উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পথে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী বিদ্যুতায়ন কর্মসূচিগুলোর একটি ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো। ইন্দোনেশিয়ার এই নেতা তিন থেকে চার বছরের মধ্যে প্রায় ১২ কোটি পেট্রলচালিত মোটরসাইকেলকে বিদ্যুতে চালিত করার লক্ষ্য নিয়েছেন। জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেওয়া এই ব্যাপক উদ্যোগের বিষয়ে মার্চে এক ভিডিও ভাষণে প্রবোও বলেন, "আমাদের সব মোটরসাইকেলকে বিদ্যুতে রূপান্তর করাই পুরো পরিকল্পনা।" বৈশ্বিক তেলের বাজারের অস্থিরতার মধ্যে তিনি এই নীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।
সূচিপত্র
এই লক্ষ্যের পেছনে জরুরি তাগিদ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি-সংকটের মুখে ইন্দোনেশিয়ার দুর্বল অবস্থানের কারণে। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে, যার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দেখিয়েছে, সরবরাহে বিঘ্ন কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। জ্বালানি রূপান্তরবিষয়ক সরকারি টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বাহলিল লাহাদালিয়া। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, "সম্ভব হলে আরও দ্রুত" এই রূপান্তর সম্পন্ন করতে।
তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে পরিকল্পনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মোটরসাইকেল বহরকে এত কম সময়ে বিদ্যুতায়িত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, শিল্প বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদেরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। গাজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ফাহমি রাধি পরিকল্পনার একজন উল্লেখযোগ্য সমালোচক। তাঁর যুক্তি, ব্যাপক বিদ্যুতায়ন সামাল দেওয়ার মতো মৌলিক অবকাঠামো ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান ব্যবস্থায় নেই।
কর্মশালার সংকট: গাণিতিকভাবেই অসম্ভব
প্রবোওর পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বাধা হলো সনদপ্রাপ্ত রূপান্তরকেন্দ্রের তীব্র ঘাটতি। ইনস্টিটিউট ফর এসেনশিয়াল সার্ভিসেস রিফর্মের (আইইএসআর) তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে সরকারি সনদপ্রাপ্ত মোটরসাইকেল রূপান্তরকেন্দ্র রয়েছে মাত্র ৩৯টি। পাঁচ বছরে ১২ কোটি মোটরসাইকেল রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণে, প্রতিটি কেন্দ্র বছরে ৯০০ থেকে ১,৫০০টি মোটরসাইকেল রূপান্তর করবে ধরে নিলে, দেশের সব অঞ্চলে প্রায় ১৬ হাজার থেকে ২৭ হাজার সনদপ্রাপ্ত কর্মশালা দরকার হবে।
এই ঘাটতি বিপুল। আইইএসআরের নির্বাহী পরিচালক ফ্যাবি তুমিওয়া নিশ্চিত করেছেন, অনুমোদিত কর্মশালার সংখ্যা "৫০টির বেশি নয়, আর সেগুলোও বৃহত্তর জাকার্তা এলাকায় কেন্দ্রীভূত"। এ ছাড়া বোগর, বান্দুং ও বালিতে কয়েকটি গুচ্ছ রয়েছে। পাপুয়া, কালিমান্তান বা সুলাওয়েসির মতো গ্রামীণ প্রদেশের মোটরসাইকেল মালিকদের নিকটতম সনদপ্রাপ্ত কেন্দ্রে যেতে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিতে হতে পারে। সরকারি ভর্তুকি থাকলেও এতে রূপান্তর আর্থিকভাবে অবাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন জাভা ও বাইরের দ্বীপগুলোর মধ্যে বৃহত্তর অবকাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন। রূপান্তর প্রযুক্তির জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, রোগনির্ণয়ের সরঞ্জাম এবং ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও বৈদ্যুতিক মোটরের সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন। দ্রুত দক্ষ কর্মী তৈরি ও কেন্দ্রগুলোকে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে বছরে লাখ লাখ যানবাহন রূপান্তরের যান্ত্রিক সক্ষমতা গড়ে উঠবে না।
রূপান্তরের প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াতেও বাড়তি জটিলতা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত মোটরসাইকেলকে বিদ্যুতে চালানোর উপযোগী করতে জ্বালানির ট্যাংক ও পেট্রল ইঞ্জিন খুলে ফেলতে হয়, এরপর বসাতে হয় ব্যাটারি প্যাক, বৈদ্যুতিক মোটর ও পরিবর্তিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত পর্যালোচিত গবেষণা বলছে, রূপান্তরে সময় লাগার বিষয়টি মানুষ তা গ্রহণ করবে কি না, তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। রূপান্তরের সময় ৫০ শতাংশ বাড়লে ইএমসি (ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল কনভার্সন) গ্রহণের সম্ভাবনা ৫.২ শতাংশ পয়েন্ট কমে; একই সঙ্গে নতুন পেট্রলচালিত মোটরসাইকেল কেনার হার ৩ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে।
ব্যর্থ অতীত উদ্যোগের শিক্ষা
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনাই ইন্দোনেশিয়ায় মোটরসাইকেল বিদ্যুতায়নের প্রথম উদ্যোগ নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সময় ২০২৩ সালে সরকার একটি রূপান্তর কর্মসূচি শুরু করে। ব্যাটারি ও মোটরসহ রূপান্তর কিট কেনায় প্রতি যানবাহনে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি রুপিয়াহ (প্রায় ৪০৮ থেকে ৫৮৩ ডলার) ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। কর্মসূচিতে ২০২৩ সালে ৫০ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৫০ হাজার মোটরসাইকেল রূপান্তরের লক্ষ্য ছিল।
ফল আশানুরূপ হয়নি। সিএনএন ইন্দোনেশিয়ার উদ্ধৃত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাত্র ১৪৫টি মোটরসাইকেল রূপান্তর করা হয়; ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৬১৫টিতে। এ সংখ্যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১ শতাংশেরও কম, যা নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান তুলে ধরে। অবসরপ্রাপ্ত অটোমোটিভ নির্বাহী বেবিন জুয়ানা এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থার অভাবকে দায়ী করেন: "অনেক সহায়ক বিষয় তখনও প্রস্তুত ছিল না। প্রতিটি যানবাহনের মডেল আলাদা; সবার জন্য একই রূপান্তরপদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় না। রূপান্তরের কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী দরকার, কিন্তু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কোথায়?"
গাজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা-আচরণবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের চালকের জন্য বাধাগুলোও ভিন্ন। মোটরসাইকেলপ্রেমী এবং বয়স্ক চালকদের প্রধান উদ্বেগ অর্থায়ন ও পুনর্বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়া নিয়ে। যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল দৈনিক যাত্রীরা রূপান্তর-প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং খরচসংক্রান্ত তথ্যের প্রাপ্যতা নিয়ে চিন্তিত। বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেলপ্রেমী এবং হালকা মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী নতুন চালকেরা রূপান্তর চলাকালে যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করেন। অভিজ্ঞ মেকানিকের ক্ষেত্রে প্রতিটি যানবাহন রূপান্তরে সাধারণত ৪৫ মিনিট থেকে দুই ঘণ্টা লাগে।
শিক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রচলিত পেট্রলচালিত মডেলের তুলনায় বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের পুনর্বিক্রয়মূল্য দ্রুত কমে যায়, যা মালিকদের এ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ইন্দোনেশীয় মোটরসাইকেলচালক তাঁদের যানবাহনকে ফেলে দেওয়ার মতো ভোগ্যপণ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হিসেবে দেখেন। তাই অনিশ্চিত দ্বিতীয় বাজারের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে তাঁরা অনিচ্ছুক।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা
লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার বাইরেও ব্যাপক রূপান্তর কর্মসূচির প্রযুক্তিগত বাস্তবতা নিয়ে নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞেরা গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছেন। পেট্রলচালিত মোটরসাইকেলে বৈদ্যুতিক চালনাব্যবস্থা বসাতে হলে ভিন্ন ওজনবণ্টন ও কাঠামোগত চাপ বিবেচনায় তৈরি গাড়ির কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হয়। ভিয়েতনামে এ ধরনের রূপান্তর কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করেছেন, পেট্রলচালিত মোটরসাইকেলের কাঠামো ভারী ব্যাটারি প্যাক ও বৈদ্যুতিক মোটর বহনের জন্য তৈরি করা হয়নি।
ভিয়েতনামের একটি মোটরসাইকেল কোম্পানির প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ বুই ভ্যান হুং ব্যাখ্যা করেছেন, মূল ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশন বদলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ বসালে যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সাসপেনশন ব্যবস্থা, টায়ার ও কাঠামোর অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, "যানবাহনের মূল তাপ অপসারণব্যবস্থা নতুন ব্যাটারির তাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে, ফলে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ে।" কাঠামো পুড়ে যাওয়ার পর ব্যাটারির অতিরিক্ত কক্ষ উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় পরিবর্তিত বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলে আগুন লাগার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপটেও এসব নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রাসঙ্গিক, কারণ অনেক কর্মশালায় জটিল প্রকৌশলগত কাজ করার সক্ষমতা নেই। বিনতাং রেসিং টিম, এল্ডার্স গ্যারেজ ও স্পোরা ইভির মতো কয়েকটি ইন্দোনেশীয় কোম্পানি নিজস্ব মোটর ও আমদানি করা ব্যাটারি—প্রধানত চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা—ব্যবহার করে নিজস্ব রূপান্তর কিট তৈরি করেছে। তবে অধিকাংশ ছোট কর্মশালা বিভিন্ন মানের পণ্য সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বহু ছোট প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় পক্ষের মোটরের ওপর নির্ভরশীল।
হো চি মিন সিটি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড এডুকেশনের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ড. নুয়েন ভ্যান লং জিয়াং জানান, পেট্রলচালিত যানকে বিদ্যুতে রূপান্তর নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় নিরাপত্তা উদ্বেগ ও বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এই পদ্ধতিকে অবাস্তব বলে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, "রূপান্তরের ব্যয়-সাশ্রয়িতা এখনও প্রশ্নসাপেক্ষ।" তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের দামের ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত রূপান্তরে ব্যয় হতে পারে। এর প্রায় অর্ধেকই লাগে লিথিয়াম ব্যাটারিতে, যা প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর বদলাতে হয়।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বৈদ্যুতিক গাড়ি-সংক্রান্ত বৈপরীত্য
ইন্দোনেশিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরন নিয়ে বিদ্যুতায়ন কর্মসূচির পরিবেশগত সুফল প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এতে সরকারের সবুজ রূপান্তরের বক্তব্যে একটি কাঠামোগত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল চলার সময় সরাসরি কোনো নির্গমন ঘটায় না, তবে ব্যাটারি চার্জের জন্য যে বিদ্যুৎ লাগে, তাতে উল্লেখযোগ্য কার্বন নিঃসরণ জড়িত।
ফাহমি রাধি পরিবেশগত এই উভয়সংকট তুলে ধরে বলেন, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের পরিচ্ছন্নতা না বাড়ালে ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারে দূষণ শুধু যানবাহনের ধোঁয়ার পাইপ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনিতে সরে যাবে। ইন্দোনেশিয়ার পরিবহন খাতের কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে দেশের মোট নির্গমনের প্রায় ২২ শতাংশ হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবদান প্রায় ৫০ শতাংশ। লাখ লাখ মোটরসাইকেল বিদ্যুতায়িত হলে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার না বাড়লে কয়লার ব্যবহারও বেড়ে যেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট প্রবোও আলাদাভাবে ১০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং দুই বছরের মধ্যে ১৩টি ডিজেল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এর লক্ষ্য জ্বালানি আমদানি প্রতিদিন ২ লাখ ব্যারেল কমানো। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, নতুন করে বিদ্যুতায়িত হওয়া লাখ লাখ যানবাহনের বাড়তি চাহিদার চেয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে কি না।
নীতির অস্থিরতা ও শিল্পখাতের উদ্বেগ
নিয়ন্ত্রক নীতির অনিশ্চয়তা রূপান্তর কর্মসূচির প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ আরও বাড়াচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ান ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (আইসমোলি) চেয়ারম্যান বুদি সেতিয়াদি নিশ্চিত করেছেন, উৎপাদকেরা বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যকে সমর্থন করলেও, "ব্যবসার কার্যকারিতা বজায় রাখতে নীতির নিশ্চয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ"। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, সরকারের সহায়তার কাঠামো অস্থিতিশীল হওয়ায় কিছু নির্মাতা হতাশ হয়ে পড়ছেন।
বৈদ্যুতিক যান কেনায় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি চালু হওয়া সরকারি প্রণোদনার মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। ২০২৫ সালজুড়ে বারবার পিছিয়ে দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত জানায়, নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রণোদনা দেওয়া হবে না। নীতির এমন ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগ পরিকল্পনার পরিবেশকে অত্যন্ত অস্থিতিশীল করেছে। এদিকে মোটরসাইকেলের সামগ্রিক বাজারও স্থবির। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ০.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর জ্বালানির দাম বাড়ার পর ২০২৬ সালের মার্চে বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.২ শতাংশ কমে যায়।
১২ কোটি রূপান্তরে ভর্তুকি দেওয়ার আর্থিক হিসাব বেশ কঠিন। আগের কর্মসূচির মতো সরকার প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ১ কোটি রুপিয়াহ সহায়তা দিলে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১,২০০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ, যা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। ইন্দোনেশিয়ার ২০২৫ সালের জ্বালানি ভর্তুকির মোট ব্যয় ২৬.৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহর তুলনায় এ অঙ্ক প্রায় ৪৫ গুণ বেশি। এতে আর্থিকভাবে কর্মসূচিটি টেকসই কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
শিল্পমন্ত্রী আগুস গুমিওয়াং কার্তাসাসমিতা জানিয়েছেন, সরকার এমন নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হওয়া সব মোটরসাইকেল বৈদ্যুতিক হওয়া বাধ্যতামূলক হবে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য পেট্রলচালিত মোটরসাইকেল উৎপাদন ধাপে ধাপে বন্ধ হতে পারে, যদিও আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় রপ্তানি অব্যাহত থাকবে। তবে রূপান্তর ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে এমন বাধ্যবাধকতা দিলে পুরোনো যানবাহনের মালিকেরা কার্যত বিপাকে পড়তে পারেন, অথবা অনিরাপদ ও সনদহীন রূপান্তরে বাধ্য হতে পারেন।
বিকল্প পথ ও বেসরকারি খাতের উদ্যোগ
কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, বেসরকারি খাতের কিছু উদ্যোগ থেকে বোঝা যায় যে সীমিত পরিসরেও এ খাতের বিকাশ সম্ভব। চীনা বৈদ্যুতিক যানবাহন নির্মাতা ইয়াদেয়া পশ্চিম জাভার বেকাসিতে ২৮ হাজার বর্গমিটারের একটি উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করেছে, যার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩ লাখ ইউনিট। দেশীয় স্টার্টআপ মাকা মোটরস সম্প্রতি তাদের নকশা করা মাকা ক্যাভালরি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল বাজারে এনেছে। একবার চার্জে ১৬০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম এই মডেলটিতে রয়েছে উন্নত পুনরুৎপাদনমূলক ব্রেকিং ব্যবস্থা। এসি ভেঞ্চারসের সহ-নেতৃত্বে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের প্রাথমিক তহবিল সংগ্রহের পর মডেলটি উন্মোচন করা হয়।
অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ নির্মাতা পিটি ধর্মা পলিমেটাল দুই চাকা ও চার চাকার যানবাহনের ব্যাটারি প্যাক, চার্জিং স্টেশন ও রূপান্তর প্রযুক্তি নিয়ে সমন্বিত একটি ব্যবস্থা ‘ধর্মা কানেক্ট’ চালু করেছে। কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর ইরিয়ান্তো সান্তোসো বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে "স্থানীয় মেধার তৈরি উদ্ভাবনী পণ্য বিকাশের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরকে সমর্থনের" অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয়েছে।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞেরা ব্যাপক রূপান্তরের লক্ষ্য থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন। ফ্যাবি তুমিওয়ার মতে, শুরুতে অনলাইন মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক, পণ্য পরিবহনকারী কুরিয়ার এবং শিল্পাঞ্চলের কর্মীদের মতো বেশি ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করা উচিত। এভাবে প্রায় ২০ লাখ যানবাহন রূপান্তর করলে বছরে সর্বোচ্চ ৮ লাখ কিলোলিটার জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে। অন্যরা ১০ বছরের বেশি পুরোনো মোটরসাইকেলের মালিকদের পুরোনো যান জমা দিয়ে নতুন বৈদ্যুতিক যান কেনার সুযোগ দিতে ‘পুরোনোর বদলে নগদ’ কর্মসূচির প্রস্তাব করেছেন; এতে পুরোনো মোটরসাইকেলে নতুন প্রযুক্তি বসানোর প্রয়োজন পড়বে না।
জাকার্তা, সুরাবায়া ও বান্দুংকেন্দ্রিক পরীক্ষামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মশালার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শপিং সেন্টারে সীমাবদ্ধ বর্তমান চার্জিং অবকাঠামো আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা বলছে, পুরোনো মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী যাত্রীরা ইএমসি গ্রহণে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। তাই নতুন মডেলের বদলে পুরোনো যানবাহনকে লক্ষ্য করলে প্রতিটি রূপান্তরের বিপরীতে পরিবেশগত সুফল সর্বাধিক হতে পারে।
ফাহমি রাধির মতে, ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বদলে বাস্তব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমাদের এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত, যা প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটায়। অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন না-ও হতে পারে।" তিনি আরও বলেন, "জ্বালানির দাম বাড়ার মতো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা সমাধানের উপযোগী নয় এসব কর্মসূচি।"
মূল কথা
- জ্বালানিতে স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট প্রবোওর পরিকল্পনায় তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ১২ কোটি পেট্রলচালিত মোটরসাইকেলকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে চায় ইন্দোনেশিয়া।
- দেশজুড়ে বর্তমানে সনদপ্রাপ্ত রূপান্তরকেন্দ্র মাত্র ৩৯টি, যেখানে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দরকার ১৬ হাজার থেকে ২৭ হাজার কেন্দ্র।
- আগের কর্মসূচিতে ২০২৩ সালে ৫০ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৫০ হাজার রূপান্তরের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে রূপান্তর করা হয় যথাক্রমে মাত্র ১৪৫টি ও ১,৬১৫টি মোটরসাইকেল।
- ইন্দোনেশিয়ার প্রায় ৫৬ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে কয়লা থেকে, যা যানবাহন বিদ্যুতায়নের পরিবেশগত সুফল সীমিত করে।
- যানবাহনের কাঠামোয় পরিবর্তন, ব্যাটারিতে আগুন লাগা এবং তাপ অপসারণ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ ব্যাপক হারে পুরোনো যান রূপান্তরের পথে প্রযুক্তিগত বাধা।
- ১২ কোটি মোটরসাইকেল রূপান্তরে পুরো ভর্তুকি দিলে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- বিশেষজ্ঞেরা সবার মোটরসাইকেল রূপান্তরের বদলে বেশি ব্যবহার হওয়া বাণিজ্যিক যান এবং পুরোনো মোটরসাইকেলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।






