ফাঁকি দেওয়ার কৌশল ঠেকাতে প্রতিরক্ষা জোরদার ব্রাসেলসের
মিসর, বাহরাইন ও থাইল্যান্ডে কার্যক্রম চালানো চীনা কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত গ্লাস ফাইবার পণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে চীনের বাণিজ্যিক শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। ২০২৫ সালের মার্চে ঘোষিত এ ব্যবস্থায় পণ্যের মূল্যের ১১% থেকে ২৫.৪% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান শুল্ক এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করাই এর লক্ষ্য।
সূচিপত্র
- ফাঁকি দেওয়ার কৌশল ঠেকাতে প্রতিরক্ষা জোরদার ব্রাসেলসের
- বড় স্থানান্তর: আগের শুল্ক এড়াল যেভাবে চীনা কোম্পানিগুলো
- আইনি নজির: মিসরের ভর্তুকির উৎস যখন বেইজিং
- শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া: স্বস্তির সঙ্গে উদ্বেগ
- অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব: সরবরাহ শৃঙ্খল ও দামের চাপ
- তদন্ত প্রক্রিয়া ও মেয়াদ
- ইইউর বাণিজ্য সুরক্ষার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি
- মূল কথা
ইউরোপের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য গ্লাস ফাইবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। হালকা ওজনের এই শক্তিবর্ধক উপাদান ব্যবহৃত হয় বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনের ব্লেড, সৌর প্যানেলের বিভিন্ন অংশ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং মহাকাশ প্রযুক্তিতে। ব্রাসেলস সবুজ রূপান্তরের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ায় এসব কৌশলগত উপকরণের দেশীয় উৎপাদন সুরক্ষিত করা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। ইইউর আটটি দেশে এ শিল্পে সরাসরি ৪,৫০০-এর বেশি কর্মী কাজ করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়ে আরও কয়েক লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানও এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমান তদন্তে ইউরোপীয় উৎপাদকদের বহুদিনের সন্দেহের সত্যতা মিলেছে। চীন থেকে সরাসরি আমদানিতে কমিশন ২০১০ সালে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের পর চীনা উৎপাদকরা তৃতীয় দেশগুলোতে কারখানা স্থাপন করে। এসব কারখানা প্রায়ই বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তির আওতায় তৈরি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত। এতে চীনের শিল্প উৎপাদন দেশের সীমানার বাইরে কার্যত সম্প্রসারিত হয়েছে, আর পণ্যে চীনা না লিখে মিসরীয়, বাহরাইনি বা থাই পরিচয় দিয়ে শুল্ক এড়ানো গেছে।
২০২৪ সালের মধ্যে এই তিন দেশ থেকে আমদানি ইইউর গ্লাস ফাইবার বাজারের ২৪% দখল করে; শুধু মিসর থেকেই আসে ১৮%। স্বল্পমূল্যের পণ্যের এই প্রবাহ দেশীয় উৎপাদকদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিপুল সরকারি ভর্তুকি পেয়েছে এবং উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেছে। সম্প্রতি আরোপিত শুল্ক বাজারে প্রতিযোগিতার সমতা ফেরাতে ব্রাসেলসের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। তবে শুল্কের হার অন্যায্য কম দামে বিক্রির কৌশল ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে শিল্প খাতের নেতারা সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন তুলেছেন।
বড় স্থানান্তর: আগের শুল্ক এড়াল যেভাবে চীনা কোম্পানিগুলো
২০১৩ সালে চালুর পর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধরন আমূল বদলে দিয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ, কাঁচামাল আহরণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিদেশে স্থানান্তরের কাজে বেইজিং ১৫০টিরও বেশি দেশে আনুমানিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। গ্লাস ফাইবার খাতে এর অর্থ ছিল, চীনা উৎপাদকরা মিসরের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে কার্যক্রম স্থাপন করতে পেরেছে। এর ফলে ইউরোপীয় বাণিজ্য সুরক্ষা এড়িয়ে বিদেশে চীনা ভূখণ্ডের কার্যত সম্প্রসারণ ঘটেছে।
২০১০ সালের শুল্ক কার্যকর হওয়ার কিছু পরই এ প্রবণতা শুরু হয়। চীনে তৈরি গ্লাস ফাইবারের ওপর শুল্ক দেওয়ার বদলে চায়না জুশির মতো কোম্পানিগুলো মিসর ও বাহরাইনে কারখানা স্থাপন করে। এসব কারখানা স্থানীয় সরকার ও বেইজিংয়ের মধ্যে চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয় এবং প্রায়ই মিসরীয় ও চীনা—উভয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিপুল ভর্তুকি পায়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালত এ ব্যবস্থার সত্যতা নিশ্চিত করে। আদালত জানায়, ইইউর বাণিজ্য আইনে চীনের দেওয়া ভর্তুকি আইনত মিসরের উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
আদালতের রায়ে ২০২০ সালে মিসরে তৈরি গ্লাস ফাইবার রিইনফোর্সমেন্ট পণ্যে আরোপিত ১৩.১% অ্যান্টি-সাবসিডি ব্যবস্থা বহাল থাকে। বিচারকেরা স্বীকার করেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তির আওতায় তৈরি মিসরের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কার্যক্রম চালানো চীনা কোম্পানিগুলো মূলত চীনা শিল্পনীতির সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে। বর্তমান অ্যান্টি-ডাম্পিং মামলার জন্য এ আইনি নজির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। এতে অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা নির্ধারণের সময় তৃতীয় দেশে উৎপাদিত পণ্যকে চীনা পণ্য হিসেবে বিবেচনার ক্ষমতা পেয়েছে ব্রাসেলস।
এই আইনি সাফল্য সত্ত্বেও গ্লাস ফাইবার শিল্পের দাবি, আগের শুল্কের হার আমদানির প্রবাহ ঠেকাতে পারেনি। মিসরের নিজস্ব বাজার প্রায় না থাকলেও দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ৪ লাখ টনে পৌঁছেছে। ফলে দেশটি কার্যত চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনের রপ্তানি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। চীনের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ইউরোপের চাহিদার দ্বিগুণ হওয়ায় উৎপাদকদের সতর্কবার্তা, তৃতীয় দেশগুলোতে উৎপাদন অব্যাহতভাবে বাড়লে পুরো মহাদেশে কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আইনি নজির: মিসরের ভর্তুকির উৎস যখন বেইজিং
সীমান্ত পেরিয়ে দেওয়া ভর্তুকিসংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালত এসব ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে বায়োডিজেল রপ্তানিসংক্রান্ত এক রায়ে জেনারেল কোর্ট জানায়, কাঁচামাল তৃতীয় দেশ থেকে এলেও চীনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া ভর্তুকি মিসরীয় উৎপাদকদের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কমিশনের বিধিমালায় এ যোগসূত্র স্বীকার না করায় আদালত তা বাতিল করে এবং জানায়, চীনা ভর্তুকি ও মিসরীয় উৎপাদকদের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই বলে কমিশন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
এই নজিরই বর্তমান অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্তের পথ খুলে দিয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো যখন ব্যবহৃত রান্নার তেল কেনে বা বেল্ট অ্যান্ড রোডের অর্থায়নে মিসরে কারখানা গড়ে, তখন সেই সুবিধা সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে—যা প্রচলিত বাণিজ্য তদন্তে ধরা নাও পড়তে পারে। বেল্ট অ্যান্ড রোডের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাজ করা মিসরীয় উৎপাদকরা চীনা ভর্তুকি থেকে লাভবান হন বলে আদালতের স্বীকৃতি চীনের বাইরে উৎপাদিত বলে বিবেচিত পণ্যে শুল্ক আরোপের প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
গ্লাস ফাইবারের বাইরেও কমিশন এ কাঠামো প্রয়োগ করেছে। এর আগে থাইল্যান্ডের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং তুরস্কের গ্লাস ফাইবার পণ্য নিয়ে তদন্ত হয়েছে। বিভিন্ন খাতে শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে ব্রাসেলসের পদক্ষেপে ধারাবাহিকতা তৈরি করেছে এসব মামলা। প্রতিটি মামলায় ব্রাসেলসের এ অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে যে, বেল্ট অ্যান্ড রোডের বিনিয়োগ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন তৃতীয় দেশের শিল্প গড়ে তোলে না; বরং বাণিজ্য সুরক্ষা এড়াতে চীনা উৎপাদন সক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটায়।
মিসর, বাহরাইন ও থাইল্যান্ডের উৎপাদনে বর্তমান শুল্ক ২০২৫ সালের মার্চের শুরুতে সরাসরি চীনা আমদানিতে আরোপিত পৃথক ব্যবস্থার পরিপূরক। গ্লাস ফাইবার সুতার ক্ষেত্রে ওই শুল্কের হার ২৬.৩% থেকে ৫৬.১%, যা তৃতীয় দেশের উৎপাদনে প্রয়োগ করা ১১% থেকে ২৫.৪% হারের চেয়ে অনেক বেশি। সরাসরি আমদানি এবং শুল্ক ফাঁকির পথ—দুটিই বন্ধ করার চেষ্টা এই দ্বিমুখী ব্যবস্থার লক্ষ্য। তবে দুই পথের শুল্ক হারে পার্থক্য নিয়ে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা উদ্বিগ্ন; তাদের দাবি, দুই ক্ষেত্রেই শুল্ক সমান হওয়া উচিত।
শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া: স্বস্তির সঙ্গে উদ্বেগ
গ্লাস ফাইবার ইউরোপের সভাপতি লুডোভিক পিরো বলেন, তদন্তে অন্যায্য চর্চার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
তদন্তে অন্যায্য চর্চার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তবে গৃহীত ব্যবস্থাগুলো তৃতীয় দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে চালানো অন্যায্য কৌশল পুরোপুরি মোকাবিলার জন্য এখনো যথেষ্ট নয়।
চীনা পণ্যের আমদানি বেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই এ সংশয় তৈরি হয়েছে। গ্লাস ফাইবার ইউরোপের মহাসচিব সেড্রিক জানসেন্স এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, বাণিজ্য সুরক্ষা এড়ানোর উদ্দেশ্যেই চীনা কোম্পানিগুলো মিসরের অর্থনৈতিক অঞ্চলে কার্যক্রম স্থাপন করেছে।
এই তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এমন একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোম্পানিগুলো স্থাপন করেছে, যা কার্যত বিদেশে চীনা ভূখণ্ডের সম্প্রসারণ। এর ফলে ২০১৪ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
মিসরের উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ৪ লাখ টনে পৌঁছেছে, অথচ দেশটির নিজস্ব বাজার কার্যত নেই। ফলে এসব কারখানা মূলত রাষ্ট্রীয় সহায়তায় নির্ধারিত দামে ইউরোপের বাজারে পণ্য সরবরাহের রপ্তানি মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে।
ইন্ডাস্ট্রি অল ইউরোপের মহাসচিব জুডিথ কির্টন-ডার্লিং কর্মসংস্থানের পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
দীর্ঘ মেয়াদে ইইউ চীনা ডাম্পিংয়ের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ইউরোপে কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল, যা আমাদের শিল্পকে মৌলিকভাবে দুর্বল করে দেবে।
শ্রমিক নেত্রীর উদ্বেগের প্রতিফলন হলো, সরাসরি ৪,৫০০টি চাকরি এবং পুরো মূল্যশৃঙ্খলে আরও কয়েক লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থান এখনো ঝুঁকিতে। বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়ার সময় এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চীনা পণ্যে ব্যাপক হারে শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইউরোপীয় উৎপাদকদের আশঙ্কা, চীনা পণ্য অন্য বাজার থেকে ঘুরে এসে অবশিষ্ট ফাঁকফোকর দিয়ে ইইউর বাজারে ঢুকে পড়তে পারে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব: সরবরাহ শৃঙ্খল ও দামের চাপ
তাৎক্ষণিক বাণিজ্য বিরোধের বাইরেও এসব শুল্ক ইউরোপের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলবে। গ্লাস ফাইবার সুতা কম্পোজিট শিল্পে সিমেন্টজাত উপকরণ, থার্মোপ্লাস্টিক রেজিন ও ইলাস্টোমারকে শক্তিশালী করে এমন বোনা কাপড় তৈরির অপরিহার্য উপাদান। গাড়ি, ট্রাক, ট্রেন, উড়োজাহাজ, ভবনের তাপ নিরোধক, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, শব্দ নিরোধক এবং পরিস্রাবণ ব্যবস্থায়ও এ উপাদান ব্যবহৃত হয়।
সাশ্রয়ী গ্লাস ফাইবারের ওপর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের নির্ভরতা ব্রাসেলসের নীতিনির্ধারণে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনের ব্লেড তৈরিতে বিপুল পরিমাণ এ উপাদান লাগে। সৌর প্যানেল নির্মাতারাও মাউন্টিং ব্যবস্থা ও সুরক্ষামূলক অংশে এটি ব্যবহার করেন। উচ্চ শুল্ক তাত্ত্বিকভাবে ইউরোপীয় উৎপাদকদের সুরক্ষা দেয়, তবে এতে সরবরাহ শৃঙ্খলের মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্নধারার সবুজ প্রযুক্তি নির্মাতাদের খরচ বাড়তে পারে।
কেমঅ্যানালিস্টের বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হলে ২০২৫ সালের মার্চে জার্মানিতে দামে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হবে। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে এশিয়া থেকে সরবরাহ কমে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে বসন্তকালে গাড়ি শিল্পে চাহিদা বাড়লে সাধারণত ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। এর পাশাপাশি শিল্পে ব্যবহৃত সিলিকা বালুর কাঁচামালের দাম বাড়লে দেশীয় উৎপাদকদের উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে।
সম্ভাব্য মার্কিন শুল্কের কারণেও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা বাড়তি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বাণিজ্যে বিঘ্নের আশঙ্কায় বাজারের অংশীজনরা আগেভাগে মজুত নিশ্চিত করতে চাইছেন বলে জানা গেছে। এতে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বেড়ে দাম আরও চাপে পড়ছে। এ আচরণ ইঙ্গিত দেয়, সুরক্ষামূলক শুল্কও কম্পোজিট উপকরণের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপীয় উৎপাদন খাতগুলোতে অনিচ্ছাকৃত মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও মেয়াদ
কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় আধুনিক বাণিজ্যিক বিধি প্রয়োগের জটিলতা স্পষ্ট হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধিমালা ২০১৬/১০৩৬-এর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তদন্ত শুরু হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিনিধিত্বকারী গ্লাস ফাইবার ইউরোপ অভিযোগ দায়ের করে। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্রাথমিক শুল্ক আরোপের পর ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ তা চূড়ান্ত হয়। সাধারণত এসব ব্যবস্থা পাঁচ বছর কার্যকর থাকে এবং পর্যালোচনা না হলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
দেশীয় বাজার নেই এমন দেশে ডাম্পিং তদন্তে পদ্ধতিগত কিছু বিশেষ চ্যালেঞ্জ থাকে। মিসরে স্থানীয়ভাবে গ্লাস ফাইবারের ব্যবহার কার্যত নেই, ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে দামের তুলনা সম্ভব নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী তদন্তকারীরা উৎপাদনের পূর্ণ খরচের সঙ্গে যুক্তিসংগত মুনাফা যোগ করে দেশীয় মূল্য হিসাব করেন; সংজ্ঞা অনুযায়ী এসব কারখানাকে রপ্তানিমুখী কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নির্দিষ্ট নমুনাভুক্ত উৎপাদক, যেমন হেনান গুয়াংইয়ুয়ান নিউ মেটেরিয়াল কোম্পানি লিমিটেডের ক্ষেত্রে সরাসরি আমদানির গ্লাস ফাইবার সুতায় চূড়ান্ত শুল্কের হার ২৬.৩% থেকে শুরু। চীনের অন্যান্য উৎপাদকের ক্ষেত্রে তা ৫৬.১% পর্যন্ত। মিসর, বাহরাইন ও থাইল্যান্ডের উৎপাদনে তৃতীয় দেশের শুল্ক তুলনামূলক কম, ১১% থেকে ২৫.৪%। প্রতিষ্ঠিত কারখানার উৎপাদন ও সরাসরি রপ্তানির ক্ষেত্রে হিসাবের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন লাইনের দিকে তাকিয়ে থাকা শ্রমিকদের কাছে এসব কারিগরি পার্থক্যের গুরুত্ব সামান্য। ইইউর আটটি দেশে গ্লাস ফাইবার উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে এই শুল্ক চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয়, তবে অনিশ্চিত প্রতিরক্ষা। রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাওয়া প্রতিযোগীদের অন্যায্য কম দামে বিক্রি ঠেকাতে ২৫.৪% শুল্ক যথেষ্ট হবে কি না—মহাদেশজুড়ে কারখানা চালু থাকা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার ভাগ্য নির্ধারণে এটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইইউর বাণিজ্য সুরক্ষার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি
বেল্ট অ্যান্ড রোডের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে ব্রাসেলসের কঠোর অবস্থান ইইউর বাণিজ্যনীতিতে বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। চীনা বিনিয়োগ ইউরেশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ায় তৃতীয় দেশের উৎপাদন সত্যিকারের স্বাধীন শিল্পোন্নয়ন, নাকি কেবল শুল্ক এড়ানোর মঞ্চ—তা ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ ক্রমেই খতিয়ে দেখছে। গ্লাস ফাইবারের এ মামলা অন্য খাতেও তদন্তের কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজছে।
কমিশনের এ পদ্ধতিতে বাণিজ্য সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কৌশলের মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড চুক্তিতে বিদেশে চীনা শিল্পনীতির কার্যকর সম্প্রসারণ ঘটানো অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি হয়—এটি স্বীকার করার ফলে ব্রাসেলস আরও বিস্তৃতভাবে শুল্ক ফাঁকিবিরোধী ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারবে। আগের ইইউ শুল্কের পর চীনা কোম্পানিগুলো বিদেশে উৎপাদন স্থাপন করেছে—এমন ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিরামিকসহ অন্যান্য খাতেও এ আইনি কাঠামো প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে শুল্কের হার যথাযথভাবে নির্ধারণের ওপর। শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের দাবি, তৃতীয় দেশের উৎপাদনে বর্তমান ১১% থেকে ২৫.৪% শুল্ক চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির বিপরীতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না। তাদের যুক্তি, বিদ্যমান ১৩.১% অ্যান্টি-সাবসিডি শুল্ক সত্ত্বেও মিসরীয় আমদানি বাজারের ১৮% দখল করেছে, যা প্রমাণ করে আংশিক ব্যবস্থা প্রতিযোগিতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ।
২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব—এমন পাঁচ বছর মেয়াদি শুল্ক ইউরোপীয় শিল্পকে নিজেদের সুসংহত করার সময় দেয়। তবে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনের কাঠামোগত সমাধান না হলে, যা এরই মধ্যে ইউরোপের চাহিদার দ্বিগুণ, সাময়িক শুল্ক শিল্পের স্থানচ্যুতি ঠেকানোর বদলে শুধু বিলম্বিত করতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় গ্লাস ফাইবার উৎপাদকরা যেন অন্যায্য কম দামের কাছে হার না মেনে দেশীয় সবুজ রূপান্তর প্রকল্পে সরবরাহ দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মূল কথা
- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি ঠেকাতে মিসর, বাহরাইন ও থাইল্যান্ডে কার্যক্রম চালানো চীনা কোম্পানিগুলোর গ্লাস ফাইবারে ১১% থেকে ২৫.৪% অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ইউরোপীয় কমিশন।
- ইইউর বাণিজ্য আইনে তৃতীয় দেশে উৎপাদনের সঙ্গে চীনা ভর্তুকি আইনত যুক্ত করা যায় বলে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালতের রায়ের পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
- ২০২৪ সালের মধ্যে এই তিন দেশ থেকে আমদানি ইইউর গ্লাস ফাইবার বাজারের ২৪% দখল করে। মিসরীয় আমদানি একাই পৌঁছায় ১৮%-এ, যদিও দেশটিতে কার্যত কোনো নিজস্ব বাজার নেই।
- শিল্প খাতের নেতারা ও শ্রমিক সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, শুল্কের হার অন্যায্য কম দামে বিক্রি এবং ৪,৫০০ সরাসরি কর্মী ও কয়েক লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে ফেলা সম্ভাব্য কারখানা বন্ধ ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
- চীন থেকে সরাসরি আমদানিতে ২৬.৩% থেকে ৫৬.১% পর্যন্ত পরিপূরক শুল্ক প্রযোজ্য। এতে সরাসরি ও পরোক্ষ—উভয় পথে শুল্ক ফাঁকির বিরুদ্ধে দ্বিমুখী প্রতিরক্ষা তৈরি হয়েছে।
- বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইনের ব্লেড ও সৌর প্যানেলসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গ্লাস ফাইবার। ফলে এ বাণিজ্য বিরোধ ইইউর সবুজ রূপান্তরের সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
- শুল্ক কার্যকর হওয়া এবং সম্ভাব্য মার্কিন শুল্কে বাণিজ্য অনিশ্চয়তা বাড়ার কারণে জার্মানি ও ইউরোপজুড়ে দাম বাড়বে এবং সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হবে বলে বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস।






