বঞ্চনার ব্যাপকতা
মুহাম্মদ দাউদ আলি বছরের পর বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধে আহত হন। ৬৫ বছর বয়সে তাঁর কাছে ছিল পাসপোর্ট, পেনশনের নথি এবং সামরিক বাহিনীতে কাজের প্রমাণপত্র, যা নাগরিক হিসেবে তাঁর মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা। তবু চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শেষ হলে আলি জানতে পারেন, তাঁকে ও তাঁর তিন সন্তানকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাঁর স্ত্রীর নাম রয়ে গেছে। আলি সাংবাদিকদের বলেন, "আমি হতবাক। গভীরভাবে আহত ও অপমানিত বোধ করছি। আমাদের বিরোধের নিষ্পত্তি না করেই তারা কীভাবে নির্বাচন করতে পারে? কার কাছে ন্যায়বিচার চাইব, তা আমার একেবারেই জানা নেই।"
সূচিপত্র
আলি একা নন। ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া আনুমানিক ৯০ লাখ ভোটারের মধ্যে তিনি একজন। পশ্চিমবঙ্গের ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ তাঁরা। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল নির্ধারিত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত বিশাল ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাম বাদ পড়ে। অনুপস্থিত বা মৃত ভোটার হিসেবে ৬০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া হলেও, আলির পরিবারের মতো আরও ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য আইনি অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। তাদের মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি; ট্রাইব্যুনাল ও স্থগিত ভোটার তালিকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।
১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে, তবে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে এর পর বিশেষ বিচারিক প্রক্রিয়ার আরেকটি ধাপ যুক্ত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই সংশোধনের লক্ষ্য দ্বৈত বা পুরোনো তথ্য বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ায় নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট ও আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের অখণ্ডতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কীভাবে তালিকা থেকে উধাও হলেন লাখো ভোটার
বিশেষ নিবিড় সংশোধন পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালের পর ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করার সবচেয়ে বিস্তৃত উদ্যোগ। নিয়মিত সংশোধনের মতো নয়, এসআইআরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই, নথিপত্রের কঠোর পরীক্ষা এবং কর্মকর্তাদের ভাষায় "যৌক্তিক অসংগতি" শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৭ কোটি ৬৬ লাখ নিবন্ধিত ভোটার নিয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় নামের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে প্রায় ৭ কোটি ৪ লাখে দাঁড়ায়।
নাম বাদ পড়ার ঘটনাগুলো তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথমত, দ্বৈত নাম, মৃত ভোটার এবং রেকর্ড হালনাগাদ না করেই স্থানান্তরিত হওয়া ব্যক্তিদের নাম প্রশাসনিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যাচাইয়ের সময় বুথ স্তরের কর্মকর্তারা যেসব অনুপস্থিত ভোটারকে খুঁজে পাননি। তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত শ্রেণিতে রয়েছেন ২৭ লাখ ভোটার, যাঁদের ২০০২ সালের তালিকা—যেটিকে শেষ নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়—এবং বর্তমান তথ্যের মধ্যে অসংগতি খুঁজতে এআই-চালিত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এআই ব্যবস্থাটি কয়েক দশকের ব্যবধানে নামের বানানে অমিল, একই পূর্বপুরুষের সঙ্গে ছয়জনের বেশি ভোটার যুক্ত থাকা, মা-বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান ১৫-৪৫ বছরের বাইরে হওয়া, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে ভোটারের বয়সের ব্যবধান ৪০ বছরের কম হওয়া এবং নাম ও লিঙ্গের অসংগতি—এ ধরনের সতর্কসংকেত শনাক্ত করেছে। আলির মতো ভোটাররা ২০০২ সালের রেকর্ডের সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র দেখানো ফরম জমা দেওয়া এবং পর্যাপ্ত নথিপত্র দেওয়া সত্ত্বেও সন্দেহভাজন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছেন। পুনরায় যাচাইয়ের শুনানির পরও তাঁদের অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সংকলিত নির্বাচনী এলাকা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, আইনি অনিশ্চয়তায় থাকা ২৭ লাখ ভোটারের প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলিম। বাদ পড়া মোট ৯০ লাখের মধ্যে মুসলিম ৩১ লাখ ১০ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যায় তাঁদের অংশ ২৭ শতাংশ, ফলে বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে তাঁদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে এই বাদ দেওয়ার প্রভাব বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপরই পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন মতুয়া উদ্বাস্তু সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দু, শহরাঞ্চলের হিন্দিভাষী অভিবাসী এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও।
ভোটাধিকার হারানোর গল্প
পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে অপমান ও বিভ্রান্তির ব্যক্তিগত গল্প। ৮৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সুপ্রবুদ্ধ সেন দামোদর ভ্যালি করপোরেশনে ৩২ বছর কাজ করেছেন। কিংবদন্তি শিল্পী নন্দলাল বসুর নাতি সেন মাধ্যমিকের সনদ, পাসপোর্ট, চাকরির নথি ও পেনশনের কাগজপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও দেখেন, তাঁর নাম বাদ পড়েছে। সেন বলেন, "ভোটাধিকার হারানো নিয়ে এখন আর আমার কিছু যায় আসে না। যাঁরা আমার নাম বাদ দিয়েছেন, তাঁদের বলতে হবে, আমি তালিকায় নেই কেন।"
ভারতীয় বিমানবাহিনীর সম্মাননাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উইং কমান্ডার মো. শামীম আখতার একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ছিলেন এবং ১৭ বছর দেশের সেবা করেছেন। তিনি দেখলেন, চূড়ান্ত তালিকা থেকে তাঁর নাম "বিচারাধীন" অবস্থায় চলে গেছে, পরে পুরোপুরি বাদ পড়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে বুথ স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি। আখতার বলেন, "আমি আমার বিএলও মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করি, কিন্তু কী করতে হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন যে নামটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরিয়ে আনা হবে। এরপর ২৮ মার্চ দ্বিতীয় তালিকায় আমার নাম বাদ পড়লে বিএলও আমাকে আইনজীবী নিয়োগ করে ট্রাইব্যুনালে যেতে বলেন।"
প্রক্রিয়াটির খামখেয়ালিপনা কিছু অদ্ভুত বৈপরীত্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু পরিবারে মৃত সদস্যদের নাম তালিকায় রয়ে গেছে, অথচ জীবিত আত্মীয়দের নাম বাদ পড়েছে। রাজ্যের মন্ত্রী গোলাম রব্বানি চারটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং কয়েক দশক ধরে নিয়মিত ভোট দিয়েছেন, তবু দেখেন তাঁর নাম বিচারাধীন। মন্ত্রিসভার সদস্য শশী পাঁজার পরিবারের অন্য সদস্যরা ভোটার থাকার যোগ্য বিবেচিত হলেও তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং ভারতের ২০২৫ সালের নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ২২ বছর বয়সী রিচা ঘোষও বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় যাচাইয়ের মুখে পড়েছেন।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মালদা জেলার হরিশ্চন্দ্রপুর আসনের ৩৫ বছর বয়সী হাসনরা খাতুন এই বাদ দেওয়ার প্রজন্মান্তরের ক্ষত তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "আমি খুব রেগে আছি।" তাঁর বাবা, দাদা ও প্রপিতামহ ভোটার ছিলেন। এখন তাঁদের পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজনের ভোটাধিকার স্থগিত। তিনি প্রশ্ন করেন, "কার্যত আমাদের অ-নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। এরপর কী হবে, কে জানে? এই ব্যবস্থার ওপর আর আস্থা রাখা যায় না।"
আমরা ভোট না দিলে, গরিব মানুষের অস্তিত্বের কথা মনে রাখারও কেউ থাকবে না।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের নৃবিজ্ঞানী মুকুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের এক ভোটার এই কথাটি বলেছিলেন। ভোটাধিকার হারানোর অস্তিত্বগত তাৎপর্য এতে ফুটে ওঠে। বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভোট দেওয়া শুধু একটি প্রক্রিয়াগত অধিকার নয়, এর গভীর অর্থ রয়েছে। তিনি বলেন, "তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে তাদের একটি মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া—যে অধিকারটি তাদের কাছে অত্যন্ত অর্থবহ এবং নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরার সুযোগ দেয়।"
রাজনৈতিক মেরুকরণ
ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার সংকট পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পরস্পরবিরোধী বয়ানের সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) অভিযোগ করেছে, নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে মিলে বিরোধী ভোটারদের, বিশেষ করে মুসলিমদের, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। বন্দ্যোপাধ্যায় বিক্ষোভের পরিকল্পনা এবং আবার সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন করেছেন, "২৭ লাখ ভোটারের মামলার নিষ্পত্তি না করে কীভাবে নির্বাচন শুরু হতে পারে?"
বিজেপি এই উদ্যোগকে জরুরি জাতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান হিসেবে সমর্থন করেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের যুক্তি, সংবিধান অনুযায়ী শুধু ভারতীয় নাগরিকেরাই নেতা নির্বাচন করতে পারেন। তিনি বলেন, "তাই অ-নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়া জরুরি ছিল।" সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ায় প্রক্রিয়া ধীর করার জন্য তিনি রাজ্য সরকারকে দায়ী করেন। প্রচারসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের লক্ষ্য বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। টিএমসির মতে, মুসলিমদের বোঝাতে এই শব্দটি সাংকেতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে তথ্য-উপাত্ত সরল সাম্প্রদায়িক বয়ানকে জটিল করে তুলেছে। মুর্শিদাবাদ ও মালদার মতো জেলায় মুসলিমদের ওপর অসম হারে প্রভাব পড়লেও অন্য এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ায় বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের মতুয়া সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দুদের নাম ব্যাপক হারে বাদ পড়েছে। ঐতিহাসিকভাবে তাঁরা বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। কলকাতায় উত্তর অংশে প্রায় ২৯.৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ অংশে ২৭.৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ গেছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশই হিন্দু; তাঁদের অনেকের শিকড় উত্তর ভারতে এবং তাঁরা হিন্দিভাষী সম্প্রদায়ের সদস্য।
টিএমসির একটি প্রতিনিধিদল দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করলে বিতর্ক চরমে ওঠে। সাত মিনিটের বৈঠকের পর প্রতিনিধিদলের সদস্য ডেরেক ও'ব্রায়েন অভিযোগ করেন, কুমার প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং দলকে "দূর হয়ে যেতে" বলে অপমান করেন। নির্বাচন কমিশন অভিযোগগুলো জোরালোভাবে অস্বীকার করে দাবি করেছে, বরং টিএমসি নেতারাই গলা চড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আস্থার ভাঙন তুলে ধরে।
নাম বাদ পড়ার ভৌগোলিক ধরন
পশ্চিমবঙ্গের সব এলাকায় সমান হারে নাম বাদ পড়েনি। বরং উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী গুরুত্ব রয়েছে, এমন কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় তা বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর এবং কোচবিহার জেলায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গেছে। শুধু উত্তর ২৪ পরগনাতেই ১২ লাখ ৬০ হাজার ভোটার বাদ পড়েছেন, যা জেলার মোট ভোটারের ১৫ শতাংশ। ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম-অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে ৭ লাখ ৪৯ হাজার নাম বাদ গেছে, যা জেলার ভোটারের প্রায় ১৩ শতাংশ।
রাজ্যজুড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন ঘটেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলায়, যেখানে ভোটারের সংখ্যা কমেছে ১৬.৯ শতাংশ। এই ধরন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ভাগ্য প্রায়ই নির্দিষ্ট কিছু আসনে অল্প ব্যবধানে নির্ধারিত হয়। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মাত্র ১,৯৫৬ ভোটে হেরেছিলেন। সেখানে বাদ পড়া ভোটারদের ৯৫.৫ শতাংশ পর্যন্ত মুসলিম বলে জানা গেছে, যদিও স্থানীয় ভোটারের মাত্র ২৫ শতাংশ এই সম্প্রদায়ের।
বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসন ভবানীপুরে মুসলিম ভোটারের ৫১.৮ শতাংশকে বিচারাধীন রাখা হয়েছে, যদিও জনসংখ্যার মাত্র ২১.৯ শতাংশ মুসলিম। আসনটিতে কয়েক হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। রাজনৈতিকভাবে নির্ণায়ক আসনে এ ধরনের বাছাই করা পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয়, এই সংশোধনের ফলে ভোটারদের সমর্থন আদায় করে নয়, বরং ভোটার সংখ্যা কমিয়ে নির্বাচনের ফল বদলে যেতে পারে।
সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, এমন তফসিলি জাতিভুক্ত গোষ্ঠী মতুয়া সম্প্রদায় এ অঞ্চলের পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির জটিলতা তুলে ধরে। বাগদা ও বনগাঁ উত্তরের মতো আসনে বিপুলসংখ্যক হিন্দু মতুয়া ভোটারের নাম বাদ গেছে, যা শুধু মুসলিমদের লক্ষ্য করে বাদ দেওয়ার বয়ানকে দুর্বল করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে আসা মতুয়াদের কয়েক ডজন বিধানসভা আসনে প্রভাব রয়েছে। ২০২১ সালে তাঁদের বেশির ভাগই বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন, যা দলটিকে ৩ থেকে ৭৭টি আসনে উন্নীত করতে সহায়তা করে। এখন তাঁদের ভোটাধিকার হারানো বিজেপির গড়ে তোলা জোটকেই ভেঙে দিতে পারে।
আইনি অনিশ্চয়তা ও আদালতের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের অখণ্ডতা ও গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের পর সর্বোচ্চ আদালত নাম বাদ দেওয়ার সব বিরোধ নিষ্পত্তি না করেই নির্বাচন কমিশনকে এপ্রিলে ভোট এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ফলে ২৭ লাখ মামলা বিচারাধীন থাকলেও ভোটার তালিকা কার্যত স্থগিত রয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ সাংবিধানিক সংস্থা ও নির্বাচিত সরকারের মধ্যে পরিস্থিতিটিকে "আস্থার ঘাটতি" বলে বর্ণনা করেছে।
আদালত একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে: পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের প্রায় ৭০০ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে নির্বাচনী নিবন্ধন কর্মকর্তাদের আধা-বিচারিক দায়িত্ব নিতে নিয়োগ করা হয়েছে। আবেদনের বিপুল চাপ সামলাতে হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিদের নেতৃত্বে ১৯টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। তবে মামলার বিপুল সংখ্যায় ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আদালতে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ডি.এস. নাইডু জানিয়েছেন, বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৪ লাখ আবেদন বিচারাধীন এবং প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে এক লাখের বেশি মামলা রয়েছে।
বিচারপতি বাগচী অস্বাভাবিক আবেগের সঙ্গে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "যে দেশে আপনার জন্ম, সেখানে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু সাংবিধানিক নয়, আবেগেরও। এটি গণতন্ত্রের অংশ হওয়া এবং সরকার নির্বাচনে সহায়তা করার বিষয়।" তবু আদালত বলেছে, বিচারিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য নির্বাচন এগিয়ে নিতে সহায়তা করা, তা থামানো নয়। বেঞ্চ জোর দিয়ে বলেছে, বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়ে নির্বাচনের ফল উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত না হলে প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না।
নাম পুনর্বহালের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য বাস্তব ফল হয়েছে হতাশাজনক। বিচারিক প্রক্রিয়ার পর বাদ পড়া ২৭ লাখ নামের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ফিরিয়ে আনা হয়েছে, দুটিই সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট হস্তক্ষেপের পর। ফারাক্কার কংগ্রেস প্রার্থী মাহতাব শেখ এবং বর্তমানে মানিকচকের কংগ্রেস প্রার্থী সাবেক বিধায়ক মোত্তাকিন আলম ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন। বাকি লাখো মানুষের জন্য ট্রাইব্যুনালগুলো এখনো কার্যত কাজ শুরু করতে পারেনি, যদিও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশনের মতো স্থানে প্রস্তুতিমূলক কাজ হয়েছে।
ভোটার তালিকা স্থগিত এবং ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় সুপ্রিম কোর্ট ১৩ এপ্রিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানির দিন ধার্য করেছে। স্থগিতাদেশের পর ট্রাইব্যুনালে যেসব ভোটারের নাম পুনর্বহাল হবে, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণ করা হবে ওই শুনানিতে। মূল প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত সময়সীমার পর যাচাই-বাছাই শেষ হলেও এই নির্বাচনেই কি ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া যাবে, নাকি যোগ্য নাগরিকদের অংশগ্রহণের পরবর্তী সুযোগের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে।
নির্বাচনী হিসাব ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ
৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া আমলাতান্ত্রিক কোনো রদবদলের চেয়ে অনেক বেশি; এটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বহু জেলায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। হুগলিতে ২০২১ সালে টিএমসি ২ লাখ ৭৯ হাজার ভোটে জিতেছিল, এখন সেখানে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ভোটারের নাম বাদ গেছে। পূর্ব বর্ধমানে ২ লাখ ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানের বিপরীতে এখন বাদ পড়েছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার ভোটার। পশ্চিম বর্ধমানে মাত্র ৪৩,৮৯৩ ভোটের ব্যবধানকে ছাপিয়ে গেছে ৩ লাখ ১৪ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়া।
এই হিসাব নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মৌলিক গতিপ্রকৃতি বদলে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন প্রায়ই আসনভিত্তিক অল্প ব্যবধানে নির্ধারিত হয়। নির্দিষ্ট কিছু বুথে মাত্র কয়েক হাজার ভোটার কমে গেলেও ফল বদলে যেতে পারে, বিশেষ করে শহর ও শহরতলির আসনে। ভোটারভিত্তি সংকুচিত হওয়ায় দলগুলোকে পুরোপুরি নতুন করে কৌশল সাজাতে হবে। ভোটারদের সমর্থন আদায়ের বদলে নিবন্ধিত বাকি ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব বাড়বে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শিবাজী প্রতিম বসু বলেন, ভোটারদের অধিকার স্থগিত রেখে নির্বাচন করার কোনো নজির ভারতে নেই। তিনি বলেন, "ভারতে ভোটারদের অধিকার স্থগিত থাকা অবস্থায় নির্বাচন হওয়ার কোনো উদাহরণ নেই। এটি গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার।" এই বিতর্ক নির্বাচনী অখণ্ডতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করা জরুরি হলেও এই উদ্যোগের ব্যাপকতা, পদ্ধতি ও সময় মানুষের মধ্যে আস্থার বদলে ভয় সৃষ্টি করেছে।
ব্যক্তির ভোটাধিকার হারানোর বাইরে এই পরিস্থিতির মানবিক মূল্য গণতন্ত্রের ওপর আস্থার ক্ষয়। সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য, সম্মাননাপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ এবং আজীবন নাগরিকরাও বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তালিকা থেকে বাদ পড়লে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে আগে থেকেই সন্দিহান সম্প্রদায়গুলোতে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। হাসনরা খাতুনের পরিবার যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ভোটাধিকার হারানোর মুখে, তখন প্রশাসনিক ভুল রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গের আসনসংখ্যা সংসদে চতুর্থ সর্বোচ্চ। তাই এই সংকটের সমাধানের প্রভাব রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। ট্রাইব্যুনাল সময়মতো ন্যায়বিচার দিতে পারবে কি না, স্থগিত তালিকার সঙ্গে ভোটাধিকার মিলিয়ে দেখার পথ সুপ্রিম কোর্ট বের করতে পারবে কি না, এবং নির্বাচন কমিশন জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না—এসবের ওপর শুধু এপ্রিলের নির্বাচনের ফল নয়, ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাও নির্ভর করবে।
মূল বিষয়
- পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ গেছে, যা রাজ্যের ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের ১২ শতাংশ
- ২৭ লাখ ভোটার "বিচারাধীন" অবস্থায় আইনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন; নির্বাচনের তারিখ ২৩ ও ২৯ এপ্রিল
- ট্রাইব্যুনাল গঠন হলেও বিতর্কিত ২৭ লাখ মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি নাম পুনর্বহাল হয়েছে
- বিরোধ নিষ্পত্তি না হলেও সুপ্রিম কোর্ট স্থগিত ভোটার তালিকা নিয়েই নির্বাচন এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে
- ২০০২ সালের ভিত্তি-তালিকার সঙ্গে বর্তমান রেকর্ড তুলনা করে এআই-চালিত প্রক্রিয়ায় "যৌক্তিক অসংগতি" চিহ্নিত হয়েছে
- মোট বাদ পড়া ভোটারের ৩৪ শতাংশ মুসলিম, যদিও জনসংখ্যায় তাঁদের অংশ ২৭ শতাংশ; হিন্দু মতুয়া সম্প্রদায়ও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
- মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর ২৪ পরগনাসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নাম বাদ পড়ার হার সবচেয়ে বেশি
- ক্ষতিগ্রস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কার্গিল যুদ্ধের প্রবীণ সেনাসদস্য, রাজ্যের মন্ত্রী, মুখ্যসচিব এবং ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী রিচা ঘোষ
- বিরোধী ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশ করেছে বলে টিএমসির অভিযোগ
- অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়াকে জরুরি উদ্যোগ বলে বিজেপির সমর্থন






