সেনানিবাস-রাষ্ট্রের অচলাবস্থা
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন ষষ্ঠ বছরে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধের নিষ্ঠুর পরিহাসগুলোর একটি হলো, পর্যাপ্ত সৈন্য নিয়োগে হিমশিম খাওয়া সেনাবাহিনীর সামরিক জান্তা বারবার যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক নিজেদের সেনাদের ওপরই বোমা হামলা চালিয়েছে। এই সেনানিবাস-রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী ও তার বেসামরিক ছদ্ম-সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে সবকিছুকেই যেন বিসর্জনযোগ্য মনে করা হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ব্যাপকভাবে বিতর্কিত নির্বাচনের পর সংঘাত কৌশলগত অচলাবস্থায় থিতু হয়েছে, যেখানে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল (এসএসি) বা জান্তাবিরোধী বিচিত্র জোট—কেউই নির্ণায়ক আঘাত হানতে পারছে না।
সূচিপত্র
পরিসংখ্যানে মুক্তির বদলে বিভক্তির চিত্রই ফুটে উঠেছে। সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মিয়ানমারের মাত্র ২১ শতাংশ ভূখণ্ড সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, আর বিদ্রোহী বাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দখলে ৪২ শতাংশ। তবে এই ভৌগোলিক সুবিধার আড়ালে রয়েছে নির্মম বাস্তবতা। অর্থনৈতিক কেন্দ্র ইয়াঙ্গুন ও রাজনৈতিক রাজধানী নেপিডোসহ অধিকাংশ বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ জান্তার হাতে; অন্যদিকে প্রতিরোধ বাহিনী বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকায় প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, আর ৩০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
নোবেলজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের শুরু। ২০২০ সালের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে সেনাবাহিনী, তবে এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। সামরিক বাহিনীর কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন মেনে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কেবল বাহ্যিক গণতান্ত্রিক আবরণ তৈরি করে আগের মতো কাজ চালিয়ে যাওয়া। রাষ্ট্রে তাদের গভীরভাবে প্রোথিত ভূমিকার বিরুদ্ধে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ আসবে, তা তারা আঁচ করতে পারেনি। সংবিধানেই যেকোনো সময় বেসামরিক সরকার অপসারণের ক্ষমতা তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
অপারেশন ১০২৭ ও পালাবদলের স্রোত
২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) নিয়ে গঠিত থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স (৩বিটিএ) অপারেশন ১০২৭ শুরু করে। শান রাজ্যে সমন্বিত এই অভিযানে চীন-সীমান্তবর্তী উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড দখল হয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ১৮০টির বেশি সামরিক চৌকি কবজায় আসে এবং সারা দেশে অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীও ধারাবাহিক হামলা শুরু করে।
অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বাজার থেকে সংগ্রহ করা ড্রোনসহ উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত ৩বিটিএ বাহিনী নজিরবিহীন সমন্বয়ের পরিচয় দেয়। তাদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ) এবং অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন সমন্বিত অভিযান শুরু করে, যা সাময়িকভাবে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দেয়।
তবে এই বিজয় ছিল আংশিক এবং উল্টে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। সীমান্তে চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার প্রতারণার কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে চীন প্রথমে নীরব সমর্থন দিলেও, পরে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বেইজিং যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করে এবং কৌশলগত শহর লাশিওর নিয়ন্ত্রণ জান্তার কাছে ফিরিয়ে দিতে এমএনডিএএর ওপর চাপ দেয়। এতে বোঝা যায়, বড় শক্তির ধারাবাহিক সমর্থন ছাড়া জাতিগত প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জান্তা সীমিতভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চীন ও রাশিয়ার সরবরাহ করা উড়োজাহাজ দিয়ে লাগাতার বিমান হামলা, নতুন ড্রোন সক্ষমতা এবং নিয়োগ করা পদাতিক বাহিনীর ঢেউ মিলিয়ে সামরিক বাহিনী উত্তর শান রাজ্যের কিয়াউকমে, হিসিপাও ও নওংখিওসহ কয়েকটি শহর পুনর্দখল করেছে। এই পাল্টা সাফল্যগুলো দেখায়, জান্তা পুরো দেশ পুনর্দখল করতে না পারলেও পতন ঠেকানোর মতো যথেষ্ট গোলাবারুদ ও সামরিক সক্ষমতা তার রয়েছে।
বেইজিংয়ের হিসাবি বাজি
মিয়ানমারের সংঘাতে চীনের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠেছে, যদিও বেইজিংয়ের প্রভাব সর্বাত্মক নয়, একমুখীও নয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি জান্তাকে ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে জনগণনা ও নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট অর্থও রয়েছে, যার উদ্দেশ্য সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা ছাড়ার একটি পথ দেখানো। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁকে মিয়ানমারের “ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট” বলে উল্লেখ করেছে, যা আগের কূটনৈতিক আচরণের তুলনায় মর্যাদার উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
তবে সীমান্তবর্তী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও চীন সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এতে জটিল এক পৃষ্ঠপোষক-প্রতিনিধি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে বেইজিং দুই পক্ষকেই সমর্থন দিচ্ছে, যাতে কেউই পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে না পারে। জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বেইজিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) চীনা অস্ত্র পায় এবং জান্তাবিরোধী বাহিনীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে তা সরবরাহ করে। এই কৌশলের লক্ষ্য হলো প্রভাববলয় হিসেবে একটি বাফার অঞ্চল ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে জান্তার সম্পূর্ণ পতন বা ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক বিজয়—দুটিই ঠেকানো।
নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে চীনের হস্তক্ষেপ নির্ণায়ক হয়েছে। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স যখন সীমান্তবাণিজ্যের পথ দখল করে—যে পথে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আন্তসীমান্ত বাণিজ্য হতো—তখন বেইজিং চাপ সৃষ্টি করতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি রপ্তানিও চীন সরকার আটকে দিয়েছে; অন্যদিকে জান্তাকে জেট প্রশিক্ষণ বিমান, চালকবিহীন আকাশযান এবং ড্রোন উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।
মিয়ানমারে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের বিরোধী চীন,” ২০২৫ সালের আগস্টে বলেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বেইজিংয়ের প্রধান উদ্বেগ সংক্ষেপে তুলে ধরে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের পতন যেন না ঘটে, সেটিই বেইজিংয়ের নীতি।
এই নীতির প্রতিফলন হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে সিরিয়ার মতো ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর ও বেল্ট অ্যান্ড রোড বিনিয়োগ ব্যাহত হতে পারে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থান ও তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও বেইজিং মনে করে, বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশটিকে একসঙ্গে ধরে রাখার ক্ষমতা একমাত্র সামরিক বাহিনীরই রয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধের বিবর্তন
চালকবিহীন ব্যবস্থার আধিপত্যে সংঘাতটি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। এখন উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে, যদিও চালকযুক্ত উড়োজাহাজ ও ভারী কামানের ক্ষেত্রে জান্তা এগিয়ে। মিয়ানমার বিমানবাহিনী চীনের কাছ থেকে এফটিসি-২০০০জি জেট প্রশিক্ষণ বিমান পেয়েছে এবং রাশিয়ার সরবরাহ করা বিমানও ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তারা মাসে গড়ে প্রায় ৩০০টি বিমান হামলা চালায়।
প্রতিরোধ বাহিনী শুরুতে সামরিক কাজে রূপান্তরিত বাণিজ্যিক ড্রোন ব্যবহার করে সুবিধা পায়। শুধু অপারেশন ১০২৭-এই তারা ২৫ হাজার গোলাবারুদ নিক্ষেপ করে। কম খরচের এসব ড্রোনের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন সামরিক চৌকিতে নির্ভুল হামলা ও ঝাঁকবদ্ধ আক্রমণ চালানো সম্ভব হয়। তবে জান্তা দ্রুত কৌশল মানিয়ে নেয়; বিশেষ ড্রোন ইউনিট গড়ে তোলে এবং চীন, রাশিয়া ও ইরান থেকে আত্মঘাতী ড্রোন আমদানি করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ চালু করে সামরিক বাহিনী জনবলের ঘাটতি পূরণ করেছে। আনুমানিক ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। তাদের অনেককে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই বিদ্রোহীদের প্রতিরক্ষা ভাঙতে “মানবঢল” কৌশলে মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্য মিয়ানমারে তিনজন বিদ্রোহী যোদ্ধা এই কৌশল প্রত্যক্ষ করার কথা নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, হতাহতের পরপরই নতুন সেনাদের এগিয়ে দেওয়া হতো; কখনো কখনো নিজস্ব কর্মকর্তাদের হুমকির মুখেও তাদের তা করতে বাধ্য করা হতো।
সংঘাত নিয়ে গবেষণা করা সামরিক বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা মেজর নাউং ইয়ো ব্যাখ্যা করেছেন, অপারেশন ১০২৭-এর ধাক্কার পর জান্তা পক্ষপাতের ভিত্তিতে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের সরিয়ে আরও অভিজ্ঞ কমান্ডারদের নিয়োগ করে। এই কর্মী পরিবর্তন, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং ড্রোন সংগ্রহের সঙ্গে মিলে প্রান্তিক এলাকায় ক্রমাগত ভূখণ্ড হারানো সত্ত্বেও সামরিক বাহিনীকে নিজেদের অবস্থান স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছে।
মানবিক বিপর্যয়
ভূখণ্ড নিয়ে টানাপোড়েনের বাইরে মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬ লাখ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৫ লাখের বেশি মানুষ। সংঘাত মান্দালয়ের মতো বড় শহরের কাছাকাছি চলে আসায় দেশটিতে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ জাতিসংঘের সাড়াদান পরিকল্পনায় বিশ্বে সবচেয়ে কম অর্থায়ন রয়েছে মিয়ানমারের জন্য; প্রয়োজনীয় তহবিলের ৩০ শতাংশেরও কম অর্থে কার্যক্রম চলছে।
আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর প্রবেশে জান্তা দীর্ঘদিন ধরেই বাধা দিয়ে আসছে। আইন প্রয়োগ করে তারা সহায়তা কীভাবে ও কাদের দেওয়া যাবে, তা সীমিত করছে। প্রতিরোধ বাহিনী কোনো এলাকা দখল করলে সামরিক বাহিনী প্রায়ই অবরোধ বা নির্বিচার বিমান হামলা চালায়, যার লক্ষ্য হয় স্কুল, হাসপাতাল ও বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চিন রাজ্যের একটি গ্রামে বিমান হামলায় আট শিশুসহ ১১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলো যেখানে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না, সেখানে স্থানীয় ত্রাণ সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে এগিয়ে এসেছে। তবে এসব সংগঠন তীব্র সম্পদ সংকট ও আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে পড়ছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশের আগে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার শর্তও রয়েছে।
“আমরা চামচ দিয়ে পুকুরের পানি সেচে ফেলার চেষ্টা করছি, অথচ পানি আসতেই থাকছে,” পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মিয়ানমারে কর্মরত এক আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মী বলেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক টমাস কিন সতর্ক করে বলেন, সংঘাতের নতুন পর্যায়ে গোলাগুলির মাঝখানে আটকে পড়া বেসামরিক মানুষের ওপর “বিধ্বংসী প্রভাব” পড়বে। মরিয়া শাসকগোষ্ঠী “বুবি ট্র্যাপ ও এ ধরনের ভয়ংকর কৌশল, প্রতিশোধ এবং আঘাত হানার দল” ব্যবহার করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও বিভক্তি
সংঘাতের রাজনৈতিক দিকেও সামরিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে, তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। ২০২৫ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে জান্তার পরিকল্পিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোকে ব্যাপকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে নিন্দা করা হয়েছে। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে জোর করে বিলুপ্ত করা হয়েছে, আর অং সান সু চি এখনো আটক। ফলে বেসামরিক প্রতিনিধি ব্যবহার করে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার বৈধতা দেওয়ার কৌশলে পরিণত হয়েছে এই ভোট।
বিদেশে থাকা মিয়ানমারের জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভোট বর্জন করেছে। লাখ লাখ মিয়ানমারের অভিবাসী শ্রমিকের আবাস দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে; সেখানে শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃপক্ষ পাসপোর্ট নবায়নের আবেদনকারীদের ভোটের ফরম পূরণে বাধ্য করেছে এবং অংশ নিতে ফোনে তাগাদা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কর্মীরা বয়কটের আয়োজন করেন; অধিকাংশ অভিবাসীই তাঁদের কাছে প্রহসন মনে হওয়া প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
ক্ষমতাচ্যুত আইনপ্রণেতাদের নিয়ে গঠিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট প্রতিরোধ আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি। বিভিন্ন পিডিএফ বাহিনীতে ৮৫ হাজার যোদ্ধা আছে বলে দাবি করলেও, সবচেয়ে বেশি ভূখণ্ড ও অস্ত্রের অধিকারী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ওপর এনইউজির নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ নেই। আরাকান আর্মি ও ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির মতো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে; তারা প্রায়ই দেশব্যাপী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চেয়ে স্থানীয় ভূখণ্ডগত সাফল্যকে অগ্রাধিকার দেয়।
চীনের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিগুলো জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও বৃহত্তর পিডিএফ আন্দোলনের মধ্যে আস্থা আরও ক্ষয় করেছে। কোকাংয়ের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতির বিনিময়ে লাশিও ফিরিয়ে দিতে এমএনডিএএ যখন জান্তার সঙ্গে চুক্তি করে, তখন তারা থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠিত যৌথ দর-কষাকষির নীতি ভঙ্গ করে। এই আচরণ থেকে বোঝা যায়, জাতিগত গোষ্ঠীগুলো জাতীয় পর্যায়ে শাসন পরিবর্তনের চেয়ে নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সুরক্ষিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
স্থায়ী বলকানীকরণের ঝুঁকি
বিশ্লেষকেরা ক্রমেই সতর্ক করছেন, মিয়ানমার কোনো পক্ষের ঐক্যবদ্ধ বিজয়ের বদলে স্থায়ীভাবে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়তে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সংঘাতটিকে “গন্তব্যহীন যুদ্ধ” বলে বর্ণনা করেছে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা বিভেদ গভীর করে এবং শান্তির পথ বন্ধ করে দেয়। কৌশলগত পরিকল্পনায় তিনটি পরিস্থিতি প্রাধান্য পাচ্ছে: দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা চলতে থাকা; আংশিক ও অন্তর্ভুক্তিহীন যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছু অঞ্চলে স্থিতিশীলতা এলেও অন্যত্র সংঘাত বেড়ে যাওয়া; অথবা সব পক্ষকে নিয়ে একযোগে যুদ্ধবিরতি, যা বর্তমান বিভক্তির মধ্যে রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে।
প্রতিরোধ আন্দোলন নিজেও জাতিগত ও আদর্শিক বিভাজনে খণ্ডিত হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মি ফেডারেল ব্যবস্থার বদলে কনফেডারেল কাঠামো চায়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতি চালিয়ে তারা নতুন বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ আহরণ নিয়ে টিএনএলএ ও এমএনডিএএর সঙ্গে অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়েছে। মধ্য মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াই শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশ ক্ষমতাধর স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ের রূপ নিচ্ছে; পিডিএফ ইউনিটগুলো স্থানীয় কর ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অর্থ জোগাচ্ছে।
ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এই বিভাজনকে আরও জোরদার করেছে। ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে প্রত্যাবর্তন বিদেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি মার্কিন আগ্রহ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার অব্যাহত সমর্থন জান্তাকে কূটনৈতিক সুরক্ষা ও সামরিক সরঞ্জাম জোগাচ্ছে। আসিয়ান কার্যকর ও সর্বসম্মত অবস্থান নিতে পারেনি। বর্তমানে ফিলিপাইন আলোচনা পরিচালনা করলেও নেপিডোকে ছাড় দিতে বাধ্য করার মতো প্রভাব তার নেই।
মিয়ানমার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী স্বতন্ত্র বিশ্লেষক ডেভিড ম্যাথিসন বলেন, “আঞ্চলিক সংস্থার চেয়ে চীন বেশি ‘অগ্রগতি’ অর্জন করলে আসিয়ান ক্ষোভ দেখাতে পারে না; তাদের আঞ্চলিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।” এই পরিস্থিতিতে সংঘাত এমন এক স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যেখানে জান্তা জিততে পারছে না, আবার প্রতিরোধ বাহিনীও শাসন চালাতে পারছে না।
মূল বিষয়গুলো
- ছয় বছর পর মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ কৌশলগত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। জান্তার নিয়ন্ত্রণে ২১ শতাংশ ভূখণ্ড, প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে ৪২ শতাংশ; তবু কোনো পক্ষই নির্ণায়ক আঘাত হানতে পারছে না।
- ২০২৩ সালের অক্টোবরে অপারেশন ১০২৭ জান্তাবিরোধী বাহিনীর সাফল্যের শিখর চিহ্নিত করে। তবে চীনের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের পর কৌশলগত লাশিও শহর জান্তার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়াসহ আংশিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হয়েছে।
- চীন গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈত ভূমিকা পালন করছে: জান্তাকে ৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে ও যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করছে; একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির মাধ্যমে জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র জুগিয়েছে। রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ পতন ঠেকাতে তারা ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিয়েছে।
- ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার সেনাকে জোর করে নিয়োগ, “মানবঢল” পদাতিক কৌশল এবং বেইজিং ও মস্কোর সরবরাহ করা ড্রোন যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়িয়ে সামরিক বাহিনী নিজেদের কৌশল মানিয়ে নিয়েছে।
- ৩৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত হওয়ায় মানবিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। ত্রাণকর্মীদের ভাষায়, এটি যেন চামচ দিয়ে পুকুর সেচে ফেলার চেষ্টা, অথচ পানি আসতেই আছে।
- ২০২৫ সালের পরিকল্পিত নির্বাচন বিদেশে থাকা ভোটার ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বর্জন করেছে। এতে জান্তা আন্তর্জাতিক বৈধতা পায়নি, বরং জান্তাবিরোধী শক্তিগুলোর বিভক্তি প্রকাশ পেয়েছে।
- বিশ্লেষকেরা স্থায়ী বলকানীকরণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো জাতীয় ঐক্যের বদলে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে; এর ফলে ঐক্যবদ্ধ ফেডারেল গণতন্ত্রের বদলে প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভরশীল স্বায়ত্তশাসিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে।






