীন ডুবোযান (এক্সএলইউইউভি) এজেএক্স০০২ বেইজিংয়ের রাজপথে প্রদর্শিত হয় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির ক্রমবর্ধমান স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্রভান্ডারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে। প্রায় ১৮ থেকে ২০ মিটার দীর্ঘ এবং শব্দ কমিয়ে চলার পাম্প-জেট প্রপালশন ব্যবস্থায় চালিত টর্পেডো-আকৃতির এই ড্রোনটি পানির নিচে যুদ্ধপ্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
এজেএক্স০০২ বিশেষভাবে আক্রমণাত্মকভাবে মাইন পেতে রাখার অভিযানের জন্য তৈরি। আনুমানিক ১,০০০ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার) পর্যন্ত চলার ক্ষমতা এবং একবার মোতায়েনের সময় প্রায় ২০টি নৌমাইন বহনের সামর্থ্য থাকায়, এই স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা মানব ক্রুদের ঝুঁকিতে না ফেলে চীনের উপকূল থেকে অনেক দূরে অভিযান চালাতে পারে। এজেএক্স০০২-এর পাশাপাশি পর্যবেক্ষকেরা এইচএসইউ১০০ নামে আরও বড় একটি দ্বিতীয় এক্সএলইউইউভি নকশার কথাও জানান। মহড়ার সময় সেটি ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পানির নিচে চালানোর ড্রোনের একটি বৈচিত্র্যময় পরিবার তৈরি করা হচ্ছে। এসব অস্ত্রের প্রকাশ্য প্রদর্শন থেকে বোঝা যায়, ঢেউয়ের নিচে নীরবে শক্তি প্রদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ইচ্ছা রয়েছে বেইজিংয়ের। এ কাজে প্রচলিত সাবমেরিনের তুলনায় বেশি সময় ধরে গোপনে অবস্থান করতে পারবে ড্রোনগুলো।
আক্রমণাত্মকভাবে মাইন পেতে রাখা ও প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল
কয়েক দশক ধরে জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক বলয়, প্রথম দ্বীপশৃঙ্খল, চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ সীমিত রাখার কৌশলগত বাধা হিসেবে কাজ করেছে। এখন চীনা সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এই বাধাকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে অবরোধের অস্ত্রে রূপ দিতে চান। চীনা সামরিক সাময়িকী শিপবোর্ন উইপনসে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (পিএলএএন) এজেএক্স০০২ মোতায়েন করে আক্রমণাত্মকভাবে মাইন পেতে রাখতে পারে। এর লক্ষ্য প্রতিরক্ষার জন্য চীনের জলসীমায় অস্ত্র পাতা নয়, বরং প্রতিপক্ষের প্রবেশ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে মাইন স্থাপন করা।
এই কৌশলের লক্ষ্য জাপানের রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর এবং ফিলিপাইনের কৌশলগত সংকীর্ণ পথগুলো। স্বায়ত্তশাসিত মাইন দিয়ে এসব জলসীমা ছেয়ে চীন এমন সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করতে চায়, যা আঞ্চলিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাহিনীকে রসদ জোগাবে। হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড থেকে এই পদ্ধতির অনুপ্রেরণা এসেছে বলে মনে হয়। সেখানে সামুদ্রিক অবরোধের হুমকি দেখিয়েছে, অসমমিত কৌশলের কাছে বৈশ্বিক নৌপরিবহন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমা সরাসরি অবরুদ্ধ করার চেষ্টা না করে, এই নীতিতে দ্বীপটির বাইরের সরবরাহপথ কেটে তাকে বিচ্ছিন্ন করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপকারীরা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আটকা পড়বে, আর তাইওয়ানের কার্যক্রম চালানোর পরিসর সংকুচিত হবে।
অবরোধের যুদ্ধ-অনুশীলন
মাইন পেতে রাখার এই সক্ষমতার কৌশলগত প্রভাব ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা মহলের নজর এড়ায়নি। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২০২৫ সালের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে তাইওয়ান অবরোধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে যুদ্ধ-অনুশীলন করা হয়। এতে মিত্রদের রসদ সরবরাহের জন্য ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাইওয়ানের সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ধরে নিলেও চীনা সাবমেরিন ও মাইন একযোগে তাইওয়ানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা জাহাজের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারে।
তাইওয়ানের সর্বোচ্চ প্রতিরোধ সত্ত্বেও চীনের সাবমেরিন ও মাইন তাইওয়ানে যাওয়া জাহাজের ৪০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। যেকোনো অবরোধ এমন উত্তেজনা তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।
চীনের বৃহত্তর শত্রুর প্রবেশ ঠেকানো ও এলাকায় প্রবেশ সীমিত করার (এ২/এডি) কৌশলে এই সক্ষমতা শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। মাইনক্ষেত্রের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের আকাশপথে উড়ে যাওয়া, গুলিবর্ষণের মহড়া এবং কোস্ট গার্ডের বাধা দেওয়ার তৎপরতা যুক্ত করে বেইজিং এমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে মাইন থাকার নিছক আশঙ্কাতেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, বাস্তবে মাইন পরিষ্কার করা হয়েছে কি না তা বিবেচ্য হবে না। সিএসআইএসের বনি লিন ও তাঁর সহকর্মীরা একে যৌথ অবরোধ অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে রয়েছে নৌবহরের আক্রমণকারী দল, কোস্ট গার্ডের জাহাজ এবং আইন প্রয়োগের যুক্তিতে নিয়ম না মানা জাহাজকে আটকাতে গোপনে মাইন পেতে রাখা। এই অবরোধ বলয়ের পাল্লা বাড়ায় মাইন, আর নিয়ম মানা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে রূপ দেয় বাস্তব বাধায়, যা থেকে প্রকাশ্য সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
পানির নিচের নজরদারি ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু
তাইওয়ান অবরোধের বাইরেও এজেএক্স০০২ ও এর মতো অন্যান্য এক্সএলইউইউভির বৃহত্তর একটি লক্ষ্য রয়েছে: মার্কিন পানির নিচের নজরদারির সুবিধা নষ্ট করা, যার মাধ্যমে বর্তমানে চীনা সাবমেরিনের চলাচল শনাক্ত করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ফিশ হুক আন্ডারসি ডিফেন্স লাইন পরিচালনা করে। জাপান থেকে তাইওয়ান হয়ে ফিলিপাইন ও এর বাইরেও বিস্তৃত সমুদ্রতলদেশের স্থির সেন্সরের এই নেটওয়ার্কটি প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের সময় চীনা সাবমেরিনগুলোকে শনাক্ত করার জন্য তৈরি। অভ্যন্তরীণ সামরিক লেখালেখিতে চীনা নৌ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, সমন্বিত এই ত্রিমাত্রিক নজরদারি ব্যবস্থা পিএলএএনের অভিযানের জন্য গুরুতর হুমকি।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি, যিনি এখন ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো, এই বড় ড্রোনগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
এগুলো সত্যিই অনেক বড়। এতে প্রচুর জ্বালানি রাখা যায়। কোনো সামুদ্রিক ঘাঁটিতে এটি পানিতে নামতে দেখতেও পারেন, আবার নাও পারেন; আর এটি কোথায় আছে, তা আসলে আপনার জানা থাকবে না। দশ ঘণ্টা পর এটি প্রায় যেকোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে।
চীনা কৌশলবিদেরা ফিশ হুক নেটওয়ার্কের কেবল ও সেন্সর-সারিগুলোকে অ্যাকিলিসের গোড়ালি হিসেবে দেখেন। কেবল বিচ্ছিন্ন করা, বিস্ফোরক পেতে রাখা বা সেন্সরে ভুল সংকেত পাঠাতে সক্ষম এক্সএলইউইউভি মার্কিন সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের (এএসডব্লিউ) সক্ষমতা অকার্যকর করে দিতে পারে। এই নজরদারি নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করলে শুধু তাইওয়ান অবরোধে সুবিধা হবে না, চীনের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাও সুরক্ষিত হবে। বর্তমানে চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন (এসএসবিএন) দক্ষিণ চীন সাগরে নিরাপদ ঘাঁটিনির্ভর কৌশলে সীমাবদ্ধ এবং মার্কিন আক্রমণকারী সাবমেরিনের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। সমুদ্রতলদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে ফাঁক তৈরি করে বেইজিং তার পারমাণবিক বাহিনীকে প্রশান্ত মহাসাগরের উন্মুক্ত অংশে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে চায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব আরও জটিল হয়।
ঝুঁকি ও পাল্টা ব্যবস্থা
মাইন পেতে রাখার ড্রোন কৌশল বেইজিংকে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা দিলেও এর দুই দিকই রয়েছে। শান্তিকাল বা সংকটের সময় আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাইন পাতা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হয়; এতে বড় ধরনের উত্তেজনা ছড়ানো এবং বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া, পণ্য পরিবহনের পরিমাণের হিসাবে চীন এখনো বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক দেশ। দেশটির বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে চলে। প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলে অবরোধ বসালে চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক জীবনরেখাও অনিবার্যভাবে ব্যাহত হবে, যা বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই কৌশলের কার্যকারিতা মার্কিন নৌপরিকল্পনার একটি গুরুতর দুর্বলতাও সামনে এনেছে। পুরোনো অ্যাভেঞ্জার-শ্রেণির মাইন প্রতিরোধী জাহাজের বদলে লিটোরাল কমব্যাট শিপ (এলসিএস) আনার মার্কিন নৌবাহিনীর পরিকল্পনা প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও বিলম্বে থমকে গেছে। ২০২২ ও ২০২৫ সালের সরকারি জবাবদিহি দপ্তরের প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে, মাইন পরিষ্কারের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সক্ষমতা এলসিএস দেখাতে পারেনি; প্রতিবেদনে সরঞ্জামের ত্রুটি ও অপরিপক্ব প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য মাইন প্রতিরোধী সক্ষমতা না থাকলে, মাইন পাতা জলসীমা দিয়ে তাইওয়ানে সরবরাহ চালু রাখার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। সে ক্ষেত্রে নৌবহরের লড়াইয়ের বদলে রসদ সরবরাহ শ্বাসরোধ করেই সংঘাতের ফল নির্ধারিত হতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- চীন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অতিরিক্ত বড় আকারের চালকবিহীন ডুবোযান (এক্সএলইউইউভি) এজেএক্স০০২ উন্মোচন করেছে। টর্পেডো-আকৃতির এই ড্রোনটি ২০টি মাইন বহন করতে এবং স্বায়ত্তশাসিতভাবে ১,৮০০ কিলোমিটার চলতে পারে।
- ড্রোনটি প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলে, বিশেষ করে জাপানের রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জ ও ফিলিপাইনের কাছের সংকীর্ণ পথগুলোতে আক্রমণাত্মকভাবে মাইন পেতে রাখার জন্য তৈরি। এর লক্ষ্য তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের প্রবেশ ঠেকানো।
- যুদ্ধ-অনুশীলনে দেখা গেছে, চীনা সাবমেরিন ও মাইন তাইওয়ানে পৌঁছানোর চেষ্টাকারী জাহাজের ৪০ শতাংশ ধ্বংস করতে পারে; শত্রুর প্রবেশ ঠেকানোর কৌশলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
- এজেএক্স০০২ ফিশ হুক ডিফেন্স লাইনসহ মার্কিন পানির নিচের নজরদারি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও কাজে লাগতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের সক্ষমতা অকার্যকর করে দিতে পারে।
- এই কৌশলে বেইজিংয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা এবং সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা।
- মাইন প্রতিরোধী সক্ষমতায় মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাটতি রয়েছে। উন্নত মাইনক্ষেত্র পরিষ্কারের জন্য প্রতিশ্রুত কার্যকর প্রস্তুতি দেখাতে লিটোরাল কমব্যাট শিপ কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে।






