প্রণালির দুই পারে এক ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ
কূটনৈতিক নাটকীয়তার সুপরিকল্পিত প্রদর্শনীতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তাইওয়ানের বিরোধী দল কুওমিনতাং (কেএমটি)-এর চেয়ারওম্যান চেং লি-ওয়েনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় এক দশকের মধ্যে দায়িত্বে থাকা কোনো কেএমটি নেতার এটিই প্রথম মূল ভূখণ্ড চীন সফর। ২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি)-এর সাই ইং-ওয়েন নির্বাচিত হওয়ার পর বেইজিং তাইপের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ছিন্ন করলে যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা শুরু হয়, এই সফর তা ভাঙল।
সূচিপত্র
তাইওয়ান প্রণালিজুড়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় এই বৈঠকের গুরুত্ব অনেক। গত বছর রক্ষণশীল ঘরানার কেএমটির নেতৃত্ব নেওয়া চেং সাংহাই, নানজিং ও বেইজিংয়ে ছয় দিনের সফরকে সেতুবন্ধ গড়ার উদ্দেশ্যে করা ‘শান্তি সফর’ বলে বর্ণনা করেছেন। শি এ সাক্ষাৎকে অভিন্ন ঐতিহ্যের অংশীদার স্বদেশিদের পুনর্মিলন হিসেবে তুলে ধরে বলেন, ‘তাইওয়ান প্রণালির দুই পারের মানুষ চীনা’ এবং তাদের মধ্যে শান্তি ও উন্নয়নের সহজাত আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
সফরের সময়টি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। বেইজিংয়ে শির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ আগে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সময়ে তাইওয়ানের সংসদে বিতর্কিত ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা চলছে। এই পরিস্থিতিগুলো একসঙ্গে চেংয়ের উদ্যোগকে ঘিরে নজরদারি বাড়িয়েছে: এটি কি সত্যিই সংঘাত ঠেকানোর চেষ্টা, নাকি কৌশলগত অবস্থান নেওয়া, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাইওয়ানের নিরাপত্তাসম্পর্ক জটিল করতে পারে?
বিরোধী আন্দোলনকর্মী থেকে বেইজিংয়ের অতিথি
চেংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল সফর সাম্প্রতিক তাইওয়ানি রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের প্রতীক। ১৯৬৯ সালে জন্ম নেওয়া চেং ‘ওয়াইল্ড লিলি’ প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত বামপন্থী আন্দোলনকর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তাইওয়ানের এই ছাত্র আন্দোলন দ্বীপটিকে পূর্ণ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছিল। তরুণ বয়সে তিনি কেএমটিকে ‘সবচেয়ে ঘৃণ্য শাসকগোষ্ঠী’ বলে নিন্দা করেন এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন।
২০০৫ সালে বিতর্কিতভাবে ডিপিপি ছেড়ে কেএমটিতে যোগ দেওয়ার পর চেং ক্রমে ‘ডিপ ব্লু’ উপদলের দিকে ঝুঁকেছেন, যারা চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সংহতির পক্ষে। এখন তিনি নিজেকে ‘ফাইটিং-ব্লু’ নেতা হিসেবে পরিচয় দেন; ক্ষমতাসীন ডিপিপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তিনি যাকে ‘সভ্যতাগত’ সম্পর্ক বলেন, তা গড়ে তুলছেন।
এই মতাদর্শগত বিবর্তন তাইওয়ানের বিভক্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁর দাবি, ‘ডিপিপির প্রতারণা বুঝতে পারার’ ফলেই তাঁর অবস্থান বদলেছে; সমালোচকেরা একে সুবিধাবাদ বলে অভিযুক্ত করেন। জরিপে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন সীমিত বলে ইঙ্গিত মিললেও বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগে তাঁর আগ্রহ প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের অধীনে ডিপিপির অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টতই ভিন্ন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম লাইকে অবজ্ঞাসূচকভাবে ‘যুদ্ধবাজ’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
অভিন্ন বয়ান, ভিন্ন লক্ষ্য
প্রকাশ্য বক্তব্যে দুই নেতাই তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন এবং অভিন্ন চীনা পরিচয়ের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা তুলে ধরেন। শি জোর দিয়ে বলেন, ‘চীনের সব সন্তান একই চীনা শিকড় ও একই চীনা চেতনার অংশীদার।’ তিনি এই সম্পর্ককে রক্তের বন্ধন ও ইতিহাসে প্রোথিত বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ‘পূর্ণ আস্থা’ রয়েছে যে দুই পারের স্বদেশিরা শেষ পর্যন্ত ‘আরও ঘনিষ্ঠ হবে এবং এক হবে’; একে তিনি অনিবার্য ঐতিহাসিক ধারা বলে অভিহিত করেন।
আমাদের দুই দলের নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা আশা করি, তাইওয়ান প্রণালি আর সম্ভাব্য সংঘাতের উত্তপ্ত বিন্দু হয়ে উঠবে না, বাইরের শক্তির দাবার ছকও হবে না। বরং এটি হবে পারিবারিক বন্ধন, সভ্যতা ও আশাকে যুক্ত করা প্রণালি।
চেংও একই ধরনের বক্তব্য দেন। দারিদ্র্য দূরীকরণে চীনের সাফল্যের প্রশংসা করেন এবং ‘চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান’-কে অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে ‘১৯৯২ সালের ঐকমত্যের’ পক্ষে কথা বলেন। কেএমটি ও বেইজিংয়ের মধ্যে এই অলিখিত সমঝোতায় ‘এক চীন’ স্বীকার করা হয়, তবে শব্দটির ব্যাখ্যা দুই পক্ষের জন্য ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তাঁর সুনির্দিষ্ট ভাষ্য ভ্রু কুঁচকেছে: তিনি ‘এক চীন’ নীতিতে অঙ্গীকারের কথা বলেছেন, তবে কেএমটির প্রচলিত ‘নিজ নিজ ব্যাখ্যা’র সুরক্ষাকবচের ওপর জোর দেননি।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো, চেং ‘যুদ্ধ প্রতিরোধে’ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন; বিশ্লেষকেরা একে প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তাইওয়ান সেন্টারের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়েন-তি সুংয়ের মতে, তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত ছিল, ‘তাঁর নেতৃত্বে কেএমটি যুদ্ধ প্রতিরোধে প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেবে না।’ এর কার্যত অর্থ, তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনা হ্রাস করা উচিত।
ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ
বৈঠকের সময়সূচি ওয়াশিংটন এবং তাইওয়ানের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মে মাসে শির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, বেইজিং চেংয়ের সফরকে কাজে লাগিয়ে দেখাতে চাইছে যে তাইওয়ানে তাদের পছন্দের অংশীদাররা গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ‘একই সুরে’ রয়েছে। আসন্ন আলোচনায় অস্ত্র বিক্রি ও নিরাপত্তা অঙ্গীকার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানে এই প্রচার প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, চেং নিজেকে এমন নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেখছেন, যিনি প্রণালির দুই পারের যোগাযোগ বজায় রাখতে সক্ষম। একই সঙ্গে তিনি দেখাতে চান, প্রেসিডেন্ট লাই বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে পারেননি। ইয়াংয়ের ব্যাখ্যা, ‘তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে বাড়তে থাকা সংশয়, যার বড় কারণ তাইওয়ান নীতি নিয়ে ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী সংকেত, চেংয়ের যুক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।’
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন নিয়ে আইনসভায় অচলাবস্থার মধ্যেই এই সফর হয়েছে। প্রেসিডেন্ট লাইয়ের প্রস্তাবিত ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট আটকে দিয়েছে কেএমটি। এর বদলে তারা নির্দিষ্ট কিছু খাতে ১২ বিলিয়ন ডলারের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। চেং বড় প্যাকেজটিকে তাইওয়ানকে ‘বারুদের স্তূপে’ পরিণত করার শামিল বলেছেন এবং প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘তাইওয়ান আমেরিকার অস্ত্র কেনার এটিএম নয়।’ সম্প্রতি তাইপে সফরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জিম ব্যাংকস সংসদকে পুরো প্যাকেজ অনুমোদনের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, বিলম্ব হলে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ প্রভাবিত হতে পারে।
বাস্তব ছাড় ও অব্যাহত চাপ
চেংয়ের সফর শেষ হওয়ার পর বেইজিং সদিচ্ছা দেখাতে ১০টি পদক্ষেপ ঘোষণা করে। এর মধ্যে তাইওয়ান ও মূল ভূখণ্ডের আরও কয়েকটি শহর, যেমন উরুমচি, সিয়ান ও হারবিনের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করার কথা রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ আগে নিষিদ্ধ করা তাইওয়ানি কৃষিপণ্য, যার মধ্যে গ্রুপার মাছ, স্কুইড ও টুনা রয়েছে, আমদানির অনুমতি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বিষয়বস্তুর নির্দেশনা মেনে চললে তাইওয়ানি টিভি নাটক ও প্রামাণ্যচিত্র মূল ভূখণ্ডের প্ল্যাটফর্মে সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া হবে।
এ ছাড়া চীন কমিউনিস্ট পার্টি ও কেএমটির মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার অঙ্গীকার করেছে। মূল ভূখণ্ড চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের উপকূলবর্তী কিনমেন ও মাতসু দ্বীপপুঞ্জকে যুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্পের প্রস্তাবও নতুন করে তুলেছে।
তবে এই সদিচ্ছার ইঙ্গিতের পাশাপাশি সামরিক চাপও অব্যাহত রয়েছে। চীন প্রতিদিন তাইওয়ানের কাছে যুদ্ধবিমান ও নৌযান মোতায়েন করছে এবং প্রণালিতে গোলাবারুদসহ মহড়া চালাচ্ছে, যা সম্ভাব্য অবরোধের প্রস্তুতির মতো। বিশ্লেষকেরা একে ‘দ্বিমুখী কৌশল’ বলছেন, যেখানে নমনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে কঠোর প্রতিরোধমূলক চাপ রয়েছে। তাইওয়ানের তামকাং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জেমস চেনের পর্যবেক্ষণ, বেইজিং বিরোধী ডিপিপি সরকারের ওপর চাপ বজায় রেখেও বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তাঁর ভাষায়, সামরিক উড্ডয়ন ‘চীনের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরও ঘনিষ্ঠ হস্তক্ষেপ ঠেকানোর’ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাইওয়ানে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া
তাইওয়ানে চেংয়ের সফর ক্ষমতাসীন দলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডিপিপি তাঁকে বেইজিংয়ের প্রতি ‘নতজানু’ বলে অভিযুক্ত করেছে এবং সতর্ক করেছে, সফরটি ‘সম্পূর্ণভাবে’ কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে আপস করলে শুধু সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রই বিসর্জন দিতে হয়; এতে স্বাধীনতা আসবে না, শান্তিও আসবে না।’
চীনের সঙ্গে নীতিনির্ধারণের দায়িত্বে থাকা তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল ঘোষিত পদক্ষেপগুলোকে তাইওয়ানের নির্বাচিত সরকারকে পাশ কাটিয়ে করা ‘রাজনৈতিক লেনদেন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কাউন্সিল বলেছে, ‘প্রশাসনিক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সব প্রণালি-পারের বিষয়ে দুই সরকারের সমান ও মর্যাদাপূর্ণ ভিত্তিতে আলোচনা করতে হবে।’ তারা জোর দিয়ে বলেছে, দলীয় পর্যায়ের যোগাযোগ আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলের বিকল্প হতে পারে না।
জনমত জরিপে গভীর দ্বিধার ছবি উঠে এসেছে। অধিকাংশ তাইওয়ানি ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার পক্ষে—আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা বা একীভূতকরণ, কোনোটিই নয়। তবে জরিপে ‘চীনা’র বদলে ‘তাইওয়ানি’ হিসেবে পরিচয়ের প্রবণতা বাড়ছে। ন্যাশনাল চেংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের শুধু তাইওয়ানি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন; ১৯৯২ সালে এই হার ছিল ১৭.৬ শতাংশ। ‘চীনা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের হার নেমে এসেছে মাত্র ২.৫ শতাংশে। চেংয়ের স্পষ্টত চীনা পরিচয় এবং সভ্যতাগত সম্পর্কের বয়ান মূলধারার জনমতের সঙ্গে ক্রমেই বেমানান হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে, বিশেষত তরুণ ভোটারদের মধ্যে।
কেএমটির ভেতরেও কৌশলগত বিভেদ দেখা দিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রায়ই আলোচিত তাইচুংয়ের মেয়র লু শিউ-ইয়েন জোর দিয়ে বলেছেন, শক্তি ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁর অবস্থান চেংয়ের বেইজিংকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকায় কেএমটির কয়েকজন প্রার্থী আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের ক্ষতির আশঙ্কায় চেয়ারওম্যানের বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ কূটনীতি, নাকি বাস্তববাদী যোগাযোগ?
চেংয়ের এই বাজি ধরে নেওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে যে সামরিক প্রতিরোধের চেয়ে সংলাপ সংঘাতের ঝুঁকি বেশি কার্যকরভাবে কমায়। তিনি নিজেকে ‘শান্তির সেতু’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং ১৯৯২ সালের ঐকমত্য বজায় রাখাই যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র কার্যকর পথ। শির সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করলে আমরা যুদ্ধ এড়াতে পারি।’
তবে সমালোচকদের বক্তব্য, চেংয়ের পদ্ধতি বেইজিংয়ের সেই বয়ানকেই বৈধতা দেয়, যেখানে তাইওয়ানকে নিজস্ব গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারসহ সার্বভৌম রাষ্ট্রের বদলে অমীমাংসিত গৃহযুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে দুই দলের নেতার সাক্ষাতের কাঠামো মেনে নিয়ে তিনি এমন এক ঐতিহাসিক বয়ান ছড়াতে সহায়তা করেছেন, যা তাইওয়ানের বর্তমান সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে বলে বিশ্লেষকদের মত।
কৌশলগত প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে: এই কূটনৈতিক আয়োজন সংঘাত কমাবে, নাকি শান্তির নামে বেইজিংয়ের পছন্দের রাজনৈতিক পরিণতিকে স্বাভাবিক করে তুলবে? চেং বাস্তব অর্থনৈতিক ছাড় আদায় করেছেন এবং ২০১৬ সাল থেকে স্থগিত দলীয় যোগাযোগের পথ খুলেছেন। তবে এতে মধ্যপন্থী ভোটারদের বিরূপ করা এবং ওয়াশিংটনে তাইওয়ানের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদারকে উদ্বিগ্ন করার ঝুঁকি রয়েছে। চলতি বছরের শেষের দিকে স্থানীয় নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে চেংয়ের বেইজিং সফর শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা করবে, তাইওয়ানের ভোটাররা শান্তির জন্য চীনের সঙ্গে সমঝোতা, নাকি তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করাকে জরুরি মনে করেন।
মূল বিষয়গুলো
- প্রায় এক দশকের মধ্যে দায়িত্বে থাকা প্রথম কেএমটি চেয়ার হিসেবে চেং লি-ওয়েন চীন সফর করেন এবং বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন
- দুই নেতাই তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন এবং প্রণালির দুই পারের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের আহ্বান জানিয়ে অভিন্ন ‘চীনা’ পরিচয়ের কথা বলেন
- চীন তাইওয়ানের আরও কয়েকটি শহরের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর এবং কৃষিপণ্য ও গণমাধ্যমের কনটেন্ট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দেয়
- ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ আগে এবং তাইওয়ানের ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে আইনসভায় অচলাবস্থার মধ্যে সফরটি হয়
- চেং তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কেনা হ্রাস করার ইঙ্গিত দেন; তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন ডিপিপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এর সমালোচনা করেন
- দেশীয় জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ তাইওয়ানি ‘চীনা’র বদলে ‘তাইওয়ানি’ হিসেবে পরিচয় দেন; এতে জনমতের সঙ্গে চেংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
- বিশ্লেষকেরা বেইজিংয়ের কৌশলকে ‘দ্বিমুখী’ বলে বর্ণনা করেন: কেএমটির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি তাইওয়ানের কাছে সামরিক চাপ ও মহড়া অব্যাহত রাখা






