জাপানের করপোরেট নিয়োগ সংস্কৃতিতে পরিবর্তন
দশকের পর দশক ধরে জাপানের করপোরেট নিয়োগে একটি অনুমানযোগ্য ছন্দ অনুসরণ করা হয়েছে: প্রতি বসন্তে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিয়োগ, এরপর বছরের পর বছর অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে পদোন্নতি। নতুন স্নাতকদের একযোগে নিয়োগ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থা যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক উত্থানের পর থেকে দেশটির শ্রমবাজারকে রূপ দিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে কোম্পানিগুলো মার্চে স্নাতক হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিয়োগ করত এবং তাদের করপোরেট পরিবারের অংশ করে নিত, যেখানে তাৎক্ষণিক বিশেষায়িত দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিতে লাখো তরুণ জাপানি কর্মীর জন্য স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের ধারা ও অনুমানযোগ্য পেশাগত অগ্রগতির পথ তৈরি হয়েছিল।
সূচিপত্র
তবে কিয়োদো নিউজের ১১১টি বড় কোম্পানির ওপর করা সাম্প্রতিক এক জরিপে এমন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে, যা এসব মৌলিক চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জাপানের বেশি কোম্পানি ২০২৭ অর্থবছরে নতুন স্নাতক নিয়োগ বাড়ানোর বদলে কমানোর পরিকল্পনা করছে, যদিও দেশজুড়ে শ্রমিকের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শুরুর দিকে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ২৩ শতাংশ (২৫টি কোম্পানি) ২০২৭ সালের এপ্রিলে শুরু হতে যাওয়া অর্থবছরে প্রারম্ভিক পর্যায়ের নিয়োগ কমানোর পরিকল্পনা করছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। বিপরীতে, মাত্র ১৬ শতাংশ (১৮টি কোম্পানি) নতুন স্নাতক নিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বর্তমান নিয়োগের মাত্রা ধরে রাখার পরিকল্পনা করেছে ৩৫ শতাংশ, সিদ্ধান্তহীন রয়েছে ২২ শতাংশ এবং উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ৫ শতাংশ। এই পরিবর্তন তিন প্রজন্ম ধরে জাপানি পুঁজিবাদকে সংজ্ঞায়িত করা যুদ্ধোত্তর কর্মসংস্থান-সমঝোতার অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বদলে যাচ্ছে কর্মীবাহিনীর চাহিদা
এই সংকোচনের প্রধান কারণ নিছক অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত। নতুন স্নাতক পদের সংখ্যা কমানোর মূল কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে শ্রম সাশ্রয়ের পদক্ষেপের কথা বলেছে। মুরাতা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের মাধ্যমে কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ায় তারা প্রারম্ভিক পর্যায়ের নিয়োগের ধারা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জুনিয়র কর্মীদের দেওয়া নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করছে। জাপানের করপোরেট কাঠামোয় নতুন স্নাতকেরা ঐতিহাসিকভাবে কোম্পানির নিয়মকানুন শেখার পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তা, তথ্য এন্ট্রি, নথি তৈরি ও প্রাথমিক বিশ্লেষণের কাজ করতেন। জেনারেটিভ এআই ব্যবস্থা এখন এসব কাজের অনেকগুলোই আরও দ্রুত ও কম ভুলে করছে, ফলে প্রারম্ভিক পর্যায়ের কর্মীদের বড় দল নিয়োগের প্রয়োজন কমছে।
এই পরিবর্তন মহামারিকালীন নিয়োগের ধারা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। কোভিড-১৯-এর কারণে সৃষ্ট বিঘ্নের পর জনসংখ্যাগত সংকট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসার প্রেক্ষাপটে তরুণ মেধাবীদের নিশ্চিত করতে জাপানি কোম্পানিগুলো জোরালো নিয়োগ অভিযান চালিয়েছিল। তবে ২০২৩ সাল থেকে এআই সরঞ্জাম দ্রুত গ্রহণ করায় বিদ্যমান কর্মীবাহিনীকে আনুপাতিক হারে কর্মী না বাড়িয়েও বেশি কাজ সামলানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা জাপানের করপোরেট খাতে সতর্ক বাজেট প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছে।
অভিজ্ঞ ও বৈশ্বিক মেধা নিয়োগে কৌশলগত ঝোঁক
প্রচলিত স্নাতক নিয়োগ কমলেও জাপানের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একই সঙ্গে বিকল্প উপায়ে মেধাবী কর্মী নিয়োগের পরিসর বাড়াচ্ছে। জরিপে তাৎক্ষণিক উৎপাদনশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া বহুমুখী নিয়োগ কৌশলের দিকে স্পষ্ট ঝোঁক দেখা গেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৩৯ শতাংশ কোম্পানি, যাদের মধ্যে ফুজিফিল্ম হোল্ডিংস করপোরেশন ও রেস্তোরাঁ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্কাইলার্ক হোল্ডিংস কোম্পানি রয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ পদে আরও বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। উদ্ভাবন এবং বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রত্যাশাকে এসব কোম্পানি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাপানের বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জন্মহার কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মেধার প্রয়োজন জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে প্রচলিত নতুন স্নাতক নিয়োগব্যবস্থায় জাপানের বাইরের এমন প্রার্থীরা অনেকাংশেই বাদ পড়তেন, যাঁরা কঠোর শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনের শর্তের সঙ্গে খাপ খেতেন না।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিশেষায়িত ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নিশ্চিত করতে বড় করপোরেশনগুলো অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। হিতাচি লিমিটেড ও এমইউএফজি ব্যাংক উভয়েই জানিয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে তাদের নিয়োগ করা নতুন স্নাতকের সংখ্যা ২০২৬ অর্থবছরে নিয়োগ করা অভিজ্ঞ কর্মীদের চেয়ে কম হবে। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তবায়ন, তথ্যবিজ্ঞান ও ডিজিটাল রূপান্তরে তাৎক্ষণিক দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন; বছরের পর বছর প্রশিক্ষণের প্রয়োজন এমন নতুন স্নাতক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি করা এক মন্তব্যে শিক্ষার্থীদের জন্য এর বাস্তব পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কোম্পানিগুলো নতুন স্নাতক কম নিয়োগ করছে। এর অর্থ, নতুন স্নাতকদের চাকরি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, আর তাদের কেউ কেউ হয়তো চাকরিই পাবে না।
এই মন্তব্য জাপানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের প্রতিফলন। প্রচলিত অলিখিত চুক্তি—যেখানে স্নাতকেরা আজীবন চাকরি ও ধাপে ধাপে উন্নতির বিনিময়ে শুরুতে কম বেতন ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা মেনে নিতেন—ভেঙে পড়ছে। এর বদলে এমন এক দক্ষতাভিত্তিক কর্মবাজার গড়ে উঠছে, যেখানে সম্ভাবনার চেয়ে প্রমাণিত সক্ষমতার মূল্য বেশি।
নিয়োগে সতর্কতা, তবু শ্রমিকের ঘাটতি অব্যাহত
নতুন স্নাতক নিয়োগ কমানোর ঘটনা এমন এক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটছে, যেখানে স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। নিয়োগ কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ কোম্পানি শ্রমিকের ঘাটতির কথা জানিয়েছে; বিশেষ করে প্রকৌশলী ও উৎপাদন খাতের কর্মীর সংকট রয়েছে। মাত্র ৩৭ শতাংশ বলেছে, তারা কোনো ঘাটতির মুখে নেই।
এই আপাত বৈপরীত্যের মূলে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে দক্ষতার অমিল। জাপানের উচ্চশিক্ষায় ঐতিহাসিকভাবে এমন সাধারণ দক্ষতা বিকাশে জোর দেওয়া হয়েছে, যা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাধারণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উপযোগী। এআই নিয়মিত কাজের পদগুলো বিলুপ্ত করায় চাহিদা এখন বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত পদের দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যেগুলো পূরণের যোগ্যতা সাম্প্রতিক স্নাতকদের অনেকেরই নেই।
চাকরির জন্য যোগ্য স্নাতকদের নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্রই রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৭ শতাংশ কোম্পানি বর্তমান চাকরির বাজারকে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল বা ক্রমেই আরও অনুকূল বলে বর্ণনা করেছে। সীমিতসংখ্যক মেধাবী প্রার্থীকে আকৃষ্ট করতে ৭৪ শতাংশ কোম্পানি ২০২৬ অর্থবছরে প্রারম্ভিক বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে, আর আরও ৯ শতাংশ ভবিষ্যতে বেতন বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে। মজুরি বৃদ্ধির এই চাপের পেছনে রয়েছে জনসংখ্যাগত বাস্তবতা: জাপানের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রতিবছর কয়েক লাখ করে কমছে।
কোম্পানিগুলো কর্মী ধরে রাখা ও নিয়োগে সৃজনশীল কৌশলও নিচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ কোম্পানি আগে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়া কর্মীদের পুনর্নিয়োগের কর্মসূচি চালু করেছে। এই ‘বুমেরাং কর্মীরা’ দীর্ঘ সময় ধরে পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে ফিরে আসেন। ফলে নতুন স্নাতককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার খরচ এবং বাইরের অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতা তৈরি হয়।
সৃজনশীল খাতে এআইয়ের নতুন সুযোগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রচলিত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রারম্ভিক পর্যায়ের পদগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠলেও, একই সঙ্গে জাপানের সৃজনশীল শিল্পে নতুন ধরনের পেশাগত সুযোগ তৈরি করছে এই প্রযুক্তি। দেশের অ্যানিমে শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ কণ্ঠাভিনয় খাত দেখাচ্ছে, যথাযথ ব্যবস্থাপনা থাকলে এআই কীভাবে মানব মেধাকে প্রতিস্থাপন না করে বরং তার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
জাপানি কণ্ঠাভিনেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী ভয়েস ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড ডাবিং অ্যাডভান্সমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি এমন কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যেগুলো এআই কাজে লাগিয়ে অভিনয়শিল্পীদের বাণিজ্যিক পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত করবে। নভেম্বরের এক প্রদর্শনীতে কণ্ঠাভিনেতা মিকা কানাই জাপানি ভাষায় একটি সহজ বাক্য বলেন। এআই ব্যবস্থা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য ও আবেগের সূক্ষ্মতা অক্ষুণ্ন রেখে সেটি ইংরেজি, চীনা ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করে।
অ্যানিমের বিশ্বায়নে দীর্ঘদিনের একটি বাধা দূর করতে পারে এই প্রযুক্তি। প্রচলিতভাবে বিদেশে পরিবেশনের জন্য স্থানীয় কণ্ঠশিল্পীদের দিয়ে ব্যয়বহুল পুনরায় ডাবিং করতে হতো, যাতে প্রায়ই মূল অভিনয়ের সূক্ষ্মতা হারিয়ে যেত। এআই-চালিত কণ্ঠ অনুবাদ জাপানি অভিনয়শিল্পীদের সরাসরি আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়, ফলে তাঁদের বাজারমূল্য বহুগুণ বাড়তে পারে।
অননুমোদিত কণ্ঠ নকলের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে শিল্প খাতের অংশীজনেরা জে-ভক্স-প্রো প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইতোচু করপোরেশন ও জাপান অ্যাক্টরস ইউনিয়ন পরিচালিত একটি আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ-তথ্যভান্ডার। এই প্ল্যাটফর্মে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠ নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয় এবং চুরি ঠেকাতে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক যুক্ত করা হয়। জাপানের বর্তমান আইনে কণ্ঠ নিজেই কপিরাইট-সুরক্ষিত বিষয়বস্তু নয়। ফলে অভিনয়শিল্পীদের রেকর্ডিংয়ে সম্মতি বা পারিশ্রমিক ছাড়াই প্রশিক্ষিত এআই ব্যবস্থার কাছে তাঁরা ঝুঁকিতে থাকেন।
অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি পরিচালক মাসাকাজু কুবো অর্থনৈতিক যুক্তি ব্যাখ্যা করে বলেন: "বিদেশে জাপানি অ্যানিমের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কণ্ঠাভিনেতারা খুব জনপ্রিয়। ডাবিং ছাড়াই কণ্ঠাভিনেতাদের আসল কণ্ঠ ব্যবহার করা হলে ভক্তের সংখ্যা আরও বাড়বে।" এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, গাড়ির নেভিগেশন থেকে শুরু করে বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশনা—বিভিন্ন কাজে কোম্পানিগুলো তাঁদের এআই-তৈরি কণ্ঠ ব্যবহার করলে অভিনয়শিল্পীরা রয়্যালটি পাবেন।
তোয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাস্বত্ব আইনের অধ্যাপক কাজুহিরো আন্দো পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সম্পর্কে এই মূল্যায়ন দিয়েছেন।
ডাবিং শিল্পীদের আসল কণ্ঠ প্রত্যয়ন করার বেসরকারি উদ্যোগ কিছুটা হলেও অননুমোদিত কণ্ঠের ব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর হবে। তবে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই আইনগত ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া এবং এ ধরনের চর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট হয়, জাপানের শ্রমবাজারে একদিকে ঐতিহ্যবাহী খাতে এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান কমছে, অন্যদিকে সৃজনশীল শিল্পে এআই পেশাদারিত্বের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
জাপানের অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপান্তর
২০২৭ অর্থবছরের নিয়োগের প্রবণতা জাপানি পুঁজিবাদের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজীবন চাকরি, জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক পদোন্নতি ও বিপুলসংখ্যক স্নাতক নিয়োগের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন যুদ্ধোত্তর কর্মসংস্থান মডেলের জায়গায় পশ্চিমা শ্রমবাজারের মতো আরও পরিবর্তনশীল ও দক্ষতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা আসছে।
এই পরিবর্তনের সামাজিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। জাপানে নতুন স্নাতকেরা ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি এপ্রিলে একযোগে কর্মজীবন শুরু করতেন, যা তাঁদের মধ্যে সুস্পষ্ট ব্যাচ-পরিচয় ও অনুমানযোগ্য পেশাগত অগ্রগতির পথ তৈরি করত। অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগের দিকে ঝোঁক এবং নতুন স্নাতক নিয়োগ কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে; অন্যদিকে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের জন্য বাড়তে পারে কর্মস্থল বদলের সুযোগ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জনসংখ্যাগত সংকট মোকাবিলায় এআই গ্রহণ জাপানের জন্য সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক নির্ভরশীলতার হার বাড়ার প্রেক্ষাপটে কম কর্মী দিয়ে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার উপায় হতে পারে স্বয়ংক্রিয়করণ। তবে এই পরিবর্তনের গতি শিক্ষাব্যবস্থার অভিযোজনক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে এমন তরুণদের মধ্যে সাময়িক বেকারত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যাঁরা এমন এক নিয়োগব্যবস্থার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যা এখন আর নেই।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা পর্যবেক্ষকেরা এসব পরিবর্তন নিবিড়ভাবে নজরে রাখছেন। ইউরোপীয় বিজনেস কাউন্সিল ইন জাপান এই নিয়োগ পরিবর্তনকে দ্বীপপুঞ্জে কার্যক্রম চালানো বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জাপানি কোম্পানিগুলো নতুন স্নাতক নিয়োগ কমালে অভিজ্ঞ ও দ্বিভাষিক কর্মীদের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। এতে স্থানীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজছে এমন আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষতিপূরণ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
যা জানা জরুরি
- জাপানের ২৩ শতাংশ বড় কোম্পানি ২০২৭ অর্থবছরে নতুন স্নাতক নিয়োগ কমানোর পরিকল্পনা করছে। পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম পরিকল্পিত নিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়িয়ে যাচ্ছে পরিকল্পিত নিয়োগ হ্রাস।
- প্রারম্ভিক পর্যায়ের নিয়োগ কমানোর প্রধান কারণ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশনকে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে জুনিয়র কর্মীদের প্রচলিত কাজের প্রয়োজন কমছে।
- ৩৯ শতাংশ কোম্পানি দেশের অভ্যন্তরীণ পদে আরও বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে; তাদের লক্ষ্য উদ্ভাবন ও বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা পাওয়া।
- হিতাচি ও এমইউএফজি ব্যাংকসহ বড় করপোরেশনগুলো আসন্ন অর্থবছরগুলোতে নতুন স্নাতকের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ পেশাজীবী নিয়োগ করবে এবং তাৎক্ষণিক ডিজিটাল দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেবে।
- নিয়োগ কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও ৭৭ শতাংশ কোম্পানি চাকরির বাজারকে শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল বলে বর্ণনা করেছে। ২০২৬ অর্থবছরে ৭৪ শতাংশ কোম্পানি প্রারম্ভিক বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
- প্রচলিত নতুন স্নাতক নিয়োগের বিকল্প হিসেবে ৭৭ শতাংশ কোম্পানি সাবেক কর্মীদের পুনর্নিয়োগের কর্মসূচি চালু করেছে।
- এআই শ্রমবাজারে ভিন্নমুখী প্রভাব ফেলছে: প্রচলিত করপোরেট পদের নিয়মিত কাজ বিলুপ্ত করছে, আবার কণ্ঠাভিনয়ের মতো সৃজনশীল খাতে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করছে।
- এই প্রবণতা জাপানের প্রচলিত আজীবন চাকরি ও জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরে দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ মডেলের দিকে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।






