উচ্ছেদের শব্দ
বছরের পর বছর কোরিয়ার টেলিভিশনের কেনাকাটাবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোর শেষে শোনা দ্রুতগতির, কিছুটা ধাতব কণ্ঠস্বরটি লাখো পরিবারের ঘরে পটভূমির শব্দ হয়ে ছিল। আজ সেই একই শব্দ একটি পুরো পেশার সংকটের সংকেত। দক্ষিণ কোরিয়ার কণ্ঠশিল্পীরা জানিয়েছেন, গত দুই বছরে তাঁদের গড় আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর জন্য দায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এমন সব ব্যবস্থা, যা এখন শুধু লেখা থেকেই বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কণ্ঠ তৈরি করতে পারে।
সূচিপত্র
কোরিয়া ভয়েস পারফরম্যান্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান চোই জে-হো এই স্থানচ্যুতির সূত্রপাত খুঁজে পেয়েছেন কয়েক বছর আগে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে। তখন নেটফ্লিক্সের মতো বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো কোরীয় ভাষায় ডাবিংয়ে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছিল। সে সময় চাহিদার উল্লম্ফনকে শিল্পের জন্য সুবর্ণ সময় বলে মনে হয়েছিল। তবে এসব চুক্তিতে এমন ধারা ছিল, যা কোম্পানিগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য রেকর্ড করা কণ্ঠ প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নতুন কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। বৃহৎ ভাষা মডেলের প্রকৃত সক্ষমতা কল্পনা করারও অনেক আগে এসব চুক্তি করা হয়েছিল।
পরে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম কণ্ঠের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক কণ্ঠশিল্পীর রেকর্ডিং করতে শুরু করে। এককালীন অর্থের বিনিময়ে তারা শিল্পীদের কণ্ঠস্বরের বৈশিষ্ট্য কার্যত সীমাহীন ও একচেটিয়াভাবে ব্যবহারের অধিকার পায়। এর ফল এখন শোনা যাচ্ছে করপোরেট জনসংযোগ ভিডিও, সরকারি প্রচারমূলক ক্লিপ এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনে, যেখানে একসময় মানুষের কণ্ঠ ব্যবহার করা হতো।
আগে কাজটা আমরাই করতাম। এখন তারা সিস্টেমে যায়, পছন্দের কণ্ঠ ডাউনলোড করে, তারপর চিত্রনাট্য লিখে দেয়। কাজটা একেবারেই চলে গেছে।
অ্যাসোসিয়েশনটি এখন এআই-নির্দিষ্ট মানসম্মত চুক্তি এবং "কণ্ঠের প্রচারস্বত্ব" নামে নতুন একটি আইনি ধারণার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। এই ধারণায় প্রত্যেকের কণ্ঠকে সুরক্ষিত বাণিজ্যিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা হবে। পুরোনো চুক্তির ভিত্তিতে এআইয়ে সীমাহীন ব্যবহার চ্যালেঞ্জ করার উপায় এবং সুস্পষ্ট সম্মতি ছাড়া কণ্ঠ দিয়ে প্রশিক্ষণ বা কণ্ঠের নকল তৈরি নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছেন শিল্পীরা।
অননুমোদিত প্রশিক্ষণের মুখে ওয়েবটুন শিল্পীরা
কণ্ঠশিল্পীরা যখন তাঁদের কানে এআইয়ের বিরুদ্ধে লড়ছেন, ওয়েবটুন নির্মাতারা তখন তাঁদের ফাইল ও ফিডে এর প্রভাব ঠেকাতে লড়ছেন। কোরিয়া কার্টুনিস্টস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, সাধারণ চিত্র ও প্রচারমূলক কমিকস তৈরির কাজের অনুরোধ দ্রুত কমেছে। তরুণ সহকারীরা তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে সবচেয়ে বেশি পড়েছেন। অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে থাকা কোওন হিউক-জু বলেন, সমস্যা শুধু কাজ হারানোয় সীমাবদ্ধ নয়; বাজারের ধারণাতেও মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রাহকেরা ধরে নিচ্ছেন, আগে যে কাজে মানুষের দক্ষতা লাগত, এআই তা করতে পারে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট চুন দু-হোয়ানের নাতি চুন উ-ওনের এআই-নির্মিত ওয়েবটুন ধারাবাহিক "মংলটুন" সম্প্রতি জনমনে এ বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসে। প্রকৃত সৃজনশীল কাজ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে ধারাবাহিকটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এতে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ছবি আঁকার অনুশীলন বা প্রযোজনা দলের সহায়তা ছাড়াই নতুন সরঞ্জাম ব্যবহার করে যে কেউ ওয়েবটুনের ধাঁচে কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন।
কোওন শিল্পের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনলাইন থেকে সংগ্রহ করা কমিকস দিয়ে অনুমতি ছাড়া বৃহৎ পরিসরে এআই প্রশিক্ষণকে। বর্তমানে কোন মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে কোন কাজ ব্যবহার হয়েছে, তা জানার বা পারিশ্রমিক ছাড়া নিজেদের অর্থের বিনিময়ে প্রকাশিত কনটেন্ট ডেটাসেটে যুক্ত হওয়া ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থা শিল্পীদের হাতে নেই।
এআই কোন তথ্য ব্যবহার করছে, তা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো আলোচনার শুরু হওয়া উচিত স্বচ্ছতা দিয়ে।
কোওন যাকে ন্যূনতম সুরক্ষাব্যবস্থা বলছেন, তা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি এমন একটি আগাম ব্যবস্থা চান, যাতে প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই লেখকেরা তাঁদের কাজ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। তাঁর যুক্তি, নির্মাতাদের সুরক্ষা ছাড়া গড়ে ওঠা এআই শিল্প টেকসই হতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, কোরিয়ার ওয়েবটুন বিশ্বের বৃহত্তম বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক রপ্তানি পণ্য। নির্মাতাদের পরিমণ্ডল ভেঙে পড়লে শিল্পটিও টিকতে পারবে না। এআই কাজের কিছু অংশ অবশ্যই প্রতিস্থাপন করবে, তবে কোওনের মতে, এটি সৃষ্টির মূল সত্তাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। তাঁর ধারণা, নির্মাতারা কেবল পণ্য উৎপাদকের ভূমিকা থেকে সরে এসে এআই সরঞ্জাম পরিচালনাকারী পরিকল্পনাকারী হয়ে উঠতে পারেন।
বাজারের মেরুকরণের মুখে ভাষা পেশাজীবীরা
এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অনুবাদ ও দোভাষী পেশাজীবীরাও একই ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ছেন। আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে আয়োজকেরা আগে যাঁদের যুগপৎ দোভাষীর কাজে নিয়োগ করতেন, এখন তাঁদের বদলে এআই সরঞ্জামে তৈরি স্বয়ংক্রিয় সাবটাইটেল দেখাচ্ছেন। এসব সরঞ্জাম অল্প খরচে মোটামুটি মানের তাৎক্ষণিক অনুবাদের প্রতিশ্রুতি দেয়। আগে যেসব করপোরেট বৈঠকে ফ্রিল্যান্স দোভাষী নিয়োগ করা হতো, সেগুলোও ক্রমে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তন ছড়িয়ে পড়েছে সরাসরি মঞ্চনাটকেও। সিউলের প্রযোজকেরা এখন এআইচালিত স্মার্ট চশমা পরীক্ষা করছেন, যেগুলোর লেন্সে মঞ্চের ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনূদিত সংলাপ দেখা যায়। কোরীয় স্টার্টআপ এক্সপার্ট ইনকরপোরেশনের তৈরি প্রযুক্তিটি বর্তমানে চারটি ভাষায় কাজ করে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানস্থলে মানুষের দোভাষীর প্রয়োজন পুরোপুরি দূর করাই এর লক্ষ্য।
কোরিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রান্সলেটরস অ্যান্ড ইন্টারপ্রেটার্সের প্রধান হো জি-উন জানিয়েছেন, বাজারের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে উচ্চপর্যায়ে নয়, বরং মাঝের স্তরে। শীর্ষস্থানীয় দোভাষীরা সম্ভবত টিকে যাবেন, তবে প্রাথমিক পর্যায়ের সেবা দেন এমন পেশাজীবীদের কাজ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। এতে বাজার মেরুকৃত হয়ে পড়ছে, যেখানে কেবল সবচেয়ে দক্ষ পেশাজীবীরাই টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
অনুবাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আরও এগিয়েছে; এআইয়ের তৈরি প্রথম খসড়া মানব বিশেষজ্ঞরা সংশোধন ও পরিমার্জন করেন, এমন সম্পাদনা-পরবর্তী কাজ বেড়েছে। কারিগরি নথি, যেমন নির্দেশিকা ও ব্যবহারবিধিতে এ পদ্ধতিই প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে কাজের সৃজনশীল অংশ কমে দাঁড়াচ্ছে মাননিয়ন্ত্রণে।
হো সরকারকে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য মৌলিক সুরক্ষা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক দোভাষীর সামাজিক বিমা বা করপোরেট সুরক্ষাব্যবস্থা নেই, ফলে এআই-চালিত বাজার পরিবর্তনের মুখে তাঁরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আদালত ও সংসদে দোভাষীর কাজের জন্য সরকারি সংস্থাগুলোকে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বেছে নেওয়া থেকেও তিনি সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, এতে কার্যক্রম বোঝার নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং দক্ষ মানব বিশেষজ্ঞ তৈরির ধারাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিজুড়ে প্রাথমিক পর্যায়ের পদ বিলুপ্ত
এই স্থানচ্যুতি সৃজনশীল শিল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে কোরিয়ার বৃহত্তর শ্রমবাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। সফটওয়্যার পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছরের কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোরীয় সফটওয়্যার ডেভেলপারের হার ২০২২ সালের ২৬.৯ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ২০.৭ শতাংশে নেমেছে। অভিজ্ঞতার সব স্তরের মধ্যে কেবল এই স্তরেই হার কমেছে। ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি চালুর পর থেকে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নীরবে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে এগিয়েছে, যার লক্ষ্য নতুন কর্মীদের দেওয়া নিয়মিত কাজগুলোই।
ছদ্মনামে পরিচিত ২৩ বছর বয়সী অর্থনীতির ছাত্রী জি-উন জানান, ইন্টার্নশিপের সময় বাজার গবেষণার জন্য এক্সেল স্প্রেডশিট তৈরি করতে তাঁর দুই দিন লেগেছিল। পরে দেখেন, তাঁর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক এআই সেবা ব্যবহার করে পাঁচ মিনিটেই এর চেয়ে ভালো ফল তৈরি করেছেন। এই অভিজ্ঞতায় চাকরির বাজারে নিজের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন তিনি। সেখানে এআই ক্রমবর্ধমান দক্ষতায় তথ্য বিশ্লেষণ, নথি তৈরি, ইন্টারনেটে অনুসন্ধান এবং বৈঠকের কার্যবিবরণী লিখছে।
কোরিয়া লেবার ইনস্টিটিউটের জরিপে ৫০০ জন অফিসকর্মীর ৫৮ শতাংশ বলেছেন, আগামী দশ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন। বিশের কোঠায় বয়স যাঁদের, তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। ব্যাংক অব কোরিয়ার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তরুণদের জন্য ২ লাখ ১১ হাজার কম চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৮ হাজারই এআইয়ের প্রভাবের বিচারে ৫০তম পার্সেন্টাইলের ওপরের ক্ষেত্রগুলোতে।
উৎপাদন খাতও এ প্রবণতা থেকে রেহাই পায়নি। সেমিকন্ডাক্টরের জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট সিরামিক ক্যাপাসিটর তৈরি করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে মান যাচাইয়ের কাজে এআই চালু করার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে কারখানার ২০০ জনের বেশি কর্মী চলে গেছেন। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি পাঁচটি বাছাইযন্ত্রের জন্য একজন করে কর্মী রাখার বদলে এখন প্রতি ১৫টি যন্ত্রের জন্য একজন কর্মী রাখছে।
আট বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ৩৪ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স ভিডিও সম্পাদক ইউন-জিন জানান, এক মিনিটের ভিডিও সম্পাদনার জন্য আগে ২০ থেকে ৩০ লাখ ওন দেওয়া হতো এবং কয়েক সপ্তাহ কাজ করতে হতো। এখন সেই দর ভেঙে পড়েছে। এক থেকে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সম্পাদকেরাও এআই ব্যবহার করে ২০ বছরের অভিজ্ঞদের মতো ফল তৈরি করতে পারেন।
ঐতিহাসিক এআই বিধিমালা প্রণয়ন কোরিয়ার
এই পরিবর্তনের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া এমন একগুচ্ছ আইন প্রণয়ন করেছে, যাকে কর্মকর্তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইন বলছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৭ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে আইন কার্যকরের আগেই কার্যকর হওয়া এআই বেসিক অ্যাক্টের লক্ষ্য, নিরাপত্তা ও আস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশটিকে শীর্ষ তিন এআই শক্তির একটিতে পরিণত করা।
আইন অনুযায়ী, পারমাণবিক নিরাপত্তা, পানীয় জল উৎপাদন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং ঋণ মূল্যায়নের মতো আর্থিক সেবায় উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন এআই ব্যবহারে কোম্পানিগুলোকে মানুষের তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন বা জেনারেটিভ এআই পণ্য সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের আগাম জানাতে হবে এবং বাস্তবের সঙ্গে পার্থক্য করা কঠিন এমন এআই-তৈরি ফলাফল স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। আইন লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ওন (প্রায় ২০ হাজার ৪০০ ডলার) জরিমানা হতে পারে।
তবে অনেক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার স্টার্টআপ অ্যালায়েন্সের সহ-প্রধান লিম জং-উক জানান, পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা সামলানোর দায়িত্ব প্রথমে তাঁদের ওপর পড়ায় প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
কিছুটা অসন্তোষ তো আছেই। এটা প্রথম আমাদেরই করতে হবে কেন?
প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানিয়েছেন, অবকাশকালে উদ্যোগী কোম্পানিগুলো যেন যথাযথ সহায়তা পায় তা নিশ্চিত করতে। এ সময়ে কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক জরিমানা আরোপের আগে অন্তত এক বছর সময় দেয়। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নির্দেশনাবিষয়ক একটি প্ল্যাটফর্ম ও বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করছে। শিল্পের পরিস্থিতি প্রয়োজন হলে অবকাশের মেয়াদ বাড়ানোও হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বর্তমান কাঠামোয় প্রশিক্ষণের তথ্য হিসেবে সৃজনশীল কাজ অননুমোদিতভাবে ব্যবহার করার বিষয়টি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। একইভাবে শিল্পীরা যে কণ্ঠ ও ছবির অধিকার দাবি করছেন, তা-ও প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি শ্রমিকদের সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে।
শিক্ষা ও বিনোদন: সহযোগী হিসেবে এআই
সৃজনশীল পেশার কর্মীরা যখন স্থানচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়ছেন, অন্য খাতগুলো এআইকে প্রয়োজনীয় বিবর্তন হিসেবে দেখছে। দক্ষিণ কোরিয়া দেশজুড়ে এআই ডিজিটাল পাঠ্যবই চালু করা প্রথম দেশ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে তৃতীয়, চতুর্থ, সপ্তম ও দশম শ্রেণিতে এ কার্যক্রম শুরু হবে; এতে ইংরেজি, গণিত ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয় থাকবে। ২০২৮ সালের মধ্যে সব স্কুলে পুরোপুরি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে সরকার তিন বছরের জন্য প্রায় ৭৪ কোটি ওন বরাদ্দ করেছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য, শিক্ষকদের বক্তৃতাদাতা থেকে পরামর্শদাতায় রূপান্তর করা, যাঁরা প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও সমালোচনামূলক চিন্তায় শিক্ষার্থীদের পথ দেখাবেন; অন্যদিকে এআই সামলাবে নিয়মিত পাঠদান ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু সরবরাহের কাজ। তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া জানানো যাবে। তথ্য এনক্রিপশন ও নিরাপদ ক্লাউড সংরক্ষণসহ কঠোর গোপনীয়তা সুরক্ষাও থাকবে।
চলচ্চিত্র শিল্পের চিত্র আরও জটিল। সিউলভিত্তিক মোফ্যাক স্টুডিওর মাত্র আড়াই কোটি ডলারে নির্মিত অ্যানিমেটেড ছবি "কিং অব কিংস" যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে ৬ কোটি ডলার আয় করেছে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে সফল মার্কিন মুক্তি হিসেবে "প্যারাসাইট"-কে ছাড়িয়ে গেছে। স্টুডিওটি দৃশ্য নকশা ও রেন্ডারিং স্বয়ংক্রিয় করতে এআই-সহায়ক নির্মাণ সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। এতে ছোট দলও এমন ফল করতে পেরেছে, যার জন্য আগে শত শত কর্মী লাগত।
তবে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা লাগামহীন এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। "ওল্ডবয়" ছবির জন্য পরিচিত পরিচালক পার্ক চান-উক বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সতর্ক করে বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অনেকের চাকরি কেড়ে নিতে পারে এবং চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা মৌলিকভাবে বদলে দিতে পারে। নির্মাণের সময় অর্ধেক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সরঞ্জাম গ্রহণে স্টুডিওগুলো যখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন দক্ষতা ও সৃজনশীলতার অখণ্ডতার মধ্যকার টানাপোড়েনের সমাধান হয়নি।
বিশ্বজুড়ে একই প্রবণতা, বাড়ছে প্রতিরোধ
কোরীয় কর্মীদের সংগ্রাম সৃজনশীল শিল্পে বিশ্বজুড়ে দেখা প্রবণতারই প্রতিফলন। বেন অ্যাফ্লেক প্রতিষ্ঠিত এআই কোম্পানি ইন্টারপজিটিভকে সম্প্রতি নেটফ্লিক্স অধিগ্রহণ করেছে। এ পদক্ষেপে দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস কর্মীর চাকরি হুমকিতে পড়েছে। প্রযুক্তিটি রং সমন্বয়, আলো পুনর্বিন্যাস এবং দৃশ্যের ধারাবাহিকতা ঠিক করার কাজ স্বয়ংক্রিয় করবে, যা বর্তমানে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও লাতিন আমেরিকার শিল্পীরা প্রতিটি ফ্রেম ধরে করেন।
শিল্পখাতের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালেই বিনোদন খাতের ৭৫ শতাংশ নির্বাহী চাকরি বাদ দিতে, কমাতে বা একীভূত করতে এআই ব্যবহার করছিলেন। পূর্বাভাস বলছে, তিন বছরের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ পদ বিলুপ্ত হতে পারে। হলিউডে শ্রমিক সংগঠনগুলো এআই সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু কোরিয়া ও অন্যত্র পোস্ট-প্রোডাকশন কর্মীদের প্রায়ই সমতুল্য প্রতিনিধিত্ব নেই।
চীনে প্রযুক্তি খাতের কর্মীরা নিজেদের কাজের ধাপ নথিবদ্ধ করে এআই এজেন্টকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে "ডিস্টিলিং" নামে অভিহিত করেছেন। এসব এজেন্ট পরে তাঁদেরই প্রতিস্থাপন করতে পারে। সাংহাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ল্যাবরেটরির প্রকৌশলী তিয়ানই ঝৌ ব্যঙ্গ করে তৈরি করেছিলেন কোলিগ স্কিল নামের একটি ভাইরাল গিটহাব প্রকল্প। কর্মীদের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য ও কাজের অভ্যাস ধরে ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করা যে কত সহজ, তা দেখিয়ে প্রকল্পটি আলোড়ন তোলে।
এই প্রবণতা ঠেকাতে পাল্টা ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। বেইজিংভিত্তিক এআই পণ্য ব্যবস্থাপক কোকি শু কাজের ধাপবিষয়ক নির্দেশিকা তৈরিতে বাধা দেওয়ার জন্য একটি "অ্যান্টি-ডিস্টিলিং" সরঞ্জাম প্রকাশ করেছেন। এটি নথিপত্রকে সাধারণ ভাষায় নতুন করে লেখে, যাতে সেগুলো থেকে তৈরি এআইয়ের বিকল্প কর্মী কম কার্যকর হয়। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর প্রকল্পটি ৫০ লাখের বেশি লাইক পেয়েছে। এতে কর্মীদের নিজেদের বিকল্প কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রত্যাশার বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা প্রতিরোধের চিত্র ফুটে উঠেছে।
কোরিয়ায় ফিরে কণ্ঠশিল্পী, ওয়েবটুন শিল্পী ও দোভাষীরা স্বচ্ছতার শর্ত এবং সম্মতিভিত্তিক কাঠামোর দাবিতে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবির কেন্দ্রে একটি নীতি: স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক ছাড়া সৃজনশীল শ্রমকে কাজে লাগানোর বদলে এআইয়ের উচিত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রযুক্তির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় নীতিমালা এসব কর্মীকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো দ্রুত বদলাতে পারবে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মূল বিষয়গুলো
- বিজ্ঞাপন ও সম্প্রচারে মানুষের বদলে এআই-তৈরি বর্ণনা ব্যবহৃত হওয়ায় কোরিয়ার কণ্ঠশিল্পীরা দুই বছরে গড় আয় ৫০ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
- ওয়েবটুন শিল্পীদের কাজ অনুমতি ছাড়া প্রশিক্ষণ ডেটাসেটে ব্যবহারের ঝুঁকিতে রয়েছে। শিল্পনেতারা এআই প্রশিক্ষণের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা এবং আগাম সম্মতির ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
- স্বয়ংক্রিয় সাবটাইটেল ও সম্পাদনা-পরবর্তী কাজের কারণে দোভাষী ও অনুবাদকদের বাজার মেরুকৃত হচ্ছে। মাঝারি পর্যায়ের পেশাজীবীরা কাজ হারাচ্ছেন, আর কেবল শীর্ষ দক্ষ পেশাজীবীরাই তুলনামূলক নিরাপদে রয়েছেন।
- বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এআই আইন হিসেবে বর্ণিত দক্ষিণ কোরিয়ার এআই বেসিক অ্যাক্ট ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হয়েছে। এতে চিহ্নবিহীন জেনারেটিভ এআই কনটেন্টের জন্য সর্বোচ্চ ৩ কোটি ওন জরিমানার বিধান রয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে এক বছরের অবকাশ দেওয়া হয়েছে।
- সফটওয়্যার উন্নয়ন, উৎপাদন ও অফিস প্রশাসনে প্রাথমিক পর্যায়ের পদ দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। তরুণদের বেকারত্ব বেড়ে ৫.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
- ২০২৫ সালের মার্চ থেকে কোরিয়ার স্কুলগুলোতে দেশজুড়ে এআই ডিজিটাল পাঠ্যবই চালু হবে। এতে শিক্ষকরা পরামর্শদাতার ভূমিকায় যাবেন, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদানে এআই ব্যবহৃত হবে।
- নেটফ্লিক্সের এআই অধিগ্রহণে বিশ্বজুড়ে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস কর্মীরাও একই ধরনের হুমকির মুখে। এদিকে নিজেদের বিকল্প এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবির জবাবে চীনের প্রযুক্তি খাতের কর্মীরা সহযোগিতা ও নাশকতা, দুই পথেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।






