স্কুলজীবনের স্মৃতি হারাচ্ছে একটি প্রজন্ম
দশকের পর দশক ধরে রাতযাপনসহ শিক্ষাসফর দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় একটি প্রিয় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। শিক্ষাজীবনের পুরোটা সময় শিক্ষার্থীরা এসব ভ্রমণের অপেক্ষায় থাকত—জেজু দ্বীপের আগ্নেয়গিরিময় ভূদৃশ্যে যাওয়া, গ্যাংওন প্রদেশের পাহাড়ে হাঁটা কিংবা গিয়ংজুর প্রাচীন মন্দির ঘুরে দেখা। এসব অভিজ্ঞতা শুধু বিনোদনের সুযোগই দিত না, বরং স্বনির্ভরতা, সামাজিক বন্ধন এবং শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সম্ভব নয় এমন ব্যবহারিক শিক্ষা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও করে দিত। এসব ভ্রমণে শ্রেণিকক্ষের স্তরভিত্তিক গণ্ডি পেরিয়ে সহপাঠীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠত এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলশিক্ষার তীব্র একাডেমিক চাপ থেকে শিশুরা সীমিত পরিসরে হলেও মুক্তির স্বাদ পেত।
সূচিপত্র
কিন্তু এই ঐতিহ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় অর্ধেক স্কুল রাতযাপনসহ অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এর বদলে তারা স্বল্প সময়ের দিনের ভ্রমণ, স্কুলের ভেতরে সীমাবদ্ধ অনাড়ম্বর কার্যক্রম অথবা কিছুই না করার পথ বেছে নিয়েছে। এই পরিবর্তনের কারণ বাজেটের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া বা মহামারির সতর্কতা নয়; বরং শিক্ষকদের পেশাজীবনে ছড়িয়ে পড়া আইনি আতঙ্ক। শিক্ষকেরা ক্রমেই এসব ভ্রমণকে শিক্ষার সুযোগ হিসেবে নয়, সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার শিশুরা তাদের গঠনমূলক বছরগুলোতে যেভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে এবং শিক্ষাগত অভিজ্ঞতায় প্রজন্মগত বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
তথ্য-উপাত্তে সংকটের চিত্র
কোরিয়ান টিচার্স অ্যান্ড এডুকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের পরিচালিত একটি বিস্তৃত জরিপে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা থেকে এই সরে আসার ব্যাপকতা উঠে এসেছে। ২৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ইউনিয়নটি দেশজুড়ে ৭৮৯টি শাখার প্রধানের ওপর জরিপ চালায়। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ৪১.৯৫ শতাংশ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৭.৭৬ শতাংশ এবং উচ্চবিদ্যালয় ২৩.০৭ শতাংশ। ফলাফলে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়: গত শিক্ষাবর্ষে মাত্র ৫৩.৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাতযাপনসহ শিক্ষাসফরের আয়োজন করেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এটি বড় ধরনের পতন; এসব শিক্ষাভ্রমণ আয়োজন করতে আগ্রহী স্কুলের সংখ্যা কার্যত অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প বেছে নিয়েছে। প্রায় ২৫.৯ শতাংশ শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণের আয়োজন করেছে, আর ১০.৮ শতাংশ বাইরের ভ্রমণের বদলে স্কুল প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ কার্যক্রম করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ৭.২ শতাংশ স্কুল অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করেছে; ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে কোনো শিক্ষামূলক স্থানে গিয়ে শেখার সংগঠিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাতযাপনসহ কর্মসূচি আয়োজনে অনীহার কারণ জানতে চাইলে ৮৯.৬ শতাংশ শিক্ষক বলেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ফৌজদারি দায়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪.৮ শতাংশ এই চাপকে “খুব বেশি” বলে বর্ণনা করেছেন।
সকছোর সেই রায়, যা পেশাজীবীদের আতঙ্কিত করেছে
এখন কেন ৮৯.৬ শতাংশ শিক্ষক ফৌজদারি মামলার আশঙ্কা করছেন, তা বুঝতে হলে স্কুলভ্রমণ ঘিরে আইনি পরিস্থিতি বদলে দেওয়া একটি নির্দিষ্ট মর্মান্তিক ঘটনার দিকে তাকাতে হবে। ২০২২ সালের নভেম্বরে গ্যাংওন প্রদেশের সকছোতে শিক্ষাসফরে গিয়ে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারা যায়। পার্কিং লটে পেছনে যাওয়ার সময় একটি ভাড়া করা বাস শিশুটিকে ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় গভীর শোকের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও হয়, যা সারা দেশের শিক্ষকদের কক্ষে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
কর্তৃপক্ষ শ্রেণিশিক্ষক ও একজন সহকারী তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে পেশাগত অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ আনে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে উল্লেখযোগ্য মেয়াদের কারাদণ্ড হতে পারে এবং পেশাগত রেকর্ডে স্থায়ী দাগ পড়তে পারে। প্রাথমিক আদালত রায় দেয়, শিক্ষার্থীদের তদারকির সময় শ্রেণিশিক্ষক যথাযথ যত্নের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন; শিক্ষককে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়। পরে আপিল আদালত সাজা কমিয়ে তা কার্যকর না করার নির্দেশ দেয়। ফলে শিক্ষককে তাৎক্ষণিক কারাভোগ এড়াতে এবং পদে বহাল থাকতে দেওয়া হয়। তবে প্রাথমিক আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার রায়টি ভয়াবহ নজির তৈরি করে। শিক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার জন্য শিক্ষকদের ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা এবং কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে—এমনকি ঘটনায় তৃতীয় পক্ষের অবহেলা থাকলেও, যেমন পার্কিং এলাকায় বাসচালকের অনিরাপদভাবে পেছনে যাওয়া।
এই মামলায় নিয়মিত শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে “পেশাগত অবহেলা” (업무상 과실치사) অভিযোগের কঠোর প্রয়োগের সূচনা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ফৌজদারি আইনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে কারও ক্ষতি করলে এই অভিযোগ প্রযোজ্য হয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আদালত এই বিধানকে শিক্ষাসফরের তদারকির দায়িত্ব পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য শিক্ষকেরা সম্ভাব্য কারাদণ্ডের মুখে পড়তে পারেন, এমন পরিস্থিতিতেও যেখানে তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত অথবা বাইরের ঠিকাদার জড়িত। আগে দুর্ঘটনার জন্য শিক্ষকদের দেওয়ানি মামলা বা পেশাগত শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারত। এখন তাদের ফৌজদারি রেকর্ড, কারাবাস এবং শিক্ষকতার পেশা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই রায় শিক্ষাসফরকে মূল্যবান শিক্ষার সুযোগ থেকে বিপজ্জনক আইনি ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। ফলে দেশজুড়ে শিক্ষকেরা ভাবছেন, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষার কোনো সুফলই কি কারাবাস ও পেশাগত সর্বনাশের ঝুঁকি নেওয়ার মতো যথেষ্ট।
যাত্রা শুরুর আগেই কাগজপত্রের পাহাড়
ফৌজদারি মামলার আশঙ্কার পাশাপাশি শিক্ষকদের এমন প্রশাসনিক কাজের চাপে পড়তে হচ্ছে, যা পাঠদানের জন্য বরাদ্দ সময় গ্রাস করছে। ইউনিয়নের জরিপ অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা শিক্ষাসফর আয়োজনে অতিরিক্ত প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক আগাম স্থান পরিদর্শন, পরিবহন সংস্থা ও আবাসন সরবরাহকারীদের সঙ্গে জটিল চুক্তি, সাধারণ পাঠপরিকল্পনার চেয়েও বেশি বিস্তৃত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি এবং প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা বোর্ডের কাছ থেকে একাধিক ধাপে প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া।
শিক্ষকেরা জানান, শিক্ষাসফরের ব্যবস্থাপনার পেছনে তাঁরা পাঠ্যক্রম তৈরি বা শিক্ষামূলক বিষয়বস্তুর জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন। প্রতিটি সম্ভাব্য গন্তব্যে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সরেজমিনে পরিদর্শন করতে হয়। তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই, জরুরি বহির্গমন পথের ছবি তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড মেনে চলা হচ্ছে কি না দেখা এবং খাদ্যনিরাপত্তার নিয়ম মূল্যায়ন করতে হয়। কাগজপত্রের মধ্যে থাকে বিস্তারিত দায়মুক্তির সম্মতিপত্র, সব অংশগ্রহণকারীর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য-ইতিহাস পর্যালোচনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শিক্ষার্থীর অসুস্থতা পর্যন্ত নানা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা। আগে থেকেই ভারী পাঠদানের চাপ ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত শিক্ষকদের ওপর এই আমলাতান্ত্রিক বোঝা এসে পড়ে। ফলে শিক্ষাসফর শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতার বদলে প্রশাসনিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, যা কর্মদিবসকে সন্ধ্যা ও সপ্তাহান্ত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
চাপ আরও নানা উপায়ে প্রকাশ পায়। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের ৭২.২ শতাংশ বলেছেন, সফর পরিকল্পনার সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু ৩৫.৫ শতাংশ জানিয়েছেন, নিজেদের বিবেচনার বিরুদ্ধে গিয়ে অংশ নিতে বাধ্য বোধ করেন অথবা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা সফরে সম্মতি দিতে উল্লেখযোগ্য চাপ অনুভব করেন। এতে এক বিষাক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়: পেশাগত পরিণতির আশঙ্কা ছাড়া শিক্ষকেরা অংশগ্রহণে না বলতে পারেন না, অথচ কিছু ভুল হলে তাঁদের ভয়াবহ আইনি পরিণতির মুখে পড়তে হয়।
নিরাপত্তার ভয় ও আর্থিক বাস্তবতা
সাম্প্রতিক বিতর্কগুলো দেখায়, স্কুলগুলোকে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাসফর বন্ধ করতে বাধ্য করার একমাত্র চাপ দায়বদ্ধতার আশঙ্কা নয়। এপ্রিলের শুরুতে একটি অনলাইন পোস্টে জানানো হয়, গ্যাংওন প্রদেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন দিনের একটি সফরে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর খরচ হবে ৬০৬,০০০ ওন (প্রায় ৪১০ থেকে ৪৪০ ডলার)। দেশীয় সরকারি স্কুলের সফরের জন্য এই অঙ্ককে অতিরিক্ত মনে করে অভিভাবকেরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান। শেষ পর্যন্ত স্কুলটি পুরো আয়োজন বাতিল করে। ঘটনাটি দেখায়, আধুনিক শিক্ষাসফর একই সঙ্গে নানা দিক থেকে চাপের মুখে পড়ছে—শিক্ষকদের কারাবাসের ভয় এবং অভিভাবকদের পারিবারিক ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের মাঝখানে।
এই ঘটনা সারা দেশে শিক্ষামূলক ভ্রমণকে প্রভাবিত করা মূল্যস্ফীতির চাপও তুলে ধরে। আবাসন, পরিবহন ও বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সফরের ব্যয় অনেক কর্মজীবী পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে। এই আর্থিক বোঝা দ্বিমুখী সংকট তৈরি করেছে, যা নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকুক বা না থাকুক, স্কুলভ্রমণের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে হুমকিতে ফেলছে। পরিবারগুলো ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, আর শিক্ষকেরা সফর আয়োজনের আইনি পরিণতি নিয়ে ভীত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা দেওয়া এবং পরিবারগুলোর বাজেট ও শিক্ষকদের কল্যাণ রক্ষার মধ্যে আটকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ব্যয়বহুল ও উচ্চচাপের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে বাতিল করাই সবার জন্য ভালো।
কিছু প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী পুরো শ্রেণির রাতযাপনসহ ভ্রমণের বদলে শ্রেণিভিত্তিক অভিজ্ঞতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। ছোট পরিসরের এসব আয়োজনে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা ও দায়বদ্ধতার ঝুঁকি কমে, কিন্তু বড় দলের ভ্রমণে যে বিস্তৃত সামাজিক সুফল পাওয়া যায়, তা হারিয়ে যায়। অন্য স্কুলগুলো বাইরের কার্যক্রম পুরোপুরি বাদ দিয়ে সরেজমিনে অভিজ্ঞতার বদলে ভার্চুয়াল ভ্রমণ বা অতিথি বক্তার ব্যবস্থা করছে—যে অভিজ্ঞতা একসময় দক্ষিণ কোরিয়ার শৈশবস্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি
অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা টিকিয়ে রাখতে এবং শিক্ষকদের অন্যায় আইনি পরিণতি থেকে রক্ষা করতে কোরিয়ান টিচার্স অ্যান্ড এডুকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা “শিক্ষকদের ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি জোরদার করাকে” সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; ৮০.৯ শতাংশ এ পদক্ষেপের পক্ষে। শিক্ষকেরা বিশেষভাবে চান, বৈধ শিক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যেন “পেশাগত অবহেলায় মৃত্যু বা আঘাত”–সংক্রান্ত অভিযোগ প্রয়োগ না করে। তাঁদের যুক্তি, অনিবার্য দুর্ঘটনার বদলে শুধু ইচ্ছাকৃত ক্ষতি বা চরম বেপরোয়া আচরণের ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত।
সংস্কারের অন্য অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে স্পষ্ট নিরাপত্তামান নির্ধারণ, যাতে আইনি যত্নের দায়িত্ব পালনে ঠিক কী ধরনের সতর্কতা যথেষ্ট, তা নির্দিষ্ট হয় এবং শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে বিচারকদের ব্যক্তিনির্ভর ব্যাখ্যার সুযোগ কমে। উত্তরদাতাদের প্রায় ৩০.৮ শতাংশ দায়বদ্ধতার সমস্যা সমাধান করা না গেলে রাতযাপনসহ কর্মসূচি সীমিত করা বা বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন, আর ২৬.৬ শতাংশ নিরাপত্তামান স্পষ্ট করার ওপর জোর দিয়েছেন। তদারকি ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার দায়িত্ব শ্রেণিশিক্ষকদের একার ওপর না দিয়ে পেশাদার নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং পেশাগত শাস্তি বা ক্যারিয়ারের ক্ষতি ছাড়া সফরে অংশগ্রহণে না বলার অধিকার নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকেরা।
ইউনিয়নের বক্তব্য, বর্তমান কাঠামো শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে শিশুর বিকাশের জন্য অপরিহার্য মূল্যবান শিক্ষাদান হিসেবে না দেখে বিপজ্জনক ও বোঝাস্বরূপ কাজ হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মতে, ফৌজদারি দায়ের ভয় শেষ পর্যন্ত শিক্ষার মান কমায় এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক দক্ষতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান গড়ে তোলার অপরিহার্য অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করে। শিক্ষামূলক পরিবেশে দুর্ঘটনাকে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রেখে যুক্তিসংগত নিরাপত্তামান বজায় রাখার মতো মৌলিক পরিবর্তন না এলে দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা দ্রুত কমতেই থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাস্মৃতি হবে ম্লান এবং ব্যবহারিক দক্ষতাও কমে যাবে।
অতিরিক্ত সতর্কতার শিক্ষাগত মূল্য
রাতযাপনসহ শিক্ষাসফর হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু বিনোদনমূলক ভ্রমণের সুযোগ হারানো নয়। ঐতিহ্যগতভাবে এসব কর্মসূচি দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভরতা চর্চা, অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং শ্রেণিকক্ষের স্তরভিত্তিক কাঠামোর বাইরে সম্পর্ক গড়ে তোলার বিরল সুযোগ দিয়েছে। অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ ও কঠোর শৃঙ্খলার জন্য প্রায়ই সমালোচিত একটি শিক্ষাব্যবস্থায়, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মানসম্মত পরীক্ষার কঠোর চাহিদার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে শিক্ষাসফর ব্যক্তিগত বিকাশ এবং অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসর তৈরি করত।
স্কুলগুলো যখন ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হচ্ছে বা সব কার্যক্রমই বাতিল করছে, তখন শিক্ষার্থীরা এমন অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা পাঠ্যবই বা ডিজিটাল উপস্থাপনার মাধ্যমে দেওয়া যায় না। আইনি ঝুঁকি থেকে শিক্ষকদের সুরক্ষা দিলেও ঝুঁকি এড়ানোর এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত পুরো প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করতে পারে। তারা এমন গঠনমূলক অভিজ্ঞতা হারাবে, যা আগের প্রজন্মগুলো তাদের বিকাশের অপরিহার্য অংশ বলে মনে করত। দক্ষিণ কোরিয়া বৈধ নিরাপত্তা-উদ্বেগের সঙ্গে শিক্ষাসফরের শিক্ষাগত মূল্য কীভাবে সমন্বয় করবে, তা এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন; এ জন্য নীতিগত মনোযোগ ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
মূল বিষয়গুলো
- এ বছর দক্ষিণ কোরিয়ার মাত্র ৫৩.৪% স্কুল রাতযাপনসহ শিক্ষাসফরের আয়োজন করেছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় নাটকীয়ভাবে কম; ৭.২% স্কুল অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা পুরোপুরি বাতিল করেছে।
- ৮৯.৬% শিক্ষক শিক্ষাসফর এড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে ফৌজদারি দায়ে পড়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। ২০২২ সালে সকছোতে শিক্ষাসফরের সময় বাস দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এক শিক্ষককে স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
- ৮৪% শিক্ষাবিদ জানিয়েছেন, বাধ্যতামূলক স্থান পরিদর্শন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথিপত্র ও চুক্তি নিয়ে আলোচনাসহ অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ পাঠ্যক্রম প্রস্তুতির চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে।
- ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে। গ্যাংওন প্রদেশের একটি সফরে শিক্ষার্থীপ্রতি খরচ ছিল ৬০৬,০০০ ওন (৪৪০ ডলার), যা অভিভাবকদের প্রতিবাদ ও সফর বাতিলের কারণ হয়েছে।
- শিক্ষক ইউনিয়নের দাবি, শিক্ষামূলক কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে “পেশাগত অবহেলা” অভিযোগ থেকে অব্যাহতি, স্পষ্টতর নিরাপত্তামান এবং শাস্তি ছাড়া সফরে অংশগ্রহণে না বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।






