ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পেট্রোকেমিক্যাল সংকট, হুমকিতে চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্যনিরাপত্তা

পড়তে 8 মিনিট
ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক পেট্রোকেমিক্যাল সংকট, হুমকিতে চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্যনিরাপত্তা

শিরোনামের আড়ালে অদৃশ্য সংকট

ইরান যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে গেছে। বিশ্ব এখন এমন এক ঘাটতির মুখে, যা অপরিশোধিত তেলের সংকটের চেয়েও অনেক বিস্তৃত। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে গেছে। শিরোনামগুলোতে যখন পেট্রলের দাম বাড়ার খবর প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন আরও গভীর এক সংকট মহাদেশজুড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে হুমকির মুখে ফেলছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বাধা পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহব্যবস্থায় ধারাবাহিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এতে জুতা, পোশাক, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও খাবারের মোড়ক তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহে টান পড়েছে।

সূচিপত্র
  1. শিরোনামের আড়ালে অদৃশ্য সংকট
  2. অপরিশোধিত তেলের চেয়ে ন্যাপথা কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
  3. হুমকিতে চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্যনিরাপত্তা
  4. থেমে যাচ্ছে অবকাঠামো প্রকল্প
  5. সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে অসমতা
  6. স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার দীর্ঘ পথ
  7. যা জানা জরুরি

এশিয়ায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন এ অঞ্চলে হয়, আর অঞ্চলটি আমদানি করা পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দক্ষিণ কোরিয়ায় মানুষ ময়লা ফেলার ব্যাগ কিনতে হুড়োহুড়ি করছে। প্লাস্টিকের উপকরণের অভাবে পড়া উৎপাদনকারীদের জন্য তাইওয়ান জরুরি হটলাইন চালু করেছে। জাপানের হাসপাতালগুলো ডায়ালাইসিসের নল ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে। সরবরাহব্যবস্থা মহাসাগর পেরিয়ে বিস্তৃত হলে জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন কত দ্রুত ভোগ্যপণ্যের ঘাটতিতে রূপ নেয়, এই সংকট তা দেখিয়ে দিচ্ছে।

আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার আন্তঃসংযোগের কারণে পেট্রোলিয়ামের উপজাত উৎপাদনের অদৃশ্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জুতার আঠা, শিল্পকারখানার লুব্রিক্যান্ট, রঙের দ্রাবক এবং প্লাস্টিক রেজিন—সবই একই ন্যাপথা-জাত কাঁচামাল থেকে তৈরি হয়। এসব কাঁচামাল এখন পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। এই উপকরণগুলো হারিয়ে গেলে, চূড়ান্ত পণ্য জ্বালানির সঙ্গে সম্পর্কিত মনে না হলেও উৎপাদন লাইনের গতি কমে যায়।

এশিয়ার বাজার নিয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের ব্যবসায়িক গোয়েন্দা বিভাগের সহপ্রধান ড্যান মার্টিন জ্বালানি খাত থেকে তৈরি পণ্যে অর্থনৈতিক ধাক্কা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।

এর প্রভাব খুব, খুব দ্রুত সবকিছুতে ছড়িয়ে পড়ে: বিয়ার, নুডলস, চিপস, খেলনা, প্রসাধনী।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি সতর্ক করেছে, এমন জটিল পরোক্ষ প্রভাব সীমিত ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন অর্থনীতিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সংস্থাটি এক ব্লগ পোস্টে বলেছে, সব পরিস্থিতিতেই দাম বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি কমবে। দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল ছাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এসব মজুত দিয়ে ন্যাপথার নির্দিষ্ট ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। পেট্রোলিয়ামের এই উপজাত কৃত্রিম উপকরণ তৈরির মূল কাঁচামাল।

বিজ্ঞাপন

অপরিশোধিত তেলের চেয়ে ন্যাপথা কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ

ন্যাপথার ঘাটতির কারণেই এই সংকট সাধারণত তেলের বাজারে দেখা দেওয়া ধাক্কা থেকে আলাদা। পেট্রোলিয়ামের উপজাত ন্যাপথা কৃত্রিম উপকরণ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। অপরিশোধিত তেলের মতো দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে ন্যাপথা ছাড়তে পারে না; এর সহজলভ্য বিকল্পও নেই। উৎপাদনকারীরা এই বিশেষ কাঁচামালের মজুত খুব কম রাখে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলো তাদের প্রধান সরবরাহপথ হারায়।

ডাওয়ের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জিম ফিটারলিং হিউস্টনে সিইআরএউইক বাই এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল সম্মেলনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বের পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশ আটকে পড়েছে।

বছরের বাকি সময়ে বাজারে কী ঘটবে, তার সিদ্ধান্ত এখনই হয়ে যাচ্ছে। কোভিডের সময় সরবরাহব্যবস্থায় যে ভাঙন দেখেছিলাম, এ যেন তার উল্টো পথে ফেরা। এতে ২৫০ থেকে ২৭৫ দিন লাগতে পারে। সবকিছু আগের অবস্থায় রাতারাতি ফিরে যাবে না।

কাঁচামালের উৎসের ভৌগোলিক বণ্টনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পশ্চিম গোলার্ধের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানাগুলো, প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পাওয়া ইথেনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এই সরবরাহ প্রভাবিত হয়নি। এশিয়া ও ইউরোপের বড় অংশ অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি ন্যাপথার ওপর নির্ভরশীল। এশিয়ার ন্যাপথা সরবরাহের প্রায় অর্ধেক সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।

ফলে এশিয়ার কারখানাগুলো চুক্তি পূরণে বাধা সৃষ্টি করা অনিবার্য ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত আইনি শব্দ ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করতে শুরু করেছে। কয়েকটি কারখানা উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়েছে, কিছু কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ধরে রাখতে দক্ষিণ কোরিয়া ন্যাপথা রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো দেশটি মস্কো থেকে ন্যাপথার একটি চালানও কিনেছে। রাশিয়ার কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত থাকায় এই সুযোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হুমকিতে চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্যনিরাপত্তা

পেট্রোকেমিক্যালের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জাপানের হাসপাতালগুলো আশঙ্কা করছে, হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের চিকিৎসা-নল ফুরিয়ে গেলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি বিকলতায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে। মালয়েশিয়ার গ্লাভস উৎপাদনকারীরা জানিয়েছেন, রাবার ল্যাটেক্স তৈরিতে প্রয়োজনীয় পেট্রোলিয়াম উপজাতের ঘাটতি বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা-গ্লাভসের সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এগুলো বিলাসপণ্য নয়, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অপরিহার্য উপকরণ।

সারসংকটের কারণে খাদ্য উৎপাদনও হুমকিতে পড়েছে। সার তৈরিতে ব্যবহৃত বিশ্বের ৪৫ শতাংশ সালফার এবং ফসলের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার ২২ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মর্গ্যান স্ট্যানলির তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সার-বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের আমদানি করা ইউরিয়ার জন্য ইতিমধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

এশিয়ার ধানচাষিরা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ফসল কাটার উপযোগী ধানখেত পড়ে আছে; ট্রাক্টর চালানোর ডিজেল বা ফসলের জন্য সার কেনার সামর্থ্য নেই কৃষকদের। অতিরিক্ত ফসল কাটার খরচ এড়াতে থাইল্যান্ডের কিছু কৃষক ধান জমিতেই রেখে দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর দেশটির কৃষকেরা কম ভুট্টা ও বেশি সয়াবিন আবাদ করার পরিকল্পনা করছেন। সয়াবিনের জন্য কম পুষ্টি উপাদান লাগে।

ধারাবাহিক বিপর্যয়ের একটি উদাহরণ ভারত। ৯ মার্চ সরকার গ্যাস সরবরাহে বিধিনিষেধ জারি করে শিল্পকারখানার চেয়ে ঘরোয়া রান্নার জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেয়। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যারোমেটিকসের উৎপাদন কমিয়েছে, এতে প্যারাক্সিলিনের উৎপাদন ৭৫ হাজার টন কমতে পারে। ভারত পেট্রোলিয়াম অ্যাক্রিলিক অ্যাসিড উৎপাদন বন্ধ করেছে। গ্যাস অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড পলিথিন উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ থাকায় খাবার, ওষুধ ও ভোগ্যপণ্যের মোড়ক তৈরিতে প্রভাব পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

থেমে যাচ্ছে অবকাঠামো প্রকল্প

বিটুমিন ও তরল ডিজেল তেলের ঘাটতিতে ভারতজুড়ে সড়ক নির্মাণকাজ থমকে গেছে। রাজস্থানে জাতীয় মহাসড়ক ২৭ ও ১৪৮ডি-তে কাজ করা ঠিকাদারেরা অ্যাসফাল্টের তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন। এক ঠিকাদারের ভাষ্য, প্রায় ৬০০ কোটি রুপির প্রকল্পে গুরুতর বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে। প্রতি টন অ্যাসফাল্টের দাম প্রায় ৪০ হাজার রুপি থেকে বেড়ে ৫০ হাজার রুপি ছাড়িয়েছে। দাম বাড়লেও সরবরাহ অনিয়মিত।

ভারী নির্মাণ সরঞ্জাম চালাতে ব্যবহৃত ইমার্সন অয়েল ও তরল ডিজেল তেলের ঘাটতি সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন প্রকল্পে আনুমানিক ২৭ লাখ লিটার প্রয়োজন হলেও এসেছে মাত্র প্রায় ১০ লাখ লিটার। প্রতি টনের দাম ৪৫ হাজার থেকে বেড়ে ৬০ হাজার রুপি হয়েছে। কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে স্বীকার করেছে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া। প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ হওয়া ঠেকাতে ঠিকাদারদের সম্ভব হলে অন্য কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সরকার কঠিন পরীক্ষার মুখে। জ্বালানি সংকট ভয়াবহ জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর্থিক চাপ সত্ত্বেও সরকার ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনা মূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি কমাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ শতাংশের বেশি বাজেট ঘাটতির সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, ব্যয় কমানো না হলে ঘাটতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে অসমতা

এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে দুই গতির করে তুলেছে। এশিয়ার উৎপাদনকারীরা কাঁচামালের ঘাটতিতে ভুগলেও পশ্চিম গোলার্ধের উৎপাদকেরা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছেন। উত্তর আমেরিকার পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলো নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে চলে; স্বাভাবিক সময়েও এতে তাদের খরচ কম থাকে। এশিয়ায় দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারের মধ্যে প্রতি মেট্রিক টনে দামের পার্থক্য ৫০০ ডলারেরও কম থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

পোর্ট হিউস্টনের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা জন মোসেলি জানিয়েছেন, মাত্র দুই সপ্তাহে রপ্তানি ১২ শতাংশ বেড়েছে; এর মধ্যে কনটেইনারে পাঠানো পলিথিনও রয়েছে। বিশ্লেষকেরা আশা করছেন, বছর এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ায় রপ্তানি অনেক বাড়বে। তবে আমেরিকা মহাদেশে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন করলেও মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার হারানো উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।

চীনের পরিস্থিতি জটিল। দেশটি উল্লেখযোগ্য তেলের মজুত নিয়ে সংকটে প্রবেশ করেছে, যা দিয়ে ১৩০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। দেশীয় সরবরাহ ধরে রাখতে বেইজিং পেট্রোলিয়াম পণ্যের বেশির ভাগ রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। এতে বাণিজ্যিক অংশীদাররা ডিজেল ও জেট জ্বালানির সংকটে পড়তে পারে। চীনা জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে এতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। চীনে লিথিয়াম ও লৌহ আকরিকের বড় সরবরাহকারী অস্ট্রেলিয়ায় ডিজেলের ঘাটতি বাড়ছে, যা খনির কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

ইউরোপের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরাসরি আসা সরবরাহের ওপর মহাদেশটি খুব বেশি নির্ভরশীল না হলেও বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় ঝুঁকিতে আছে। বিএএসএফের নির্বাহী পর্ষদের সদস্য অনুপ কোঠারি বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমদানি নিয়ে যে সমস্যাগুলো ছিল, এ অঞ্চলে তার চাপ তুলনামূলক কম। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ইউরোপের উৎপাদকদের জন্য সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। তবে সবাই আশা করছেন, সংকটের পূর্ণ প্রভাব শিগগিরই দেখা দেবে।

বিজ্ঞাপন

স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার দীর্ঘ পথ

আগামীকালই সংঘাত থেমে গেলেও পুনরুদ্ধারে কয়েক মাস, এমনকি বছরের বাকি সময়টাও লেগে যেতে পারে। পারস্য উপসাগরে প্রায় ৪৩০টি জাহাজ আটকে আছে, যার মধ্যে ৩০০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার। প্রণালি খুলে গেলে কর্তৃপক্ষ তেল ও গ্যাসের চালানকে অগ্রাধিকার দেবে, এরপর কৃষিকাজের জন্য সার পাঠানো হবে। অগ্রাধিকারের তালিকায় পেট্রোকেমিক্যালবাহী জাহাজ থাকবে নিচের দিকে; এশিয়ায় পৌঁছাতে তাদের চার সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রা করতে হয়।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির রাসায়নিক পণ্য বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান অ্যান্ড্রু নিল সতর্ক করেছেন, রাসায়নিক শিল্পে সরবরাহব্যবস্থা গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে। কনটেইনারগুলো ভুল জায়গায় জমে থাকবে; এ অবস্থা কাটাতে মাস নয়, কয়েক প্রান্তিক লেগে যেতে পারে। কোভিড মহামারির পরের সময়ের মতো চাহিদায় ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

জে.পি. মর্গ্যানের বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ধাক্কাটি একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়ছে; সরবরাহে এই ধারাবাহিক বিঘ্ন পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে। এশিয়া এখন আগাম সতর্কতার পর্যায় পেরিয়ে সক্রিয়ভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে পাঠানো অপরিশোধিত তেলের শেষ চালানগুলো এপ্রিলের শুরুর দিকে পৌঁছেছে। এরপর থেকে পণ্যের বাস্তব ঘাটতি মোকাবিলায় শুধু দাম নিয়ন্ত্রণের চেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কিছু উৎপাদনকারী কেনাকাটা পিছিয়ে দিয়ে সংকট পার করার আশা করছেন। তাঁদের ধারণা, সংঘাত মিটে গেলে দাম কমবে। চীনের হাইনিংয়ের পলিয়েস্টার উৎপাদক কিউ জুন জানিয়েছেন, পলিয়েস্টার চিপের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অর্ডার দেওয়া পণ্য তৈরির জন্যই তাঁর কারখানা চলছে; প্রয়োজন নেই এমন মজুত বেশি দামে কেনা এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে এই সতর্কতার ঝুঁকি আছে। আইসিআইএসের জ্যেষ্ঠ পেট্রোকেমিক্যাল বিশ্লেষক শারিয়েন গোহ বলেছেন, শেষ পর্যায়ের পণ্য উৎপাদনকারীরা মজুতের ওপর নির্ভর করতে পারেন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই মজুত ফুরিয়ে যাবে। প্লাস্টিকের মোড়কের ওপর বেশি নির্ভরশীল ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ শিগগিরই শেষ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

যা জানা জরুরি

  • ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ ব্যাহত এবং এশিয়ার ন্যাপথা আমদানির প্রায় অর্ধেক আটকে পড়েছে।
  • ন্যাপথার ঘাটতিতে এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলো ফোর্স মেজর ঘোষণা ও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। এতে প্লাস্টিক, চিকিৎসাসামগ্রী ও খাবারের মোড়কের সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
  • পেট্রোলিয়ামের উপজাতের ঘাটতিতে ডায়ালাইসিসের নল, ল্যাটেক্স গ্লাভস ও আইভি ব্যাগের সরবরাহব্যবস্থা সংকটে পড়েছে।
  • সারের ঘাটতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ধানের ফসল হুমকিতে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
  • প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহারকারী পশ্চিম গোলার্ধের উৎপাদকেরা খরচের সুবিধা পাচ্ছেন, অন্যদিকে এশিয়ার উৎপাদকেরা সরবরাহসংকটে ভুগছেন।
  • সংঘাত এখনই শেষ হলেও জাহাজ চলাচলে জট ও সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ২৫০ থেকে ২৭৫ দিন লাগতে পারে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে