সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে দুর্যোগের আঘাত
ইন্দ্রাণী রবিচন্দ্রন এখনও তাঁর বাড়ির যে একমাত্র অংশটি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই ঘুমান। শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি জেলার কুদুগালহেনা গ্রামে বন্যার পানি ঢুকে পড়ার তিন মাস পরও তিনি ও তাঁর পরিবার তাঁদের আগের জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছেন। "পানির স্তর দ্রুত বেড়ে গেল। আমরা ছুটে বেরিয়ে আসি, ঘর থেকে কিছু নেওয়ারও প্রায় সময় পাইনি," ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ার তাণ্ডবের রাতের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন। "চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল, আর মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। দৌড়ে পালানোর সময় বিষাক্ত প্রাণীর ওপর পা পড়ে যায় কি না, তা নিয়ে আমরা আতঙ্কিত ছিলাম। তবে বেঁচে যাওয়াটা আমাদের সৌভাগ্য।"
সূচিপত্র
- সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে দুর্যোগের আঘাত
- ডিটওয়ার তাণ্ডব
- পানির সীমা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়
- ব্যবস্থাগত ব্যর্থতায় দুর্যোগের প্রভাব আরও বেড়েছে
- ইরান যুদ্ধ: দ্বিতীয় ঝড়
- সহায়তার ভূরাজনীতি: সমুদ্রের ওপারের বন্ধু
- রাজনৈতিক চাপ ও কয়লা সংকট
- সরকারি সক্ষমতার টানাপোড়েনে তৃণমূলের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
- কৌশলগত সন্ধিক্ষণ: জ্বালানি ও জোট
- মূল তথ্য
তাঁর অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রের লাখো মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগটি আঘাত হানে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি চরম নাজুক অবস্থায় ছিল। শ্রীলঙ্কা এখন অর্থনীতিবিদদের ভাষায় "ত্রিমুখী ধাক্কা" সামলাচ্ছে: ২০২৫ সালের নভেম্বরের ধ্বংসাত্মক বন্যা, ২০২২ সালে রাষ্ট্রকে প্রায় ভেঙে ফেলার উপক্রম করা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, আর এখন ইরান যুদ্ধের ফলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই তিন সংকটের মিলিত প্রভাবে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, যা বহু বছরের ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারকে নস্যাৎ করার হুমকি দিচ্ছে।
মাত্র তিন দিনে শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের উচ্চভূমির কিছু এলাকায় ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে, যা প্রায় দুই মাসের গড় বৃষ্টিপাতের সমান। এর ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ৬৪৩ জন নিহত, ১৭৩ জন নিখোঁজ এবং ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার, যা জিডিপির ৪ শতাংশের সমান; তবে দেশীয় কিছু হিসাব অনুযায়ী অঙ্কটি ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে একে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় বলে অভিহিত করেছেন। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিতে এটি ২০০৪ সালের সুনামিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
"২০০৪ সালের সুনামির তুলনায় প্রাণহানি ততটা বেশি ছিল না। কিন্তু অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে ডিটওয়া সুনামির চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে।"
লন্ডনের ওডিআই গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ড. গণেশন উইগনারাজা
সময়টা এর চেয়ে খারাপ হওয়া কঠিন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর যখন দেখা গেল, পুরো জনপদ ভেসে গেছে এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চল পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে, তখনই বিশ্ববাজারে তেলের দামে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করে তোলে। এতে সরাসরি হুমকিতে পড়ে এমন একটি দেশ, যেটি মোট আমদানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশের জন্য আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো বছরে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে।
ডিটওয়ার তাণ্ডব
ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়া ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আছড়ে পড়ে, এরপর পূর্ব উপকূল ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়। আগের আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের তুলনায় এই ঝড়ের বিশেষত্ব শুধু এর তীব্রতা ছিল না, ছিল অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত। শুধু ২৮ নভেম্বরেই দ্বীপটিতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি নামে, যা শ্রীলঙ্কার গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
পানির প্রবাহের হার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটারে পৌঁছায়, যা প্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আমাজন নদীর সমতুল্য। ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত আমাজন অববাহিকার সঙ্গে তুলনা করলে শ্রীলঙ্কার পানিনিষ্কাশন অববাহিকা অতি ক্ষুদ্র। আগের বৃষ্টিতে মাটি ইতিমধ্যে পানিতে সম্পৃক্ত থাকায় প্রায় সব পানিই প্রবাহিত হয়ে যায়। এতে জলাধারগুলো উপচে পড়ে এবং কেলানি, মাহাওয়েলি ও দেদুরু ওয়া-সহ প্রধান নদীগুলো একই সময়ে প্লাবিত হয়।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। চা উৎপাদনকারী উচ্চভূমির পুরো গ্রাম ভূমিধসে চাপা পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নুয়ারা এলিয়া জেলার থালাওয়াকেলেতে বাগানশ্রমিক সুন্দরম মুত্তুপিল্লাই শুধু বাড়িই হারাননি, হারিয়েছেন জীবিকাও। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "সব শেষ। আমরা জানি, ঢেউখেলানো পাহাড়ি এলাকায় পরিস্থিতি অনিশ্চিত, আর সময়ে সময়ে কাদাধসও হয়েছে। এখন রাস্তাঘাট চলাচলের অযোগ্য। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আশাও নেই।"
জাতীয় ভবন গবেষণা সংস্থা সাতটি জেলায় ২১৫টি গুরুতর ভূমিধসের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ৪১ হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ৫০০টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ৪০টি সেতু ভেসে গেছে এবং ২৪৭ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মধ্যাঞ্চলের উচ্চভূমি দিয়ে যাওয়া প্রধান রেলপথের বেশ কয়েকটি অংশ নষ্ট হয়েছে, ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই পথে অনির্দিষ্টকালের জন্য রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রান্নার গ্যাস, ওষুধ ও খাবারের ব্যাপক সংকট দেখা দেওয়া ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সামলে উঠতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এই দুর্যোগের মানসিক অভিঘাত ছিল গভীর। ইন্দ্রাণীর স্বামী রবিচন্দ্রন বলেন, "৩০ বছরে এই প্রথম এমন ভয়াবহ বন্যা দেখলাম।" আংশিক ধ্বংস হওয়া বাড়ি মেরামতের জন্য দম্পতি সরকার থেকে ৫০ হাজার রুপি (৩২৫ ডলার) পেয়েছেন, পাশাপাশি ছোট সন্তানদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তাও পেয়েছেন। সবকিছু হারানো মানুষদের সর্বোচ্চ ৫০ লাখ রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তবে কয়েক মাস পরও অনেকেই সেই অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন।
পানির সীমা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে শ্রীলঙ্কার কৃষি ও শিল্পের প্রাণকেন্দ্রে। ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যাঞ্চলের উচ্চভূমি দেশটির চা ও সবজির প্রধান উৎপাদন এলাকা। পোশাকের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়কারী খাত চায়ে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার আয় হয়। এই খাতে বিপর্যয়কর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে উৎপাদন ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে; পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস বা কয়েক বছরও লাগতে পারে।
উভা প্রদেশের বাদুল্লায় চা-বাগানের ৩৪ বছর বয়সী শ্রমিক সেন্থিলনাথন পালানসামি বলেন, "আমরা যা সহ্য করেছি, তার জন্য কোনো কিছুরই প্রস্তুতি ছিল না। বাগানগুলো এখন নিরাপদ নয়। কয়েক মাস কোনো কাজ থাকবে না। বাগানের জীবন ছেড়ে অন্য কোথাও কাজ করতে হবে।" তাঁর স্ত্রী মারিয়াপ্পান শর্মিলা এলাকাটিকে "বিরানভূমির মতো" বলে বর্ণনা করেন।
এই অর্থনৈতিক ধাক্কা সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলে। আদমশুমারি ও পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার চা রপ্তানিকারক সমিতি ২০২৫ সালে ১৫০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, যা এখন আর অর্জনযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে না।
কলম্বোভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডভোকাটা ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী ধননাথ ফার্নান্দো সতর্ক করে বলেন, এই দুর্যোগ অর্থনীতিকে সচল রাখতে অত্যাবশ্যক বৈদেশিক আয় কমিয়ে দেবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে শ্রীলঙ্কার দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনীতি বড় করে ঋণ পরিশোধ করাই আমাদের লক্ষ্য। তা করতে হলে অন্য কাজের খোঁজে মানুষকে বাগান ছেড়ে যেতে দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।"
এই দুর্যোগ শ্রীলঙ্কার সরকারি অর্থব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও সামনে এনেছে। সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সুযোগ দ্বীপরাষ্ট্রটির খুবই সীমিত। পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৫০ কোটি ডলারের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ সরকার পেয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-সহনশীলতার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
ব্যবস্থাগত ব্যর্থতায় দুর্যোগের প্রভাব আরও বেড়েছে
জলবায়ু পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ার ধ্বংসাত্মক শক্তি বাড়ালেও মানুষের সিদ্ধান্তই একটি তীব্র ঝড়কে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত করেছে। বিজ্ঞানীরা নথিভুক্ত করেছেন, ভারত মহাসাগরে ক্যাটাগরি ৩ থেকে ৫ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলো আগের চেয়ে দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, ফলে কর্তৃপক্ষের হাতে সাড়া দেওয়ার সময় কমে যাচ্ছে। তবে শ্রীলঙ্কায় ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতার পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশের অবক্ষয়।
১৯৭৭ সালে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হওয়ার পর থেকে শ্রীলঙ্কার সরকারগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রক তদারকি থেকে সরে আসে। আবাসন, মহাসড়ক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য জলাভূমি ভরাট করা হয়। দখলের কারণে নদী ও খাল ভরাট হয়ে যায়। পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড় ও নির্মাণকাজ ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বহু বছর আগে কর্মকর্তারা বন্যা ও ভূমিধসের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করলেও, সেখানকার বাসিন্দাদের সরিয়ে না নিয়েই নির্মাণকাজ চলতে থাকে।
এই নাজুকতার শিকড় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। ১৮৮০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা বাগান অর্থনীতি সম্প্রসারণের ফলে শ্রীলঙ্কার প্রায় ৪০ শতাংশ বনভূমি ধ্বংস করে। ১৯৩০ সালের মধ্যে নদীর উজানের অববাহিকা অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি চা চাষের জন্য পরিষ্কার করা হয়। এর ফলে বছরে ৫ লাখ থেকে ৮ লাখ টন মাটি ক্ষয় হতে থাকে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়ে।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারি বিনিয়োগ বরাবরই খুব কম। ২০২০ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক সংকটের সময় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরও বেড়ে যায়। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ বন্ধ রাখা হয় এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, জলাধার ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ উপেক্ষিত হয়। আবহাওয়া বিভাগের রাডার নেটওয়ার্ক প্রায় অকার্যকর, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশনের সংখ্যা অপর্যাপ্ত এবং স্যাটেলাইট থেকে তথ্য গ্রহণের সরঞ্জাম পুরোনো।
সেচ প্রকৌশলী পালিথা দেশাপ্রিয় ব্যাখ্যা করেন, "কলম্বোর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কেলানি নদীর তীরের নিচু এলাকাগুলোতেও কয়েক লাখ মানুষ অনিরাপদ অবস্থায় বাস করেন। তাঁদের অধিকাংশেরই নিরাপদ এলাকায় জমি কেনার সামর্থ্য নেই।" সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পানিপ্রবাহের হিসাব উপেক্ষা করে সেতু ও বাঁধ খুব ছোট বা নিচু করে নির্মাণ করায় সেগুলো ভেঙে পড়ে।
উদ্ধার অভিযানে হাজারো সেনা মোতায়েন করা হলেও সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মূলধনী ব্যয়ের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। প্রতিরক্ষা খাতে বছরে ১৫০ কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ থাকলেও এর বেশির ভাগই নিয়মিত ব্যয়ে চলে যায়, সরঞ্জাম কেনায় নয়। উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর কাছে ভারী মালামাল বহনে সক্ষম হেলিকপ্টার আছে মাত্র কয়েকটি; প্রত্যন্ত এলাকার জন্য উঁচু পানিতে চলতে পারে এমন যানবাহন, নৌকা, ড্রোন ও আধুনিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রকৌশল সরঞ্জামও অপর্যাপ্ত।
ইরান যুদ্ধ: দ্বিতীয় ঝড়
শ্রীলঙ্কা যখন কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন ২ হাজার ৭০০ মাইল দূরে আরেকটি সংকট শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভর দ্বীপরাষ্ট্রটির বৈদেশিক লেনদেনে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। গত বছর বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কাছ থেকে শ্রীলঙ্কা প্রায় ৭০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছিল, যার বড় অংশ এসেছিল উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ব্যাপক ছাঁটাই এখনও শুরু না হলেও শ্রীলঙ্কানদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকার জরুরি ব্যবস্থা নেয়, যা ২০২২ সালের পতনের তিক্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সাপ্তাহিক জ্বালানি বরাদ্দ সীমিত করতে কিউআর কোডভিত্তিক রেশনিং আবার চালু হয়। জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়; ভর্তুকি না থাকলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৬০০ রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিদ্যুতের খরচ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে, আর কমে আসা সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সরকার পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে কাটছাঁট করে। পরিবহন জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তাহে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়।
সিংহলি ও তামিল নববর্ষের আগে জনঅসন্তোষের মুখে প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে তিন মাসে ১০ হাজার কোটি রুপি (৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার) সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এর আওতায় প্রতি লিটার ডিজেলে সর্বোচ্চ ১০০ রুপি এবং পেট্রলে ২০ রুপি ভর্তুকি দেওয়া হবে। নতুন ঋণ না নিয়ে বিদ্যমান বাজেট থেকেই এই অর্থ দেওয়া হবে। ধানচাষিদের জন্য সার ভর্তুকি ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার রুপি করা হয়েছে, পাশাপাশি চা চাষিদের জন্যও অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হবে। মাসে ৯০ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা বিলে সরকারি ভর্তুকি পাবেন।
দিসানায়েকে পার্লামেন্টে বলেন, "আমরা ব্যাংকঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে রাখার চেষ্টা করছি। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আমরা সহায়তা ব্যবস্থাগুলো চালু করেছি। মে মাসের শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করব।"
এই সরবরাহ নিশ্চিত করতে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার হয়েছে। প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে টেলিফোনে কথা হওয়ার পর মার্চের শেষ দিকে ভারত ৩৮ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল পাঠায়। সরবরাহ বাড়াতে কলম্বো রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও আলোচনা করছে, যদিও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় দরকার, যার মেয়াদ এপ্রিলের শুরুতে শেষ হয়েছে।
সহায়তার ভূরাজনীতি: সমুদ্রের ওপারের বন্ধু
ডিটওয়ার পর আন্তর্জাতিক সাড়ায় ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তন ও দাতাদের ক্লান্তির চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০৪ সালে সুনামির ভয়াবহতায় বিচলিত হয়ে আন্তর্জাতিক দাতারা কয়েকশ কোটি ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবার সাড়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে মৃদু। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৫০ কোটি ডলারের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ শ্রীলঙ্কা সরকার পেয়েছে। ফলে দুর্যোগের কয়েক মাস পরও ১ লাখ ৬৫ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
প্রথম সাড়া প্রদানকারী দেশ এবং সবচেয়ে বড় অবদানকারী হিসেবে ভারত স্পষ্টভাবে এগিয়ে আসে। নয়াদিল্লি ‘অপারেশন সাগর বন্ধু’ শুরু করে, যার নাম হিন্দিতে ‘সমুদ্রের ওপারের বন্ধু’ বোঝায়। ত্রাণ অভিযানে একটি বিমানবাহী রণতরীসহ দুটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার একাধিকবার উড়ে বিদেশি নাগরিকসহ শত শত মানুষকে উদ্ধার করে। উদ্ধারকারী দলগুলো অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করে এবং এক হাজার টনের বেশি জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেয়। অনুদান ও সহায়তা মিলিয়ে ভারতের সহায়তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ কোটি ডলার।
এর বিপরীতে, শ্রীলঙ্কার অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের মিত্র চীন ২০ লাখ ডলারেরও কম সহায়তা এবং প্রায় ১০০ টন সামগ্রী দিয়েছে। জানুয়ারিতে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সহায়তার জন্য শ্রীলঙ্কা আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের কাছে অনুরোধ জানায়। তবে ভারতের উদ্যোগের তুলনায় চীনের সাড়া সীমিতই ছিল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর জরুরি বৈদেশিক লেনদেনের চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি র্যাপিড ফাইন্যান্সিং ইনস্ট্রুমেন্টের আওতায় ২০ কোটি ডলারের জরুরি অর্থায়নের অনুরোধ বিবেচনা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার ২৯০ কোটি ডলারের বেইলআউট কর্মসূচির পঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্যালোচনা মিলিয়ে আইএমএফ কর্মীরা একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। নির্বাহী বোর্ড অনুমোদন দিলে এতে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের অর্থায়ন ছাড় হতে পারে।
তবে এই তহবিলের সঙ্গে শর্ত রয়েছে। কর্মী পর্যায়ের সমঝোতা অনুযায়ী, ঝুঁকিতে থাকা গ্রাহকদের সুরক্ষা দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামে ব্যয়-উসুলের নীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি বহুপক্ষীয় অংশীদারদের অবদান নিশ্চিত করতে অর্থায়ন নিশ্চয়তার পর্যালোচনা সম্পন্ন করতে হবে। জিডিপির প্রায় ১০০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং কয়লা সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় এই শর্তগুলো সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক চাপ ও কয়লা সংকট
প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে নানা দিক থেকে বাড়তে থাকা চাপের মুখে রয়েছেন। ত্রিমুখী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি তাঁর সরকার নিম্নমানের কয়লা আমদানি নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছে, যা নোরোচ্চোলাই লক্ষবিজয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। সাধারণত ২৭০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রটি ভারতের ট্রাইডেন্ট কেমফার থেকে আসা নিম্নমানের কয়লার কারণে সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে।
জ্বালানিমন্ত্রী কুমারা জয়কোডি অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে পড়েছেন। ২০১৬ সালে লঙ্কা ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার অভিযোগের জেরে ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত কমিশন ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। বিরোধী দলগুলো তাঁর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত মানের কয়লা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। জাতীয় নিরীক্ষা দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহকারীদের নিবন্ধনের মানদণ্ড ‘অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে’ শিথিল করেছিল লঙ্কা কয়লা কোম্পানি। এর ফলে যে সরবরাহকারীদের আগে বাতিল হওয়া কয়লার মানের অভিজ্ঞতা ছিল, তারাও চুক্তি পায়।
নিরীক্ষায় হিসাব করা হয়েছে, নিম্নমানের প্রথম নয়টি চালানে অতিরিক্ত কয়লা ব্যবহারের কারণে রাষ্ট্রের ২২০ কোটি রুপি ক্ষতি হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দাবি, চাপের মধ্যে থাকা বিদ্যুৎব্যবস্থার ভারসাম্য রাখতে আগাম ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা শুরু হয়েছে। তবে মন্ত্রী তা অস্বীকার করেছেন। প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে কয়লা সংগ্রহ প্রক্রিয়ার পক্ষে সাফাই দিলেও কয়লার মানের সমস্যা স্বীকার করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই খরচ গ্রাহকদের নয়, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকেই বহন করতে হবে।
শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার সরকারি প্রচেষ্টাকে কয়লা সংকট জটিল করে তুলেছে। এ সময় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায় এবং ঘাটতি মেটাতে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। এল নিনোর প্রভাবে জলাধারগুলোর পানির স্তর কমে আসায়, অন্যান্য সংকটের পাশাপাশি দেশটি জ্বালানি নিরাপত্তার নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি।
সরকারি সক্ষমতার টানাপোড়েনে তৃণমূলের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
সরকারি ত্রাণ তৎপরতা বিলম্ব ও আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে পড়লেও শ্রীলঙ্কার নাগরিক সমাজ অসাধারণ দ্রুততায় সংগঠিত হয়। ঘূর্ণিঝড়টি ২০২২ সালের বিক্ষোভের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে ক্ষমতাচ্যুত করা স্বেচ্ছাসেবী চেতনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এবার সেই চেতনা রাজনৈতিক আন্দোলনের বদলে মানবিক সহায়তার কাজে নিয়োজিত হয়।
কলম্বোর উইজেরামা এলাকায় আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করা কর্মীরা খাবার সহায়তার জন্য কমিউনিটি রান্নাঘর চালু করেন। ২০১৬ সালের বন্যার সময় গড়ে তোলা স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী সাসিন্দু সাহান তারাকা বলেন, "কেউ কাজ শেষে এসেছেন, কেউ পালা করে দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ সেখানে থাকতে ছুটিও নিয়েছেন। আমরা যা চেয়েছি, সমাজের কাছ থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি।"
শ্রীলঙ্কার অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী জি কে রেজিনল্ড মোটরচালিত মাছ ধরার নৌকা ব্যবহার করে বিচ্ছিন্ন শহরতলির পরিবারগুলোর কাছে খাবার ও পানি পৌঁছে দেন, যারা কয়েক দিন ধরে কোনো সহায়তা পায়নি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "আমি এটা করতে চেয়েছিলাম মূলত তাদের অন্তত এক বেলার খাবারের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করার জন্য। আর সেটা করতে পেরে আমি খুব খুশি হয়েছি।"
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কার্যকরভাবে ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয় করে। স্বেচ্ছাসেবকেরা অনুদানের দিকনির্দেশনা এবং প্রয়োজনের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের মিলিয়ে দেওয়ার জন্য উন্মুক্ত ডেটাবেস তৈরি করেন। বেসরকারি কোম্পানিগুলো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় এবং স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সাবান, টুথব্রাশ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি চালু করে। ভূমিধসে বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় আনুষ্ঠানিক মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে হিমশিম খাওয়ায় নাগরিকদের এই সাড়া গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করে।
প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে শ্রীলঙ্কানদের প্রতি আহ্বান জানান, তাঁরা যেন "সব রাজনৈতিক মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রাখেন" এবং "দেশ পুনর্গঠনে একসঙ্গে কাজ করেন।" দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে বিতর্কে ক্ষমতাসীন দল বাধা দিয়েছে, এই অভিযোগে বিরোধী রাজনীতিবিদেরা পার্লামেন্ট থেকে ওয়াকআউট করেন। তবে মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে ঐক্যের মনোভাবই ছিল প্রবল।
কৌশলগত সন্ধিক্ষণ: জ্বালানি ও জোট
ত্রিমুখী সংকট শ্রীলঙ্কাকে কৌশলগতভাবে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির পক্ষে আর সংকটের পর সংকটের মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ানির্ভর নীতি ও লক্ষ্যহীনতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান নাজুকতার ভিত্তি হলো দুটি অস্থির স্তম্ভ: মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লেই শ্রীলঙ্কার আমদানি ব্যয় কয়েকশ কোটি ডলার বেড়ে যেতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহও দ্রুত কমে যেতে পারে।
কৌশলগত বিশ্লেষকেরা শুধু পরিবেশনীতি হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবেও কার্বন নিঃসরণমুক্ত জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করার সুপারিশ করছেন। অনুকূল জলপ্রবাহের বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কার বিদ্যুতের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, তবে খরার সময় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সমাধান হলো সৌর ও বায়ুশক্তির সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বদলে দ্বীপের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি কাজে লাগিয়ে পাম্পড-হাইড্রো শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে সরবরাহের অনিয়ম সামাল দেওয়া।
বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পররাষ্ট্রনীতিও মানিয়ে নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ও সংকটে প্রথম সাড়াদানকারী ভারত এবং হাম্বানটোটা বন্দর ও কলম্বো পোর্ট সিটির মতো অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগকারী চীনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখাই শ্রীলঙ্কার চ্যালেঞ্জ। ডিটওয়ার ত্রাণ কার্যক্রমে ভারতের তাৎক্ষণিক ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক নৈকট্যের সুবিধা স্পষ্ট হয়; অন্যদিকে চীনের সাড়া ছিল তুলনামূলক সংযত।
এক সাম্প্রতিক কৌশলগত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, "তাই শ্রীলঙ্কার চ্যালেঞ্জ ভারত ও চীনের মধ্যে কাউকে বেছে নেওয়া নয়; বরং নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে উভয়ের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক ধরে রাখা।" বহিরাগত চাপ প্রতিরোধের মতো দৃঢ়, আবার বিস্তৃতভাবে সম্পর্ক গড়ার মতো নমনীয় এই জোটনিরপেক্ষ নীতি অপরিহার্য। কারণ বিশ্ববাণিজ্য খণ্ডিত হচ্ছে এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা সরবরাহ শৃঙ্খলকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
আগামী কয়েক মাসে বোঝা যাবে, প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের সরকার সংকটকে রূপান্তরের সুযোগে পরিণত করতে পারে কি না। আইএমএফের সম্ভাব্য ৭০ কোটি ডলারের অর্থছাড়, ভারতের ধারাবাহিক জ্বালানি সহায়তা এবং পুনর্গঠনে নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পুনরুদ্ধারের উপাদানগুলো রয়েছে। তবে গভীর কাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে: উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আধুনিক করা এবং জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জন।
ইন্দ্রাণী রবিচন্দ্রন এবং তাঁর মতো অর্ধেক ধ্বংস হওয়া বাড়িতে বসবাসকারী হাজারো মানুষের কাছে এসব কৌশলগত আলোচনা অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হতে পারে। তবু তাঁদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে শ্রীলঙ্কা শেষ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর চক্র ভেঙে জলবায়ুর অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার যুগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে কি না, তার ওপর।
মূল তথ্য
- ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ায় ৬৪৩ জন নিহত হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৭০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে; অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিতে তা ২০০৪ সালের সুনামিকে ছাড়িয়ে গেছে
- ২০২৫ সালের নভেম্বরের দুর্যোগের কয়েক মাস পরও ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়েছেন; পুনর্গঠন তহবিল প্রয়োজনের মাত্র ২০ শতাংশ
- ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে; এর জেরে জ্বালানি রেশনিং, বিদ্যুতের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং সরকারের ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সহায়তা প্যাকেজ চালু হয়েছে
- অপারেশন সাগর বন্ধুর মাধ্যমে ভারত তাৎক্ষণিকভাবে ৪৫ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে, আর চীনের সহায়তা ছিল ২০ লাখ ডলারেরও কম
- আইএমএফ ২০ কোটি ডলারের জরুরি অর্থায়ন এবং বিদ্যমান কর্মসূচির পর্যালোচনা থেকে আরও ৭০ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করছে; তবে এর সঙ্গে পরিষেবা মূল্যের শর্ত যুক্ত রয়েছে
- শ্রীলঙ্কার চা খাতে উৎপাদন ৩৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে, যা বছরে ১৩০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়কে হুমকিতে ফেলছে
- বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট এবং অপর্যাপ্ত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাসহ নানা ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বাড়িয়েছে
- নোরোচ্চোলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা সংকট এবং জ্বালানিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন






