দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জয় করা ১.৩০ ডলারের লাতে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জমজমাট কফি বাজারে অতি সাধারণ সূচনা থেকে উঠে এসে বৈশ্বিক জায়ান্টদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে একটি ব্র্যান্ড। ইন্দোনেশীয় ভাষায় “কফির স্মৃতি” অর্থে ব্যবহৃত কোপি কেনাঙ্গান ২০১৭ সালে জাকার্তার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড টাওয়ারে একটি ছোট্ট কফি নিয়ে যাওয়ার স্টল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এখন এটি অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় স্থানীয় কফি চেইন। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ছয়টি দেশে কোম্পানিটির আউটলেটের সংখ্যা ১,৩২৪ ছাড়ায়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তাইওয়ানে প্রবেশের মধ্য দিয়ে সপ্তম বাজারে যাত্রা শুরু হয়।
সূচিপত্র
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জয় করা ১.৩০ ডলারের লাতে
- পোকেমন কার্ড থেকে কফির সাম্রাজ্য
- ইন্দোনেশিয়ার কফি বাজারে উপযুক্ত দাম খুঁজে পাওয়া
- ডিজিটাল-প্রথম: প্রযুক্তির হাত ধরে সাফল্য
- বৈশ্বিক সম্প্রসারণ ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
- তারকাখচিত বিনিয়োগকারী ও বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন
- ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: কৌশল বদলের গল্প
- ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার লড়াই
- আইপিওর প্রস্তুতি ও ২০৩০ সালের লক্ষ্য
- মূল বিষয়গুলো
সংখ্যাগুলো চোখধাঁধানো প্রবৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়। টানা পাঁচ বছর লোকসানের পর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বার্ষিক মুনাফা করে কোপি কেনাঙ্গান। ১৮৪ মিলিয়ন ডলার আয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা হয় ১৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এখন মাসে লাখ লাখ কাপ কফি বিক্রি করে কোম্পানিটি। তাদের বিশেষ পাম সুগার লাতে ইন্দোনেশিয়ার মিলেনিয়াল ও জেন-জি গ্রাহকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কোম্পানিটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়তো আরও বেশি চমকপ্রদ। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এডওয়ার্ড তিরতানাতা ২০৩০ সালের মধ্যে দোকানের সংখ্যা তিন গুণ বাড়িয়ে ৪,০০০-এ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। এ জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ২০০ মিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিরতানাতা বলেন, “আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী একক কোম্পানি বা ব্র্যান্ড হতে চাই—শুধু দোকানের সংখ্যায় নয়, আয় ও মুনাফার দিক থেকেও।”
পোকেমন কার্ড থেকে কফির সাম্রাজ্য
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কফি সাম্রাজ্য গড়ার পথে এডওয়ার্ড তিরতানাতার যাত্রা শুরু হয়েছিল এসপ্রেসো মেশিন দিয়ে নয়, পোকেমন কার্ড দিয়ে। জাকার্তায় উদ্যোক্তা বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া তিরতানাতা স্কুলে পড়ার সময়ই ব্যবসায়িক দক্ষতার পরিচয় দেন। গেমিং কার্ড ও বট কেনাবেচা করে মুনাফা করতেন তিনি। তাঁর কথায়, “কিন্তু যখনই অর্থ উপার্জন বা ব্যবসা করার কোনো সুযোগ আসত, আমি সব সময়ই [খুব] উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতাম। এটা টাকার ব্যাপার নয়—কাজটা করার আনন্দের ব্যাপার।”
বোস্টনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিং পড়ার সময় ক্যাম্পাসের ডানকিন ডোনাটসে প্রতিদিন কফি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে তাঁর। ২০১০ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ফিরে প্রথমে বাবার সঙ্গে কয়লা বিপণনের কাজে যোগ দেন। কিন্তু ২০১৪ সালে পণ্যমূল্য ধসে পড়লে বাজারের অস্থিরতা সম্পর্কে কঠিন শিক্ষা পান। তিনি বলেন, “আমি বাজারের দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এরপর নিজেকে কথা দিয়েছিলাম, পরের উদ্যোগ এমন ব্যবসায় হবে যেখানে নিজের দাম নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।”
পানীয় খাতে তাঁর প্রথম উদ্যোগ ছিল প্রিমিয়াম চায়ের চেইন লুইস অ্যান্ড ক্যারল, যা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। তবে এই ধাক্কাই বাজারের এমন এক ঘাটতি সামনে আনে, যা শেষ পর্যন্ত কোপি কেনাঙ্গানের জন্ম দেয়। স্কুলজীবনের বন্ধু জেমস প্রানান্তো এবং বিপণন খাতের অভিজ্ঞ সিনথিয়া চেরুন্নিসাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা নিজেদের সঞ্চয় থেকে ১৫০ মিলিয়ন রুপিয়া (প্রায় ১০,০০০ ডলার) পুঁজি করে ২০১৭ সালে প্রথম আউটলেট চালু করেন।
ইন্দোনেশিয়ার কফি বাজারে উপযুক্ত দাম খুঁজে পাওয়া
কোপি কেনাঙ্গানের সাফল্যের রহস্য এর বাজার অবস্থানে। তিরতানাতা ইন্দোনেশিয়ার কফি সংস্কৃতিতে স্পষ্ট বিভাজন দেখেছিলেন: রাস্তার বিক্রেতারা প্রায় ৫,০০০ রুপিয়ায় (০.৩০ ডলার) ইনস্ট্যান্ট কফি বিক্রি করতেন, আর আন্তর্জাতিক চেইনগুলোর দাম ছিল ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ রুপিয়া (২.৩৩ থেকে ২.৯২ ডলার)। দেশটির গড় মাসিক বেতন যেখানে প্রায় ২০০ ডলার, সেখানে প্রতিদিন স্টারবাকসে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষের জন্যই ছিল সাধ্যের বাইরে।
তিরতানাতা বলেন, “আমি যখন শুরু করি, তখন কোম্পানিগুলো প্রতি কাপ কফি ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ রুপিয়ায় বিক্রি করত, যা অধিকাংশ ইন্দোনেশীয়ের সাধ্যের বাইরে ছিল।” কোপি কেনাঙ্গান এই ঘাটতি পূরণে ইন্দোনেশিয়ার আরাবিকা ও রোবাস্তা বিন দিয়ে সদ্য তৈরি কফি ২২,০০০ রুপিয়ায় (১.৩০ ডলার) বিক্রি করে। দাম রাস্তার কফির প্রায় দ্বিগুণ হলেও প্রিমিয়াম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে যথেষ্ট কম।
কোম্পানিটির সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পানীয় কোপি কেনাঙ্গান মানতান। নামটির শিথিল অর্থ “আমার প্রাক্তনের কফির স্মৃতি”। এতে দুধ, ক্রিমার ও গুলা আরেন (স্থানীয় পাম সুগার) মেশানো হয় এসপ্রেসোর সঙ্গে। স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এ প্রবণতা নামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক চেইনগুলো যেখানে স্বাদে ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে কোপি কেনাঙ্গান স্থানীয় রুচি অনুযায়ী রেসিপি বদলায়। সিঙ্গাপুরে একই লাতেতে স্থানীয় পছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে চিনি কম দেওয়া হয়। তিরতানাতা বলেন, “আমরা নিশ্চিত করতে চাই, কফির মিষ্টতা ও কড়া স্বাদ যে বাজারে কাজ করছি, সেখানকার মানুষের রুচির সঙ্গে সত্যিই মানানসই।”
ডিজিটাল-প্রথম: প্রযুক্তির হাত ধরে সাফল্য
প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ফলে কোপি কেনাঙ্গানের প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে ত্বরান্বিত হয়। কফি নিয়ে যাওয়ার এই মডেলে ব্যয়বহুল বসার জায়গা ও বড় দোকানের প্রয়োজন হয় না। ফলে দাম কম রেখেও উপকরণের মানে বেশি সম্পদ কাজে লাগাতে পেরেছে কোম্পানিটি। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় কোম্পানিটির ডিজিটাল রূপান্তরই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।
লকডাউনে অফিস ও বিপণিবিতানে মানুষের আনাগোনা কমে গেলে কয়েক ডজন দোকান বন্ধ রাখতে হয়। তখন তিরতানাতা তাঁর ভাষায় “বড় ধরনের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস” করেন। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি চালু করে মোবাইল অ্যাপ, যার মাধ্যমে আগাম অর্ডার, ডেলিভারি ও লয়্যালটি প্রোগ্রাম চালু করা সম্ভব হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ অ্যাপটির সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১.৫ মিলিয়নে—আগের বছরের দ্বিগুণেরও বেশি। মোট বিক্রির প্রায় অর্ধেক আসে অ্যাপ থেকে।
মহামারির ফলেই অ্যাপটির জন্ম। ৭০ শতাংশ অর্ডার আসে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
এই ডিজিটাল অবকাঠামো শুধু সুবিধাই দেয় না। ভোক্তাদের পছন্দ সম্পর্কে মূল্যবান তথ্যও তৈরি করে, যা চেইনটিকে প্রতি দুই মাসে নতুন পানীয় আনতে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে সহায়তা করে। জীবনবৃত্তান্ত যাচাই এবং কর্মীদের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে সাহায্যের জন্য কোম্পানিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে। এর ফলে পুরো প্রতিষ্ঠানে উন্নত বিশ্লেষণী সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে।
বৈশ্বিক সম্প্রসারণ ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
১,১০০টির বেশি দোকান থেকে ৭৫ শতাংশ আয় আসায় ইন্দোনেশিয়াই এখনো কোপি কেনাঙ্গানের মূল বাজার। তবে কেনাঙ্গান কফি ব্র্যান্ড নামে আন্তর্জাতিক বাজারে জোরেশোরে সম্প্রসারণ করছে কোম্পানিটি। বিদেশে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি মালয়েশিয়ায়, যেখানে আউটলেটের সংখ্যা প্রায় ১৫৮। এরপর রয়েছে ১০টি দোকান নিয়ে সিঙ্গাপুর। ২০২৪ সালে ফ্রেডলি গ্রুপ অব কোম্পানিজের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ফিলিপাইনে প্রবেশ করে কোম্পানিটি। সেখানে প্রথম ধাপে ১০টি দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরেও সম্প্রসারণ করেছে চেইনটি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ভারতের ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে সাবেক সাবওয়ে নির্বাহী ধীরাজ মাইনিকে নিয়োগ দেয় কোপি কেনাঙ্গান। প্যাসিফিক মলে দিল্লিতে প্রথম দোকান খোলার পাশাপাশি ৫০টি আউটলেট স্থাপন এবং সর্বোচ্চ ৪০ কোটি ভারতীয় রুপি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাইপের শিন কং মিৎসুকোশি এ১১-তে প্রথম দোকান খুলে তাইওয়ানে প্রবেশ করে ব্র্যান্ডটি। পরীক্ষামূলক উদ্বোধনের সময় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতিদিন ৩৫০ জন ক্রেতা আসেন।
বাজারভেদে সম্প্রসারণ কৌশলও আলাদা। ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতে কোম্পানিটি নিজেই দোকানের মালিক ও পরিচালনাকারী। অন্যদিকে ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ায় ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল ব্যবহার করছে। ২০২৬ সালের পর নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজিই হবে প্রধান পথ বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিরতানাতা। তাঁর ভাষায়, “সত্যিকারের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হতে হলে বছরে দুই থেকে তিনটি নতুন দেশে যেতে হবে।”
তারকাখচিত বিনিয়োগকারী ও বিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন
কোপি কেনাঙ্গানের উত্থান বিশ্বের প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছে। ২০২১ সালে সিরিজ সি তহবিল সংগ্রহে ৯৬ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম খাদ্য ও পানীয় খাতের “ইউনিকর্ন” হয়ে ওঠে কোম্পানিটি। তখন এর মূল্যায়ন ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। একাধিক দফায় মোট তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৪ মিলিয়ন ডলারে।
শেয়ারহোল্ডারদের তালিকায় রয়েছেন অনেক তারকা। মার্কিন র্যাপার জে-জেড তাঁর ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান অ্যারাইভের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছেন। টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস বিনিয়োগ করেছেন সেরেনা ভেঞ্চারসের মাধ্যমে। উল্লেখযোগ্য অন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আছেন মেটা প্ল্যাটফর্মসের সহপ্রতিষ্ঠাতা এদুয়ার্দো স্যাভেরিন—যিনি বি ক্যাপিটালের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছেন; সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল জিআইসি; হংকংয়ের ধনকুবের সোলিনা চাউয়ের হরাইজনস ভেঞ্চারস; এবং পিক এক্সভি পার্টনার্স (আগের নাম সিকোইয়া ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া)।
চেইনটিতে ২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা পিক এক্সভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোহিত আগরওয়াল তিরতানাতার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, প্রতিষ্ঠাতা কোনো স্লাইড উপস্থাপনার বদলে চার কাপ কফি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আগরওয়াল বলেন, “এড চার কাপ কফি নিয়ে এসেছিলেন। বৈঠকটা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী—স্লাইড উপস্থাপনা দিয়ে শুরু না করে একজন প্রতিষ্ঠাতা কফির কাপ নিয়ে এসেছিলেন। কফির স্বাদে এমন কিছু ছিল, যা একদম ঠিক মনে হয়েছিল।”
ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা: কৌশল বদলের গল্প
বর্তমান সাফল্যের পরও কোপি কেনাঙ্গানের যাত্রায় ব্যয়বহুল ভুল ছিল। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কয়েকটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ চালু করে কোম্পানিটি, যা শেষ পর্যন্ত মূল ব্যবসা থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয়। এর মধ্যে ছিল কেনাঙ্গান হেরিটেজ ও কেনাঙ্গান সিগনেচার—সনাতন পদ্ধতিতে কফি তৈরি এবং বড় ক্যাফের জায়গাসহ বিত্তবান গ্রাহকদের লক্ষ্য করে সাজানো প্রিমিয়াম মডেল। ছিল সাতু কেনাঙ্গানও, গ্রামীণ এলাকার ক্রেতাদের জন্য ৭,০০০ রুপিয়ার কাপ বিক্রির স্বল্পমূল্যের চেইন।
এসব ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিরতানাতা। তিনি স্বীকার করেন, “২০২২ সালের পর বুঝতে পারি, আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু করছি। বুঝলাম, এসব মনোযোগের বিচ্যুতি আমাদের মূল ব্যবসা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।” এরপর থেকে এসব গৌণ ব্র্যান্ডের সম্প্রসারণ বন্ধ রেখেছে কোম্পানিটি। এখন মূল কোপি কেনাঙ্গান ধারণা এবং তৈরি-অবস্থায় বিক্রির পানীয় কোপি কেনাঙ্গান হানিয়া উন্তুকমু-তে মনোযোগ দিচ্ছে তারা। ২০২৫ সালে এই পানীয়ের বিক্রিত ইউনিটের সংখ্যা তিন গুণ হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা পুঁজি বরাদ্দ নিয়ে তিরতানাতার দর্শনও বদলে দিয়েছে। এখন তাঁর মতে, শুরুতেই অতিরিক্ত তহবিল পাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্টার্টআপগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের হাতে সম্পদের প্রাচুর্য থাকে; সম্পদের অভাব থাকে না। শত শত মিলিয়ন ডলার তহবিল পেলে এমন প্রকল্প শুরু করতে থাকেন, যেগুলো আসলে আপনার পঞ্চম, ষষ্ঠ বা সপ্তম অগ্রাধিকার।”
ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার লড়াই
ক্রমেই প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠা বাজারে কাজ করছে কোপি কেনাঙ্গান। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ার জুস কফি, ভিয়েতনামের হাইল্যান্ডস কফি, থাইল্যান্ডের ক্যাফে অ্যামাজন এবং ইন্দোনেশিয়ারই জানজি জিওয়া, ফোর কফি ও তোমোরো কফি। এদিকে ৩১,০০০-এর বেশি দোকান নিয়ে চীনের জায়ান্ট লাকিন কফিকেও সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতা এখন শুধু দ্রুত সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে মোমেন্টাম ওয়ার্কসের ভাষায় “ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার লড়াইয়ে”। সাফল্য এখন শুধু দোকানের সংখ্যার ওপর নয়, বরং পরিচালন দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। শীর্ষস্থানীয় চেইনগুলো এখন দিনে ৬০০ থেকে ৮০০ কাপ কফি বিক্রি করে; সেরা দোকানগুলোতে এ সংখ্যা ৯,০০০-এ পৌঁছায়। সাধারণ দোকানে বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৪০০ কাপ।
নিজের কোম্পানির অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তিরতানাতা। তাঁর হিসাবে, ইন্দোনেশিয়ায় মাথাপিছু সদ্য তৈরি কফি পানের পরিমাণ বছরে মাত্র ২.৭ কাপ, যা এশিয়ায় সর্বনিম্ন। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির বিপুল সুযোগ রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের হুমকি হিসেবে না দেখে তিনি বরং বাজার বড় করার সহায়ক হিসেবে দেখেন। তাঁর বক্তব্য, “সবার জন্যই জায়গা আছে।” তাঁর ধারণা, চার বছরের মধ্যে মাথাপিছু কফি পানের পরিমাণ বেড়ে ৪.২ কাপে উঠতে পারে।
আইপিওর প্রস্তুতি ও ২০৩০ সালের লক্ষ্য
মুনাফা অর্জন এবং কার্যক্রমের ব্যবস্থা আরও দক্ষ করার পর পরবর্তী ধাপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কোপি কেনাঙ্গানকে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য রয়েছে কোম্পানিটির। এ জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় একটি করে নতুন দোকান খোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিরতানাতা বলেছেন, সুশাসনের দিক থেকে কোম্পানিটি “আইপিওর জন্য প্রস্তুত”। নিরীক্ষক হিসেবে প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্সকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়ার ইউনিকর্ন ইফিশারির পতনের পর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার চাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। স্বচ্ছতা ঝুঁকি সম্পর্কে ওই ঘটনা “প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা” ছিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তবে শিগগিরই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিরতানাতা বলেন, “অনেক কোম্পানি খুব তাড়াতাড়ি শেয়ারবাজারে আসে। আমাদের জন্য এটি জীবনে একবারই আসা সুযোগ, তাই কাজটা ঠিকভাবে করাই ভালো।” নতুন পুঁজি তোলার বদলে পরিচালন নগদ প্রবাহ থেকেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ কর্মসূচির অর্থ জোগানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। লক্ষ্য ইন্দোনেশিয়ায় ২,৬০০টি এবং মালয়েশিয়ায় ৮০০টি দোকান খোলা; বাকিগুলো হবে নতুন বাজারে, যেখানে আরও ১০ থেকে ১৫টি দেশে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে।
তাইওয়ান, ভারত এবং সম্ভাব্য নতুন বাজারে সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ইন্দোনেশিয়ার কফি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে ব্র্যান্ডটি। তিরতানাতা বলেন, “প্রথম দিন থেকেই আমরা বিশ্বাস করতাম, বিশ্বজুড়ে ইন্দোনেশীয় কফি চেইনের জন্য বিশেষ চাহিদা থাকবে। আমরা সব সময় বলেছি, আমরা ইন্দোনেশিয়া থেকে বিশ্বের পথে। যাত্রা সবে শুরু।”
মূল বিষয়গুলো
- ২০১৭ সালে জাকার্তার একটি স্টল থেকে যাত্রা শুরু করে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ছয়টি দেশে ১,৩২৪টির বেশি আউটলেটে পৌঁছেছে কোপি কেনাঙ্গান; ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাইওয়ানেও সম্প্রসারণ করেছে
- টানা পাঁচ বছর লোকসানের পর ২০২৫ সালে প্রথমবার বার্ষিক মুনাফা করেছে কোম্পানিটি; ১৮৪ মিলিয়ন ডলার আয়ের বিপরীতে মুনাফা হয়েছে ১৭ মিলিয়ন ডলার
- প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড তিরতানাতার লক্ষ্য, পরিচালন নগদ প্রবাহ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ২০৩০ সালের মধ্যে দোকানের সংখ্যা ৪,০০০-এ নেওয়া
- রাস্তার ০.৩০ ডলারের কফি ও স্টারবাকসের ৩ ডলারের লাতের মধ্যবর্তী দামের চাহিদা পূরণ করছে ব্র্যান্ডটি; তাদের বিশেষ পাম সুগার লাতের দাম ১.৩০ ডলার
- কোম্পানির অ্যাপের মাধ্যমে হওয়া ডিজিটাল অর্ডার মোট বিক্রির প্রায় অর্ধেক; ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ সক্রিয় ব্যবহারকারী ১.৫ মিলিয়ন
- তারকাখচিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন জে-জেড, সেরেনা উইলিয়ামস, মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা এদুয়ার্দো স্যাভেরিন এবং সিঙ্গাপুরের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল জিআইসি
- প্রিমিয়াম মডেল ও স্বল্পমূল্যের চেইন নিয়ে ব্যর্থ পরীক্ষার পর কোম্পানিটি মূলত কফি নিয়ে যাওয়ার মডেল এবং তৈরি-অবস্থায় বিক্রির পণ্যে মনোযোগ ফিরিয়েছে
- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে নিজস্ব দোকানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ করছে; ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবহার করছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল






