কয়েক দশকের সংযমের অবসান
২১ এপ্রিল জাপান সরকার যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পর থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি বিধিমালায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সামরিক বিক্রি প্রাণঘাতী নয়—এমন সীমিত কিছু সরঞ্জামের মধ্যে আটকে রাখা দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মন্ত্রিসভা পাঁচ শ্রেণির বিধিনিষেধ বাতিলের সংস্কার অনুমোদন করেছে। ওই ব্যবস্থায় রপ্তানি উদ্ধার, পরিবহন, সতর্কীকরণ, নজরদারি ও মাইন অপসারণের সরঞ্জামে সীমিত ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে জাপানি নির্মাতারা বিশ্বের মিত্র দেশগুলোর কাছে যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানসহ প্রাণঘাতী অস্ত্রব্যবস্থা বিক্রির সুযোগ পাবে।
সূচিপত্র
এই সংশোধন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপানের নিরাপত্তানীতিকে গড়ে তোলা শান্তিবাদী সীমাবদ্ধতা থেকে মৌলিক সরে আসার ইঙ্গিত। কয়েক দশক ধরে টোকিও প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানিতে স্বেচ্ছায় সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছিল। সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের অঙ্গীকারে এই অবস্থানের ভিত্তি ছিল। নতুন কাঠামোয় জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি রয়েছে—এমন ১৭টি দেশে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফিলিপাইন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেন, ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন, কারণ এককভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন আর যথেষ্ট নয়।
এখন কোনো দেশই একা নিজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহায়তা করে—এমন অংশীদার দেশ প্রয়োজন।
মন্ত্রিপরিষদের প্রধান সচিব মিনোরু কিহারাও এই অবস্থান সমর্থন করে বলেন, জাপানকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এগুলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করায় এই নীতিগত পরিবর্তন এসেছে। এতে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা পূরণে এখন জাপানি প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোও অস্ত্র কেনার উৎসে বৈচিত্র্য আনছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা এর একটি কারণ।
সংশোধিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে ইচ্ছামতো শ্রেণিবিভাগের বদলে প্রাণঘাতী সক্ষমতার ভিত্তিতে ভাগ করা হবে। প্রস্তাবিত প্রতিটি বিক্রি মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবেন। কঠোর যাচাই, তৃতীয় দেশে হস্তান্তরে নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর কাছে বিক্রিতে সাধারণ নিষেধাজ্ঞাসহ জাপানের তিনটি মূলনীতি বহাল থাকবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে হলে ব্যতিক্রম অনুমোদন করা হতে পারে বলে সরকার জানিয়েছে।
শান্তিবাদ থেকে অংশীদারত্ব
যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী অবস্থান থেকে ধাপে ধাপে সরে এসে জাপানের বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়। অস্ত্র রপ্তানিতে মূল সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ১৯৭৬ সালে। এর আগে ১৯৬৭ সালে কমিউনিস্ট দেশ, জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কয়েক দশক ধরে এসব বিধিনিষেধের ফলে জাপানি প্রতিরক্ষা নির্মাতারা কেবল জাপান আত্মরক্ষা বাহিনীর জন্যই সরঞ্জাম উৎপাদন করত।
২০১৪ সালে সরকার পাঁচটি নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রাণঘাতী নয়—এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির সীমিত ব্যতিক্রম চালু করে। এর আওতায় উদ্ধার হেলিকপ্টার, পরিবহন যান ও মাইন অপসারণ প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ ছিল; তবে যুদ্ধ অভিযানের জন্য তৈরি অস্ত্রব্যবস্থা রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় ছিল। সর্বশেষ সংস্কারে এই শ্রেণিভিত্তিক বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি প্রস্তাব আলাদাভাবে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রাণঘাতী সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এখন দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। সরঞ্জাম জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করার অঙ্গীকার করতে হবে গ্রহীতা দেশগুলোকে। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের পর সংসদকে রপ্তানি সিদ্ধান্ত জানানো হবে; আগে জানানো হতো অনুমোদনের আগে। বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা, এতে আইনসভার নজরদারি কমবে।
যোগ্য ১৭টি দেশ জাপানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার। এসব দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি রয়েছে, যেগুলোতে অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান সুরক্ষার শর্ত আছে। এই তালিকার বাইরে থাকা দেশগুলোও সংশোধিত কাঠামোর আওতায় প্রাণঘাতী নয়—এমন সরঞ্জাম পেতে পারে।
প্রথম ক্রেতারা
নতুন রপ্তানি সক্ষমতার সুবিধা নিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ইতিমধ্যে কেনাকাটার প্রস্তাব তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রথম দিকের সুবিধাভোগীদের মধ্যে ফিলিপাইন থাকতে পারে। জাপানি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ম্যানিলা জাপানের ব্যবহৃত যুদ্ধজাহাজ ও টিসি-৯০ নজরদারি বিমান কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই সরঞ্জাম হস্তান্তর দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইন নৌবাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করবে। সেখানে চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো এই নীতিগত পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে জাপানি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের তিনটি মূলনীতি এবং তা বাস্তবায়নের নির্দেশিকা পর্যালোচনার ফলকে জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগ স্বাগত জানায়। এর ফলে ফিলিপাইন সর্বোচ্চ মানের ও নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাবে। এসব সরঞ্জাম দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা জোরদার করবে এবং প্রতিরোধক্ষমতার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।
সামরিক কৌশলবিদদের ভাষায়, ফিলিপাইন প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে তাইওয়ান হয়ে মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই ভৌগোলিক বলয় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর প্রবেশ সীমিত করে। ফিলিপাইনের সামুদ্রিক সক্ষমতা জোরদার হলে জাপানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিপূরক হবে এবং বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধও শক্তিশালী হবে।
টোকিওর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কেনাকাটার চুক্তি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করেছে অস্ট্রেলিয়া। গত সপ্তাহে মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের কাছ থেকে উন্নত সংস্করণের তিনটি মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট কেনার চুক্তি সই করেছে দেশটি। যৌথভাবে আরও আটটি জাহাজ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রায় ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার কাঠামো তৈরি করেছে বলে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লস জানিয়েছেন। বিদ্যমান যৌথ উন্নয়ন বিধির আওতায় চুক্তিটি করা হয়েছে। তবে নতুন রপ্তানি বিধি ভবিষ্যতে লেনদেন এবং তৃতীয় দেশের কাছে বিক্রির জন্য সম্ভাব্য যৌথ উৎপাদনে সহায়তা করবে।
অস্ট্রেলিয়ার পথ অনুসরণ করে নৌবাহিনীর জন্য মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেটের একটি সংস্করণ কেনার কথা ভাবছে নিউজিল্যান্ড। তবে তৈরি অস্ত্র কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অংশীদারত্ব চুক্তিতে প্রথমে সই করতে হবে ওয়েলিংটনকে। জাপানি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইন্দোনেশিয়াও। এদিকে পোল্যান্ডসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের বাহিনী আধুনিক করার সুযোগ খতিয়ে দেখছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনৈতিক কম্পন
নীতিগত ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বাড়তে থাকা বিভাজন তুলে ধরে। চীন তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কারের নিন্দা জানায়। টোকিওর কৌশলগত গতিপথ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন।
চীন এ বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত সতর্ক থাকবে এবং নতুন ধরনের সামরিকবাদের পথে জাপানের যেকোনো বেপরোয়া পদক্ষেপের দৃঢ় বিরোধিতা করবে।
নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বলেছিলেন, জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন চীনা হামলা তাইওয়ানে হলে সামরিক জবাব দেওয়া হতে পারে। এরপর থেকেই বেইজিংয়ের সমালোচনা জাপান-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির প্রতিফলন। তাকাইচি প্রশাসনের বিরুদ্ধে চীনা কূটনীতিকেরা ক্রমেই আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন। তার সংস্কার কর্মসূচিকে হেয় করতে চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে এতে অনিচ্ছাকৃতভাবে দেশের ভেতরে তাকাইচির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, জাপানের ঐতিহ্যবাহী মিত্ররা রপ্তানি উদারীকরণকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জর্জ গ্লাস এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি জাপান-যুক্তরাষ্ট্র জোটের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় সম্মিলিত সক্ষমতা জোরদার করবে।
টোকিওতে জার্মানির রাষ্ট্রদূত পেত্রা সিগমুন্ডও সংস্কারের প্রশংসা করে বলেন, বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা জোরদারের লক্ষ্যে এটি আরও গভীর সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে। ওয়াশিংটন ও বার্লিনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়, কর্তৃত্ববাদী সম্প্রসারণ ঠেকাতে প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা এবং পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে চাপে পড়া প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার বৃহত্তর পশ্চিমা প্রচেষ্টার সঙ্গে জাপানের এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য রয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনরুজ্জীবন
ভূরাজনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি, এই রপ্তানি সংস্কার জাপানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতের জরুরি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও মেটাতে পারে। কয়েক দশক ধরে মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ, কাওয়াসাকি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ও মিতসুবিশি ইলেকট্রিকের মতো ঠিকাদাররা উন্নত সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা প্রায় একচেটিয়াভাবে জাপান আত্মরক্ষা বাহিনীর জন্য তৈরি করেছে। একক ক্রেতার ওপর নির্ভরতায় উৎপাদন অদক্ষ হয়েছে, প্রতিটি সরঞ্জামের খরচ বেড়েছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত থেকেছে। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংকট দেখা দিলে এই সক্ষমতা অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারত।
র্যান্ড করপোরেশনের জাপানি নিরাপত্তানীতি বিশেষজ্ঞ জেফ্রি হর্নাং বলেন, কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরতায় পুরো শিল্পজুড়ে খরচ ও পরিচালনাগত অদক্ষতা বেড়েছে।
বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে তারা ব্যাপক উৎপাদনের সুবিধা পেতে এবং জাপানের শিল্পভিত্তিতে, বিশেষ করে ছোট কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে, নতুন প্রাণ সঞ্চারের আশা করছে।
রপ্তানি বাড়লে দেশের ভেতরে কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রতিটি সরঞ্জামের খরচ কমার কথা। একই সঙ্গে জরুরি অবস্থায় জাপান দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে। নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের সম্ভাবনায় বড় ঠিকাদাররা ইতিমধ্যে রপ্তানি বিভাগ সম্প্রসারণ করতে শুরু করেছে। তারা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রত্যাশা করছে, যার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হবে এবং ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
তাকুশোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেইগো সাতো বলেন, শান্তিকালেই মিত্রদের মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহজে বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তুললে যুদ্ধের প্রস্তুতি বাড়ে এবং অপ্রত্যাশিত সংঘাতে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এই দ্বিমুখী বিনিময়ে অস্ত্রবাণিজ্য নিছক বাণিজ্যিক লেনদেন না থেকে পারস্পরিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তার একটি ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
একই সঙ্গে টোকিও নজিরবিহীন সামরিক আধুনিকীকরণ করছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশে বাড়ানো হয়েছে; ২০২৬ সালের নিরাপত্তা কৌশল হালনাগাদের সময় আরও বাড়তে পারে। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি মোতায়েনের লক্ষ্যে জাপান যুক্তরাজ্য ও ইতালির সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। উন্নয়ন ব্যয় ভাগাভাগি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার পাওয়াই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। রপ্তানি সংস্কার এসব প্রচেষ্টার পরিপূরক, কারণ এর ফলে জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্প দেশের পুনরায় অস্ত্রসজ্জা এবং মিত্রদের কেনাকাটা—দুই প্রয়োজন মেটানোর মতো উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে।
সাংবিধানিক সন্ধিক্ষণ
কৌশলগত যুক্তি থাকলেও, রপ্তানি সংস্কারের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। এর পেছনে রয়েছে শান্তিবাদী নীতির প্রতি দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে পরিচালিত মার্চের এক জরিপে দেখা যায়, জাপানের ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধ শিথিল করার বিরোধী। পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন মাত্র ৩২ শতাংশ। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি কঠোর শান্তিবাদের জন্য দেশের গর্বিত ইতিহাস ক্ষয় করছেন এবং সার্বভৌম অধিকার হিসেবে যুদ্ধ পরিত্যাগের ঘোষণা দেওয়া সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদের চেতনা লঙ্ঘন করছেন।
প্রবীণ শান্তিকর্মী কোজি সুগিহারা সতর্ক করে বলেন, এই নীতিগত পরিবর্তন ঐতিহাসিক এক বাঁক, যার কূটনৈতিক পরিণতি হতে পারে।
মানুষ চায় না জাপানে তৈরি পণ্য বিদেশে মানুষ হত্যায় ব্যবহৃত হোক। শান্তিবাদী দেশ হিসেবে জাপানের সুনাম ঐতিহাসিকভাবে তার কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ককে সহায়তা করেছে।
নতুন রপ্তানি ব্যবস্থার প্রক্রিয়াগত দিকগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলো আপত্তি তুলেছে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর সংসদকে শুধু জানানো হবে—এই কর্তৃত্ব নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে। তাকাইচির কঠোর অবস্থান এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর কারণে জাপান বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ জানিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে।
সংস্কারের অর্থ শান্তিবাদী মূল্যবোধ ত্যাগ নয়—এ আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি।
যুদ্ধের পর ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে আমরা যে পথ ও মৌলিক নীতি অনুসরণ করে এসেছি, তা বজায় রাখার অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন নেই। নতুন ব্যবস্থায় সরঞ্জাম হস্তান্তর কৌশলগতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি, তা অনুমোদনযোগ্য কি না—সে বিষয়ে আরও কঠোর ও সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরঞ্জাম ব্যবহার করার অঙ্গীকার করেছে—এমন দেশগুলোর মধ্যেই রপ্তানি সীমিত থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তার অসাধারণ পরিস্থিতি ছাড়া সক্রিয় সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে।
কৌশলগত হিসাব-নিকাশ
জাপানের রপ্তানি উদারীকরণের সময়টি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তাকাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলা বৈশ্বিক চাপের সঙ্গে মিলে গেছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কমেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে জাপানি নির্মাতারা এমন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন সরবরাহকারীদের আধিপত্য ছিল। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত মিত্ররা বিকল্প কেনাকাটার পথ খুঁজছে।
চীনের আঞ্চলিক প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় জাপানকে আরও শক্তিশালী ভূমিকায় নেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে এই নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেনা প্রবেশাধিকার এবং সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা চুক্তির মাধ্যমে ম্যানিলার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা গভীর করেছে টোকিও। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোতে সামরিক অ্যাটাশে নেটওয়ার্ক এবং আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সহায়তা সম্প্রসারণ করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমির অধীনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা দপ্তর প্রতিষ্ঠা থেকে বোঝা যায়, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যবর্তী উত্তর-দক্ষিণ গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে থাকা অঞ্চলে চীনের তৎপরতার ঝুঁকিকে টোকিও কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
জাপানের বিস্তৃত নিরাপত্তা দায়িত্বে এখন অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনও যুক্ত। সমসাময়িক কৌশলগত প্রতিযোগিতায় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নীতির মেলবন্ধন এর মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। রপ্তানি সংস্কার তাকাইচির সমন্বিত নিরাপত্তা সংস্কারের একটি অংশ মাত্র। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল, জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি হালনাগাদ নিয়ে আরও ঘোষণা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মৌলিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান। দুই দেশের বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বকে বাস্তব রূপ দেবে এই রপ্তানি সংস্কার। এপ্রিলের শেষ দিকে বা মে মাসের শুরুতে হতে পারে সফরটি। সেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক জোটের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে, যা জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।
যা জানা প্রয়োজন
- ২১ এপ্রিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিরক্ষা রপ্তানি বিধির সবচেয়ে বড় সংস্কারে অনুমোদন দিয়েছে জাপান। ২০১৪ সাল থেকে পাঁচটি প্রাণঘাতী নয়—এমন শ্রেণিতে সীমিত রপ্তানির বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে।
- প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে—এমন ১৭টি দেশে যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানসহ প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির সুযোগ দেবে এই সংস্কার। দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফিলিপাইন রয়েছে।
- প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো দেশ একা নিজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না, তাই এই পরিবর্তন প্রয়োজন।
- প্রথম দিকের ক্রেতাদের মধ্যে ফিলিপাইন থাকতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরে টহল জোরদার করতে দেশটি জাপানের ব্যবহৃত যুদ্ধজাহাজ ও নজরদারি বিমান কিনতে পারে।
- মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের কাছ থেকে ১১টি মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট কেনার জন্য ৭০০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে অস্ট্রেলিয়া।
- নতুন ধরনের সামরিকবাদের দিকে বেপরোয়া পদক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক করে নীতিগত পরিবর্তনের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে চীন।
- সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা জোরদারে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি।
- কঠোর যাচাই, তৃতীয় দেশে হস্তান্তরে নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর কাছে বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা—জাপানের এই তিনটি মূলনীতি বহাল থাকবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যতিক্রম হতে পারে।
- দেশের ভেতরে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা রয়েছে। এনএইচকের জরিপ অনুযায়ী, জাপানের ৫৩ শতাংশ নাগরিক এই পদক্ষেপের বিরোধী।
- ব্যাপক উৎপাদনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে খরচ কমানো এবং সম্ভাব্য সংকটের জন্য উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করাই এ সংস্কারের লক্ষ্য। এতে জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনরুজ্জীবিত হবে এবং দেশের ভেতরে সরঞ্জাম কেনার খরচ কমবে।






