বাষ্পযুগের অবসান?
প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্ভর করেছে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে অপরিবর্তিত এক সহজ নীতির ওপর: পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা, টারবাইন ঘোরানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। বর্তমানে বিশ্বে মোট বিদ্যুতের ৮০ শতাংশ উৎপাদনে এই র্যাঙ্কিন সাইকেল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চীন বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই-অক্সাইড বিদ্যুৎ জেনারেটর, চাওতান ওয়ান চালু করে এই দীর্ঘদিনের ধারায় পরিবর্তন আনে। গুইঝৌ প্রদেশের লিউপাংশুইয়ের একটি ইস্পাত কারখানায় স্থাপিত কেন্দ্রটি শিল্পকারখানার বর্জ্য তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে সুপারক্রিটিক্যাল অবস্থায় সংকুচিত কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার শুরু করে। এতে দক্ষতা এতটাই বেড়েছে যে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের মৌলিক অর্থনীতিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সূচিপত্র
শৌগাং শুইচেং আয়রন অ্যান্ড স্টিল কারখানার গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থাটিতে রয়েছে ১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট, মোট ক্ষমতা ৩০ মেগাওয়াট। আগে বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া সিন্টার প্রক্রিয়ার বর্জ্য তাপ কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রটি বছরে ৭ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। একই সঙ্গে ইস্পাত কারখানার আয় বছরে প্রায় ৩ কোটি ইউয়ান (প্রায় ৪২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার) বাড়ায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কেন্দ্র নির্মাণের বদলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামোকে নতুন প্রযুক্তির উপযোগী করে তোলার পথ দেখিয়েছে এই উদ্ভাবন। বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় এটি একটি বড় সুবিধা।
সুপারক্রিটিক্যাল CO2 যেভাবে সবকিছু বদলে দিচ্ছে
সুপারক্রিটিক্যাল CO2 তরল ও গ্যাসের মধ্যবর্তী এক হাইব্রিড অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং চাপ ৭৩ বায়ুমণ্ডল ছাড়ালে এই অবস্থা তৈরি হয়, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০ মিটার গভীরতার সমান। এই অবস্থায় CO2 তরলের মতো ঘনত্ব বজায় রাখে, আবার গ্যাসের মতো প্রবাহিত হয়। ফলে বাষ্পের তুলনায় বেশি শক্তিতে এবং অনেক কম ঘর্ষণে টারবাইন চালাতে পারে। প্রযুক্তিটি প্রচলিত র্যাঙ্কিন সাইকেলের বদলে ব্রেটন সাইকেল ব্যবহার করে। র্যাঙ্কিন সাইকেলে তাপশক্তির প্রায় ৩৩ শতাংশ বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়, আর ব্রেটন সাইকেলের তাত্ত্বিক দক্ষতা ৫০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
বাষ্প ব্যবস্থার বিপরীতে, sCO2 ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদ্ধ চক্রে চলে। এতে কার্যকরী তরলটি অবিরাম পুনর্ব্যবহৃত হয়, বায়ুমণ্ডলে কিছু ছাড়তে হয় না এবং পানি-ভিত্তিক শীতলীকরণ ব্যবস্থারও প্রয়োজন পড়ে না। পানিবিহীন এই পরিচালনব্যবস্থা বিশেষত শুষ্ক অঞ্চলে মূল্যবান, যেখানে প্রচলিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। একই ক্ষমতার বাষ্প ব্যবস্থার তুলনায় এর নকশায় প্রয়োজনীয় মেঝের জায়গা ৫০ শতাংশ কম। সরল কাঠামোয় সহায়ক যন্ত্রাংশও কম লাগে এবং ব্যবস্থা দ্রুত সাড়া দিতে পারে।
চীনের নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী এবং চাওতান ওয়ানের প্রধান নকশাবিদ হুয়াং ইয়ানপিং একটি জীবন্ত উপমা দিয়ে তাপগতীয় সুবিধাটি ব্যাখ্যা করেছেন।
এটা যেন একজন শক্তিশালী মানুষ লুব্রিকেটিং তেল মাখানো সাইকেলে চড়ে অনায়াসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
বদ্ধ-চক্রের নকশাটি আধুনিক জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাগুলো মোকাবিলা করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০৩০ সালের মধ্যে এআই স্থাপনাগুলো চালাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা আনুমানিক ১৬৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াই দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন চালু করার সুযোগ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রযুক্তি মাঝারি তাপমাত্রার বর্জ্য তাপের উৎস থেকে শক্তি কাজে লাগায়, যা থেকে আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অলাভজনক মনে করা হতো।
১৭ বছরের সাধনার ফল
চাওতান ওয়ানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়া চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের অধীন চীনের নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইনস্টিটিউটের ২০০৯ সালে শুরু করা গবেষণা কর্মসূচির পরিণতি। এই উন্নয়নের পথে এমন কিছু মৌলিক প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জের সমাধান করতে হয়েছে, যেগুলোর কারণে ১৯৪৮ সালে ধারণাটি প্রথম প্রস্তাবের পর থেকে আন্তর্জাতিক অগ্রগতি থমকে ছিল। এ সাফল্যের কেন্দ্রে ছিল প্রায় এক মিলিমিটার ব্যাসের সূক্ষ্ম চ্যানেলযুক্ত মাইক্রোচ্যানেল হিট এক্সচেঞ্জার তৈরি, যা সুপারক্রিটিক্যাল চাপে কার্যকরভাবে তাপ স্থানান্তরের জন্য দরকার।
উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ভ্যাকুয়াম ডিফিউশন ওয়েল্ডিংয়ে নতুনত্ব আনতে হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ধাতব পাত গলিয়ে না দিয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে জোড়া লাগানো হয়। বিদেশি সরবরাহকারীরা প্রযুক্তিটি রপ্তানিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কঠোর বিধিনিষেধসহ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের তালিকায় রাখে। এরপর হুয়াংয়ের দল ৮২৯ দিন ধরে নিবিড় গবেষণা চালায়। ২৭ দফা অপ্টিমাইজেশনে তারা ওয়েল্ডিংয়ের ২১৮টি ভিন্ন পরামিতি পরীক্ষা করে। সাফল্য আসার আগে ব্যর্থ পরীক্ষার নমুনায় গুদামের অর্ধেক ভরে গিয়েছিল। ২০২১ সালের এক শীতল সকালে প্রক্রিয়াটির ৪৯তম পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত জোড় তৈরি হয়। পরীক্ষাগারের মনিটরিং পর্দায় স্থিতিশীল সবুজ রেখা দেখে তা নিশ্চিত করা হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা ছিল সিল করার প্রযুক্তি। প্রচলিত ধারণা ছিল, উচ্চচাপে ঘূর্ণায়মান শ্যাফট থেকে লিকেজের ঝুঁকির কারণে মেগাওয়াট-ক্ষমতার sCO2 টারবাইন তৈরি অসম্ভব। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা হুয়াংকে ১০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার ইউনিট তৈরির চেষ্টা না করার পরামর্শ দেন; তাদের কাছে মেগাওয়াট-ক্ষমতার ব্যবস্থা ছিল অসম্ভব এক লক্ষ্য। দমে না গিয়ে দলটি বিভিন্ন সিলিং পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে এবং সুপারক্রিটিক্যাল CO2-এর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ড্রাই গ্যাস সিল ব্যবস্থা তৈরি করে। এর মাধ্যমে sCO2 টার্বোমেশিনারির জন্য বিশ্বের প্রথম সফল মেগাওয়াট-স্তরের ড্রাই গ্যাস সিল বাস্তবায়ন করা হয়।
গ্রিডে যুক্ত হতে চীন কেন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেল
২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর চীন গ্রিড-সংযোগ উদ্যাপন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের স্যান্ডিয়া ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিজে সুপারক্রিটিক্যাল ট্রান্সফরমেশনাল ইলেকট্রিক পাওয়ার (STEP) কর্মসূচির আওতায় একই ধরনের প্রযুক্তির পরীক্ষা চলছে। বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে পরীক্ষাগারে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের ওপর জোর দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০২২ সালের এপ্রিলে sCO2 ব্যবহার করে স্যান্ডিয়া ৫০ মিনিটের জন্য গ্রিডে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থায় ক্ষমতা বাড়িয়ে ৪ মেগাওয়াটে নেওয়া হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিকভাবে চালুর লক্ষ্য এখনো ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি।
এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে উদ্ভাবনের ভিন্ন দর্শন। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা প্রযুক্তির পরিসর বাড়ানোর আগে সব তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান এবং উপকরণের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ বিশ্লেষণে অগ্রাধিকার দেন। এ কাজে ব্যাপক ক্ষয়-পরীক্ষা এবং সংকর ধাতুর যোগ্যতা যাচাইয়ের কর্মসূচি নেওয়া হয়। চীনের উন্নয়নপদ্ধতি বেশি বাস্তববাদী; দেশটিতে একে বলা হয় ‘পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে নদী পার হওয়া’। এই পদ্ধতিতে আগে নির্মাণ ও চালু করা হয়, তারপর পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ সামনে এলে ধাপে ধাপে সমাধান করা হয়। এ কৌশলে দ্রুত প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তুলনামূলক সতর্ক উন্নয়নপদ্ধতিতে এসব অনিশ্চয়তা কমানোর চেষ্টা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ ২০১৭ সালে সুপারক্রিটিক্যাল CO2 বিদ্যুৎ উৎপাদনকে কৌশলগত সীমান্তপ্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০১৮ সালে এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ একে শীর্ষ ১০টি যুগান্তকারী প্রযুক্তির মধ্যে রাখে। প্রথম দিকে এমন স্বীকৃতি পাওয়া সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সতর্কতা এবং ঝুঁকি ব্যাপকভাবে কমানোর ওপর জোর দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক ব্যবহার পিছিয়ে গেছে।
বর্জ্য তাপকে আয়ে রূপান্তর
মাঝারি তাপমাত্রার তাপের উৎস থেকে ছোট ও মাঝারি পরিসরে শক্তি আহরণের দীর্ঘদিনের বাধা কাটাতে চাওতান ওয়ান স্থাপনাটি তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রার নিচে বর্জ্য তাপ কাজে লাগাতে প্রচলিত বাষ্প ব্যবস্থা প্রায়ই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় না; ফলে বিপুল শক্তি অব্যবহৃত থেকে যায়। sCO2 সাইকেলের উন্নত তাপগতীয় কার্যকারিতা এমন শক্তি আহরণ করে, যা নইলে অপচয় হতো। পুরো স্থাপনা নতুন করে তৈরি না করেই ভারী শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ এটি।
ইস্পাত কারখানাটিতে এই ব্যবস্থা সিন্টারিং প্রক্রিয়ার অবশিষ্ট তাপ কাজে লাগায়। এ প্রক্রিয়ায় লোহা আকরিকের সূক্ষ্ম কণাগুলো ব্লাস্ট ফার্নেসে দেওয়ার আগে উত্তপ্ত করা হয়। আগে এই তাপ অপচয় হতো। স্থাপনাটি দেখিয়েছে, প্রচলিত বর্জ্য-তাপভিত্তিক বাষ্প প্রযুক্তির তুলনায় সুপারক্রিটিক্যাল CO2 জেনারেটর ৮৫ শতাংশ বেশি দক্ষতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং নিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০ শতাংশ বাড়াতে পারে, অথচ জায়গা লাগে অর্ধেক।
তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভের বাইরেও, শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রযুক্তিটি চীনের দ্বৈত কার্বন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে পানির সংকট প্রায়ই শিল্প সম্প্রসারণ সীমিত করে। তাই পানির ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দিতে পারার বিশেষ মূল্য রয়েছে। বাষ্পকেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ শীতলীকরণ পানি লাগে, কিন্তু বদ্ধ-চক্রের sCO2 ব্যবস্থা শুষ্ক পরিবেশেও কার্যকরভাবে চলে। ফলে যেসব অঞ্চলে বর্জ্য তাপ থেকে শক্তি আহরণ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, তার ভৌগোলিক পরিসর বাড়ে।
স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
এই অর্জন সত্ত্বেও স্বাধীন বিশ্লেষকেরা প্রাথমিক কার্যকারিতার পরিসংখ্যান অন্ধভাবে মেনে না নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছেন। ক্লিনটেকনিকার বিশ্লেষক মাইকেল বার্নার্ডের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে চাওতান ওয়ানের কার্যকারিতায় পরিমাপযোগ্য অবনতি ঘটার সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ। ২০০ বায়ুমণ্ডল চাপ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় চলা সুপারক্রিটিক্যাল CO2 ব্যবস্থায় পরস্পর-সম্পর্কিত কয়েকটি সম্ভাব্য ত্রুটির ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
নির্ভুল হিট এক্সচেঞ্জারে ডিফিউশন বন্ডিং ব্যবহার করে এমন মাইক্রোচ্যানেল তৈরি করা হয়, যা চরম চাপ সহ্য করতে পারে। জোড়া লাগানো সংযোগস্থলে ক্ষয় শুরু হলে তা মেরামত কার্যত অসম্ভব, ফলে পুরো ইউনিট বদলাতে হয়। সুপারক্রিটিক্যাল অবস্থায় কার্বন ইস্পাতের সংকর ধাতুর ভেতরে প্রবেশ করলে কার্বুরাইজেশন ঘটে। এতে উপকরণ ভঙ্গুর হতে পারে এবং চ্যানেলের ভেতরের পৃষ্ঠের মসৃণতা বদলে যেতে পারে। এর ফলে চাপ কমে যায় এবং সময়ের সঙ্গে সাইকেলের দক্ষতা হ্রাস পায়; চালুর সময় দাবি করা ৮৫ শতাংশ দক্ষতার সুবিধাও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
সিলের অখণ্ডতাও আরেকটি দুর্বল দিক। হাইড্রোজেনের মতো আকারে ছোট ও সহজে চলাচল করতে পারে এমন উচ্চচাপের CO2 অণুকে ঘূর্ণায়মান শ্যাফট ও ফ্ল্যাঞ্জে পুরোপুরি আটকে রাখতে হয়; এসব যন্ত্রাংশ তাপীয় ও যান্ত্রিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। হাইড্রোজেন রিফুয়েলিং স্টেশনের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সিল নষ্ট হওয়ার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ পরিষেবা ব্যাহত হয়। এ থেকে বোঝা যায়, একটানা কয়েক বছর নিখুঁত সিল অক্ষত থাকবে বলে আশা করা অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে। সামান্য লিক হলেও কার্যকরী তরলের পরিমাণ বদলে যায়, কম্প্রেসর সর্বোত্তম পরিচালন অবস্থান থেকে সরে যায় এবং নিজস্ব শক্তি খরচ বেড়ে যায়।
শিল্পকারখানার দূষণ এসব ঝুঁকি বাড়ায়। ইস্পাত কারখানার নির্গত গ্যাসে থাকা কণা, ধাতব অক্সাইড ও সালফার যৌগ তাপ স্থানান্তরের পৃষ্ঠে জমে কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমায়, অনেকটা চুনের আস্তরণ জমার মতো। বার্নার্ডের অনুমান, এই শিল্প পরিবেশে দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ময়লা জমার কারণে কার্যকারিতা কমার সম্ভাবনা ৬০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ভেতরের CO2 চক্র অক্ষত থাকলেও এতে টারবাইনে প্রবেশের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে।
ইস্পাতের বাইরেও: পরবর্তী সম্ভাবনাগুলো
গলিত লবণের শক্তি সঞ্চয়ব্যবস্থার সঙ্গে সুপারক্রিটিক্যাল CO2 প্রযুক্তি যুক্ত করে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে সিএনএনসি। ২০২৮ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য রয়েছে। এই সমন্বিত পদ্ধতিতে গলিত লবণে তাপশক্তি সঞ্চয় করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনিয়মিত সরবরাহের সমস্যা মোকাবিলা করা হবে। চাহিদা সর্বোচ্চ হলে দক্ষ sCO2 সাইকেলের মাধ্যমে সেই তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে। চীনের প্রথম-ধরনের প্রধান জ্বালানি সরঞ্জামের পঞ্চম দফা তালিকায় প্রকল্পটি স্থান পেয়েছে।
ঘনীভূত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গেও এ প্রযুক্তির সামঞ্জস্য আরেকটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র। সৌর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপন্ন উচ্চ তাপমাত্রা sCO2 ব্রেটন সাইকেলের জন্য আদর্শ; এতে বর্তমান বাষ্পভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে বেশি দক্ষতায় বিদ্যুৎ রূপান্তর করা সম্ভব হতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতেও এর সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর এবং উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস-শীতলীকৃত ব্যবস্থাসহ উন্নত চুল্লির নকশায় কমপ্যাক্ট টার্বোমেশিনারি সুবিধা দিতে পারে।
হুয়াং ইয়ানপিং জ্বালানি সঞ্চয়, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার এবং শিল্পে বাষ্প সরবরাহসহ আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির ব্যবহার কল্পনা করছেন। এ উদ্ভাবন বিশেষভাবে মাঝারি আকারের তাপের উৎসকে লক্ষ্য করে, যেগুলো থেকে দক্ষতার সঙ্গে শক্তি রূপান্তর করা ঐতিহাসিকভাবে কঠিন ছিল। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য আগে অলাভজনক মনে করা বাজারগুলোও উন্মুক্ত হতে পারে। আগামী বছরগুলোতে প্রযুক্তিটি টেকসই প্রমাণিত হলে বিশ্বজুড়ে বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমানোর অর্থনীতি মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক সুপারক্রিটিক্যাল CO2 বিদ্যুৎ জেনারেটর চাওতান ওয়ান ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চীনের গুইঝৌ প্রদেশে চালু হয়
- ৩০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি ইস্পাত কারখানার বর্জ্য তাপ কাজে লাগিয়ে প্রচলিত বাষ্প ব্যবস্থার তুলনায় ৮৫% বেশি দক্ষতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে
- সুপারক্রিটিক্যাল CO2 ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ও ৭৩ বায়ুমণ্ডলের বেশি চাপে কাজ করে; এতে তরলের মতো ঘনত্ব এবং গ্যাসের মতো প্রবাহের বৈশিষ্ট্য থাকে
- ভ্যাকুয়াম ডিফিউশন ওয়েল্ডিং এবং মেগাওয়াট-স্তরের ড্রাই গ্যাস সিল প্রযুক্তিতে সাফল্যসহ এর উন্নয়নে ১৭ বছরের গবেষণা লেগেছে
- বদ্ধ-চক্রের ব্যবস্থাটিতে শীতলীকরণের জন্য পানি লাগে না এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণ ছাড়াই বিদ্যমান শিল্পকারখানায় বসানো যায়
- বিশ্লেষকদের সতর্কতা, হিট এক্সচেঞ্জারের ক্ষয়, সিলের লিকেজ এবং শিল্প দূষণের কারণে ২-৫ বছরের মধ্যে কার্যকারিতা কমার সম্ভাবনা ৪০-৭০%
- যুক্তরাষ্ট্র STEP কর্মসূচির মাধ্যমে একই ধরনের প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে; ২০৩০-এর দশকে বাণিজ্যিকভাবে চালুর লক্ষ্য রয়েছে
- ভবিষ্যৎ ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে গলিত লবণের শক্তি সঞ্চয়, ঘনীভূত সৌরবিদ্যুৎ এবং উন্নত পারমাণবিক চুল্লির সঙ্গে সংযুক্তি






