শহরের রাস্তায় নতুন প্রবণতা
কয়েক দশক ধরে মালয়েশিয়ার ব্যস্ত রাজধানীর বাসিন্দারা দরজার সামনে ও উড়ালসড়কের নিচে আশ্রয় নেওয়া গৃহহীন মানুষের দৃশ্যের সঙ্গে অভ্যস্ত। তবে এখন কুয়ালালামপুরের বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় এলাকাজুড়ে উদ্বেগজনক এক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। খুব ছোট শিশুদের সঙ্গে থাকা নারীদের দল ক্রমেই বেশি আক্রমণাত্মক কৌশল নিচ্ছে। তারা সরাসরি পথচারীদের কাছে যাচ্ছে, আমন্ত্রণ ছাড়াই খাবারের দোকানে ঢুকছে, এমনকি যানজটের মোড়ে গাড়ির জানালায় টোকা দিচ্ছে।
সূচিপত্র
এই পরিবর্তন ভিক্ষাবৃত্তির প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সাধারণত ব্যক্তিরা হাত বা পেয়ালা বাড়িয়ে স্থির হয়ে বসে থাকেন। এর বদলে নতুন এই আগন্তুকেরা সম্ভাব্য দাতাদের সক্রিয়ভাবে লক্ষ্য করছে, কখনো চলে যেতে বললেও যেতে চাইছে না এবং আগে ব্যক্তিগত বা নিরাপদ বলে বিবেচিত স্থানে অস্বস্তিকর মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি করছে।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এসব সমন্বিত উপস্থিতি বিচ্ছিন্নভাবে চরম অসহায়ত্বের প্রকাশ, নাকি আর্থিক লাভের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারী ও শিশুদের কাজে লাগানো সংগঠিত চক্রের প্রমাণ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একই ব্যক্তিদের দিনে বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। এতে দৈবক্রমে দেখা হওয়ার বদলে ব্যস্ত এলাকাগুলোতে নিয়ম মেনে পালাক্রমে অবস্থান করার ইঙ্গিত মেলে।
লেখক জেনিফার সি. শহরের কেন্দ্রের একটি রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের সঙ্গে দেরিতে মধ্যাহ্নভোজের সময় এমন আচরণের মুখোমুখি হন। তাঁর বর্ণনায় এসব সাক্ষাতের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠা একরোখা আচরণের চিত্র ফুটে উঠেছে এবং বর্তমানে ব্যবহৃত কৌশলগুলোর জটিলতাও তুলে ধরা হয়েছে।
একদিন আমি আর আমার বন্ধুরা দেরিতে মধ্যাহ্নভোজ করছিলাম। হঠাৎ কালো পোশাক পরা এক নারী ভেতরে ঢুকে টেবিলে টেবিলে গিয়ে ভিক্ষা চাইতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ফিলিস্তিনের বাসিন্দা, কিন্তু আমার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলেন। আরও সন্দেহজনক ছিল, তাঁর কোলে থাকা ছোট শিশুটি সব সময় ঘুমিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল।
জেনিফার যখন জানান যে তাঁর কাছে নগদ টাকা নেই, তখনও ওই নারী নড়লেন না। রেস্তোরাঁর মালিক হস্তক্ষেপ করে বিনা মূল্যে একটি খাবারের প্যাকেট দেওয়ার প্রস্তাব দিলে তবেই ভিক্ষুকটি চলে যান। দশ মিনিট পর একই ধরনের নিস্তেজ শিশুকে কোলে নিয়ে আরেক নারী ওই রেস্তোরাঁয় ঢুকে একই কাণ্ড ঘটান।
চাপে বাণিজ্যিক এলাকা
এ ধরনের ব্যক্তিগত ঘটনার বাইরে ব্যবসায়ীরা জানান, নিয়মিত অনুপ্রবেশে তাঁদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং অর্থ দিয়ে খাবার কিনতে আসা ক্রেতারা অস্বস্তিতে পড়ছেন। শহরের কেন্দ্রের কাছে একটি রেস্তোরাঁর ক্যাশিয়ার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিকেলে নিয়মিত আসা এসব লোকজনকে ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিকেল প্রায় ৪টার দিকে, যখন খুব বেশি গরম থাকে না, তখন তারা আসতে শুরু করে। ক্রেতাদের বিরক্ত করতে পারে বলে আমরা বারবার তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি, কিন্তু তারা আবার ফিরে আসে।
এই অনুপ্রবেশ শুধু সাধারণ খাবারের দোকানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রধান বাণিজ্যিক সড়ক জালান তুয়াংকু আবদুল রহমানের কাপড়ের দোকানগুলোতে পালাক্রমে আসা নারীদের দল নিয়মিত ঘুরে বেড়ায়।
এলাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী স্থানীয় বাসিন্দা রবি জানান, এসব দলের আনাগোনা বেড়েছে। নারীরা ঢিলেঢালাভাবে সমন্বয় করে কাজ করছেন বলে মনে হয়। কেনাকাটার ব্যস্ত সময়ে, যখন মানুষের চলাচল সবচেয়ে বেশি এবং সহানুভূতি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি, তখন তারা নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান নেন।
ধর্মীয় সমাবেশকে লক্ষ্য করে কৌশলগত অবস্থান
সমাজনেতাদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উপাসনালয়ের বাইরে পরিকল্পিতভাবে অবস্থান নেওয়া। সেখানে মুসল্লিরা দান করার বিষয়ে বেশি নৈতিক দায়বদ্ধতা বোধ করতে পারেন। মসজিদ ইন্ডিয়ায় পর্যবেক্ষণ করা সাংবাদিকেরা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলার বিষয়টি নথিবদ্ধ করেছেন, যা ধর্মীয় সময়সূচি সম্পর্কে গভীর সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রায় পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশুকে সঙ্গে নিয়ে এক নারী হাঁটার পথে অবস্থান নেন। জুমার নামাজ শেষ হয়ে মুসল্লিরা বের হতে শুরু করলে ওই নারী ও শিশু সঙ্গে সঙ্গে মূল বেরোনোর পথ আটকে দাঁড়ান এবং বেরিয়ে আসা মুসল্লিদের কাছ থেকে দান নেওয়ার জন্য ব্যাগ বাড়িয়ে দেন।
তামান তুন ড. ইসমাইল মসজিদেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে প্রবেশপথে চারটি শিশু পাহারার মতো দাঁড়িয়ে ছিল। প্রত্যেকের হাতে ছিল প্লাস্টিকের পাত্র, যা দিয়ে তারা মসজিদে ঢোকা বা বের হওয়া মুসল্লিদের কাছে নীরবে দান চাইছিল। শিশুদের নীরব আবেদন এবং তাদের অল্প বয়স—দুইয়ে মিলে প্রবল আবেগের চাপ সৃষ্টি করে, যা উপেক্ষা করা অনেকের জন্য কঠিন।
পোশাক পরে ভিক্ষার প্রবণতা
এসব ঘটনার পাশাপাশি মালয়েশিয়ার শহরাঞ্চলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষায় ‘উন্নত ধরনের ভিক্ষুক’ দেখা যাচ্ছে, যারা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও আধুনিক অর্থগ্রহণের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। জোহর বাহরু ও কুয়ালালামপুরের রাতের বাজার, পেট্রল স্টেশন ও রমজানের বাজারে এখন সুপার মারিও, লুইজি ও ডোরেমনসহ জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রের পোশাক পরা ব্যক্তিদের দেখা যায়।
এই পরিবেশকদের অনেকেই শিশু। তারা পেশাদার মানের পোশাক পরে, যাতে বাতাস চলাচলের পাখা লাগানো থাকে। এসব পোশাকে বিনিয়োগের অঙ্কও বড়। একই ধরনের লাবুবু পোশাক অনলাইনে ৬০০ থেকে ১,০০০ রিঙ্গিত দামে বিক্রি হয়। এই ব্যয় হয় কোনো ব্যক্তির দৃঢ় উদ্যোগ, নয়তো সংগঠিত নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষকতার ইঙ্গিত দেয়।
স্থানীয় এক বাজারে সাক্ষাৎকার নেওয়া নয় বছর বয়সী এক ছেলের পরনে ছিল ব্যাঙের পোশাক; হাতে ছিল মালয়েশিয়ার রিঙ্গিতের নোট রাখা একটি দানের বাক্স। তাকে প্রশ্ন করা হলে সে জানায়, টাকাটা তার নিজের জন্য। কাছেই ধূসর লাবুবু চরিত্রের পোশাক পরা আরেক শিশু একই কৌশল ব্যবহার করছিল। গোলাপি খরগোশের পোশাক পরা ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী তার দানের বাক্সে দেখানো কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থ গ্রহণ করছিল।
৬১ বছর বয়সী কামাল, যিনি অবসরপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দশ সন্তানের বাবা, ট্রাফিক সিগন্যালে ভিক্ষা করার সময় ব্যাঙের পোশাক পরার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিন ঘণ্টায় তিনি ১০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত আয় করেন, যা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে আগের মজুরির চেয়ে অনেক বেশি। স্কুলে পড়ুয়া সন্তানদের ভরণপোষণসহ আর্থিক চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের পাশে কাজ করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন।
আইনি কাঠামো ও প্রয়োগের ঘাটতি
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বর্তমানে নিঃস্ব ব্যক্তি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। যথাযথ অনুমতি ছাড়া জনসমক্ষে ভিক্ষা করাকে এই আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আইনের ২ নম্বর ধারায় জনসমক্ষে দান চাওয়া ব্যক্তিদের ভিক্ষুক হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নেই। জোহর বাহরু সমাজকল্যাণ বিভাগের পরিচালক আহমদ হাশিম সেলামাত নিশ্চিত করেছেন, সম্প্রতি জালান পাদি এমাস ১-এর ট্রাফিক সিগন্যালে তিনজন পোশাকধারীকে আটক করা হয়। বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাঁদের মৌখিক ও লিখিত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা অঙ্গীকারনামায় সই করেন যে একই অপরাধ আবার করলে আইনের আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হবে।
স্কুদাইয়ের আইনপ্রণেতা মারিনা ইব্রাহিম জনসাধারণকে দান না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, আর্থিক সহায়তা দিলে এই চর্চা আরও ছড়াবে। তিনি জানান, পোশাক পরে ভিক্ষার প্রবণতা জোহর বাহরু থেকে কুলাইয়ের বিপণিবিতানগুলোতেও ছড়িয়েছে, যা দ্রুত ভৌগোলিক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
আহমদ হাশিম বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, যাদের দেখা যায় তাদের বেশির ভাগই গৃহহীন ভবঘুরে নন; তাঁদের পরিবার ও স্থায়ী বাসস্থান রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণে মূলত নিঃস্ব মানুষদের জন্য তৈরি প্রচলিত সমাজকল্যাণ পদ্ধতিতে জটিলতা তৈরি হয়। এর বদলে বিকল্প আয়-সহায়তা বা কর্মদক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও এলাকার দখল নিয়ে বিরোধ
এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত শারীরিক ঝুঁকি শুধু যানবাহনের বিপদেই সীমাবদ্ধ নয়। ৬০ বছর বয়সী সনি, যিনি ১২ সন্তানের ভরণপোষণ করেন, জানান যে লাল বাঘের পোশাক পরে ভিক্ষা করার সময় কয়েকজন পুরুষ তাঁকে তাড়িয়ে দেন। তাঁদের দাবি ছিল, তিনি তাঁদের নির্ধারিত ভিক্ষার এলাকায় ঢুকে পড়েছেন। এসব বর্ণনা থেকে লাভজনক স্থানগুলোর ওপর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা বা সংগঠিত নিয়ন্ত্রণ থাকার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
নারী ভিক্ষুকদের কোলে থাকা অচেতন বা অস্বাভাবিকভাবে ঘুমঘুম শিশুদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিশুদের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে আক্রমণাত্মকভাবে ভিক্ষা চাওয়ার সময় ঘুমন্ত শিশুর উপস্থিতি নিয়ে বারবার আসা বর্ণনা থেকে মনে হয়, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানোর জন্য শিশুদের শান্ত রাখতে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হতে পারে।
বিক্রি কমে যাওয়ায় পোশাক পরে ভিক্ষা শুরু করার আগে সনি নারীদের সাজসজ্জার সামগ্রী বিক্রি করতেন। নথিবিহীন বা অনিশ্চিত অভিবাসন-অবস্থায় থাকা বাসিন্দাদের সামনে যে সীমিত বিকল্প রয়েছে, সে কথাই তিনি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, তাঁর কাজ কারও অসুবিধা করে না; তবে প্রতিদ্বন্দ্বী ভিক্ষুকদের কাছ থেকে শত্রুতার কথাও তিনি স্বীকার করেন।
যা জানা দরকার
- ছোট শিশুদের সঙ্গে থাকা নারীদের দল ক্রমেই কুয়ালালামপুরের রেস্তোরাঁ ও ধর্মীয় স্থানে ঢুকে আক্রমণাত্মকভাবে দান চাইছে। কর্মী বা ক্রেতারা চলে যেতে বললেও তারা যেতে চাইছে না।
- কেউ কেউ ফিলিস্তিনি পরিচয়ের মতো বিভিন্ন জাতীয়তার দাবি করছেন, অথচ হিন্দির মতো ভাষায় কথা বলছেন। এতে তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ও সম্ভাব্য চক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- বাজার ও যানজটের মোড়ে কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থ গ্রহণের জন্য দামি কার্টুন চরিত্রের পোশাক পরা ‘উন্নত ধরনের ভিক্ষুকদের’ নিয়ে এই প্রবণতা আরও ছড়িয়েছে।
- মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ নিঃস্ব ব্যক্তি আইন প্রয়োগ করছে। জনসমক্ষে দান চাইতে অনুমতি নেওয়ার বিধান থাকলেও অনেক অপরাধীকে মামলা না করে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
- নয় বছর বয়সী শিশুরাও পোশাক পরে ভিক্ষায় অংশ নিচ্ছে। নারী ভিক্ষুকদের কোলে থাকা শিশুরা প্রায়ই ওষুধে আচ্ছন্ন বা অস্বাভাবিকভাবে ঘুমঘুম দেখায়, যা নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
- কর্মকর্তা ও সমাজনেতারা জনসাধারণকে নগদ অর্থ দান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ আর্থিক সহায়তা এসব সংগঠিত ভিক্ষাবৃত্তির কার্যক্রমকে বিস্তারে উৎসাহিত করে।






