হরমুজে অবরোধ
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ১৯৭০-এর দশকে আরব তেল অবরোধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। প্রথম হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে সরু অংশে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ট্যাংকার চলাচল প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০টি থেকে কমে কোনো কোনো দিনে এক অঙ্কের সংখ্যায় নেমে এসেছে। প্রণালির ভেতরে বা কাছাকাছি সামরিক হামলায় ইতিমধ্যে ১৮টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে।
সূচিপত্র
অর্থনৈতিক অভিঘাত তাৎক্ষণিক ও তীব্র হয়েছে। সংঘাতের আগে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭১ ডলার থেকে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ১০০ ডলারের বেশি হয়েছে; অল্প সময়ের জন্য দাম এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা বহু বছর দেখা যায়নি। বাজার স্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে ইতিহাসের বৃহত্তম পরিমাণ তেল ছাড়ার সমন্বয় করেছে। সদস্যদেশগুলো মজুত থেকে সর্বোচ্চ ৪০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত ছেড়েছে। তবে নজিরবিহীন এই পদক্ষেপেও সাময়িক স্বস্তি মিলেছে মাত্র, কারণ সরবরাহে বাস্তব বিঘ্ন জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার গতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চললেও এর অর্থনৈতিক পরিণতি এশিয়ায় বিশেষভাবে তীব্রভাবে আঘাত হেনেছে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশের গন্তব্য ছিল এশিয়ার বাজার। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা আঞ্চলিক সংঘাতকে মহাদেশজুড়ে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থায় রূপ দিয়েছে। সরকারগুলোকে এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি বণ্টনের কঠিন সিদ্ধান্ত বলেন: কোন খাতে জ্বালানি দেওয়া হবে আর কোন খাতকে তা ছাড়াই চলতে হবে।
ঝুঁকি সব দেশের জন্য সমান নয়। এশিয়ার সবচেয়ে ধনী অর্থনীতিগুলো, যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের হাতে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কৌশলগত মজুত রয়েছে, যা তাৎক্ষণিক বিপর্যয় ঠেকাতে সহায়তা করে। জাপানের কাছে প্রায় ২৫৪ দিনের তেল মজুত আছে। আইইএ কর্মসূচির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া তার মজুত থেকে ২ কোটি ২৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল ছেড়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ-বিঘ্ন সামাল দেওয়ার জন্য এসব মজুত কখনোই তৈরি করা হয়নি। দুই দেশেই মজুত শেষ হওয়ার আগে আনুমানিক ২০০ দিনের জাতীয় রিজার্ভ রয়েছে।
এশিয়ার ধনী নয় এমন দেশগুলোই তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অস্তিত্বগত হুমকির মুখে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা, অত্যন্ত সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং বিকল্প জ্বালানিতে দ্রুত সরে যাওয়ার মতো নমনীয়তাহীন জ্বালানি ব্যবস্থা। এসব দেশের জন্য হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি সামাজিক অস্থিরতা, খাদ্য অনিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাব্য সূত্রপাত, যা ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় সরকার পতনের ঘটনাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
রাস্তায় মানুষের দুর্ভোগ
পরিসংখ্যানের আড়ালে মহাদেশজুড়ে প্রতিদিন চলতে থাকা গভীর মানবিক দুর্ভোগ চাপা পড়ে যায়। জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা ফিলিপাইনে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত জিপনি চালকেরা জীবিকা হারাতে বসেছেন। রঙিন সাজে সজ্জিত এসব গাড়ির একটি বহু বছর ধরে চালানো কার্লোস ব্রাগাল জুনিয়র দেখেছেন, ১২ ঘণ্টার শিফটে তার দৈনিক আয় ১,০০০ থেকে ১,২০০ পেসো থেকে কমে মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ পেসোতে নেমেছে। সরকারের দেওয়া জ্বালানি ভর্তুকি, তার ভাষায়, মাত্র দুই দিনের গাড়ি চালানোর খরচ মেটায়।
এই কাজের আয়েই আমি আমার মেয়েদের স্কুলে পড়িয়েছি। একজন মাত্র স্নাতক হয়েছে, আরেকজনের স্নাতক হওয়ার কথা। আমাদের ভালো জীবন ছিল। কিন্তু এখন আগামী কয়েক সপ্তাহে আমাদের কী হবে, তা আমরা জানি না। এভাবে চলতে থাকলে এটা নিশ্চিতভাবেই আমাদের ও আমাদের পরিবারকে শেষ করে দেবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার বুধবারকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে শ্রীলঙ্কায়। ২০২২ সালের আর্থিক সংকটের কথা মনে করা কর্মীদের কাছে পরিস্থিতির পরিহাস চোখ এড়ায় না। সেই সংকটে জ্বালানি কেনার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশটির ছিল না। কলম্বোর এক বাসিন্দা বলেন, “আগেরবার দেশে জ্বালানি কেনার টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কিন্তু কেনার মতো জ্বালানি নেই।” লন কাটার যন্ত্র চালক নিমাল পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ, এঁকেবেঁকে চলা সারিতে এতক্ষণ অপেক্ষা করেন যে প্রতিযোগীরা কাজের সুযোগ নিয়ে নেন। তিনি বলেন, “আমরা অনেক কষ্টে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছি। জ্বালানি নিয়ে কাজে ফিরতে ফিরতে অন্য কেউ হয়তো ওই কাজের জন্য আমার জায়গায় চলে আসবে।”
থাইল্যান্ড এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অবাস্তব মনে হতো। জ্বালানি সাশ্রয়ে উৎসাহ দিতে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম থাই পিবিএসের সংবাদ উপস্থাপকেরা সরাসরি সম্প্রচারে ব্লেজার খুলে ফেলেছেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে এখন তাপমাত্রা ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হচ্ছে এবং কর্মকর্তাদের লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে। সরাসরি সম্প্রচারে পোশাকবিধির এই পরিবর্তনে অংশ নেওয়া সংবাদ উপস্থাপক সিরিমা সংকলিন পরিস্থিতিটিকে অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেন: এত ছোট একটি বিষয়ও যে চলমান সংঘাতের সুস্পষ্ট প্রভাব আমাদের ওপর তুলে ধরতে পারে।
ভারতের গুজরাটে গ্যাসের ঘাটতির কারণে সিরামিক শিল্প কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ। সেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। কারখানা বন্ধ থাকায় কাজ হারানো প্রায় ৪ লাখ শ্রমিকের একজন সচিন পরাশর বলেন, “কাজ ছাড়া এখানে থাকলে আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে।” উপমহাদেশজুড়ে রান্নায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ঘাটতিতে মুম্বাইয়ের রেস্তোরাঁগুলো মেনু থেকে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা তরকারি ও ডুবো তেলে ভাজা খাবার বাদ দিয়েছে। অন্যদিকে, জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া ও ভ্রমণকারীদের উদ্বেগের কারণে হোটেলগুলোতে কক্ষ ব্যবহারের হার ১০ শতাংশেরও নিচে নেমেছে।
জরুরি পদক্ষেপ ও রেশনিং
অর্থনৈতিক ধসের আশঙ্কায় এশিয়ার সরকারগুলো কঠোর সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিয়েছে, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময় সমাজকে যেভাবে মানিয়ে নিতে হয়েছিল, তা মনে করিয়ে দেয়। ফিলিপাইন সরকারি কর্মীদের চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে এবং দুপুরের বিরতিতে কম্পিউটার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পাকিস্তান দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ করেছে এবং সরকারি খাতের কর্মীদের জন্য হাইব্রিড কর্মব্যবস্থা চালু করেছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি এগিয়ে এনে রমজানের সঙ্গে মিলিয়েছে, আর শ্রীলঙ্কা স্কুল ও সরকারি খাতের কার্যক্রমে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে।
মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ গাড়ির নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে কঠোর জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে; ব্যক্তিগত যানবাহন এক দিন পরপর চলাচল করতে পারছে। ভিয়েতনাম ব্যাপকভাবে দূর থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়া ঈদুল ফিতরের সময় ১৪ কোটি ৩৯ লাখ যাত্রার প্রত্যাশার মধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়ার দ্বিধায় রয়েছে। এই সময় ভর্তুকির ব্যয় জাতীয় বাজেট ঘাটতিকে জিডিপির ৩ শতাংশের আইনি সীমার ওপরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভর্তুকি নিয়ে এই দ্বিধাই এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর সামনে থাকা অসম্ভব কঠিন সিদ্ধান্তগুলোকে তুলে ধরে। সাশ্রয়ী জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বজায় রাখতে ইন্দোনেশিয়া কয়েক হাজার কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে, কিন্তু রাজস্বের সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করছে, কত দিন এই সহায়তা চালানো সম্ভব। সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় পাকিস্তান কৃষক ও পরিবহনশ্রমিকদের জন্য শুরুতে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালু করলেও পরে তা কমাতে বাধ্য হয়েছে। থাইল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সামনে কঠিন এক সিদ্ধান্ত: ভর্তুকি বন্ধ করলে মজুত আরও কমে গেলে জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে, আর তা বজায় রাখলে সীমিত রাজস্বসম্পদ নিঃশেষ হবে। ইন্দোনেশিয়ায় ঈদের পর জ্বালানির দাম কী হবে, সে বিষয়ে এনার্জি শিফট ইনস্টিটিউটের পুত্র অধিগুনা বলেন, “এরপর কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।”
বড় বিভাজন: মজুত বনাম দেউলিয়াত্ব
এই সংকট এশিয়ার ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মৌলিক বিভাজন স্পষ্ট করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে কয়েক মাসের সরবরাহ-বিঘ্ন সামাল দেওয়ার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই দেশগুলোও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি এবং শিল্প খাতে মন্দার মুখে। চীনের হাতে রয়েছে ১৩০ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ বিপুল মজুত, এর সঙ্গে রাশিয়ার পাইপলাইন থেকে অতিরিক্ত সরবরাহ। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে দেশটি পেট্রোলিয়াম রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য কৌশলগত ব্যতিক্রম রেখেছে।
সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর পরিস্থিতি ভয়াবহ। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোট হিসাবে ১৬৪০ কোটি ডলার থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রায় দায় বিবেচনায় নিলে কার্যত তা ঋণাত্মক। দেশটিকে ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পরিশোধ করতে হবে এবং একই সঙ্গে আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের কর্মসূচি বজায় রাখতে হবে। এরই মধ্যে জ্বালানির দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা আইএমএফের বেলআউট কর্মসূচির শর্তে সাময়িক শিথিলতা নিয়ে আলোচনা করেছে এবং জ্বালানি ভর্তুকি আবার চালু করেছে। তবে পর্যটন ব্যবসায়ী সানোজ উইরাতুঙ্গে জানান, কোভিড-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের আশা সত্ত্বেও ব্যবসা এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে জরুরি সহায়তা হিসেবে ২০০০ কোটি থেকে ৫০০০ কোটি ডলার দিতে তারা প্রস্তুত। সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা স্বীকার করেছেন, “শর্তের ক্ষেত্রে অনমনীয় থাকা এবং এসব দেশকে ব্যর্থ হতে দেওয়া কারও স্বার্থে নেই।” পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রেজা বাকিরের মতে, আইএমএফ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিশ্বাসযোগ্য ঘোষণা দরকার যে তারা এসব দেশকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় যত দ্রুত সম্ভব, ততই ভালো।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রার ওপর চাপ ও মূলধন প্রত্যাহারের দিক থেকে বর্তমান সংকট ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের প্রতিধ্বনি হলেও এর মৌলিক চরিত্র আলাদা। ১৯৯৭ সালের সংকটের পেছনে ছিল স্থির বিনিময় হার, স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের উচ্চ মাত্রা এবং কম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষাক্ত মিশ্রণ। আজ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং বিনিময় হার আরও নমনীয়, যা তিন দশক আগে ছিল না এমন সুরক্ষা দেয়। তবে বর্তমান অভিঘাত আর্থিক নয়, বাস্তব সরবরাহের বিঘ্ন। এটি মূলধন হিসাবে নয়, চলতি হিসাবে আঘাত হানছে এবং এমন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করছে, যার মোকাবিলা করা মুদ্রানীতির জন্য কঠিন।
শিল্পে বিপর্যয় ও কয়লায় প্রত্যাবর্তন
সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এশিয়ার বিদ্যুৎ খাতে, যেখানে সংকট জলবায়ু অঙ্গীকার সাময়িকভাবে পরিত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। থাইল্যান্ড মে মোহ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবসরপ্রাপ্ত দুটি ইউনিট আবার চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে পুরোনো কেন্দ্রগুলোকে বেশি সক্ষমতায় চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ভারত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর এবং পরিকল্পিত বন্ধ এড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদনের কারণে কম ঝুঁকিতে থাকা চীনও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি কয়লা পোড়াচ্ছে এবং যেখানে সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে।
শিল্প খাতে প্রভাব বিদ্যুৎ ছাড়িয়েও বিস্তৃত। অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি পেট্রোরাসায়নিক কাঁচামাল ন্যাফথার ঘাটতিতে এশিয়াজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে প্রায় তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ন্যাফথার ঘাটতির আশঙ্কায় দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবারগুলো প্লাস্টিকের আবর্জনার ব্যাগ মজুত করেছে। অন্যদিকে, পেট্রোলিয়ামজাত উপকরণ দিয়ে তৈরি সিরিঞ্জ, গ্লাভস ও ডায়ালাইসিস সরঞ্জামের মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বিগ্ন জাপানের হাসপাতালগুলো। গ্যাসের ঘাটতিতে ভারতের গুজরাট রাজ্যের সিরামিক শিল্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এতে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
সারের ঘাটতি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সমান গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। বিশ্বের মোট সার বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, আর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। উত্তর গোলার্ধে রোপণের মৌসুম চলার মধ্যে সার প্রয়োগ কমলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ফসলের উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ আয়ের প্রায় অর্ধেক খাবারে ব্যয় করে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, বিকল্প পথে জাহাজ চলাচলের কারণে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়ার মতো খাদ্য অনিরাপদ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ইতিমধ্যে ধীর হয়ে পড়ছে। মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক ও অন্তর্বর্তীকালীন মানবিক সমন্বয়কারী গউইন লুইস বলেন, “দাম বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া কঠিন হচ্ছে এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমছে।”
ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ও পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে আধিপত্য
তাৎক্ষণিক সংকট প্রচলিত জ্বালানির আমদানিকারকদের বিপর্যস্ত করলেও একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে চীনের কৌশলগত সুবিধা আরও স্পষ্ট করেছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবকিছুর বৈশ্বিক উৎপাদনে বেইজিং আধিপত্য করছে। বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের ৭০ শতাংশের বেশি এবং ব্যাটারি সেলের ৮৫ শতাংশই চীনের। এশিয়ার দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহ শৃঙ্খলের ভঙ্গুরতা মোকাবিলা করায় চীনের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে।
পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। এখনও দেশটির জ্বালানির এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করা হলেও ২০১৭ সাল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে ৫০ গিগাওয়াটের বেশি চীনা সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাম বেশি থাকলে সৌরশক্তি আগামী বছরে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে পাকিস্তানের ৬৩০ কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারে। যুক্তরাজ্যে মার্চের প্রথম তিন সপ্তাহে বৈদ্যুতিক গাড়ি লিজ নেওয়ার চাহিদা এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেড়েছে, আর ছাদের সৌর প্যানেল বিক্রিও বেড়েছে। ভিয়েতনামের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা ভিনফাস্ট জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অভিঘাত সামলাতে ছাড় দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবো সুবিয়ান্তো বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে বড় ধরনের উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন।
এই সংকট একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধের জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল ও গায়ানা জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহের বৈচিত্র্যের ওপর নতুন করে জোর দেওয়ায় লাভবান হতে পারে, কারণ তাদের উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ পথের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ এত বেশি যে অন্য আমেরিকান উৎপাদকদের মতো বিনিয়োগ আকর্ষণ করা তাদের পক্ষে কঠিন। ইরান যুদ্ধের সংকটের পর বিশ্ব যখন জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে ভাবছে, তখন পশ্চিম গোলার্ধের দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে, তবে তার জন্য এখনই ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করেছে। এতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং বিশ্বের তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে।
- প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯০ শতাংশ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোতে যায়, ফলে অবরোধে অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে।
- পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দরিদ্র এশীয় দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম এবং অস্থির বাজারে জ্বালানি সংগ্রহের রাজস্ব সক্ষমতাও সীমিত।
- মহাদেশজুড়ে জরুরি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ফিলিপাইন, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় চার দিনের কর্মসপ্তাহ; মিয়ানমারে নম্বরপ্লেট অনুযায়ী জ্বালানি রেশনিং; এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখা।
- জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ধনী দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল ছেড়েছে। তবে এই মজুত মাত্র আনুমানিক ২০০ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ-বিঘ্নের জন্য তৈরি নয়।
- এশিয়ার কয়েকটি দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আবার চালু করেছে বা কয়লা উৎপাদনের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পাকাপোক্ত হওয়া এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
- সংকটে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে চীনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ঘাটতিতে থাকা এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে ক্রমেই চীনা সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছে।
- জ্বালানির প্রাপ্যতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব স্থিতিশীলতার মধ্যে কঠিন ভারসাম্য রক্ষার সময় সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ২০০০ কোটি থেকে ৫০০০ কোটি ডলার জরুরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।






