বনের গভীরে এক স্বপ্ন
বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব কালিমান্তানের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের গভীরে দেশটি তার ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছে। পরিকল্পিত নতুন রাজধানী নুসান্তারার নির্মাণ এলাকা প্রায় ১,০০০ বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত, যা নিউইয়র্ক শহরের প্রায় তিন গুণ। এর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে ২৫০ ফুট উঁচু ধাতব কাঠামো, যার আকৃতি গারুড়ের মতো—ঈগলসদৃশ পৌরাণিক পাখিটি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক। এই সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ; চারপাশে গাছপালায় ঢাকা সাদা অফিস ভবন এবং মহাকাশযানের মতো দেখতে ভবিষ্যৎধর্মী একটি ব্যাংক।
সূচিপত্র
নতুন করে শুরু করার এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টার প্রতীক এই শহর। ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান রাজধানী জাকার্তা এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর; বৃহত্তর মহানগর এলাকায় বাস করেন ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। সেখানে দীর্ঘস্থায়ী যানজটের কারণে বছরে আনুমানিক ৪৫০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, রয়েছে তীব্র বায়ুদূষণ এবং আরও অস্তিত্বগত এক হুমকি: ভূমি দেবে যাচ্ছে। প্রতি বছর জাকার্তার কোনো কোনো এলাকা ৩ থেকে ১০ সেন্টিমিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে, ফলে বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
২০১৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো সমাধানের ঘোষণা দেন: একেবারে নতুন করে গড়ে তোলা হবে একটি রাজধানী, যা চলবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এবং পরিচালিত হবে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে। ২০২২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শহরটির উদ্বোধন। তবে সেই সময়সীমা পেরিয়ে যায়, উদ্যাপনও হয় সীমিত পরিসরে এবং ভবনগুলোও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি এলাকা প্রায় সম্পূর্ণ হলেও বৃহত্তর মহানগর এলাকায় বাস করেন মাত্র প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ; তাঁদের অধিকাংশই নির্মাণশ্রমিক ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় বাসিন্দা। নতুন শহরের কেন্দ্রে আছেন মাত্র ১০ হাজার বাসিন্দা, তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
জাতীয় রাজধানী থেকে রাজনৈতিক রাজধানী
২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ক্ষমতায় আসার এক বছরেরও বেশি সময় পর, এ বছরের জানুয়ারিতে প্রথমবার নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন। সফরটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত; প্রকল্পে তাঁর অঙ্গীকারের স্পষ্ট বার্তা দিতে তিনি সেখানে রাতও কাটান। সফরের সময় প্রাবোও প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের উন্নয়ন প্রকল্পে তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ২০২৮ সালের মধ্যে সংসদ ও আদালত ভবন নির্মাণের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
ব্যাংক পারমাতার অর্থনীতিবিদ জসুয়া পারদেদে বলেন, প্রেসিডেন্টের রাতযাপন ও প্রচারমুখী উপস্থিতি পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে দেওয়া একটি সচেতন বার্তা।
মালিকানা ও প্রকল্পটি অপরিবর্তনীয়—এমন রাজনৈতিক সংকেত
তবে অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই এই সফর হয়। আগের বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে প্রকল্পটির জন্য রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ অর্ধেক করা হয়েছে। এ ছাড়া, প্রাবোও একটি বিধিতে সই করে ২০২৮ সালের মধ্যে নুসান্তারাকে ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক রাজধানী হিসেবে নির্ধারণ করেন। এর ফলে আগের ‘জাতীয় রাজধানী’ শব্দবন্ধ থেকে সূক্ষ্ম হলেও তাৎপর্যপূর্ণ সরে আসা হলো। এই পরিবর্তনে আইনপ্রণেতা ও নীতিবিশেষজ্ঞরা বিভ্রান্ত হয়েছেন; তাঁদের আশঙ্কা, এতে প্রকল্পটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর ইঙ্গিত রয়েছে।
নুসান্তারা রাজধানী কর্তৃপক্ষের প্রধান বাসুকি হাদিমুলজোনো শহরটি জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ নাকচ করেছেন।
চিন্তা করবেন না। কাজ চলবে।
আগামী বছর আইনসভা ও বিচার বিভাগের ভবন নির্মাণ শেষ হলে প্রেসিডেন্ট ২০২৮ সালে নুসান্তারায় বসবাস শুরু করার পরিকল্পনা করেছেন। এ বছর আরও ৪,১০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সেখানে স্থানান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে ২০২৯ সালের মধ্যে ১২ লাখ বাসিন্দাকে স্থানান্তরের মূল লক্ষ্যের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। স্কুল, বিবাহিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন, শপিং মল ও বিনোদনকেন্দ্রের মতো জরুরি অবকাঠামো এখনো প্রায় অনুপস্থিত।
পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
নুসান্তারাকে বননগরী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। মহাপরিকল্পনায় পুনঃবনায়নের মাধ্যমে শহরের ৬৫ শতাংশ এলাকা বনভূমি রাখার পাশাপাশি পার্ক ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য ১০ শতাংশ জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের আগে শহরটিকে কার্বন শোষণে নিট অবদানকারী এলাকায় পরিণত করা এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করা—যা ২০৬০ সালের জাতীয় নিট-শূন্য লক্ষ্যের চেয়ে এগিয়ে। প্রেসিডেন্ট উইদোদো একে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইন্দোনেশিয়ার অঙ্গীকারের প্রকাশ বলে অভিহিত করেছিলেন।
তবে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশবিষয়ক ফোরাম ওয়ালহি জানিয়েছে, নির্মাণকাজের কারণে বালিকপাপান উপসাগরের আশপাশে ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। পূর্ব কালিমান্তানে ওয়ালহির নির্বাহী পরিচালক ফাথুর রোজিকিন ফেন বলেন, এতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতিগুলোর ওপর পরিবেশগত ক্ষতি পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যাদের আমরা নীরব শিকার বলি; এর মধ্যে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, নাকওয়ালা বানর এবং কালিমান্তানের ওয়া।
কালিমান্তানের ওয়া এ অঞ্চলের বিপন্ন এক প্রাইমেট প্রজাতি। সুলাওয়েসি থেকে আনা নির্মাণসামগ্রীর কারণে ওই অঞ্চলে বন্যা ও ধুলাদূষণ বেড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অবৈধ খননও আরেকটি চ্যালেঞ্জ। একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুসান্তারার আশপাশে অবৈধ খনন ও কৃষিকাজের কারণে ১৩ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইন্সপেক্টর জেনারেল এডগার দিপোনেগোরো জানান, বেআইনি খামারের কারণে ৮,৩৩৮ হেক্টর এবং অবৈধ খনির কারণে ৪,২৩৬ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। সরকার নজরদারি কেন্দ্র স্থাপন করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে শক্তিশালী খনি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কর্তৃপক্ষ কতটা দৃঢ়, তা নিয়ে সমালোচকদের সংশয় রয়েছে।
আদিবাসীদের অধিকার ও পবিত্র ভূমি
এই উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব বনে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায় হুমকির মুখে পড়েছে। দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জোট (আমান) ধারণা করছে, ২০ হাজারের বেশি আদিবাসী মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। প্রকল্প এলাকায় বালিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০০ পরিবার বাস করে; তাদের মধ্যে রয়েছে সেপাকু লামা গ্রাম।
৫১ বছর বয়সী সিয়ামসিয়াহ ও তাঁর স্বামী পান্দি—দুজনই বালিক জনগোষ্ঠীর—সেপাকু লামায় নিজেদের খামারের একটি কংক্রিটের বাড়িতে থাকেন। তাঁরা কাসাভা, কলা, শিম ও ফলের গাছ চাষ করেন। তাঁদের কাছে এই জমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের গভীর ইতিহাস; সিয়ামসিয়াহর মা-বাবা ও দাদা-দাদি—দুই প্রজন্মই গ্রামের কবরস্থানে সমাহিত। কাছেই সেপাকু নদীর গণ্ডারের আকৃতির একটি পাথর, যা বাতু বাদোক নামে পরিচিত, বালিক জনগোষ্ঠীর কাছে পবিত্র স্থান। এখন পাথরটি পানি শোধনাগার চত্বরে অবস্থিত। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত কংক্রিটের দেয়াল সেটিকে স্থানীয় সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
দেয়ালটির কারণে গ্রামবাসীরা আগের মতো নদীর পানি দিয়ে গোসল ও কাপড় ধুতে পারেন না। শহর কর্তৃপক্ষ বিনা মূল্যে পরিশোধিত পানি দিলেও বাড়িতে পাইপ বসানোর খরচ বাসিন্দাদেরই দিতে হয়। তাই অনেকেই বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখেন, নয়তো সরবরাহ করা পানির ট্যাংক কেনেন। সিয়ামসিয়াহ ও পান্দির মতো বাসিন্দাদের কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, একসময় প্রকল্পের জন্য তাঁদের জমি বিক্রি করতে হবে। ৫৩ বছর বয়সী পান্দি এখনো রাজি নন।
গাছপালা, এমনকি বাড়ির জন্যও সরকার হয়তো আমাকে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। কিন্তু আমার স্মৃতি, আমার ইতিহাস—সরকার কি সেগুলোর বদলি দিতে পারবে?
সাম্প্রতিক আইনি ঘটনাপ্রবাহে জমি অধিগ্রহণ আরও জটিল হয়েছে। নভেম্বরে সাংবিধানিক আদালত ২০২৪ সালের একটি ডিক্রি বাতিল করে, যাতে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ ১৯০ বছরের জন্য জমি চাষের অধিকার দেওয়া হয়েছিল। আদালত এই সুবিধাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। ডায়াক আদিবাসী প্রতিনিধি স্তেফানুস ফেবিয়ান বাবারো ও আরেক বাসিন্দা আবেদনটি করেছিলেন। আদালত নুসান্তারাকে জাতীয় বিধি মেনে চলার নির্দেশ দেন, যেখানে চাষের অধিকারের সর্বোচ্চ মেয়াদ ৯৫ বছর। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো এই রায়কে স্বাগত জানালেও উন্নয়নকারীরা মনে করছেন, এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও চীনের ভূমিকা
প্রকল্পটির মোট ব্যয় আনুমানিক ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এর মাত্র প্রায় ১৯ শতাংশ রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে মেটানো সম্ভব। বাকি অর্থ আসতে হবে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ থেকে, যে লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে না পারায় সমালোচকেরা প্রকল্পটিকে ‘সাদা হাতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে চীন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত চীনা কোম্পানিগুলো নুসান্তারায় প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ডেলোনিক্স গ্রুপ একটি মিশ্র বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে বিনিয়োগ করে নির্মাণকাজ শুরু করা প্রথম বিদেশি বিনিয়োগকারী হয়। পরিবহন, জ্বালানি, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও শিল্পোন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সমন্বিত পরিবহন প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে চীনের নেতৃত্বাধীন দুটি বড় কনসোর্টিয়াম: চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি-আইজেএম কনসোর্টিয়াম এবং চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন-চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড কনসোর্টিয়াম। প্রতিটি প্রকল্পের মূল্য প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ। শহরের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তার আগ্রহ জানিয়েছে হুয়াওয়ে। এসব বিনিয়োগ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাকার্তা-বান্দুং উচ্চগতির রেলপথের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অবকাঠামোতে বড় পরিবর্তন এনেছে।
তবে চীনা অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। শিল্প প্রকল্পের কারণে বন উজাড় ও সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি থাকায় পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি পুঁজি ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশের যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে ইন্দোনেশিয়াকে।
অন্য নতুন রাজধানী থেকে শিক্ষা
নতুন রাজধানী নির্মাণকারী প্রথম দেশ নয় ইন্দোনেশিয়া। জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ভলান্টারি লোকাল রিভিউ’ (ভিএলআর) নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনাকারীরা আগের উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করছেন। নতুন কোনো শহরের জন্য এটিই প্রথম এমন পর্যালোচনা। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নয়, উন্নয়নের পর্যায়েই টেকসই উদ্যোগ ও মানবাধিকারের নীতিগুলো যুক্ত করা এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য।
টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কুয়ালালামপুরের দক্ষিণে বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যাননগরী হিসেবে পরিকল্পিত এই শহরে আদিবাসীদের জমি থেকে বিচ্ছিন্ন না করে বিদ্যমান মালয় গ্রামগুলোকে পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার সেজং শহর ধাপে ধাপে উন্নয়ন ও সিউল থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার সুফল দেখায়। কাজাখস্তানের আস্তানা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা কতটা জরুরি। ধারাবাহিক অবকাঠামো বিনিয়োগে শহরটি ১৩ লাখ মানুষের সমৃদ্ধ নগরীতে রূপ নিয়েছে।
নুসান্তারার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ভিএলআর প্রক্রিয়ায় সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হয় এবং উন্নয়নে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মতামত কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নথিবদ্ধ করতে হয়। অগ্রগতি ও ঝুঁকি কমানোর কৌশল তুলে ধরে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার হাতিয়ার হিসেবেও এটি কাজ করে।
আবাসন ও অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ
ঝকঝকে সরকারি ভবনের বাইরেও মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। শহরে পর্যাপ্ত স্কুল ও বিনোদনকেন্দ্র নেই; বিশেষ করে বিবাহিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন নেই। এই ঘাটতি নতুন রাজধানীতে ঠিক সেই সমস্যাগুলোই তৈরি করতে পারে, যেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শহরটি গড়া হচ্ছে।
শ্রমিকদের আবাসনের জন্য সরকার নির্মাণশ্রমিকদের আবাসন ‘হুনিয়ান পেকেরজা কনস্ট্রুকসি’ (এইচপিকে) তৈরি করেছে। এটি পরিচালনা করছে নুসান্তারা রাজধানী কর্তৃপক্ষ ও বাদান উসাহা মিলিক ওতোরিতা (বিইউএমও), গণপূর্ত ও আবাসন মন্ত্রণালয়ের সহায়তায়। নতুন অন্য রাজধানীগুলোতে যে অনানুষ্ঠানিক বসতি সমস্যা তৈরি করেছে, তা ঠেকানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে এমআইটির গবেষকেরা বলছেন, স্বল্প ও দীর্ঘ—দুই মেয়াদেই আবাসনের পরিমাণ অপর্যাপ্ত হতে পারে। শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন তৈরি না হলে, শহরটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার আগেই বস্তি গড়ে উঠতে পারে।
আইন ও শাসনব্যবস্থার বাধা
প্রকল্পটি বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বিতর্কিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি আইন, যা ‘অমনিবাস আইন’ নামেও পরিচিত, বর্তমানে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর বিচারিক পর্যালোচনার আবেদনের মুখে রয়েছে। তাদের যুক্তি, এই আইন পরিবেশ সুরক্ষা দুর্বল করে এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের সুযোগ করে দেয়। ২০২০ সালে পাস হওয়া আইনটি আগে প্রক্রিয়াগতভাবে অসাংবিধানিক ঘোষিত হলেও ২০২৩ সালে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। আইনটি পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত করে এবং পরিবেশগত অনুমতির বদলে উন্নয়নকারীদের স্বঘোষিত অনুমোদনের সুযোগ দেয়।
নুসান্তারাসহ জাতীয় কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প (পিএসএন) হিসেবে চিহ্নিত প্রকল্পগুলো দ্রুত লাইসেন্স পায় এবং জমির অধিকারসংক্রান্ত সুরক্ষা শিথিল করা হয়। ১৭৩ নম্বর অনুচ্ছেদে শুধু সরকার নয়, বেসরকারি সংস্থাকেও জনস্বার্থের নামে জমি অধিগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। রেমপাং ইকো সিটির একটি সমান্তরাল ঘটনা এর সম্ভাব্য পরিণতি দেখায়: সেখানে কাচের কারখানা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাসিন্দাদের উচ্ছেদের মুখে পড়তে হয়েছে। এর জেরে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়েছে এবং বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করেছে।
ওয়ালহির মতো পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এসব আইনি কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের যুক্তি, নীতিগত সিদ্ধান্তও বুলডোজারের মতোই নিশ্চিতভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। জনঅংশগ্রহণের অধিকার পুনর্বহাল এবং সম্প্রদায়ের কল্যাণ ও অধিকারকে সম্মান করে—এমন জনস্বার্থের আরও শক্তিশালী সংজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
জেনে রাখুন
- বোর্নিওর পূর্ব কালিমান্তানে পরিকল্পিত ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাজধানী নুসান্তারা; ২০২৮ সালের মধ্যে ডুবতে থাকা ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ জাকার্তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা
- ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের প্রকল্পে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর আমলে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ অর্ধেক হয়েছে; একই সঙ্গে এর মর্যাদা পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রাজধানীর বদলে রাজনৈতিক রাজধানীতে নামিয়ে আনা হয়েছে
- বর্তমানে শহরের কেন্দ্রে মাত্র ১০ হাজার মানুষ বাস করেন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম; স্কুল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের মতো জরুরি অবকাঠামোও অসম্পূর্ণ
- পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে ম্যানগ্রোভ বন উজাড় এবং অবৈধ খননের কারণে ১৩ হাজার হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বননগরী ও নিট-শূন্যের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক
- বালিক জনগোষ্ঠীসহ ২০ হাজারের বেশি আদিবাসী বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে; পানি শোধনাগার স্থাপনার কারণে পবিত্র স্থানগুলো এখন বিচ্ছিন্ন
- সাংবিধানিক আদালত বিনিয়োগকারীদের ১৯০ বছরের জমির অধিকার বাতিল করে একে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন এবং অধিকার সর্বোচ্চ ৯৫ বছরে সীমিত করেছেন
- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীনা কোম্পানিগুলো ৪৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে
- জাতিসংঘ-সমর্থিত ভলান্টারি লোকাল রিভিউ প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনাকারীরা পুত্রজায়া ও সেজংয়ের মতো নতুন রাজধানী থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন; এতে টেকসই উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে






