ইন্দোনেশিয়ার উচ্চাভিলাষী বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি

পড়তে 10 মিনিট
ইন্দোনেশিয়ার উচ্চাভিলাষী বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি

বিশাল এক উদ্যোগ

ইন্দোনেশিয়ার সর্বদক্ষিণের প্রদেশে ভোর হওয়ার আগেই একটি ছোট নীল-সাদা ভবনে কর্মীরা হাজার হাজার খাবার তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেন। জাকার্তার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি তিমুরের উপকূলীয় গ্রাম তইনেকেতে ইউফ্রিয়ান্তি হাউতিয়াস স্থানীয় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রতিদিন ২,৫০০টি দুপুরের খাবার তৈরির কাজ তদারক করেন। এই রান্নাঘরটি প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো দ্রুতগতিতে গড়ে তোলা বিস্তৃত নেটওয়ার্কের একটি মাত্র কেন্দ্র, যার লক্ষ্য দ্বীপপুঞ্জজুড়ে লাখ লাখ শিশুকে খাবার দেওয়া। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া কর্মসূচিটি দ্রুত বিশ্বের বৃহত্তম এ ধরনের উদ্যোগগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার হাজার হাজার দ্বীপে এখন ২৫ হাজারের বেশি রান্নাঘর চালু রয়েছে।

সূচিপত্র
  1. বিশাল এক উদ্যোগ
  2. দুর্গম অঞ্চলে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
  3. অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিকল্প ব্যয়
  4. ঋণঝুঁকি ও বৈশ্বিক চাপ
  5. সুশাসন ও তদারকিতে ব্যর্থতা
  6. রাজনৈতিক হিসাব ও জনতুষ্টিবাদী চাপ
  7. মূল কথা

‘মাকান বার্গিজি গ্রাতিস’ (এমবিজি) উদ্যোগের ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। সরকার প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে খাবার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে, যা জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলশিক্ষার্থী, ছোট শিশু, গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা। ২০২৫ সালের জন্য কর্তৃপক্ষ ৫১.৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়া (প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করেছিল। তবে ২০২৬ সালের বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়ায় (প্রায় ১৯.৭ বিলিয়ন ডলার), যা মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা জেনারেল প্রেসিডেন্ট প্রাবোও বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ করেছিলেন। তিনি এই উদ্যোগকে উন্নত পুষ্টি, স্কুলে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এবং গ্রামপর্যায়ে অর্থনৈতিক প্রণোদনার পথ হিসেবে তুলে ধরেন।

উচ্চাভিলাষী এসব লক্ষ্য সত্ত্বেও, কর্মসূচিটি আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার আইন রয়েছে। বহু বছর ধরে সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই আইনি সীমা দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ২০২৫ সালে ঘাটতি ছিল ২.৯২ শতাংশ, যা বিপজ্জনকভাবে সীমার কাছাকাছি। ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ২.৬৮ শতাংশ লক্ষ্যে ভুলের সুযোগও সামান্য। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠায় এবং জ্বালানি ভর্তুকিতে ইতিমধ্যে ২১০ ট্রিলিয়ন রুপিয়া (১২.৩ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় হওয়ায় বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচিটি আগে থেকেই সংকুচিত আর্থিক পরিসরে আরও চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, এই একক উদ্যোগে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত করায় উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁদের মতে, জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশে থাকা ইন্দোনেশিয়ার কর-জিডিপি অনুপাত এমন ব্যাপক সামাজিক কর্মসূচির ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট রাজস্ব জোগায় না; এতে ঋণের স্থায়িত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

দুর্গম অঞ্চলে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূগোলজুড়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার বাস্তবতা পরিকল্পনাকারীদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল প্রমাণিত হয়েছে। তইনেকেতে তাজা উপকরণ সরবরাহে চার ঘণ্টা যাতায়াত করতে হয়, কারণ স্থানীয় কৃষকেরা রান্নাঘরের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পণ্য উৎপাদন করতে পারেন না। দূরবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ট্রাকে করে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় কাদামাখা রাস্তা ও ঘন ঘন বন্যায় প্রায়ই চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন কর্মীদের বাকি পথ পায়ে হেঁটে খাবারের ট্রে নিয়ে যেতে হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনপদে প্রতিদিন খাবার দেওয়ার সংগ্রামের কথা জানান হাউতিয়াস। কিছু বিতরণকেন্দ্রে মাত্র ১০ বা ২০ জনের জন্য খাবার পৌঁছে দিতে হয়। অংশগ্রহণ সমান নয়—এ কথা স্বীকার করে জাতীয় পুষ্টি সংস্থা (বিজিএন) রান্নাঘর-প্রধানদের কাউকে জোর করে কর্মসূচিতে যুক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছে। কিছু এলাকার পরিবার ঘরের ঐতিহ্যবাহী রান্না বা বাজারের খাবার পছন্দ করে।

মাঠপর্যায়ের এসব অসুবিধা আরও বিস্তৃত কাঠামোগত সমস্যারই প্রতিফলন। কর্মসূচির তদারককারী জাতীয় পুষ্টি সংস্থা (বিজিএন) স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের কারণে ২,০০০টির বেশি রান্নাঘরের কার্যক্রম স্থগিত করেছে এবং অন্য কয়েকটির অর্থ পরিশোধ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। কর্মসূচি চালুর পর থেকে খাদ্যনিরাপত্তার সমস্যা লেগেই আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ৫,৯০০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ৬,৫০০-এর কাছাকাছি হতে পারে। তিমুরের পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের এক ঘটনায় দেখা যায়, শিশুরা ট্রেতে থাকা শিম সরিয়ে দিচ্ছে, আর ঘন লাল সস দেওয়া ডিমভাজার দিকে বিরক্তির চোখে তাকাচ্ছে। তারা বাইরের বিক্রেতাদের কাছ থেকে কেনা নাশতাই পছন্দ করছিল।

বিজিএনের প্রধান দাদান হিন্দায়ানা বাস্তবায়নের শুরুর দিকের এসব সমস্যা স্বীকার করলেও জোর দিয়ে বলেছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্মসূচি চলবে। তিনি সপ্তাহে কয়েকবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেন এবং বারবার কর্মসূচি থামানোর বদলে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা পান। কর্মদক্ষতার সূচকের ভিত্তিতে রান্নাঘরগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ বা ‘সি’ গ্রেড দেওয়ার স্বীকৃতি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি, যেখানে গুণমানের আগে পরিমাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের যুক্তি, সামরিক ধাঁচের এই নির্দেশনাভিত্তিক কাঠামো সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় মানানসই হলেও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নয়। এতে খাদ্যনিরাপত্তা বা শিশুবিকাশে দক্ষতা নেই—এমন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে পেশাদার পুষ্টিবিদদের উপেক্ষা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক প্রভাব ও বিকল্প ব্যয়

প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর দাবি, এই কর্মসূচি গ্রামপর্যায়ে সমৃদ্ধি বাড়িয়েছে। তবে পরিমাণগত মূল্যায়নে চিত্রটি ততটা স্পষ্ট নয়। জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থার অর্থনৈতিক মডেল বলছে, এই উদ্যোগের ফলে মোট দেশজ উৎপাদনে ১৪.৫ ট্রিলিয়ন থেকে ২৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া যোগ হতে পারে। বার্ষিক ব্যয়ের তুলনায় এই অঙ্ক সামান্য, যা অর্থনীতিতে সীমিত গুণক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। ইন্ডেফের বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, বিপুল এই বরাদ্দ অন্যান্য জরুরি খাতের অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে। জাকার্তাভিত্তিক সেন্টার অব ইকোনমিক অ্যান্ড ল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ভিমা ইউদিস্তিরা অধিনেগারা কর্মসূচিটির আর্থিক দক্ষতা নিয়ে কঠোর মূল্যায়ন দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আমি একে ‘এফ’ দেব। আর্থিক পরিসরে যেমন, মাঠপর্যায়েও বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচিটি বেশ সমস্যাজনক।

আর্থিক চাপের কারণে কঠিন কিছু অগ্রাধিকারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। খাবারের অর্থের বড় অংশ এসেছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট কমিয়ে, ফলে শিক্ষক বেতন ও স্কুল পরিচালনার ব্যয় থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্স (ইন্ডেফ)-এর হিসাব, শিক্ষা খাতে ২৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়ার ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার ফলে প্রায় ৭ লাখ ২৩ হাজার চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কুপাংয়ের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার উপকারী হলেও উন্নত সুযোগ-সুবিধা, গ্রন্থাগার ও প্রযুক্তির জন্য অর্থ পেলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখা আরও কার্যকর হতো। শত শত শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলটিতে রয়েছে মাত্র একটি প্রজেক্টর ও তিনটি ল্যাপটপ।

স্থানীয়ভাবে পণ্য কেনার মাধ্যমে যেসব কৃষকের উপকার হওয়ার কথা ছিল, তাঁরা রান্নাঘর পরিচালনাকারীদের সঙ্গে অনিয়মিত ও চাপের যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন। কুপাংয়ের বাজারে বিক্রেতারা বলেন, দেরিতে অর্ডার পাওয়ায় তাঁদের তড়িঘড়ি করে পণ্য সংগ্রহ করতে হয়। আবার কখনো উৎপাদন খরচের সামান্য বেশি দাম দেওয়া হয়, যা তাঁদের অংশগ্রহণকে অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক করে তোলে। ২৬ বছর বয়সী সবজিচাষি রিন্তো জামি লোকসানের আশঙ্কায় সরবরাহ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের ক্ষেতে সবজি বাছাই করতে করতে তাঁর মা দিনা উদজু এদো প্রশ্ন তোলেন: “আমাদের লোকসান হলে শিশুদের আসলে কে খাওয়াচ্ছে—কৃষকেরা, নাকি সরকার?”

বিজ্ঞাপন

ঋণঝুঁকি ও বৈশ্বিক চাপ

ইন্দোনেশিয়ার অবনতিশীল আর্থিক অবস্থার দিকে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর নজর পড়েছে। মুডিস ও ফিচ ইতিমধ্যেই দেশটির ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে ঋণমানের সূচক দুর্বল হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ইন্দোনেশিয়া বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়লে ভর্তুকির অর্থও বাড়ে, ফলে বাজেট ঘাটতির ওপর চাপ পড়ে। সুদের হার বাড়লে সরকারি ঋণ পরিশোধের খরচও বাড়তে পারে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের মূল্যায়ন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। মূল্যস্ফীতির ফলে বাজারে সুদের হার বাড়লে সরকারি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া চাপের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি কর্মসূচির বিতরণ সপ্তাহে ছয় দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন করার ব্যবস্থা ঘোষণা করেছেন। এতে বছরে ৪০ ট্রিলিয়ন রুপিয়া সাশ্রয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার আবারও কৃচ্ছ্রসাধনের পদক্ষেপ নিয়েছে: অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ সীমিত করা হচ্ছে এবং মন্ত্রীদের বেতন কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও কর্মসূচি সংকুচিত করার বদলে সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতিতেই অটল। তিনি বয়স্কদেরও এর আওতায় আনার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। মার্চে বাজেট সামলাতে কর্মসূচি কমাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন:

বিনা মূল্যে খাবারের কর্মসূচিতে আমি হাত দেব না। আমাদের শিশুদের অপুষ্টিতে ভুগতে দেখে আমি এই উদ্যোগ নিয়েছি।

এই অনড় অবস্থান বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করছে। ব্র্যান্ডেস ইনভেস্টমেন্ট পার্টনার্সের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক লুই লাউ মনে করেন, কর্মসূচিটির ব্যাপ্তি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং সরকারের আর্থিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। প্রশাসনে মন্ত্রী ৪৮ জন ও উপমন্ত্রী ৫৬ জনে উন্নীত হওয়া, পাশাপাশি নতুন সমন্বয় মন্ত্রণালয় গঠনের ফলে স্পষ্ট দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়াই সরকারি ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে কর আদায় ধারাবাহিকভাবেই দুর্বল: কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৯ শতাংশে স্থির, যেখানে উন্নত অর্থনীতিগুলোতে তা ৩০ শতাংশ। ফলে সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অর্থ জোগাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সুশাসন ও তদারকিতে ব্যর্থতা

সরবরাহ ও অর্থায়নের বাইরেও এই কর্মসূচি সুশাসনের গভীরতর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। কেনাকাটার প্রক্রিয়া নিয়ে বিজিএন তদন্তের মুখে পড়েছে। জানা গেছে, সংস্থাটি ১৬টি ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানকে মোট ১১৩.৯ বিলিয়ন রুপিয়া (৬.৬৫ মিলিয়ন ডলার) দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে ছিল সদর দপ্তরের দাপ্তরিক সহায়তা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে আনন্দ দৌড়ের আয়োজন। শিক্ষা বাজেট কমানো হচ্ছে অথচ রান্নাঘরগুলোতে তদারকি সামান্য—এমন পরিস্থিতিতে এসব ব্যয় অগ্রাধিকার নিয়ে সমালোচনা বাড়িয়েছে। জাতীয় ক্রয় সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে বিজিএনের সদর দপ্তরের জন্য ১৯ বিলিয়ন রুপিয়া এবং সেনায়ান আনন্দ দৌড়ের জন্য ১.৩৪ বিলিয়ন রুপিয়াসহ বিভিন্ন বরাদ্দের কথা উঠে এসেছে।

সংস্থাটির নেতৃত্বের কাঠামোও একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন: কারিগরি দক্ষতার বদলে সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ। বিজিএনে কয়েকজন বেসামরিক কর্মকর্তা উপপ্রধান হিসেবে কাজ করলেও ঊর্ধ্বতন পদে প্রশিক্ষিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। এর বদলে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। এক অভ্যন্তরীণ স্মারকে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনীর সরবরাহ নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো হবে এবং শিশুদের খাওয়ানোকে সামরিক অভিযানের মতো ধরে কর্মকর্তাদের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে শিশুদের খাদ্যচাহিদা ও খাদ্যনিরাপত্তা নীতিমালার জটিলতা বোঝেন—এমন পুষ্টিবিদেরা উপেক্ষিত হয়েছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলো অদক্ষতা বা ব্যর্থতার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কর্মসূচিটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা মামলাগুলো সাংবিধানিক আদালতে এগোচ্ছে। আবেদনকারীদের যুক্তি, সর্বত্র একইভাবে খাবার বিতরণে সম্পদের অপচয় হয়; বরং যেসব অঞ্চলে প্রয়োজন প্রমাণিত, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে অর্থ ব্যয় করা উচিত। জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর জনপ্রিয়তা প্রায় ৮০ শতাংশ থাকলেও বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ২০২৫ সালের মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে চার-পয়েন্টের স্কেলে ০.২৭ পয়েন্ট কমেছে। এতে কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে জনসাধারণের সংশয় বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক হিসাব ও জনতুষ্টিবাদী চাপ

প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এমবিজি কর্মসূচিকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় খর্বাকৃতির শিশুদের সঙ্গে সাক্ষাৎই তাঁকে এই উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করেছে বলে তিনি জানান। ইন্দোনেশিয়ার ইন্দিকাতর পলিতিকের হিসাবে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রায় ৮০ শতাংশে থাকায়, খাবার কর্মসূচিটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃশ্যমান নিদর্শন। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে তিনি পুনর্নির্বাচনে দাঁড়ালে এটি তাঁর জন্য সহায়ক হতে পারে। গ্রামীণ গ্রামগুলোতে সমর্থন সবচেয়ে বেশি, যেখানে কর্মসূচিটির দৃশ্যমানতা প্রেসিডেন্টকে জনগণকে খাওয়ানো পিতৃসুলভ অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরে।

তবে অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনের চেয়ে খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রাবোও সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ নিয়েছেন, যার মধ্যে বাতিল হওয়া একটি ইতালীয় বিমানবাহী রণতরী ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এদিকে শিক্ষা অধিকারকর্মীরা বলছেন, ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৪৩ লাখ শিশু এখনো স্কুলের বাইরে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও স্কুলের সুযোগ-সুবিধার তুলনায় এমবিজি বাজেট অনেক বড়। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এই কর্মসূচি সত্যিকারের মানবসম্পদে বিনিয়োগ, নাকি জনপ্রিয়তা বাড়ানোর রাজনৈতিক প্রদর্শনী।

বাস্তবায়নে ব্যর্থতার প্রমাণ বাড়লেও প্রেসিডেন্টের অনড় অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নীতিগতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সুযোগ কম। প্রাবোওর মেজাজ এবং উদ্যোগটির প্রতি তাঁর গভীর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের কারণে মন্ত্রিসভার সদস্যরা কর্মসূচির ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ জানাতে ভয় পান বলে জানা গেছে। এতে এমন এক শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কারিগরি দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। এর ফলে কাঠামোগত আর্থিক ভারসাম্যহীনতা বড় সংকটে রূপ নেওয়ার আগ পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

মূল কথা

  • ইন্দোনেশিয়ার বিনা মূল্যে খাবার কর্মসূচির লক্ষ্য ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। ২০২৬ সালের জন্য বরাদ্দ ৩৩৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়া (১৯.৭ বিলিয়ন ডলার), যা সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এবং আইনসিদ্ধ ৩ শতাংশ ঘাটতির সীমার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
  • তেলের দাম বাড়া ও ভর্তুকির ব্যয় বৃদ্ধির মধ্যে মুডিস, ফিচ ও এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালসহ আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে নেতিবাচক পূর্বাভাস বা সতর্কবার্তা দিয়েছে।
  • ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ৫,৯০০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে। স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন ও অব্যবস্থাপনার কারণে জাতীয় পুষ্টি সংস্থা ২,০০০টির বেশি রান্নাঘরের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
  • অর্থের বড় অংশ এসেছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট কমিয়ে। এতে শিক্ষা খাতে ৭ লাখ ২৩ হাজার চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, আর স্কুলগুলোতে গ্রন্থাগার ও কম্পিউটারের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।
  • আর্থিক চাপ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট প্রাবোও কর্মসূচিতে অটল এবং এটি বাতিলের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। কর্মকর্তারা কিছু ব্যয়সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, যেমন সপ্তাহে বিতরণের দিন ছয় থেকে পাঁচে নামিয়ে বছরে ৪০ ট্রিলিয়ন রুপিয়া সাশ্রয়ের উদ্যোগ।
  • সমালোচকদের মতে, সর্বজনীনভাবে চালুর বদলে নির্দিষ্ট প্রয়োজনপ্রবণ অঞ্চলে কর্মসূচিটি চালালে তা বেশি কার্যকর হতো। তাঁরা জাতীয় পুষ্টি সংস্থায় সামরিক কর্মকর্তাদের বদলে পেশাদার নেতৃত্ব নিয়োগেরও দাবি জানিয়েছেন।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে