সূর্যের আলোয় চলা একটি গ্রাম
সিউলের দক্ষিণ-পূর্বে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে, প্রায় ১৩০ জন বাসিন্দার কৃষিপ্রধান জনপদ গুইয়াং-রিতে ২০২২ সাল থেকে দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ বদলে গেছে। সপ্তাহে ছয় দিন গ্রামবাসীরা বিনা খরচে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে জড়ো হন। এই খাবারের খরচ সরকারি কল্যাণ তহবিল বা দাতব্য অনুদান থেকে আসে না; আসে এক মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ধারাবাহিক উৎপাদন থেকে, যা মাসে প্রায় এক কোটি ওন (৬,৮০০ ডলার) নিট মুনাফা দেয়। গ্রামপ্রধান জিয়ন জু-ইয়ং ব্যাখ্যা করেন, জ্বালানিতে এই স্বনির্ভরতা কীভাবে সামাজিক জীবনে পরিবর্তন এনেছে।
সূচিপত্র
বাসিন্দারা প্রতিদিন একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান, তাই আমরা একে অন্যের মুখ দেখি, কথা বলি। বাসিন্দাদের মধ্যে বন্ধন ও সংহতি অনেক দৃঢ় হয়। জীবন আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। টাকা ব্যক্তিগত আয় হিসেবে ভাগ করে দিলে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। বছরের পর বছর যারা একে অন্যকে চিনতেন না, তারা এখন রেস্তোরাঁর মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই পরিচিত হয়ে উঠছেন।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরুর আগে গুইয়াং-রিতে কোনো রেস্তোরাঁ ছিল না, বয়স্ক বাসিন্দাদের যাতায়াতের সুযোগ ছিল সীমিত এবং সামষ্টিক অবকাঠামোও ছিল ন্যূনতম। এখন সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসা আয়ে বিনা মূল্যের দুপুরের খাবারের পাশাপাশি বয়স্কদের জন্য "হ্যাপিনেস বাস", টেবিল টেনিসের ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের খরচও মেটানো হয়। ব্যক্তিগত লভ্যাংশের বদলে সৌরবিদ্যুতের আয় সামষ্টিক কল্যাণে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রামটি সচেতনভাবেই নিয়েছে; জিয়নের ভাষ্য, বাসিন্দারাই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
হরমুজ প্রণালির ধাক্কায় জেগে ওঠা
দ্রুত সম্প্রসারিত দক্ষিণ কোরিয়ার "সৌর আয় গ্রাম" কর্মসূচির জাতীয় মডেল হয়ে উঠেছে গুইয়াং-রি। ২০৩০ সালের মধ্যে এ কর্মসূচির লক্ষ্য ২,৫০০টি গ্রাম। চলতি বছরেই সরকার এমন ৭০০টি গ্রাম গড়তে চায়, যা আগে প্রতিষ্ঠিত প্রায় ১৫০টি গ্রামের তুলনায় বড় ধরনের গতি বৃদ্ধি। এই তাড়াহুড়োর পেছনে রয়েছে ইরান সংকটকে জ্বালানি রূপান্তরের অস্তিত্ব-সংকটময় অনুঘটক হিসেবে প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের কৌশলগতভাবে তুলে ধরা।
দক্ষিণ কোরিয়া তার প্রাথমিক জ্বালানির ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে চলাচল ব্যাহত হলে বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লি মন্ত্রিসভাকে বারবার সতর্ক করে বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বিপজ্জনক কৌশলগত দায়। তাঁর ভাষায়, দেশের "ভাগ্য" নির্ভর করছে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতে রূপান্তরের গতি বাড়ানোর ওপর।
জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশমন্ত্রী কিম সুং-হোয়ান এই তাগিদকে বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
বিশ্বজুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের গতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কোরিয়াকেও তাই গতি বাড়াতে হবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান সংঘাতের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। জ্বালানির দামে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে তেল ছাড়ার মতো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, সংকট এমন কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করেছে যা সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান করা যায় না।
প্রাথমিক মডেল থেকে জাতীয় অবকাঠামো
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার ত্বরান্বিত রূপরেখা প্রকাশ করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ প্রায় ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। সম্পূরক বাজেটে জ্বালানি রূপান্তর উদ্যোগের জন্য প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ওন বরাদ্দ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বার্ষিক সহায়তা রেকর্ড ১.১ ট্রিলিয়ন ওনে (৬৭ কোটি ডলার) পৌঁছেছে। এ ছাড়া, সৌর গ্রাম কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্টভাবে ৪০০ বিলিয়ন ওনের স্বল্প সুদের ঋণ দেওয়া হবে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব লক্ষ্যের পক্ষে জোরালো অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। অনুমোদন পেতে জটিলতা এবং সীমিত পরিসরে বাস্তবায়নের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় সৌর ও বায়ুশক্তির বর্তমান ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৮০ থেকে ২৫০ শতাংশ বেশি হলেও, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতুল্য ব্যয় ইতিমধ্যেই এলএনজিচালিত বিদ্যুতের প্রান্তিক জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে, এমনকি তার চেয়েও কম হতে পারে। এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২০ ডলারে দ্বিগুণ হওয়ায়, প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ০.০৭ থেকে ০.১১ ডলার ব্যয়ের সৌরবিদ্যুৎ এখন প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প।
এই কৌশল গ্রামীণ গ্রামের বাইরেও শিল্প খাতের রূপান্তরকে অন্তর্ভুক্ত করে। সরকার এমন RE100 শিল্পাঞ্চল গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অধিকাংশ বা সব জ্বালানির চাহিদা মেটানো হবে। ব্যয় কমাতে উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে ভোগকেন্দ্রের কাছাকাছি রাখা হবে। বাণিজ্যিক, আবাসিক ও কৃষি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নেতৃত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর।
সেমিকন্ডাক্টর ও জ্বালানি নিরাপত্তার যোগসূত্র
এই সংকট দেখিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি দুর্বলতা শুধু বাসাবাড়ির বিদ্যুতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনীতির শিল্পভিত্তিক ভিতকেও প্রভাবিত করে। স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের প্রাধান্য থাকা দেশটির সেমিকন্ডাক্টর খাত শেয়ারবাজারের মোট মূলধনের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিশ্বের উচ্চ-ব্যান্ডউইডথ মেমরি উৎপাদনের ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী। এসব কারখানায় বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
গিয়ংগি প্রদেশের ইয়ংইনে নির্মাণাধীন বিশাল নতুন সেমিকন্ডাক্টর কমপ্লেক্সটি ২০২৭ সালে আংশিকভাবে চালু হওয়ার কথা। এটি চালাতে ১৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে, যা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ। চিপ তৈরির ব্যয়ে জ্বালানির অংশ ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য উন্নত মেমরি প্রযুক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষয় করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপরীতে, তাইওয়ানের শীর্ষ চিপ নির্মাতা টিএসএমসি ২০৪০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের অঙ্গীকার করেছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য তারা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎকে কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করছে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্বালানি অর্থনীতিবিদ হং জং-হো বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি সংকট ইরান যুদ্ধের অনেক আগেই শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা কোরিয়া ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন (কেপকো) কয়েক দশক ধরে কৃত্রিমভাবে বিদ্যুতের দাম কম রাখায় এই সংকটের শিকড় তৈরি হয়েছে।
কয়েক দশক ধরে সরকারি ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ দেওয়ায় অনেক কোরীয়ের ধারণা হয়েছে, বিদ্যুৎ একটি জনসেবা—যা সরকারের সস্তায় ও পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা উচিত। এতে রূপান্তরের ব্যয় মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে জনসমর্থন ক্ষয় হয়।
পারমাণবিক বিকল্প ও আঞ্চলিক ভিন্নতা
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি কৌশল জটিলই রয়ে গেছে। গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে সরকার কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত পিছিয়েছে এবং পারমাণবিক চুল্লি পুনরায় চালুর গতি বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা বৈঠকে নিশ্চিত করা হয়েছে, জরুরি মজুত হিসেবে ২১টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ২০৪০ সালের পরও "উৎপাদনক্ষমতা ভাতা" (নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা) দেওয়া হবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অধীনে জাপান ভিন্ন পথ নিয়েছে: বড় আকারের সৌর প্রকল্পে বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি পারমাণবিক চুল্লি পুনরায় চালুর গতি বাড়াচ্ছে দেশটি। জাপানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুপ্ত সক্ষমতা রয়েছে (অস্ত্র তৈরি না করেও দ্রুত তা তৈরির সামর্থ্য) এবং দেশটিতে ৪৫ টন অস্ত্র-মানের প্লুটোনিয়াম মজুত আছে। টোকিওর রিনিউয়েবল এনার্জি ইনস্টিটিউটের ভাইস চেয়ার তাকেজিরো সুয়োশি আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার এই পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।
জাপানে আমাদের মধ্যে কোনো সংকটবোধ নেই। যুদ্ধ একটি দুঃখজনক ঘটনা হলেও, এ দেশে জ্বালানি রূপান্তর পুরোপুরি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে আমাদের এটিকে দেখা উচিত।
দক্ষিণ কোরিয়াও পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৯৭৪ সালের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংশোধনীতে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ পরিবর্তনে উত্তর কোরিয়া ও চীন সতর্কবার্তা দিয়েছে। বেইজিংয়ের হুঁশিয়ারি, বেসামরিক উদ্দেশ্যে সমৃদ্ধকরণও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা সামরিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
গ্রিডের অচলাবস্থা ও জীবাশ্ম জ্বালানির বৈপরীত্য
রাজনৈতিক গতি তৈরি হলেও প্রযুক্তিগত বাধা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব থমকে দিতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়—যেখানে সৌর ও বায়ুশক্তির উন্নয়ন কেন্দ্রীভূত হয়েছে—ইতিমধ্যেই গ্রিডের সক্ষমতার সীমা দেখা দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির কয়েক গিগাওয়াট প্রকল্প গ্রিড-সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে বর্তমানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনক্ষমতার একটি অংশ অব্যবহৃত থাকছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চল থেকে সিউলে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কেপকোর পরিকল্পনায় স্থানীয় প্রতিরোধ বাড়ছে। গ্রামীণ বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলছেন, রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কেন তাঁদের জমির দৃশ্য ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিতে হবে—বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়ার অভিন্ন জাতীয় মূল্যব্যবস্থায় তাঁরা যখন বিদ্যুতের দামে কোনো ছাড় পান না। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে সাধারণত এক দশকেরও বেশি সময় লাগে, যা ইরান সংকটের তাগিদে নির্ধারিত জরুরি সময়সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরকারি নীতিতে আরও গভীর এক বৈপরীত্য তুলে ধরছে। জ্বালানি রূপান্তরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ওন সহায়তা দেওয়া হলেও, একই সময়ে তেল শোধনাগারগুলোকে সরাসরি ভর্তুকি এবং বিদ্যুতের দামে সর্বোচ্চ সীমা আরোপের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ওন ব্যয় হচ্ছে। সলিউশনস ফর আওয়ার ক্লাইমেটের গাহি হান প্রাতিষ্ঠানিক এই টানাপোড়েনের কথা বলেছেন।
যে সরকার বাজারদরের সংকেত দমন করছে, সেই সরকারই জনগণকে জ্বালানি সাশ্রয় করতে বলছে। এই বৈপরীত্য আরও গভীর এক প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার প্রতিফলন, যা জীবাশ্ম জ্বালানিতে প্রতিষ্ঠিত স্বার্থগোষ্ঠীগুলোকে বাজারের বাস্তবতা থেকে আড়াল করে চলেছে। রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের সুযোগ এখনই রয়েছে। এই সরকার তা কাজে লাগানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক সাহস দেখাতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরই কোরিয়ার জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ চীনা সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতাও প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থাপিত অধিকাংশ সৌর প্যানেল চীন থেকে আসে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনে দেশটির আধিপত্য ও কম খরচের প্রতিফলন। সৌর গ্রামে দেশীয়ভাবে তৈরি মডিউল ব্যবহারের শর্ত এবং আমদানির ক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণ সনদের পরিকল্পনার মাধ্যমে সিউল এর জবাব দিয়েছে।
এশিয়ায় সবুজ জ্বালানির গতি বৃদ্ধি
হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের ফলে আঞ্চলিক যে বৃহত্তর পরিবর্তন শুরু হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই মোড় তারই অংশ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ৯৯ শতাংশ এলএনজি আমদানি করা পাকিস্তানে জ্বালানি মিশ্রণে সৌরবিদ্যুতের অংশ ২০২০ সালের ২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩২.৩ শতাংশ হয়েছে। তেল ও গ্যাস আমদানি এড়িয়ে দেশটি ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় করেছে। গুইয়াং-রির মতো পাকিস্তানেও প্রথমে সচ্ছল পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাদে সৌর প্যানেল বসায়; পরে সম্পদ একত্র করে যৌথ স্থাপনা গড়ার উদ্যোগ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিক বিনিয়োগ কীভাবে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করে, তার উদাহরণ স্পেন। দেশটির বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেকই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে; ফলে ইউরোপের অনেক প্রতিবেশীর তুলনায় জ্বালানির দাম কম রাখতে পেরেছে আইবেরীয় দেশটি। সংকটের জবাবে ফ্রান্স বিদ্যুতায়নে অর্থায়ন প্রায় দ্বিগুণ করেছে, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশে আনা যায়।
তবে এলএনজি সংকটের সময় এশিয়ার কিছু অর্থনীতি মধ্যবর্তী জ্বালানি হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকেছে। ভারত ও চীন অভ্যন্তরীণ কয়লার মজুত থেকে জ্বালানি ব্যবহার বাড়িয়েছে, আর ইন্দোনেশিয়া খনির উৎপাদন বাড়িয়েছে। ভিয়েতনাম পরিত্যক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা আবার চালু করেছে, আর বাংলাদেশে জ্বালানির তীব্র রেশনিং চলছে। উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহে বিঘ্ন চলতে থাকলে দাম শেষ পর্যন্ত কমলেও এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধির হার আর ফিরে নাও আসতে পারে; কারণ দেশগুলো স্থায়ীভাবে নিজেদের জ্বালানির উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে এগোনোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে গ্রিডের স্থিতিশীলতার চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সার্বভৌমত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। দেশটির বিশ্বমানের ব্যাটারি মজুত সক্ষমতা রয়েছে (চীনের পরেই দ্বিতীয়), যা সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত করে স্বনির্ভরতা বাড়ানো যেতে পারে। সম্প্রতি আইন সংশোধন করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে স্থানীয় দূরত্বসংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ায় দ্রুত সম্প্রসারণের নিয়ন্ত্রক পথ তৈরি হয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে; বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর অংশ ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশের বেশি করা হবে
- "সৌর আয় গ্রাম" কর্মসূচির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ২,৫০০টি গ্রাম; শুধু ২০২৬ সালেই ৭০০টি নতুন স্থাপনা গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে
- প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাকে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরেছেন; অপরিশোধিত তেলের আমদানির ৭০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে
- গুইয়াং-রি গ্রামটি আদর্শ মডেল; সৌরবিদ্যুতের মুনাফা দিয়ে বিনা মূল্যের খাবার ও বয়স্কদের যাতায়াতসহ সামষ্টিক কল্যাণে অর্থায়ন করা হয়
- দক্ষিণাঞ্চলে গ্রিডের সক্ষমতার সীমা এবং কেপকোর সঞ্চালন লাইন নির্মাণ পরিকল্পনায় স্থানীয় প্রতিরোধ রয়েছে; নির্মাণে এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ৫০০ বিলিয়ন ওনের বিপরীতে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানিতে ৫ ট্রিলিয়ন ওন ভর্তুকি দিচ্ছে
- জরুরি মজুত হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০৪০ সালের পরও উৎপাদনক্ষমতা ভাতা পাবে; পাঁচটি পারমাণবিক চুল্লি দ্রুত পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে
- সেমিকন্ডাক্টর শিল্প (স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স) জ্বালানির ব্যয়ের চাপে রয়েছে, যা এআই মেমরি চিপের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলছে
- আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন: জাপান পারমাণবিক চুল্লি পুনরায় চালুর দিকে ঝুঁকে সৌরবিদ্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করছে, আর পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের অংশ ৩২.৩ শতাংশে পৌঁছেছে






