ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে চালকদের সতর্ক করে যে মহাসড়ক
হেডলাইটের আলোয় হঠাৎ হরিণ, বুনো শূকর বা পথকুকুর সামনে চলে আসায় কখনো যদি সজোরে ব্রেক কষে থাকেন, তাহলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের মধ্য দিয়ে যাওয়া মহাসড়কগুলোর প্রাণঘাতী সমস্যাটি আপনার জানা। প্রাণীরা সতর্কবার্তা পড়তে পারে না, আর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ ঠেকাতে গতির ক্যামেরাও পারে না। ভারত এখন মধ্যপ্রদেশের জাতীয় মহাসড়ক ৪৫-এ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি সমাধান পরীক্ষা করছে। সড়কের একটি অংশ রক্তিম লাল হয়ে উঠেছে। এটি কেবল রং নয়। আচরণগত মনোবিজ্ঞান, স্পর্শ-সংবেদী প্রকৌশল এবং বনাঞ্চলের সঙ্গে সড়কের মিথস্ক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবনার মাধ্যমে চালক ও বন্যপ্রাণী—উভয়কেই সুরক্ষিত রাখার একটি উন্নত প্রচেষ্টা এটি।
সূচিপত্র
- ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে চালকদের সতর্ক করে যে মহাসড়ক
- লাল পৃষ্ঠ কীভাবে চালকের আচরণে প্রভাব ফেলে
- স্বচালিত গাড়ির সঙ্গে প্রকৌশলগত সামঞ্জস্য
- কার্যকারিতার নেপথ্যের অদৃশ্য অবকাঠামো
- বন্যপ্রাণী পারাপারের বিজ্ঞান
- বিশ্বের অন্যান্য উদ্যোগ: বন্যপ্রাণী চলাচলের পথে চিলির বিনিয়োগ
- বর্তমান সড়কের কারণে মানুষ ও প্রাণীর ক্ষতি
- সাফল্য পরিমাপ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা
- মহাসড়ক নকশার নতুন ভাষা
- মূল বিষয়গুলো
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এনএইচএআই) দেশের কোনো জাতীয় মহাসড়কে প্রথম টেবিল-টপ লাল মার্কিং বলে অভিহিত করা একটি প্রকল্প উন্মোচন করেছে। প্রকল্পটি এনএইচ-৪৫-এর ১১.৯৬ কিলোমিটার অংশজুড়ে, যা বীরাঙ্গনা দুর্গাবতী টাইগার রিজার্ভের মধ্য দিয়ে গেছে এবং নওরাদেহি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের পাশ ঘেঁষে চলেছে। এর মূল অংশে রয়েছে ২ কিলোমিটারের একটি বিপজ্জনক অঞ্চল, যেখানে ৫ মিলিমিটার পুরু গরম অবস্থায় প্রয়োগ করা থার্মোপ্লাস্টিকের লাল স্তর রয়েছে। উজ্জ্বল লাল রং এবং সামান্য উঁচু পৃষ্ঠের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে হঠাৎ জোরে ব্রেক না কষে, গাড়ির ক্ষতি না করে বা চালকের অস্বস্তি না ঘটিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গতি কমে আসে। সড়কটিই হয়ে ওঠে সতর্কবার্তা।
লাল পৃষ্ঠ কীভাবে চালকের আচরণে প্রভাব ফেলে
লাল সড়কের পেছনের মনস্তত্ত্ব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইন্দ্রিয়নির্ভর প্রকৌশলে প্রতিষ্ঠিত। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, তাই চালকেরা যে সাদা ও হলুদ দাগ প্রায়ই উপেক্ষা করতে শেখেন, সেগুলোর তুলনায় এটি স্বভাবতই বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। টেবিল-টপ পৃষ্ঠের সঙ্গে মিলিত হয়ে টায়ারের মাধ্যমে মৃদু স্পর্শগত ও শ্রাব্য সংকেত তৈরি করলে, বিপদ সম্পর্কে সচেতনভাবে ভাবার আগেই এই নকশা অবচেতন মনে গতি কমানোর প্রবণতা সৃষ্টি করে।
ডেলয়েট ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক বিশাল গুপ্ত এই ব্যবস্থাকে একটি সূক্ষ্ম প্রণোদনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চালকদের মনোযোগ বিঘ্নিত না করে, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী দৃশ্যমান সংকেত হিসেবে কাজ করে, যা গতিরোধকের আকস্মিক ধাক্কা ছাড়াই বিপজ্জনক অঞ্চলে প্রবেশের কথা জানায়। এই মার্কিং দীর্ঘ পথের একঘেয়েমিও ভাঙতে সাহায্য করে, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে ক্লান্তি কমাতে পারে; সেখানে মহাসড়কে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালাতে গিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্নতা দুর্ঘটনার কারণ হয়।
রাতে গাড়ি চালানোর জন্য থার্মোপ্লাস্টিকের মধ্যে কাচের দানা মেশানো হয়েছে, যা হেডলাইটের আলোয় প্রতিফলন তৈরি করে। অন্ধকার নামার পর লাল পৃষ্ঠটি উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠে এবং শুষ্ক ও ভেজা—উভয় অবস্থাতেই দৃশ্যমান থাকে। বন্যপ্রাণী চলাচলের পথগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা এতে মোকাবিলা করা হয়েছে: প্রাণী-যানবাহন সংঘর্ষের বেশির ভাগই ঘটে ভোর, সন্ধ্যা ও রাতে, যখন দৃশ্যমানতা সবচেয়ে কম এবং প্রাণীদের চলাচল সবচেয়ে বেশি।
স্বচালিত গাড়ির সঙ্গে প্রকৌশলগত সামঞ্জস্য
তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার বাইরেও, এনএইচ-৪৫ প্রকল্পটি স্বয়ংক্রিয় পরিবহনের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় রেখেছে। ভারত যখন সফটওয়্যারচালিত ও সেন্সরনির্ভর যানবাহনের উপযোগী করে মহাসড়ক তৈরি করছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—প্রচলিত নয় এমন সড়কের রং কি অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেমস (এডিএএস)-কে বিভ্রান্ত করতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক স্বচালিত ব্যবস্থা শুধু রং শনাক্তকরণের ওপর নির্ভর করে না।
টাটা টেকনোলজিসের এডিএএস বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী অভিষেক মোহনের ব্যাখ্যা, আধুনিক ব্যবস্থাগুলো ক্যামেরা, রাডার ও লিডারের সমন্বিত সেন্সর-তথ্যের সাহায্যে প্রান্ত শনাক্তকরণ, কনট্রাস্ট বিশ্লেষণ, প্রতিফলন এবং অর্থগত ব্যাখ্যা ব্যবহার করে। এডিএএস লেভেল ২ ও ৩-এর দৃষ্টিকোণ থেকে, লাল মার্কিংটি সাধারণ লেনের লম্বালম্বি দাগ ঢেকে না দিলে মূলত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এডিএএস ব্যবস্থা পার্শ্বীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রধানত সাদা ও হলুদ লেন-দাগের ওপর নির্ভর করে। আড়াআড়ি রঙিন চিহ্ন সাধারণত লেনের সীমানা নয়, সড়কের পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য হিসেবে শনাক্ত হয়।
বিরল ক্ষেত্রে নিচের লেনের রং সাময়িকভাবে ঢাকা পড়লে, ব্যবস্থা চালককে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অনুরোধ করতে পারে বা নিজে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে—এটি প্রত্যাশিত ও নিরাপদ আচরণ। লাল মার্কিং তাই সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ভবিষ্যৎমুখী অবকাঠামোগত উদ্যোগ। তবে এর জন্য উন্নত মানের লেন-দাগের ধারাবাহিকতা এবং যথাযথ ক্যালিব্রেশন মান বজায় রাখতে হবে। দাসো সিস্টেমস ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ বিক্রয় পরিচালক আজমতুল্লাহ মোহাম্মদ এমন উদ্যোগ সরাসরি বাস্তবায়নের আগে ভার্চুয়ালি যাচাই করতে CATIA SCANeR-এর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সিমুলেশন-নির্ভর উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কার্যকারিতার নেপথ্যের অদৃশ্য অবকাঠামো
প্রাণীরা যদি সড়কে উঠতে পারে, তাহলে শুধু লাল রং কোনো সংঘর্ষ ঠেকাতে পারবে না। সড়কের এই পৃষ্ঠ-ব্যবস্থা একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তাব্যবস্থার দৃশ্যমান স্তর মাত্র। এনএইচএআই ১১.৯৬ কিলোমিটারের এই পথজুড়ে বন্যপ্রাণীর চলাচলের নথিভুক্ত স্থানগুলোতে ২৫টি নির্দিষ্ট আন্ডারপাস নির্মাণ করেছে। এসব সুড়ঙ্গ দিয়ে বাঘ, হরিণ, সাম্বার ও শেয়াল মহাসড়কের নিচ দিয়ে পার হতে পারে, যানবাহনের সামনে না এসেই।
মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় আট ফুট উঁচু অবিচ্ছিন্ন চেইন-লিংক বেড়া রয়েছে। এই প্রতিবন্ধক প্রাণীদের সড়কে ঢুকতে বাধা দেয় এবং আন্ডারপাসের দিকে যেতে সাহায্য করে। গভীর কাটিং অংশে, যেখানে ভূপ্রকৃতিই প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করেছে, সেখানে বেড়াটি আশপাশের ভূমিরূপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ছোট সেতুতে বসানো ক্যামেরা পারাপারের স্থানগুলোর ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করে। সেতু ও মোড়ে সৌরবাতি পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ না বাড়িয়ে দৃশ্যমানতা উন্নত করে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এনএইচএআই কর্মকর্তা অমৃতলাল সাহু জোর দিয়ে বলেন, আন্ডারপাস সহায়ক হলেও চালকেরা আচরণ না বদলালে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। বেড়া ও আন্ডারপাস একা যথেষ্ট না হওয়ায় দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে লাল মার্কিং চালু করা হয়েছে। পুরো ব্যবস্থাটি এনএইচএআইয়ের গ্রিন হাইওয়েজ উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব সড়ক নির্মাণে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের ২০১৫ সালের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বন্যপ্রাণী পারাপারের বিজ্ঞান
গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ কেবল প্রত্যন্ত বনের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, যানবাহনের সঙ্গে বড় প্রাণীর সংঘর্ষে বছরে ১০ থেকে ২০ লাখ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এবং বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তৈরি হয়। ফেডারেল তালিকাভুক্ত কিছু বিপন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে সড়কে প্রাণহানি বেঁচে থাকার জন্য প্রধান হুমকিগুলোর একটি।
প্রশমন কৌশল নিয়ে বৃহৎ একটি মেটা-বিশ্লেষণে কার্যকারিতার স্পষ্ট ক্রম দেখা গেছে। বেড়ার সঙ্গে পারাপারের কাঠামো যুক্ত করলে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর সড়কে মৃত্যুর হার প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে। শুধু বেড়া থাকলে কমে প্রায় ৫৪ শতাংশ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেড়া ছাড়া পারাপারের কাঠামোতে শনাক্তযোগ্য তেমন উপকার দেখা যায় না। এতে পরিকল্পনাকারীদের মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, কাছাকাছি সুড়ঙ্গ নির্মাণ করলেই হবে না; নির্দিষ্ট পারাপারের স্থানের দিকে প্রাণীদের পথ দেখানোও জরুরি।
দৈর্ঘ্য ও ধারাবাহিকতাই সাফল্য নির্ধারণ করে। কনজারভেশন বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ৫ কিলোমিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যে বেড়া স্থাপন করা হলে সংঘর্ষ অন্তত ৮০ শতাংশ কমে। ছোট অংশে বেড়া দিলে ফল অনিয়মিত হয়: সংঘর্ষ কমার হার শূন্য থেকে ৯৪ শতাংশের মধ্যে থাকে, গড়ে মাত্র ৫২.৭ শতাংশ। প্রায় ১২ কিলোমিটার একটানা বেড়া এবং একাধিক আন্ডারপাসসহ এনএইচ-৪৫ প্রকল্পটি উচ্চ কার্যকারিতার মানদণ্ড পূরণ করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারণে রক্ষণাবেক্ষণই নীরব নিয়ামক।
বিশ্বের অন্যান্য উদ্যোগ: বন্যপ্রাণী চলাচলের পথে চিলির বিনিয়োগ
বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামো তৈরির প্রচেষ্টায় ভারত একা নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চিলির গণপূর্ত মন্ত্রণালয় চিলোয়ে দ্বীপে চাকাও থেকে চনচি পর্যন্ত রুট ৫-এর একটি বড় কনসেশন প্রকল্প ঘোষণা করে। ১২৬ কিলোমিটারজুড়ে এই প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এতে প্রায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ নতুন পুদেতো নদীর সেতু, আরও কয়েকটি সেতু, পথচারী চলাচলের পথ এবং সার্ভিস রোড রয়েছে।
এই অবকাঠামো তালিকার মধ্যেই রয়েছে পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গীকার। দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য নকশায় সাতটি বন্যপ্রাণী পারাপারের পথ, যেগুলোকে পরিবেশগত করিডরও বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের পর ২০২৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা; পূর্ণ কার্যক্রম শুরু হতে পারে ২০৩৩ সালের দিকে। চাকাও-চনচি মহাসড়ক কনসেশন সাম্প্রতিক কয়েক দশকে চিলোয়ে দ্বীপের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামোগত অঙ্গীকার। এটি দেখায়, পরিবহন ও সংরক্ষণের সমন্বয় বিশ্বজুড়ে অবকাঠামো পরিকল্পনার মূলধারায় প্রবেশ করেছে।
বর্তমান সড়কের কারণে মানুষ ও প্রাণীর ক্ষতি
ভারতে প্রাণী-যানবাহন সংঘর্ষের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্য নেই। তবে রাজ্যভিত্তিক যেসব পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তাতে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। পাঞ্জাবে এ ধরনের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৫৩ শতাংশের কারণ সরাসরি প্রাণীর সঙ্গে সংঘর্ষ। ভারতের ‘টাইগার স্টেট’ হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রদেশে দেশের সর্বাধিক সংখ্যক টাইগার রিজার্ভ রয়েছে। রাজ্যটিতে গত দুই বছরেই প্রাণী-যানবাহন সংঘর্ষের ২৩৭টি ঘটনা এবং মানুষের ৯৪টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
বীরাঙ্গনা দুর্গাবতীর মতো সংরক্ষিত এলাকায় বাঘের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীরা সুরক্ষিত সীমানার বাইরে, ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ কেটে যাওয়া মহাসড়কে চলে আসছে। ১২২ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত এবং ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকা এনএইচ-৪৫-এর উন্নয়ন প্রকল্পটি এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত মোকাবিলার চেষ্টা করছে। নিরাপত্তার পাশাপাশি, কাছাকাছি বন্যপ্রাণী অঞ্চলগুলোর শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের পর উন্নত মহাসড়কটি পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন।
সাফল্য পরিমাপ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা
লাল সড়ক পরীক্ষার সাফল্য শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান প্রভাব দিয়ে নয়, পরিমাপযোগ্য ফল দিয়ে বিচার করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মাপকাঠি হলো: চিহ্নিত এলাকায় গাড়ির গতির তথ্য, প্রকল্পের আগে ও পরে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সংঘর্ষের সংখ্যা, এবং প্রাণীরা বেড়ার ফাঁক খোঁজার বদলে সত্যিই আন্ডারপাস ব্যবহার করছে কি না, তার নজরদারিমূলক প্রমাণ। বন্যপ্রাণীর চলাচলের ধরন অনুসরণ এবং আন্ডারপাসের ব্যবহার যাচাই করতে ছোট সেতুগুলোতে ইতিমধ্যে সৌরশক্তিচালিত ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি রক্ষণাবেক্ষণ। বেড়ার একটি অংশ ভেঙে যাওয়া, আন্ডারপাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা লাল পৃষ্ঠে গাছপালা ছেয়ে যাওয়া—এগুলোর যেকোনো একটিই যত্ন করে নকশা করা পথটিকে আবার প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত করতে পারে। থার্মোপ্লাস্টিক পৃষ্ঠটি সহজে রক্ষণাবেক্ষণ ও বদলে ফেলার জন্য নকশা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রয়োজন হলে পুরোপুরি সরিয়েও ফেলা যাবে। সড়কের পেভমেন্টের কাঠামো বা পানি নিষ্কাশনের ধরন না বদলানোয় পরিবেশগত প্রভাব ন্যূনতম; প্রচলিত রাম্বল স্ট্রিপের তুলনায় শব্দও কম হয়।
মহাসড়ক নকশার নতুন ভাষা
এনএইচ-৪৫ প্রকল্পটি কেবল পরিবহনকেন্দ্রিক মহাসড়ক নকশা থেকে সরে এসে পরিবেশবিদ্যা, আচরণবিজ্ঞান ও যানবাহন প্রযুক্তিকে সমন্বিত করে আরও সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। উন্নত সেন্সর-সমন্বয়ের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের যানবাহন আরও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে সড়ক অবকাঠামোকে আর অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচনা করা যায় না। সহায়ক ড্রাইভিংয়ের উপযোগী সড়ক তৈরি করতে অবকাঠামো নির্মাতা ও গাড়ি নির্মাতাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মধ্যপ্রদেশের পরীক্ষাটি সফল হলে, ভারতের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী চলাচলের পথের মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য জাতীয় মহাসড়কেও এ ধরনের পরিবেশ-সংবেদনশীল নকশা দেখা যেতে পারে। দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটারের বেশি জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে, যার অনেকগুলোই পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে। লাল সড়ক এমন এক বিরল দৃষ্টান্ত, যেখানে অবকাঠামো চারপাশের জীবনের দিকে নজর দিতে থেমেছে। এটি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মহাসড়ক আর একচ্ছত্র অগ্রাধিকার দাবি করবে না, বরং অন্যদের সঙ্গে পথ ভাগ করে নিতে শিখবে।
মূল বিষয়গুলো
- মধ্যপ্রদেশের এনএইচ-৪৫-এ ভারতের প্রথম টেবিল-টপ লাল সড়ক মার্কিং চালু হয়েছে। ২ কিলোমিটারের বিপজ্জনক এলাকায় ৫ মিলিমিটার পুরু থার্মোপ্লাস্টিকের আস্তরণ দেওয়া হয়েছে, যা চালকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে গতি কমাতে উৎসাহিত করবে।
- প্রকল্পটি বীরাঙ্গনা দুর্গাবতী টাইগার রিজার্ভের মধ্য দিয়ে গেছে। এতে রয়েছে বন্যপ্রাণী চলাচলের ২৫টি আন্ডারপাস, আট ফুট উঁচু চেইন-লিংক বেড়া, সৌরবাতি এবং নজরদারির ক্যামেরা।
- গবেষণায় দেখা গেছে, বেড়ার সঙ্গে পারাপারের কাঠামো যুক্ত করলে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর সড়কে মৃত্যুর হার প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে; শুধু বেড়া থাকলে কমে প্রায় ৫৪ শতাংশ।
- নকশাটি এডিএএস ও স্বচালিত যানবাহন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব ব্যবস্থা শুধু রং শনাক্তকরণ নয়, প্রান্ত শনাক্তকরণ ও কনট্রাস্ট বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে।
- মধ্যপ্রদেশে গত দুই বছরে প্রাণী-যানবাহন সংঘর্ষের ২৩৭টি ঘটনা এবং মানুষের ৯৪টি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যা বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামোর জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে।
- চিলোয়ে দ্বীপের ১২৬ কিলোমিটার মহাসড়ক কনসেশনে সাতটি বন্যপ্রাণী পারাপারের পথ নির্মাণের পরিকল্পনাসহ আরও বড় পরিসরে একই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে চিলি।
- প্রকল্পটি ভারতের ২০১৫ সালের গ্রিন হাইওয়েজ নীতির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। নির্মাণব্যয় ১২২ কোটি রুপি এবং ২০২৫ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা।






