রোবট কফি পরিবেশন করছে, সূচিত হচ্ছে বিপ্লব
চীনের ১৩৯তম আমদানি ও রপ্তানি মেলায় আগ্রহী দর্শনার্থীদের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালে অর্থনৈতিক রূপান্তরের কয়েক দশককে ধারণ করা একটি মুহূর্ত চোখে পড়ে। দর্শনার্থীরা ৩০ মিটার দীর্ঘ সারিতে, তিন সারি গভীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন—প্রচলিত ভোগ্যপণ্যের জন্য নয়, বরং হিউম্যানয়েড রোবটের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলার সুযোগ পেতে। ১৫ এপ্রিল গুয়াংজুতে শুরু হওয়া ক্যান্টন মেলার এই দৃশ্য বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যার প্রভাব প্রদর্শনী হলের সীমানারও অনেক বাইরে বিস্তৃত।
সূচিপত্র
১৩৯তম অধিবেশনটি চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০) পর্বের প্রথম আয়োজন, আর শুরু থেকেই এতে প্রযুক্তির সর্বব্যাপী আবহ। প্রদর্শনীর অবিসংবাদিত আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সেবা রোবট। Ti5 Robot-এর তৈরি একটি হিউম্যানয়েড রোবট প্রতিদিন ৭,০০০ বারের বেশি বিশ্বজুড়ে আসা ক্রেতাদের দিকে হাত নাড়ে। অন্যদিকে, সর্বশেষ উদ্ভাবন চেখে দেখতে ছুটে আসা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য COFE+ রোবোটিক কফি মেকার প্রতিদিন প্রায় ৮০০ কাপ কফি তৈরি করে। ডোবট রোবটের কাছ থেকে আইসক্রিম পাওয়ার অপেক্ষায় অনেক দর্শনার্থী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন বা নিজেদের অভিজ্ঞতা সরাসরি সম্প্রচার করেন। এই মিথস্ক্রিয়াগুলো নিছক অভিনবত্বের বেশি কিছু; এগুলো চীনের উৎপাদন থেকে চীনের বুদ্ধিমান উৎপাদন, এবং শেষ পর্যন্ত চীনের উদ্ভাবনে পৌঁছানোর যাত্রার পূর্ণতার সংকেত দেয়।
বিবর্তনের তিন দশক
বর্তমান প্রদর্শনীর তাৎপর্য বুঝতে হলে সাম্প্রতিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোর সময়কালের বিবর্তন অনুসরণ করতে হবে। ১৩তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) সময় ক্যান্টন মেলায় আধিপত্য ছিল প্রচলিত হালকা শিল্পপণ্য এবং মৌলিক যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক পণ্যের। চীনের রপ্তানি সক্ষমতা মূলত বিপুল উৎপাদনমাত্রার ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রদর্শনীগুলো প্রযুক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের বদলে পণ্যের পরিমাণের মধ্য দিয়ে উৎপাদনশক্তি হিসেবে চীনের আত্মবিশ্বাস তুলে ধরত।
১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২১-২০২৫) সময়পর্ব শুরু হওয়ার পর ১২৯তম থেকে ১৩৮তম অধিবেশনে নতুন জ্বালানিচালিত যানবাহন (এনইভি), লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং ফটোভোলটাইক পণ্যের ‘নতুন ত্রয়ী’ দ্রুত কেন্দ্রস্থল দখল করে। পরিবেশবান্ধব, কম-কার্বন ও স্বনির্ভর প্রযুক্তি হয়ে ওঠে প্রধান বিষয়। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম চীনা ব্র্যান্ডের আবির্ভাব দেশের উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর, বুদ্ধিমান ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের পথে অগ্রযাত্রার সংকেত দেয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ১৩৩তম অধিবেশনে একটি চালকবিহীন হেলিকপ্টার প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের জন্য ‘অবশ্যদর্শনীয়’ হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ সরঞ্জাম ও বুদ্ধিমান এনইভির জন্য বিশেষায়িত নতুন প্রদর্শনী অঞ্চল খোলা হয়।
এখন, ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়পর্বে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশন হিসেবে ১৩৯তম ক্যান্টন মেলার কেন্দ্রস্থল পুরোপুরি নতুন রূপ পেয়েছে। আগের সময়ের হার্ডওয়্যার পণ্যের জায়গা নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টার্মিনাল, নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতির সরঞ্জাম, হিউম্যানয়েড রোবট, স্মার্ট পরিধেয় যন্ত্র এবং অন্যান্য অগ্রসর পণ্য। মেলায় দৃশ্যমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেখায়, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র উৎপাদনের পরিমাণ থেকে উদ্ভাবনে, আর অনুসরণ করা থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে চীনের ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন এটি।
রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণ ও বৈশ্বিক পরিসর
১৩৯তম অধিবেশনের ব্যাপ্তি নজিরবিহীন; প্রায় প্রতিটি সূচকেই এটি নতুন ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে। ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটারজুড়ে আয়োজিত মেলায় রয়েছে ৭৫,৭০০টি বুথ। অংশ নিচ্ছে ৩২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে ১১ হাজারেরও বেশি ‘লিটল জায়ান্ট’ প্রতিষ্ঠান। বিশেষায়িত ও অত্যাধুনিক এই প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের উৎপাদন উৎকর্ষ এবং উদ্ভাবন সক্ষমতার শীর্ষ অবস্থানকে তুলে ধরে। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি বিদেশি ক্রেতা মেলায় অংশ নিতে আগাম নিবন্ধন করেছেন। বড় বৈশ্বিক খুচরা বিক্রেতা গোষ্ঠীর ২৯০ জন শীর্ষ নেতা উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি।
চায়না ফরেন ট্রেড সেন্টারের প্রধান ঝু ইয়ংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সমন্বয় বাড়ানোর জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যান্টন মেলা বিকশিত হচ্ছে। মেলায় বিশেষায়িত প্রদর্শনী বিভাগের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭৯টি। স্মার্ট পরিধেয় যন্ত্র, ডিসপ্লে প্রযুক্তি, ভোক্তা ড্রোন, কৃষি ড্রোন এবং প্রিফ্যাব্রিকেটেড আবাসনের মতো অত্যাধুনিক খাতের জন্য নয়টি নতুন অঞ্চল এবারই প্রথম যুক্ত হয়েছে। এই সংযোজনগুলো উচ্চপ্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের রপ্তানির দিকে কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতিফলন। এর ফলে নতুন প্রজন্মের চীনা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি বৈশ্বিক মঞ্চে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে।
চীনা প্রদর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধরনেও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। বর্তমানে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ৬০ শতাংশ নিজস্ব স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড প্রদর্শন করছে, আর প্রায় ২০ শতাংশ বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রচলিত পণ্য বিক্রি থেকে ‘রপ্তানির সঙ্গে সেবা’ মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। এ মডেলে ২১০টি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে এআইভিত্তিক গুণমান যাচাই থেকে শুরু করে বুদ্ধিমান সরবরাহব্যবস্থা ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত চাহিদাভিত্তিক উচ্চপ্রযুক্তির সহায়তা দেওয়া হয়।
আকর্ষণের কেন্দ্রে বুদ্ধিমান যন্ত্র
মেলার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে সেবা রোবট প্রদর্শনী হল। বিপুল চাহিদার কারণে একই সময়ে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছেন আয়োজকেরা। প্রদর্শনীতে আতিথেয়তা থেকে শিল্পক্ষেত্র পর্যন্ত নানা ব্যবহারের প্রযুক্তি দেখানো হচ্ছে, যা তুলে ধরে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের মিথস্ক্রিয়াকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
Ti5 Robot-এর একটি হিউম্যানয়েড রোবট দর্শনার্থীদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলে ভিড় টানছে। দ্রুত এগিয়ে আসা শাটলককের প্রতি এটি এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। রোবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডিং বিভাগের প্রধান ওয়াং মেংদি প্রযুক্তিগত অর্জনটির ব্যাখ্যা দেন।
বহু ধাপের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রোবটটির কবজিতে একাধিক মাত্রায় নড়াচড়ার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, ফলে এটি মানুষের কবজির নড়াচড়া অনুকরণ করতে পারে,” বলেন ওয়াং মেংদি। “এটি ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ড ও উঁচুতে শট দিতে পারে, ফলে ব্যাডমিন্টনের উপযুক্ত ‘সঙ্গী’ হয়ে উঠেছে।
কাছেই COFE+ রোবোটিক কফি মেকার একটানা কাজ করছে, আর ডোবট রোবট দর্শনার্থীদের আইসক্রিম পরিবেশন করছে। দর্শনার্থীরা সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। ভোক্তাদের জন্য তৈরি এসব ব্যবহারিক প্রয়োগ বুদ্ধিমান রূপান্তরের একটি দিকমাত্র। নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতির প্রযুক্তির সমন্বয় তুলে ধরা এক প্রদর্শনীতে সৌদি আরবের ক্রেতা ওসামা ক্যান্টন মেলার মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মিল্ক টি অর্ডার করেন। কয়েক মিনিট পর কমলা রঙের ডেলিভারি বাক্স বহনকারী একটি ড্রোন নির্ধারিত সংগ্রহস্থলে অবতরণ করে। সেখানে একটি হিউম্যানয়েড রোবট পানীয়টি নিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেয়।
দারুণ! ড্রোনে পণ্য সরবরাহের অভিজ্ঞতা এটাই আমার প্রথম,” বলেন ওসামা। “এত বড় জায়গায় আমাকে লাইনে দাঁড়াতে বা ঘুরে বেড়াতে হয়নি। দ্রুত এবং একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।
অন্য ক্রেতারা বৈদ্যুতিক উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণক্ষম (ইভিটিওএল) উড়োজাহাজ দেখেছেন। ব্রাজিলের ক্রেতা হুয়ান ইউফেই এভিয়েশনের তৈরি অতি-হালকা ইভিটিওএল উড়ন্ত গাড়িটি পরীক্ষা করে দেখেন। পণ্যটির বহনক্ষমতা, গতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে খুঁটিয়ে জেনে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে নিজ দেশে এর বাজার সম্ভাবনা অনেক। এসব মিথস্ক্রিয়া দেখায়, ভৌত ও ডিজিটাল অবকাঠামোর সমন্বয়ে তৈরি নতুন প্রযুক্তিগুলোর পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে মেলা কীভাবে কাজ করছে।
ভোগ্যপণ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে শিল্পের গভীরে
ভোক্তামুখী রোবটগুলো যখন ভাইরাল হওয়ার মতো মুহূর্ত তৈরি করছে, তখন শিল্পপণ্যের প্রদর্শনী চীনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর গভীরতা তুলে ধরছে। টানা ৩১ বছর অংশ নেওয়া গ্রী ইলেকট্রিক ক্যান্টন মেলার ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী এলাকায় ১৩০টি পণ্য উপস্থাপন করেছে। এসব পণ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এআই, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি অথবা অন্যান্য অগ্রসর প্রযুক্তিসম্পন্ন।
প্রতিষ্ঠানটির SilenzX সিরিজের অতি-নীরব এয়ার কন্ডিশনার বাইরের ইউনিটের শব্দচাপ ২৯ ডেসিবেলে নামিয়ে আনে, যা শিল্পখাতের গড় ৪২ ডেসিবেলের তুলনায় অনেক কম। এর পেছনে রয়েছে ১৩৭টি উদ্ভাবন পেটেন্ট। গ্রী তাদের পণ্যের পুরো পরিসরে R290 পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট প্রযুক্তিও প্রয়োগ করেছে। তাদের ফটোভোলটাইক এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা অর্জন করেছে “শূন্য কার্বন নিঃসরণ, শূন্য বিদ্যুৎ বিল এবং শূন্য বর্জ্য”। GMV 9 সিরিজ মাইনাস ৩৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করে। মূল উপাদান থেকে শুরু করে সিস্টেম সমন্বয় পর্যন্ত প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পূর্ণ চিত্র এটি।
শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ হলগুলোতে নিম্ন-ভোল্টেজ সার্কিট ব্রেকারের বিবর্তন বুদ্ধিমান উৎপাদনের দিকে পরিবর্তন তুলে ধরে। প্রচলিত নিরাপত্তা সরঞ্জাম রূপান্তরিত হয়েছে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য তৈরি করা স্মার্ট নোডে। MAXGE ও CNC Electric-এর মতো নির্মাতারা এমন সমাধান এনেছে, যাতে সেন্সর দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কারেন্ট, ভোল্টেজ, তাপমাত্রা ও বিদ্যুতের গুণমান পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং পূর্বাভাসভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তথ্য ক্লাউডভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে পাঠানো হয়। এসব স্মার্ট ব্রেকার ত্রুটি নির্ণয়ে সময় কমাতে ও যন্ত্রপাতির আয়ু বাড়াতে পারে, পাশাপাশি মেরামতের খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমায়।
শিল্পপণ্যের প্রদর্শনীতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার চাপ মোকাবিলার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে রুপার দাম প্রতি আউন্স প্রায় ২৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের শুরুতে ১২০ ডলারের বেশি হয়েছে; তামার দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তায় আপস না করে ব্যয় সাশ্রয়ী থাকতে নির্মাতারা অ্যালুমিনিয়ামের বিকল্প উপাদান ও মডুলার নকশা গ্রহণ করছেন। কাঁচামালের দামের অস্থিরতার মধ্যেও চীনের শিল্প সরবরাহব্যবস্থার সহনশীলতার পরিচয় দেয় এই অভিযোজনক্ষমতা।
উৎপাদনশক্তি থেকে ব্র্যান্ড স্রষ্টা
‘মেড ইন চায়না’ থেকে ‘ক্রিয়েটেড ইন চায়না’য় উত্তরণের বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কয়েক দশকে ব্যবসার ধরন বদলে ফেলা স্বতন্ত্র প্রদর্শকদের গল্পে। প্রতিটি অধিবেশনে প্রথমবার অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত চীনের প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধিত্ব করে; তারা তুলে ধরে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও নতুন ধারণা। ১৩৯তম অধিবেশনে চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী মোটরসাইকেল নির্মাতা ZXMOTO দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ZXMOTO-এর বুথে অপেক্ষমাণ সিঙ্গাপুরের এক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির উত্থানে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
“কখনো ভাবিনি, একটি চীনা ব্র্যান্ড মোটরসাইকেলের বাজারে প্রবেশ করে বিশ্বের এক নম্বর হয়ে উঠতে পারে,” বলেন ওই ক্রেতা। তিনি সিঙ্গাপুর ও কম্বোডিয়ায় এজেন্সির অধিকার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানগুলোর গল্পেও সমানভাবে উঠে আসে অধ্যবসায় ও আত্মোন্নয়নের চিত্র। ক্যান্টন মেলার ৪০টি অধিবেশনে অংশ নেওয়া এক প্রদর্শক তাঁর প্রতিষ্ঠানের রূপান্তরের কথা জানান। বিশ বছর আগে তাঁর প্রতিষ্ঠান জার্মান ক্রেতাদের জন্য চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকারী হিসেবে ইস্ত্রি তৈরি করত। আজ সেই সাবেক জার্মান অংশীদাররাই তাঁর প্রতিষ্ঠানের স্মার্ট স্টিম ইস্ত্রি এবং এআইচালিত সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কফি মেশিনের একচেটিয়া ইউরোপীয় বিতরণস্বত্ব পেতে প্রতিযোগিতা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ২,৬০০টিরও বেশি পেটেন্ট অর্জন করেছে, যার ৪০০টির বেশি এখনো বৈধ। এসব পেটেন্টের অর্ধেকেরও বেশি উদ্ভাবন পেটেন্ট।
এই রূপান্তর বৃহত্তর এক প্রবণতার প্রতিফলন। বর্তমানে গ্রী-এর মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশ আসে নিজস্ব ব্র্যান্ড থেকে; বেল্ট অ্যান্ড রোডভুক্ত দেশগুলোতে এই হার ৮৫ শতাংশের বেশি। বিদেশে কার্যক্রম শুরু করা প্রথম দিকের চীনা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি নির্মাতাদের একটি গ্রী এখন ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে ব্যবসা করছে। সম্পূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত প্রবণতার সঙ্গে তাল মেলানোর সক্ষমতাসম্পন্ন এসব অভিজ্ঞ প্রদর্শক চীনা উৎপাদনের শক্ত ভিত অটুট রেখে সফলভাবে বুদ্ধিমান রূপান্তর সম্পন্ন করেছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলানো
বাণিজ্যে বিভাজন ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তনে চিহ্নিত জটিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশে ক্যান্টন মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবু এই আয়োজন উচ্চপর্যায়ের উন্মুক্ততা এবং দ্বিমুখী বাণিজ্যের প্রতি চীনের অব্যাহত অঙ্গীকার তুলে ধরে। চীনের শুল্ক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির পণ্যবাণিজ্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। রপ্তানি বেড়েছে ১১.৯ শতাংশ এবং আমদানি ১৯.৬ শতাংশ।
আমদানির এই প্রবৃদ্ধি চীনের ভোগের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা এবং ভোক্তাদের পরিবর্তিত পছন্দের প্রতিফলন। ২০২৬ সালের ১ মে থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন ৫৩টি আফ্রিকান দেশ থেকে আমদানিতে শূন্য শুল্ক আরোপ করছে দেশটি। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকে সহজ করে এবং মেলায় আমদানির জন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলে। ২০০৭ সালে ১০১তম অধিবেশনে প্রথমবার আমদানি বিভাগ চালু করেছিল ক্যান্টন মেলা।
ভোগের মানোন্নয়ন ও বাজার উন্মুক্ততার পারস্পরিক প্রভাব আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। চেচিয়াং প্রদেশের মতো অঞ্চলে পরিবারের আয় বাড়ছে। সেখানে ২০২৫ সালে মাথাপিছু ব্যবহারযোগ্য আয় ৭০,০০০ ইউয়ান (১০,২৬২ ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। ফলে উন্নত মানের পণ্য এবং আবেগনির্ভর ব্যয়ের অভিজ্ঞতার চাহিদাও বাড়ছে। ক্যান্টন মেলা এবং হাইনানে একই সময়ে অনুষ্ঠিত চায়না ইন্টারন্যাশনাল কনজিউমার প্রোডাক্টস এক্সপোর মতো আয়োজন এমন মঞ্চ তৈরি করছে, যেখানে “বিশ্বের কাছে বিক্রি” এবং “বিশ্ব থেকে কেনা”—দুইয়েরই সুযোগ রয়েছে।
অন্যত্র সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে এই মেলা কর্মকর্তাদের ভাষায় “সহাবস্থানমূলক বিশ্বায়ন”-এর প্রতীক, যা নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি কার্যকর বিকল্প দিচ্ছে। জার্মান গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কোম্পানি Severin ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেলায় অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে, বেল্ট অ্যান্ড রোড অংশীদার দেশ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার ক্রেতাদের কারণে নিবন্ধন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অংশগ্রহণের এই বৈচিত্র্য বৈশ্বিক বাণিজ্য মনোভাবের নির্দেশক হিসেবে মেলার ভূমিকা তুলে ধরে।
মূল কথা
- ১৩৯তম ক্যান্টন মেলা চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২৬-২০৩০) প্রথম আয়োজন। ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে এতে অংশ নিচ্ছে ৩২ হাজারের বেশি প্রদর্শক; আগাম নিবন্ধন করেছেন ২ লাখ ১০ হাজার বিদেশি ক্রেতা।
- প্রচলিত যন্ত্রপাতির বদলে হিউম্যানয়েড রোবট, এআই টার্মিনাল ও নিম্ন-উচ্চতার অর্থনীতির সরঞ্জাম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। Ti5 Robot ও COFE+-এর মতো সেবা রোবট বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী টানছে।
- মেলায় চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন থেকে নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলার কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রদর্শকদের ৬০ শতাংশ নিজস্ব ব্র্যান্ড উপস্থাপন করছে এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি ‘রপ্তানির সঙ্গে সেবা’ মডেল গ্রহণ করেছে।
- পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমান উৎপাদন প্রদর্শনীতে প্রাধান্য পাচ্ছে। গ্রী-র উপস্থাপিত ১৩০টি পণ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এআই বা জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিসম্পন্ন।
- আগের বছরের তুলনায় চীনের আমদানি ১৯.৬ শতাংশ বৃদ্ধি এবং ৫৩টি আফ্রিকান দেশের জন্য নতুন শূন্য-শুল্ক নীতি দ্বিমুখী বাণিজ্য ও ভোগের মানোন্নয়নের দিকে দেশটির অগ্রযাত্রা তুলে ধরে।
- ‘মেড ইন চায়না’ থেকে ‘ক্রিয়েটেড ইন চায়না’য় উত্তরণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তিন দশকের প্রতিফলন। উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতায় এই পরিবর্তন ঘটেছে।






