গোপন তদন্তে পাকিস্তানের হাসপাতালে শিশুর এইচআইভি সংক্রমণ ছড়ানোর পেছনে প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যবহারের চিত্র

পড়তে 10 মিনিট
গোপন তদন্তে পাকিস্তানের হাসপাতালে শিশুর এইচআইভি সংক্রমণ ছড়ানোর পেছনে প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যবহারের চিত্র

দক্ষিণ পাঞ্জাবে নীরব মহামারি

এইচআইভি পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার কিছুদিন পর মারা যাওয়ার সময় মোহাম্মদ আমিনের বয়স ছিল আট বছর। তার জ্বর এত তীব্র ছিল যে শরীরের জ্বালাপোড়া কমাতে বৃষ্টির মধ্যে বাইরে ঘুমানোর জন্য জেদ করত ছেলেটি। মা সগরা স্মরণ করেন, গরম তেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে—এমনভাবে যন্ত্রণায় ছটফট করত সে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের তাউনসা শহরে তার কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে মাত্র দশ বছর বয়সী বোন আসমা। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার কথা যেমন তার মনে পড়ে, তেমনি মনে পড়ে ভাই তাকে কত ভালোবাসত। মোহাম্মদ আমিনের এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ার কিছুদিন পর আসমারও এইচআইভি শনাক্ত হয়।

সূচিপত্র
  1. দক্ষিণ পাঞ্জাবে নীরব মহামারি
  2. বিপদ অব্যাহত থাকার ছদ্মবেশী প্রমাণ
  3. অস্বীকার ও দায় এড়ানোর ধারাবাহিকতা
  4. অনিরাপদ ইনজেকশন নিয়ে জাতীয় সংকট
  5. ঝুঁকির পেছনে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ
  6. পরিণতি নিয়ে বেঁচে থাকা
  7. যা জানা জরুরি

পরিবারটির বিশ্বাস, তেহসিল সদর হাসপাতাল—স্থানীয়ভাবে টিএইচকিউ তাউনসা নামে পরিচিত—নিয়মিত চিকিৎসা নিতে গিয়েই দুই শিশু সংক্রমিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে তাউনসায় এইচআইভি পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হওয়া ৩৩১ শিশুর মধ্যে তারা দুজন। যে হাসপাতালের ওপর অভিভাবকেরা একসময় সন্তানদের সুস্থ করার জন্য আস্থা রাখতেন, সেই হাসপাতাল থেকেই তাদের আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এমন ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় পুরো সম্প্রদায় বিপর্যস্ত।

২০২৪ সালের শেষ দিকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের এক চিকিৎসক এই সংক্রমণের সঙ্গে টিএইচকিউ তাউনসার যোগসূত্রের কথা বলার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্টকে সাময়িক বরখাস্ত করে তার স্থলে ডা. কাসিম বুজদারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি অনিরাপদ চর্চার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি দেন। বুজদার সাংবাদিকদের বলেন, এইচআইভি প্রতিরোধই তার প্রধান অগ্রাধিকার এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির আট মাস পর পরিস্থিতি সত্যিই উন্নত হয়েছে কি না জানতে বিবিসি আই-এর অনুসন্ধানকারীরা ছদ্মবেশে টিএইচকিউ তাউনসায় যান। ২০২৫ সালের শেষ দিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে ৩২ ঘণ্টার চিত্রধারণে তারা নথিবদ্ধ করেন, সংস্কারের সরকারি আশ্বাস সত্ত্বেও বিপজ্জনক ইনজেকশন দেওয়ার চর্চা অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিপদ অব্যাহত থাকার ছদ্মবেশী প্রমাণ

ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, চিকিৎসাকর্মীরা ১০টি পৃথক ঘটনায় একাধিকবার ব্যবহারের উপযোগী ওষুধের শিশিতে ওষুধ নেওয়ার জন্য একই সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহার করেছেন, যা ভাইরাস দূষণের স্পষ্ট ঝুঁকি তৈরি করে। এর চারটি ঘটনায় একই সম্ভাব্য দূষিত শিশি থেকে নেওয়া ওষুধ বিভিন্ন শিশুকে দেওয়া হয়। অনুসন্ধানকারীরা আরও ৬৬টি ঘটনায় কর্মীদের জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়া রোগীকে ইনজেকশন দিতে ধারণ করেন। এর মধ্যে একজন চিকিৎসককে যথাযথ সুরক্ষা ছাড়াই ইনজেকশন দিতে দেখা যায়। এক নার্সকে জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়া চিকিৎসাবর্জ্য ফেলার বাক্সে হাতড়াতে দেখা যায়, যা মৌলিক নিরাপত্তাবিধির লঙ্ঘন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এক নার্সকে কাউন্টারের নিচ থেকে ব্যবহৃত একটি সিরিঞ্জ তুলে নিতে দেখা যায়। সিরিঞ্জটিতে আগের রোগীর শরীর থেকে নেওয়া তরল তখনো ছিল। দূষিত সরঞ্জামটি ফেলে না দিয়ে তিনি তা এক সহকর্মীর হাতে দেন, যেন অন্য শিশুর শরীরে সেটি আবার ব্যবহার করা হবে।

কেন এসব চর্চা এত বিপজ্জনক, তা বুঝতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এইচআইভি কীভাবে ছড়ায়, তা জানা জরুরি। এইচআইভি-পজিটিভ রোগীর শরীরে সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে ভাইরাসটি সূঁচ ও সিরিঞ্জের নল—দুটিই দূষিত করতে পারে। চিকিৎসাকর্মী নতুন সূঁচ লাগালেও সিরিঞ্জের মূল অংশটি পুনর্ব্যবহার করলে ইনজেকশনের ওষুধের মাধ্যমে ভাইরাস পরবর্তী রোগীর রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যেতে পারে।

পাকিস্তানের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম এবং পরামর্শক মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডা. আলতাফ আহমেদ ছদ্মবেশী ভিডিওচিত্র পর্যালোচনা করে সংক্রমণের প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “নতুন সূঁচ লাগালেও পেছনের অংশটিতে—যেটিকে আমরা সিরিঞ্জের মূল অংশ বলি—ভাইরাস থাকে। তাই নতুন সূঁচ লাগালেও ভাইরাস ছড়াবে।”

একাধিকবার ব্যবহারের জন্য তৈরি শিশি থেকে সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহারের পর ওষুধ নেওয়া হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একটি শিশি দূষিত হয়ে গেলে, সেটি থেকে ওষুধ নেওয়া পরবর্তী প্রত্যেক রোগী সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েন। টিএইচকিউ তাউনসায় অধিকাংশ শিশুকে ক্যানুলার মাধ্যমে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল—শিরায় সরাসরি ঢোকানো নল দিয়ে। এ পদ্ধতিতে শরীরের ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা এড়িয়ে দূষিত ওষুধ সরাসরি রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায়।

করাচির আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের শিশু চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক ডা. ফাতিমা মীর ভিডিওচিত্র বিশ্লেষণ করে পাকিস্তাজুড়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক প্রশিক্ষণের বৃহত্তর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেন। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের উদ্দেশে তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দেন।

ইনজেকশনদাতাদের সতর্ক করতে হবে: আপনারা রোগ ছড়ানোর সক্রিয় বাহক হয়ে উঠেছেন।

বিজ্ঞাপন

অস্বীকার ও দায় এড়ানোর ধারাবাহিকতা

ছদ্মবেশী ভিডিওচিত্র দেখানো হলে টিএইচকিউ তাউনসার বর্তমান মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. কাসিম বুজদার এর সত্যতা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দাবি করেন, ভিডিওগুলো তার দায়িত্ব নেওয়ার আগের হতে পারে, কিংবা এগুলো সাজানোও হতে পারে। নিজের হাসপাতালের ওয়ার্ড ও কর্মীদের দৃশ্যমান প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার হাসপাতাল শিশুদের জন্য নিরাপদ।

স্থানীয় অভিভাবকদের উদ্দেশে কী বার্তা দেবেন জানতে চাইলে বুজদার সাংবাদিকদের বলেন, “আমি নিশ্চিতভাবে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আপনারা টিএইচকিউ তাউনসায় চিকিৎসা করান।”

পাঞ্জাব সরকারও একইভাবে জবাবদিহি এড়িয়েছে। এক সরকারি বিবৃতিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, টিএইচকিউকে সংক্রমণের উৎস হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার মতো যাচাইকৃত মহামারিবিদ্যাগত প্রমাণ নেই। এর বদলে তারা অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি চিকিৎসা এবং পরীক্ষা না করা রক্ত সঞ্চালনকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। এ দাবির পক্ষে তারা ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যৌথ মিশনের কথা জানায়।

তবে বিবিসি আই ওই যৌথ মিশনের ২০২৫ সালের এপ্রিলের পরিদর্শন প্রতিবেদনের একটি ফাঁস হওয়া কপি পায়। প্রতিবেদনে বিবিসির অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলে যায় এমন তথ্য রয়েছে। সেখানে শিশুদের জরুরি বিভাগে পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের জন্য জরুরি ওষুধ ছিল না, অনিরাপদ ইনজেকশন দেওয়া হতো, আইভি তরল পুনর্ব্যবহার করা হতো, ক্যানুলায় কোনো লেবেল ছিল না এবং ব্যবহৃত আইভি সেট স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। হাত পরিষ্কারের বিষয়টিও উপেক্ষিত ছিল; বেসিন বন্ধ ছিল, জীবাণুনাশকও ছিল না।

আগের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. তৈয়ব ফারুক চান্দিওকে ২০২৫ সালের মার্চে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, তখন সরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০৬। তিন মাসের মধ্যেই তিনি আবার শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন, তাউনসার উপকণ্ঠের একটি গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জ্যেষ্ঠ মেডিকেল কর্মকর্তা হিসেবে। বিবিসি আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চান্দিও বলেন, এইচআইভি-পজিটিভ রোগীর খবর পাওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। হাসপাতালটি সংক্রমণের উৎস ছিল না বলেও তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

অনিরাপদ ইনজেকশন নিয়ে জাতীয় সংকট

তাউনসার সংক্রমণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি অনিরাপদ চিকিৎসা ইনজেকশন নিয়ে পাকিস্তানের চলমান সংকটের সর্বশেষ অধ্যায়। উদ্বেগজনকভাবে নিয়মিত এ সমস্যা সারা দেশে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বে চিকিৎসার প্রয়োজনে ইনজেকশন নেওয়ার হার পাকিস্তানে সর্বোচ্চগুলোর একটি। অনুমান অনুযায়ী, বছরে জনপ্রতি ৮ থেকে ১৩টি ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড পাবলিক হেলথ রিসার্চে প্রকাশিত পিয়ার-রিভিউ করা গবেষণা অনুযায়ী, পাকিস্তানে চিকিৎসার জন্য দেওয়া ইনজেকশনের ৭০ শতাংশের বেশি অনিরাপদ পদ্ধতিতে দেওয়া হয়। বিশ্বে হেপাটাইটিস-সি সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বোঝা পাকিস্তানের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৬০টি প্রতিনিধিত্বশীল দেশে নতুন সংক্রমণের ৪৪ শতাংশের জন্য দায়ী অনিরাপদ চিকিৎসা ইনজেকশন।

২০১৯ সালে সিন্ধু প্রদেশের রাটোদেরো শহরেও শিশুদের মধ্যে একই ধরনের এইচআইভি সংক্রমণ ছড়ায়। ২০২১ সালের মধ্যে এতে দেড় হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়। কেলেঙ্কারিটি প্রথম প্রকাশ করা হুইসলব্লোয়ার চিকিৎসক ডা. ইমরান আরবানি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা-ইতিহাসে বারবার ক্লিনিকে যাওয়া এবং একাধিকবার ইনজেকশন নেওয়ার তথ্য পান। ছয় বছর পর, এখনো সেখানে নতুন সংক্রমণ ঘটছে।

বিবিসি আই যখন তাউনসায় চিত্রধারণ করছিল, তখন করাচিতে সংক্রমণের আরেকটি গুচ্ছ দেখা দেয়। সাইট টাউন এলাকার কুলসুম বাই ভালিকা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া শিশুরা পরে এইচআইভি-পজিটিভ শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে ছিল দুই বছর বয়সী মিকাশা। পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতালের কর্মীরা একাধিক শিশুর শরীরে একই সিরিঞ্জ ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগীর জন্য বারবার সেটিতে ওষুধ ভরতেন।

ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেন, করাচিতে ৮৪ জনের সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবটি হাসপাতালে দূষিত সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহারের কারণে ঘটেছে। তবে হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মুমতাজ শেখ প্রথমে এ সম্ভাবনা অস্বীকার করে বলেন, “যোগ্য চিকিৎসকেরা কখনোই সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহার করবেন না, তাই সরকারি হাসপাতালে এমন কিছু ঘটতে পারে—এমন ধারণাই আমাদের নেই।”

জাতীয়ভাবে পাকিস্তানে ইতিহাসের দ্রুততম গতিতে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ১০ হাজারের বেশি নতুন সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ নাগাদ মোট সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউএনএইডস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মডেলভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানে ৪০ হাজার পর্যন্ত মানুষ এইচআইভিতে সংক্রমিত হতে পারেন। তবে কাঠামোবদ্ধ পরীক্ষা-ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অধিকাংশেরই হয়তো রোগ শনাক্ত হবে না।

বিজ্ঞাপন

ঝুঁকির পেছনে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ

পাকিস্তানের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অতিরিক্ত ও বিপজ্জনকভাবে ইনজেকশন ব্যবহারের পেছনে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত চাপ কাজ করছে। সাংস্কৃতিকভাবে রোগী ও সেবাদানকারী—উভয়েই মুখে খাওয়ার ওষুধের চেয়ে ইনজেকশনকে বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর মনে করেন। সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিজেদের বা সন্তানদের জন্য ইনজেকশন চান, কারণ তাদের ধারণা এতে দ্রুত উপশম মেলে। বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য ইনজেকশন দেওয়া বাড়তি আয়ের উৎস হওয়ায় অপ্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেওয়ার আর্থিক প্রণোদনাও তৈরি হয়।

সরকারি হাসপাতালে সম্পদের ঘাটতি এই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। সুপারিনটেনডেন্টদের তত্ত্বাবধানে কোটা পদ্ধতিতে ওষুধ ও সরঞ্জাম বরাদ্দ করা হয়; নির্দিষ্ট পরিমাণ সরবরাহ পুরো মাস চালানোর কথা। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিপজ্জনকভাবে খরচ কমানো অনিবার্য হয়ে পড়ে। টিএইচকিউ তাউনসায় ছদ্মবেশে চিত্রধারণের সময় অনুসন্ধানকারীরা দেখেন, ওয়ার্ডে প্রায়ই মৌলিক সরঞ্জামও থাকত না। যেসব রোগীর তরল প্যারাসিটামল কেনার সামর্থ্য ছিল, তাদের নিজেদেরই তা নিয়ে আসতে বলা হতো। এক নার্স অভিযোগ করেন, “ওষুধের সামান্য পরিমাণেরও হিসাব দিতে আমাদের বাধ্য করা হয়।”

নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সুরক্ষা দিতে তেমন কার্যকর নয়। লাইসেন্সবিহীন চিকিৎসকেরা শহর ও গ্রামে অবাধে কাজ করায় ভুয়া চিকিৎসার বিস্তার ব্যাপক। পাঞ্জাব সরকার দাবি করেছে, তাউনসায় ভুয়া চিকিৎসকদের পরিচালিত ১৭৫টি কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এ বন্ধের মেয়াদ সাময়িক। ২০১৯ সালের রাটোদেরো সংক্রমণের পর কর্তৃপক্ষ প্রথমে অননুমোদিত ক্লিনিকগুলো সিল করে দেয়। কিন্তু ছাড়পত্র পাওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই সেগুলো আবার খুলে যায়।

পাকিস্তান সংক্রামক রোগ সমিতির সভাপতি ডা. রফিক খানানি বলেন, নিয়ন্ত্রণকারী বিভাগগুলোর অস্তিত্ব শুধু নথিপত্রে আর দপ্তরে। বাস্তবে সেগুলো কার্যকর নয়।

বিজ্ঞাপন

পরিণতি নিয়ে বেঁচে থাকা

তাউনসার সংক্রমণে আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য পরিণতি প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের পরও বহুদূর বিস্তৃত। মোহাম্মদ আমিনের দশ বছর বয়সী বোন আসমার ওজন কমছে। যে ভাইরাসে তার কখনোই আক্রান্ত হওয়ার কথা ছিল না, সেটির জন্য এখন তাকে আজীবন অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ নিতে হবে। এইচআইভি নিয়ে সামাজিক কলঙ্কের কারণে প্রতিবেশীরা প্রায়ই তাদের সন্তানদের আসমার সঙ্গে খেলতে দেন না। ফলে অসুস্থতার পাশাপাশি সে একাকীও হয়ে পড়েছে।

আসমা মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমার কী হয়েছে?” তার জীবন এতটা বদলে গেল কেন, তা বুঝতে তার কষ্ট হয়। ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সে সাংবাদিকদের বলে, ভাইকে তার খুব মনে পড়ে এবং সে বিশ্বাস করে ভাই এখন ঈশ্বরের কাছে আছে। অসুস্থতা সত্ত্বেও সে স্কুলে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে এবং বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

আগেই দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর চিকিৎসার খরচের বোঝা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে না পাওয়া বিশেষায়িত শিশুদের এইচআইভি ওষুধের জন্য অভিভাবকদের দূরের শহরে যেতে হয়, প্রতিবার যাতায়াতে হাজার হাজার রুপি খরচ হয়। তাউনসার এক বাবা স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ছেলেকে বাঁচাতে তার সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমার ঋণ বহুগুণ বেড়েছে। এক্স-রে, আলট্রাসাউন্ড ও রক্ত সঞ্চালনের খরচ মেটাতে গবাদিপশু বিক্রি করেছি।” পরিবারটি কখনো কল্পনাও করেনি এমন বিপর্যয় তাদের ওপর নেমে আসবে।

তাউনসার সংকট জনস্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহির ভেঙে পড়ার প্রতীক, বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও এবং সরকারি অস্বীকৃতি চললেও পরিবারগুলোকে চিকিৎসার খরচ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সন্তানরা কীভাবে তাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ব্যবস্থার শিকার হলো—সে প্রশ্নের উত্তরহীনতা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ চলতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যা জানা জরুরি

  • ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তানের তাউনসায় ৩৩১ শিশুর এইচআইভি পরীক্ষায় পজিটিভ ফল এসেছে। অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে সংক্রমণের উৎস হিসেবে দূষিত সূঁচ শনাক্ত হয়েছে
  • বিবিসি আই-এর ছদ্মবেশী অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতির আট মাস পরও টিএইচকিউ তাউনসা হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মীরা একাধিকবার ব্যবহারের উপযোগী ওষুধের শিশিতে সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহার করেছেন এবং জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়া রোগীদের ইনজেকশন দিয়েছেন
  • হাসপাতাল প্রশাসকরা ভিডিওচিত্রের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে অনিরাপদ পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও পাঞ্জাব সরকার বলেছে, হাসপাতালকে সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত করার চূড়ান্ত প্রমাণ নেই
  • বিশ্বে চিকিৎসার প্রয়োজনে ইনজেকশন দেওয়ার হার পাকিস্তানে সর্বোচ্চগুলোর একটি। বছরে জনপ্রতি ৮ থেকে ১৩টি ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং এর ৭০ শতাংশের বেশি অনিরাপদ পদ্ধতিতে দেওয়া হয়
  • ২০২৫ সালে পাকিস্তানে নতুন এইচআইভি সংক্রমণের সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ। করাচিতে সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব এবং সিন্ধু প্রদেশে বারবার সংক্রমণের খবরও পাওয়া গেছে
  • বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে পুনর্ব্যবহার করা যায় না এমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যাওয়া সিরিঞ্জ বাধ্যতামূলক করা, সরকারি ক্লিনিকে বহির্বিভাগের সময় বাড়িয়ে ভুয়া বেসরকারি চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং অনিরাপদ চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে জনগণকে ক্ষমতায়িত করা
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে