আর্থিক সন্ধিক্ষণ
ইন্দোনেশিয়া তার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অবকাঠামোসংক্রান্ত দায়গুলোর একটি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পৌঁছেছে। কর্মকর্তারা এ সপ্তাহে নিশ্চিত করেছেন, জাকার্তা-বান্দুং উচ্চগতির রেলপথের জন্য সরকার একটি সমন্বিত ঋণ পুনর্গঠন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। ‘হুশ’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের; শুরু থেকেই এটি রাষ্ট্রের অর্থায়নে চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পটিকে স্থিতিশীল করার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূচিপত্র
সমস্যাগ্রস্ত সম্পদটির তদারকির দায়িত্বে থাকা সার্বভৌম সম্পদ তহবিল দানান্তারা ইন্দোনেশিয়ার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ডনি ওস্কারিয়া জানান, পুনর্গঠন কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে। জাকার্তার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্সে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে স্বাক্ষরসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে দুই সপ্তাহের মধ্যে নির্দিষ্ট শর্তাবলি জানিয়ে জনসমক্ষে ঘোষণা দেওয়া হবে।
তখন আমরা পুরো পরিকল্পনাটি জানাব। আমি মন্ত্রী [পুরবায়ার] সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। একটি সমঝোতা হয়েছে। আমরা মূল্যায়নসহ অন্যান্য বিষয় সম্পন্ন করেছি।
এই সমাধানের জরুরিতা কোনোভাবেই কম করে দেখার সুযোগ নেই। ১৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বুলেট ট্রেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম পুরোপুরি চালু উচ্চগতির রেলপথ। এটি প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আর্থিক দুর্বলতা, দুইয়েরই প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার পর থেকে প্রকল্পটি বিপুল ব্যয় বৃদ্ধি, নির্মাণে বিলম্ব এবং এমন ঋণের বোঝায় জর্জরিত, যা আগামী কয়েক দশক ধরে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী সংস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বিলিয়ন ডলারের ঋণের হিসাব
ইন্দোনেশিয়ার আর্থিক অঙ্গীকারের ব্যাপ্তি বুঝতে হলে প্রকল্পটির জটিল অর্থায়ন কাঠামো খতিয়ে দেখা দরকার। চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের মাধ্যমে মোট নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ দিয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ এসেছে PT Kereta Cepat Indonesia-China (KCIC)-এর অধীনে থাকা ইন্দোনেশীয় ও চীনা কনসোর্টিয়ামের সদস্যদের ইকুইটি বিনিয়োগ থেকে। এই অর্থায়ন মডেলে শুরু থেকেই ইন্দোনেশীয় পক্ষের ঋণের নির্ভরতা ছিল বেশি, ফলে অপ্রত্যাশিত ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো ইকুইটির সুরক্ষা ছিল সামান্য।
তবে প্রকল্পে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ দেখা দেওয়ার পর আর্থিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, মহামারিসংক্রান্ত বিঘ্ন এবং নির্মাণে প্রতিবন্ধকতার কারণে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (১.২ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত খরচ মেটাতে পরিচালকেরা মূল ঋণসুবিধার তুলনায় অনেক কম অনুকূল শর্তে অতিরিক্ত অর্থায়ন নেন। ব্যয় বৃদ্ধির অর্থায়নে প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭.২৭ বিলিয়ন ডলারে, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ১১৮.৩৭ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ।
সুদের কাঠামোয় ঋণ নেওয়ার ক্রমবর্ধমান ব্যয় স্পষ্ট। ৬.০২ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক ঋণ কিস্তিতে চীন বার্ষিক ২ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করলেও, ব্যয় বৃদ্ধি মেটাতে নেওয়া অতিরিক্ত ঋণে সুদের হার ৩.৪ শতাংশ। পরিচালন আয় যখন ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তখন এই ব্যবধান ঋণ পরিশোধের খরচ আরও বাড়িয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২৪ সালেই হুশের পরিচালন লোকসান হয়েছে ৪.২ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (২৫৮ মিলিয়ন ডলার)। পরিচালন কনসোর্টিয়ামে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদার হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী সংস্থা PT Kereta Api Indonesia (KAI)-কে ওই ঘাটতির ২.২৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (১৩৭ মিলিয়ন ডলার) বহন করতে হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে আরও ১.৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (৯৮.৩ মিলিয়ন ডলার) লোকসান হয়েছে, যা KAI-এর আর্থিক সঞ্চয়ে আরও চাপ সৃষ্টি করেছে এবং অন্যত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণে অর্থায়নের সক্ষমতা সীমিত করেছে।
প্রতিশ্রুতি থেকে সংকটে
জাকার্তা-বান্দুং উচ্চগতির রেলপথকে ঘিরে তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হয়েছিল। ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়া জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাবের বদলে চীনের প্রস্তাব বেছে নেয়। বেইজিংয়ের প্রতিশ্রুত নমনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি এবং যৌথ উদ্যোগের সুযোগে তারা আকৃষ্ট হয়েছিল, যেগুলো টোকিও দিতে পারেনি। জাপান শুরুতে সরকার-টু-সরকার কাঠামোর আওতায় ০.১ শতাংশ সুদে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত বেশি সুদের হার সত্ত্বেও চীনের বিকল্পটি বেছে নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, বেইজিং বাণিজ্যিক গোপনীয়তা এবং সমন্বিত অংশীদারত্বের প্যাকেজ দিচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বুলেট ট্রেন কমিটির নেতৃত্বে থাকা লুহুত বিনসার পান্ডজাইতান চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের পক্ষে থাকা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন।
নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। নির্বিঘ্নে কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। শুরু থেকেই রুটজুড়ে জমি সংগ্রহের সমস্যা ছিল; ঘনবসতিপূর্ণ পশ্চিম জাভার সম্পত্তির মালিকদের সঙ্গে জটিল আলোচনা করতে হয়েছে। এরপর কোভিড-১৯ মহামারি সরবরাহব্যবস্থা ও শ্রমিকের প্রাপ্যতা ব্যাহত করে, ফলে কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা কয়েক বছর পিছিয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের চার বছর পর, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যখন রেলপথটি চালু হয়, তত দিনে এটি চীনের আঞ্চলিক অবকাঠামো কূটনীতির আওতায় নেওয়া সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ব্যয়ের দিক থেকে এটি লাওস, ইথিওপিয়া ও কেনিয়ার তুলনীয় রেলপথগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে, যেগুলোতে সাধারণত ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
এত বাধা সত্ত্বেও যাত্রী পরিবহনের বিচারে ট্রেনটি পরিচালনাগত সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এই পরিষেবায় ২৯ লাখ যাত্রী ভ্রমণ করেছেন, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। দুই শহরের মধ্যে যাত্রার সময় তিন ঘণ্টা থেকে কমে প্রায় ৪০ মিনিটে দাঁড়িয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য সত্যিকারের সুবিধা এনেছে। তবে এসব পরিচালনাগত সাফল্য আর্থিকভাবে টেকসই অবস্থায় রূপ নেয়নি। ফলে সামাজিক সুফল ও আর্থিক বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সরকারকে।
করপোরেট জটিলতা ও বাড়তে থাকা লোকসান
প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে জটিল করপোরেট কাঠামোর মাধ্যমে, যা ঋণ নিষ্পত্তিকে আরও জটিল করেছে। চারটি ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম PT Pilar Sinergi BUMN Indonesia (PSBI) এবং পাঁচটি চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী Beijing Yawan HSR Co Ltd-এর যৌথ উদ্যোগ KCIC রেলপথটি পরিচালনা করে। PSBI-এর হাতে রয়েছে ৬০ শতাংশ শেয়ার, আর চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ৪০ শতাংশ। ইন্দোনেশীয় কনসোর্টিয়ামে KAI-এর অংশ সবচেয়ে বেশি, ৫৮.৫৩ শতাংশ। বাকি ইকুইটির মালিক PT Wijaya Karya (WIKA), PT Jasa Marga এবং PT Perkebunan Nusantara VII।
এই ব্যবস্থার কারণে KAI-কে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। হুশে অংশীদারত্বের কারণে শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই প্রতিষ্ঠানটি ৯৫১.৪৮ বিলিয়ন রুপিয়াহ (৫৮.৪ মিলিয়ন ডলার) লোকসানের কথা জানিয়েছে। একক ঋণদাতার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল এই ঋণ কাঠামো কেন্দ্রীভূত ঋণঝুঁকি তৈরি করেছে। তা এখন পুরো দ্বীপপুঞ্জজুড়ে রেল আধুনিকায়নে বিনিয়োগের KAI-এর সক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। দানান্তারা সতর্ক করেছে, বর্তমান প্রকল্পের প্রতিকূল ঋণ কাঠামোর বোঝা KAI-এর ওপর থাকলে জাকার্তা-চিকামপেক, জাকার্তা-সুকাবুমি এবং জাকার্তা-রাংকাসবিতুং রুটে ভবিষ্যৎ রেল বিদ্যুতায়ন প্রকল্পে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া এসব দায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় বাজেটে (APBN) স্থানান্তরের প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর যুক্তি, এমন পদক্ষেপ বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে, যেখানে বেসরকারি খাতের লোকসান জনগণের দায়ে পরিণত হবে, অথচ মুনাফা বেসরকারি হাতেই থাকবে। এর বদলে সাদেওয়া দানান্তারার কাছে আসা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ দিয়ে অবকাঠামো ঋণ পরিশোধের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই লভ্যাংশের পরিমাণ আনুমানিক ৮০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ। এতে সাধারণ সরকারি রাজস্বের বদলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানব্যবস্থার মধ্যেই ঋণের বোঝা সীমিত থাকবে।
পুনর্গঠন কৌশলের রূপরেখা
দানান্তারার চূড়ান্ত পরিকল্পনার লক্ষ্য, মূল দায় না মুছে ঋণের মেয়াদ ও আর্থিক কাঠামো নতুন করে সাজানো। ডনি ওস্কারিয়া জোর দিয়ে বলেছেন, ঋণ হিসাবের খাতায় থাকবে, তবে শর্তাবলি বদলে এমন ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তর রেল খাতে বিঘ্ন না ঘটে। পুনর্গঠন পরিকল্পনায় বর্তমান সময়সূচির তুলনায় ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো, বর্তমান ২ থেকে ৩.৪ শতাংশ সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা এবং বিনিময় হারের ঝুঁকি কমাতে পরিশোধের মুদ্রা নির্দিষ্ট করার বিষয় রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো নিজে সমাধান প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দিতে ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি সীমিত পরিসরে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। প্রেসিডেন্ট সমন্বয়মন্ত্রী ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স এয়ারলাংগা হার্তার্তো, অর্থমন্ত্রী সাদেওয়া এবং দানান্তারার প্রধান নির্বাহী রোসান রোয়েসলানিকে ঋণের মেয়াদ বাড়ানোসহ সর্বোত্তম পরিস্থিতি হিসাব করতে নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা জানিয়ে রাষ্ট্রসচিব প্রাসেত্যো হাদি বলেন, প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে, অথচ আর্থিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করবে না, সরকারকে এমন একটি ব্যবস্থা বের করতে হবে।
হুশকে ঘিরে হইচই নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি সমস্যাটি খতিয়ে দেখেছি, কোনো সমস্যা নেই। আমি পুরো দায়িত্ব নিচ্ছি। ইন্দোনেশিয়া তুচ্ছ কোনো দেশ নয়। সবকিছু হিসাব করা হয়েছে।
এই আলোচনায় সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বিষয়ও জড়িত। উদীয়মান বাজারে নিজেদের উচ্চগতির রেল প্রযুক্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রকল্পটির সাফল্যে চীনের উল্লেখযোগ্য কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ডনি ওস্কারিয়া নিশ্চিত করেছেন, পুনর্গঠনের পরও চীনা অংশীদারদের ইকুইটির অংশ অপরিবর্তিত থাকবে। চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য কারিগরি দল শিগগিরই বেইজিং সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া জানিয়েছেন, প্রতিনিধিদলের যাত্রা চূড়ান্ত করার আগে চীনের কোন কর্তৃপক্ষ প্রধান আলোচনাসঙ্গী হবে, তা তিনি স্পষ্ট করতে চান। এতে আলোচনার সময় সরকার যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত হবে।
চীনের অবকাঠামো কূটনীতিতে আঞ্চলিক প্রভাব
হুশের ঋণ পুনর্গঠনের প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে পড়ছে। এ অঞ্চলের একাধিক দেশ চীনের অর্থায়নে নেওয়া একই ধরনের রেল প্রকল্প নিয়ে সমস্যায় রয়েছে। জাকার্তা-বান্দুং রেলপথ এ অঞ্চলে সম্পন্ন হওয়া প্রথম উচ্চগতির রেল। ফলে এর আর্থিক পরিণতি চীনের অবকাঠামো ঋণদানের চর্চার একটি মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। চীনের রেল কূটনীতি টেকসই উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, নাকি অসহনীয় ঋণের বোঝা তৈরি করছে, তা নিয়ে প্রকল্পটি ইতিমধ্যেই বিশ্লেষণের বিষয় হয়েছে।
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, সামনে কঠিন আলোচনা অপেক্ষা করছে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া, দুই দেশই চীনা ঋণে প্রাথমিকভাবে সমর্থন পাওয়া উচ্চগতির রেল প্রকল্প পুনর্গঠন করেছে। ঋণের টেকসইতা নিয়ে মতবিরোধ ও দুর্নীতির অভিযোগের পর তারা বেইজিংয়ের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির মধ্যে ২০২৩ সালে ফিলিপাইন চীনের ৫ বিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণে নেওয়া তিনটি রেল প্রকল্প বাতিল করে।
লাওসের অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা দেয়। ২০২১ সালে সম্পন্ন চীন-লাওস রেলপথ থেকে ঋণ পরিশোধের ব্যয় মেটানোর মতো যথেষ্ট আয় হচ্ছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সতর্ক করেছে, ছোট অর্থনীতির দেশটির জন্য প্রকল্পটি অত্যন্ত বড় আনুষঙ্গিক দায়ঝুঁকি তৈরি করছে। কম্বোডিয়া চীনের সমর্থনে ৪ বিলিয়ন ডলারের উচ্চগতির রেল প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, ভঙ্গুর অর্থনীতি সত্ত্বেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সমস্যাগ্রস্ত মুসে-মান্দালয় রুটের জন্য অর্থায়ন খুঁজছে।
ভিয়েতনাম পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজর রাখছে। ফেব্রুয়ারিতে হ্যানয় একটি প্রচলিত উত্তরাঞ্চলীয় রেলপথের জন্য চীনা ঋণ অনুমোদন করেছে এবং ৭০ বিলিয়ন ডলারের উত্তর-দক্ষিণ উচ্চগতির রেলপথ নির্মাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অতিরিক্ত কৌশলগত সম্পদ ছেড়ে না দিয়ে অনুকূল শর্তে ঋণ পুনর্গঠনে ইন্দোনেশিয়ার সক্ষমতা, নিজস্ব রেল পরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় ভিয়েতনামের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
দুর্নীতির তদন্তে প্রকল্প ঘিরে উদ্বেগ
আর্থিক সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে দুর্নীতি নির্মূল কমিশনের (KPK) তদন্ত। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে কমিশন প্রকল্পটি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। সাবেক মন্ত্রী মাহফুদ এমডি নির্মাণ ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৫২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর বিষয়ে জনসমক্ষে উদ্বেগ জানান। চীনের তুলনীয় প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ থেকে ১৮ মিলিয়ন ডলার খরচের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় তিন গুণ।
তদন্তে ক্রয় ও অর্থায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের ০.১ শতাংশ সুদের সরকার-টু-সরকার ঋণের বদলে ২ থেকে ৩.৪ শতাংশ সুদের চীনা অর্থায়ন বেছে নেওয়া। বাণিজ্যিক গোপনীয়তার দাবি পক্ষপাতমূলক সুবিধা দেওয়া বা বাজেট ফুলিয়ে দেখানোর আড়াল ছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে সন্দেহভাজন ঘোষণা করা হয়নি। তবে আগের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরোনো প্রকল্পগুলো তদন্তে KPK কতটা আগ্রহী, এই তদন্ত তা যাচাই করছে।
সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আগে আর্থিক নিশ্চয়তা
উচ্চগতির রেলপথটি পূর্ব দিকে সুরাবায়া, এমনকি বানিউওয়াঙ্গি পর্যন্ত বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বর্তমান ঋণসংকট সমাধানের ওপর নির্ভর করছে। অবকাঠামোবিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী আগুস হারিমুর্তি ইউধিওনো নিশ্চিত করেছেন, KCIC-এর আর্থিক কাঠামো স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সরকার সম্প্রসারণের বিস্তারিত পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। তিনি জানান, পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও দানান্তারার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
প্রেসিডেন্ট প্রবোও উচ্চগতির রেলপথের মাধ্যমে জাভাকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এতে যানজট ও কার্বন নিঃসরণ কমবে এবং রাজধানী থেকে পূর্ব জাভায় যাত্রার সময় কমে প্রায় তিন ঘণ্টায় দাঁড়াবে। তবে আগুস হারিমুর্তি ইউধিওনো জোর দিয়ে বলেছেন, সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান আর্থিক বোঝা সামাল দেওয়াই অগ্রাধিকার।
আরও উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার আগে আর্থিক সমস্যাটির সমাধান করা এবং এর সর্বোত্তম উপায় খুঁজে বের করাই ভালো হবে।
বর্তমান ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকারের বাইরে সম্প্রসারণের জন্য বিপুল অতিরিক্ত বিনিয়োগ লাগবে। এতে ভবিষ্যৎ অংশগুলোর অর্থায়ন কীভাবে হবে, সে প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে সরকারের পরিকল্পনা ছিল পূর্ব জাভার রাজধানী সুরাবায়া পর্যন্ত রেলপথ নিয়ে যাওয়া। পরে প্রবোও জানান, তিনি রেলপথটি জাভার সবচেয়ে পূর্বের জেলা বানিউওয়াঙ্গি পর্যন্ত বাড়াতে চান। কর্মকর্তাদের ধারণা, জাকার্তা থেকে সুরাবায়া ট্রেনে যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগলে উন্নয়নের মানচিত্র বদলে যাবে এবং রেলপথের করিডরজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে। তবে বর্তমান ঋণের বোঝা টেকসইভাবে পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত এসব পরিকল্পনা তাত্ত্বিকই থেকে যাবে।
মূল বিষয়গুলো
- দানান্তারা ও অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়ার আলোচনার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের হুশ উচ্চগতির রেলপথের ঋণ পুনর্গঠন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
- প্রকল্পটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার। এর ৭৫ শতাংশ চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কাছে পাওনা। প্রাথমিক ঋণে সুদের হার ২ শতাংশ, আর ব্যয় বৃদ্ধি মেটানোর ঋণে ৩.৪ শতাংশ।
- পরিচালন কনসোর্টিয়াম PT PSBI-তে ৫৮.৫৩ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী সংস্থা KAI-কে ২০২৪ সালে ১৩৭ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ৫৮.৪ মিলিয়ন ডলার লোকসান বহন করতে হয়েছে।
- প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো মন্ত্রীদের ঋণ সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন, তবে শুধু রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর নির্ভর না করে। মুনাফা বেসরকারি হাতে রেখে লোকসান রাষ্ট্রের কাঁধে চাপানোর নজির এড়াতে তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ বা ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে।
- দুর্নীতি নির্মূল কমিশন ক্রয়প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়ম এবং ০.১ শতাংশ সুদের কম খরচের জাপানি বিকল্পের বদলে বেশি সুদের চীনা ঋণ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তদন্ত করছে।
- বর্তমান ঋণ পুনর্গঠন সম্পন্ন ও পরিচালন আর্থিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সুরাবায়া ও বানিউওয়াঙ্গি পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত থাকবে। অবকাঠামো পরিকল্পনার সমন্বয় করছেন মন্ত্রী আগুস হারিমুর্তি ইউধিওনো।
- পুনর্গঠনের পরও প্রকল্পে চীনের ৪০ শতাংশ ইকুইটি অংশীদারত্ব থাকবে। ৭ বিলিয়ন ডলারের দায়ের পরিশোধের সময়সীমা, সুদের হার কমানো এবং পরিশোধের মুদ্রা নিয়ে আলোচনা চলছে।






