২০ বছর ধরে ইঁদুর ক্লোন করার পর কঠিন সীমায় পৌঁছালেন বিজ্ঞানীরা

পড়তে 9 মিনিট
microscope, investigation, scientific, laboratory, biology, microscope, microscope, microscope, m...

৫৮তম প্রজন্মের পতন

টানা দুই দশক ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অনির্দিষ্টকাল ক্লোন করার প্রচেষ্টায় জৈবিক দেয়ালে এসে ঠেকেছেন জাপানি বিজ্ঞানীরা। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলা এক গবেষণায় ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এক মাদি দাতা ইঁদুর থেকে ১,২০০টিরও বেশি ক্লোন তৈরি করেন, এভাবে টানা ৫৭ প্রজন্ম ধরে ক্লোন তৈরি করেন। কিন্তু ৫৮তম প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা করলে প্রতিটি নবজাতক জন্মের এক দিনের মধ্যেই মারা যায়। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক প্রমাণ পাওয়া গেল যে শুধু ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা নিজেদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে পারে না।

সূচিপত্র
  1. ৫৮তম প্রজন্মের পতন
  2. দুই দশকের জিনগত ম্যারাথন
  3. ফটোকপি করার সমস্যা
  4. যৌন প্রজনন কেন গুরুত্বপূর্ণ
  5. প্রযুক্তিগত সীমা ও জৈবিক বাস্তবতা
  6. সংরক্ষণ ও শিল্পে প্রভাব
  7. সমাধানের খোঁজে
  8. সারকথা

Nature Communications সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ধারাবাহিক ক্লোনিংয়ের একটি কঠোর সীমা নির্ধারণ করেছে। যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে করলে এ প্রক্রিয়া অনন্তকাল চলতে পারে—এমন আগের ধারণারও বিরোধিতা করেছে এটি। গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক তেরুহিকো ওয়াকায়ামা ক্লোনিং গবেষণায় নিজের কর্মজীবন উৎসর্গ করেছেন। ফলাফল নিয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন,

আমরা বিশ্বাস করতাম, অসীমসংখ্যক ক্লোন তৈরি করতে পারব। এ কারণেই এই ফলাফলগুলো এত হতাশাজনক। এই মুহূর্তে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার কোনো উপায় আমাদের জানা নেই।

গবেষকেরা এ ঘটনাকে "মিউটেশনজনিত বিপর্যয়" বলে বর্ণনা করেছেন। এটি মুলারের র‍্যাচেট নামে পরিচিত শতাব্দীপ্রাচীন বিবর্তনীয় তত্ত্বকে সমর্থন করে। তত্ত্বটি বলছে, অযৌন প্রজননে ক্ষতিকর মিউটেশন অনিবার্যভাবে জমতে থাকে, একপর্যায়ে বংশধারা আর টিকে থাকতে পারে না। উদ্ভিদ ও কিছু নিম্নশ্রেণির প্রাণী দৃশ্যত সীমাহীনভাবে ক্লোনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারলেও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা জৈবিকভাবে এই জিনগত ফাঁদ এড়াতে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দুই দশকের জিনগত ম্যারাথন

২০০৫ সালের জানুয়ারিতে এই পরীক্ষা শুরু হয়। সে সময় ওয়াকায়ামার দল সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাদামি লোমের একটি মাদি দাতা ইঁদুর থেকে প্রথম ক্লোন তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে দাতা কোষের নিউক্লিয়াস (এ ক্ষেত্রে বিকাশমান ডিম্বাণুকে পুষ্টি জোগানো কিউমুলাস কোষ) সরিয়ে সেটি এমন একটি নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করা হয়, যেখান থেকে মূল নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ডলি ভেড়া এবং ১৯৯৮ সালে প্রথম ক্লোন করা ইঁদুর কিউমুলিনা তৈরিতেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রথম ক্লোনটির বয়স তিন মাস হলে গবেষকেরা সেটিকে ক্লোন করেন, এরপর সেই ক্লোনটিকেও ক্লোন করেন। প্রতি তিন থেকে চার মাসে এভাবে চক্রটি পুনরাবৃত্তি করা হয়। পরবর্তী সব ক্লোনই ছিল মাদি এবং মূল দাতা ইঁদুরটির মতো একই রকম বাদামি লোমের। পুরো প্রক্রিয়ায় দলটি কঠোরভাবে একই পদ্ধতি বজায় রাখে। পার্থক্য কমাতে সব প্রজন্মে নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার করেন একই দুই গবেষক।

প্রথম ২৫ প্রজন্মের ফলাফল ছিল আশ্চর্যজনকভাবে আশাব্যঞ্জক। সাফল্যের হার বরং বাড়ে: শুরুর দিকের প্রচেষ্টায় ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬তম প্রজন্মে হয় ১৫.৫ শতাংশ। ইঁদুরগুলোর শরীরে দৃশ্যমান কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি, তারা প্রায় দুই বছর স্বাভাবিক আয়ু পেয়েছে এবং স্বাভাবিক পুরুষ ইঁদুরের সঙ্গে মিলনের পর সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছে। ২০১৩ সালে ওয়াকায়ামার দল প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করে জানায়, ধারাবাহিক ক্লোনিং সম্ভবত অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া যাবে।

তবে প্রথম গবেষণায় গবেষকেরা গভীর জিনগত সিকোয়েন্সিং করেননি। আরও ১৩ বছর পরীক্ষা চালিয়ে বিভিন্ন প্রজন্মের ক্লোনের জিনোম বিশ্লেষণ করলে তারা মিউটেশন জমার একটি উদ্বেগজনক ধারা আবিষ্কার করেন, যা শেষ পর্যন্ত এই বংশধারার পতন ঘটায়।

বিজ্ঞাপন

ফটোকপি করার সমস্যা

৬ষ্ঠ থেকে ৫৭তম প্রজন্মের দশটি ক্লোন করা ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোমের সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বংশধারায় জমে থাকা প্রায় ৩,৭০০টি একক নিউক্লিওটাইড ভ্যারিয়েন্ট এবং ৮০টি ইনসারশন-ডিলিশন মিউটেশন শনাক্ত করেন। প্রতি প্রজন্মে জিনগত কোডে গড়ে ৬৯.৪টি একক নিউক্লিওটাইড পরিবর্তন এবং ১.৪টি কাঠামোগত পরিবর্তন যুক্ত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব হার প্রাকৃতিক মিউটেশনের হারের কাছাকাছি হলেও, সময়ের সঙ্গে এই ত্রুটিগুলোর কী হয়, সেটিই মূল পার্থক্য।

গবেষকেরা এই প্রক্রিয়ার তুলনা করেছেন একটি ছবি বারবার ফটোকপি করার সঙ্গে। প্রথম কপিটি মূল ছবির প্রায় হুবহু হলেও তাতে থাকে ছোটখাটো ত্রুটি। সেই কপির আবার কপি করলে ত্রুটিগুলো জমতে থাকে। কয়েক ডজনবার পুনরাবৃত্তির পর ছবিটির সঙ্গে মূল ছবির মিল সামান্যই থাকে। জীববিজ্ঞানের ভাষায়, যৌন প্রজননের সময় যে জিনগত পুনর্বিন্যাস ঘটে, তা না থাকলে বংশধারা থেকে ক্ষতিকর মিউটেশন দূর করার কোনো উপায় থাকে না।

২৭তম প্রজন্ম থেকে ক্রোমোজোমের স্থানান্তর এবং হেটেরোজাইগোসিটির ক্ষয়সহ বড় ধরনের কাঠামোগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে শুরু করে। কয়েকটি ইঁদুরের X ক্রোমোজোমের সম্পূর্ণ কপি হারিয়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে এই ত্রুটি আরও সাধারণ হয়ে ওঠে। এসব কাঠামোগত ভ্যারিয়েন্ট বিশেষভাবে বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়, কারণ সাধারণ বিন্দু মিউটেশনের তুলনায় এগুলো জিনোমের অনেক বড় অংশকে প্রভাবিত করে।

প্রাকৃতিক মিলনের মাধ্যমে জন্মানো ইঁদুরের তুলনায় মিউটেশনের বোঝা তিন গুণে পৌঁছায়। ৫৭তম প্রজন্মে বেঁচে থাকার হার নেমে আসে ০.৬ শতাংশে। এরপরও বাইরে থেকে সুস্থ দেখানো এসব প্রাণীর মধ্যে ছিল প্রাণঘাতী জিনগত ক্ষতি, যা ৫৮তম প্রজন্মে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।

যৌন প্রজনন কেন গুরুত্বপূর্ণ

স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অযৌন ক্লোনিংয়ের বদলে কেন যৌন প্রজননের পথে বিবর্তিত হয়েছে, তার জোরালো প্রমাণ দিয়েছে এই গবেষণা। ২০তম, ৫০তম ও ৫৫তম প্রজন্মের ক্লোন করা মাদি ইঁদুরের সঙ্গে স্বাভাবিক পুরুষ ইঁদুরের মিলন ঘটিয়ে ফলাফলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখেন গবেষকেরা। ২০তম প্রজন্মের ক্লোনগুলোর প্রতিবার গড়ে ৯.৯টি বাচ্চা হয়, যা স্বাভাবিকভাবে প্রজনন করা ইঁদুরের কাছাকাছি। অন্যদিকে ৫০তম প্রজন্মের ক্লোনগুলোর প্রতিবার বাচ্চা হয় গড়ে ২.৮টি এবং ৫৫তম প্রজন্মের ক্লোনগুলোর হয় মাত্র ২.২টি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই বাচ্চাগুলোকে (মূল ক্লোনগুলোর নাতি-নাতনিদের) আরও প্রজনন করালে প্রতি বারে বাচ্চার সংখ্যা বেড়ে ৭.০ হয় এবং জিনগত বিশ্লেষণে তাদের জিনোম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার প্রমাণ মেলে। ক্রোমোজোমের পুনর্বিন্যাস ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যৌন প্রজনন কার্যকরভাবে জমে থাকা মিউটেশনগুলো ছেঁকে বাদ দিয়েছিল।

ওয়াকায়ামা সহজভাবে প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে বলেন,

ক্লোনিংয়ে সব জিন পরবর্তী প্রজন্মে যায়, অর্থাৎ সব ত্রুটিপূর্ণ জিনও চলে যায়। এসব মিউটেশন জমতেই থাকে বলে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে পারে না।

এই ফলাফল জিনতত্ত্ববিদ হারমান জোসেফ মুলারের ১৯৩২ সালে প্রস্তাবিত তাত্ত্বিক মডেল মুলারের র‍্যাচেটকে সমর্থন করে। এ মডেল অনুযায়ী, অযৌন বংশধারায় ক্ষতিকর মিউটেশন অনিবার্যভাবে জমতে থাকে, একপর্যায়ে "মিউটেশনজনিত বিপর্যয়" ও বিলুপ্তি ঘটে। ব্যাকটেরিয়া ও কিছু সরল প্রাণী অন্য প্রক্রিয়ায় মিউটেশন দূর করতে পারলেও, প্রজন্মের পর প্রজন্ম জিনোমের অখণ্ডতা বজায় রাখতে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যৌন প্রজননের জিনগত অদলবদলের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিগত সীমা ও জৈবিক বাস্তবতা

পরীক্ষা চলাকালে গবেষকেরা ট্রাইকোস্ট্যাটিন এ (TSA) ব্যবহার করেন। এটি একটি হিস্টোন ডিঅ্যাসিটাইলেজ ইনহিবিটর, যা ডিএনএর প্রোটিনে মোড়ানো গঠন শিথিল করে নিউক্লিয়ার রি-প্রোগ্রামিংয়ে সহায়তা করে। এর ফলে ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশের সময় জিনগুলো ঠিকভাবে সক্রিয় হতে পারে। এই রাসায়নিক সহায়তা শুরুর দিকের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এতে ক্লোনিংয়ের দক্ষতা ছয় গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল।

৫০ প্রজন্ম পরও TSA কার্যকর ছিল। TSA দিয়ে চিকিৎসা করা নিউক্লিয়ার ট্রান্সফারে সাফল্যের হার ছিল ৫.৪ শতাংশ, আর চিকিৎসা ছাড়া ছিল ১.৬ শতাংশ। এতে প্রমাণিত হয়, শেষ দিকের প্রজন্মগুলোর ব্যর্থতার কারণ এপিজেনেটিক অস্বাভাবিকতা (জিন কীভাবে নিজেদের প্রকাশ করে, তার ত্রুটি) নয়; বরং ডিএনএ সিকোয়েন্সের ভেতরে স্থায়ীভাবে লেখা জিনগত মিউটেশন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেষ দিকের প্রজন্মগুলোর ক্লোনের ডিম্বাণু (ওসাইট) নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম—দুই অংশেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। গবেষকেরা ৫৬তম প্রজন্মের একটি ক্লোনের ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াস সুস্থ জিনগত উপাদান দিয়ে বদলে দিলে, কিংবা ক্লোনটির নিউক্লিয়াস রেখে সাইটোপ্লাজম বদলে দিলে, দুই ক্ষেত্রেই ভ্রূণের বিকাশের ফল খারাপ হয়। এতে কোষের সার্বিক ক্ষতির ইঙ্গিত মেলে।

জিনগত ক্ষতির বোঝা থাকা সত্ত্বেও, জন্মের পর টিকে থাকা শেষ দিকের প্রজন্মগুলোর অধিকাংশ ক্লোন বাইরে থেকে সুস্থ ছিল। তাদের আয়ু ছিল স্বাভাবিক এবং দৃশ্যমান শারীরিক অস্বাভাবিকতা ছিল না। তাদের গর্ভফুল অস্বাভাবিকভাবে বড় হলেও স্বাভাবিকভাবে কাজ করত। এই সহনশীলতা দেখায়, প্রাণীদেহের স্তরে জিনগত ভিন্নতার প্রতি স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সহনশীলতা বিস্ময়কর; তবে মিউটেশন জমতে জমতে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক ক্লোনিং অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সংরক্ষণ ও শিল্পে প্রভাব

ক্লোনিং প্রযুক্তির যেসব কাল্পনিক প্রয়োগ জনসাধারণের কল্পনাশক্তি ও গবেষণার অর্থায়নকে আকৃষ্ট করেছে, এই ফলাফলগুলো সেগুলোর ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন, সংরক্ষিত কোষ থেকে জিনগতভাবে অভিন্ন বিকল্প জনগোষ্ঠী তৈরি করে ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে বিপন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করা যাবে। একইভাবে, কৃষি গবেষকেরা ওয়াগিউ গরুর মতো উন্নত গবাদিপশু ব্যাপক হারে তৈরি করে উচ্চমূল্যের মাংস আরও সাশ্রয়ী করার কথা ভেবেছিলেন।

গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয়, এসব প্রয়োগে মৌলিক জৈবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একক প্রাণী ক্লোন করা সম্ভব হলেও, ধারাবাহিক ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের স্বনির্ভর জনগোষ্ঠী তৈরি করা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। এমনকি হিমায়িত "জিনব্যাংকে" জিনগত উপাদান সংরক্ষণ করে মহাপ্রলয়ের পর প্রজাতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও জমে থাকা মিউটেশন দূর করতে যৌন প্রজনন প্রয়োজন হবে; শুধু সংরক্ষিত কোষ থেকে ক্লোন করলেই চলবে না।

গবেষণাটি অভিন্ন ক্লোনের সেনাবাহিনী নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্যপটেরও অবসান ঘটায়। রসিকতা করে ওয়াকায়ামা বলেন, এই ফলাফলের পর স্টার ওয়ার্সের প্রিক্যুয়েল "অ্যাটাক অব দ্য ক্লোনস"-এ দেখানো ক্লোন সৈন্য তৈরি অসম্ভব। মৃত বিড়াল ও কুকুরের ক্লোন তৈরি করতে হাজার হাজার ডলার নেওয়া পোষা প্রাণীর ক্লোনিং শিল্পেও ক্লোন করা প্রাণীর জিনগত সাদৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, ক্লোন মূল দাতা প্রাণীর নিখুঁত অনুলিপি নয়। এই ভুল ধারণা গবেষণাটির আগেও কিছু বিজ্ঞানীর মধ্যে ছিল। প্রতিটি ক্লোনের নিজস্ব মিউটেশন থাকে, যা জিনগতভাবে তাকে মূল দাতা ও তার সহক্লোনদের থেকে আলাদা করে।

সমাধানের খোঁজে

ওয়াকায়ামা স্বীকার করেন, মিউটেশন জমার সমস্যা এড়ানোর কোনো পথ বর্তমান প্রযুক্তিতে নেই। তিনি বলেন,

আমার বিশ্বাস, নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার প্রযুক্তিকে মৌলিকভাবে উন্নত করে এমন একটি নতুন পদ্ধতি আমাদের উদ্ভাবন করতে হবে,

তবে এ ধরনের উদ্ভাবনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেননি তিনি।

বিকল্প পদ্ধতিতে মিউটেশনের বোঝা কমাতে ক্লোন করা বংশধারাকে মাঝে মাঝে যৌন প্রজননে ফিরিয়ে আনা, তারপর আবার ক্লোনিং শুরু করার কথা ভাবা যেতে পারে। তবে এতে বিশুদ্ধ জিনগত বংশধারা বজায় রাখার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি দিয়ে মিউটেশন জমার আগেই সেগুলো সংশোধন করা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব, কিন্তু জমে থাকা হাজারো ভ্যারিয়েন্টের মধ্যে কোনগুলো ক্ষতিকর তা শনাক্ত করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।

গবেষণাটি এত দীর্ঘ সময় ধরে চলায় শিগগিরই এর পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ২০ বছরে গবেষকেরা ৩০,০০০টিরও বেশি নিউক্লিয়ার ট্রান্সফারের চেষ্টা করেছেন। এতে এমন সম্পদ ও ধৈর্য প্রয়োজন, যা খুব কম গবেষণাগারেরই আছে। প্রাণী গবেষণা নিয়ে ইউরোপীয় নিয়মকানুন আজ এমন দীর্ঘ পরীক্ষা সম্ভবত অনুমোদন করবে না। তাই এটি এমন এক অনন্য তথ্যভান্ডার, যা বহু বছর চ্যালেঞ্জহীন থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সারকথা

  • জাপানি গবেষকেরা ২০ বছর ধরে টানা ৫৮ প্রজন্মে ইঁদুর ক্লোন করে এক দাতা থেকে ১,২০৬টি প্রাণী তৈরি করেছেন।
  • ৫৮তম প্রজন্মের সব ক্লোন জন্মের এক দিনের মধ্যেই মারা যায়। এর মধ্য দিয়ে স্তন্যপায়ী প্রাণীর ধারাবাহিক ক্লোনিংয়ের প্রথম পরীক্ষামূলক সীমা নির্ধারিত হয়েছে।
  • জিনগত মিউটেশন প্রাকৃতিক প্রজননের তুলনায় তিন গুণ হারে জমেছে। এর মধ্যে ছিল X ক্রোমোজোম হারানো এবং ডিএনএতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন।
  • ফলাফল মুলারের র‍্যাচেট তত্ত্বকে সমর্থন করে এবং দেখায়, অযৌন প্রজননে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে "মিউটেশনজনিত বিপর্যয়" ঘটে।
  • শেষ দিকের প্রজন্মের ক্লোনকে স্বাভাবিক পুরুষের সঙ্গে প্রজনন করালে যৌন প্রজনন জমে থাকা মিউটেশনের প্রভাব উল্টে দিতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে; এতে সুস্থ নাতি-নাতনি জন্মেছে।
  • বিপন্ন প্রজাতি রক্ষা, গবাদিপশুর ব্যাপক উৎপাদন এবং পোষা প্রাণী ক্লোন করার মতো প্রয়োগ এসব জিনগত সীমাবদ্ধতার কারণে মৌলিক বাধার মুখে পড়েছে।
  • গবেষকদের সিদ্ধান্ত, উদ্ভিদ ও নিম্নশ্রেণির প্রাণীদের বিপরীতে স্তন্যপায়ী প্রাণীরা শুধু ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকাল নিজেদের প্রজাতি টিকিয়ে রাখতে পারে না।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে