হারবিনের শীতল বাস্তবতা
উত্তর-পূর্ব চীনের হারবিনের রাস্তায় তুষারপাত আর মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের শীত জেঁকে বসেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ভেতরে আরামে বসে ঝাও লি মিনিট গুনে অপেক্ষা করছেন। যানজটে আটকে নেই তিনি। রাস্তার পাশের চার্জিং স্টেশনে গাড়ি লাগিয়ে ব্যাটারির চার্জের মিটার ধীরে ধীরে বাড়তে দেখছেন। ৪৫ বছর বয়সী এই অফিসকর্মী বলেন, “পেট্রোলের খরচ বাঁচবে ভেবে বৈদ্যুতিক গাড়িটি কিনেছিলাম।” ঝাওয়ের ইভি চার্জ করতে খরচ হয় ১০০ ইউয়ানের (১৪.৪০ মার্কিন ডলার) কম। তাঁর আগের পেট্রোলচালিত গাড়ির ৫০ লিটারের ট্যাংক ভরতে লাগত প্রায় ৩৫০ ইউয়ান। “কে জানত, এর বদলে চার্জ দিতেই এত বেশি সময় চলে যাবে। সময়ই টাকা। আমার মনে হয়, লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে,” সিএনএকে বলেন তিনি। জানান, দ্রুত চার্জিং স্টেশনে একবার চার্জ দিতে তাঁর প্রায় ৩০ মিনিট লাগে।
সূচিপত্র
গাড়ির ড্যাশবোর্ডে দেখানো প্রতিশ্রুতি আর রাস্তায় বাস্তব অভিজ্ঞতার ক্রমবর্ধমান ব্যবধানই ঝাওকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করে। দুই বছর আগে একেবারে নতুন গাড়িটি কেনার সময় বলা হয়েছিল, পুরো চার্জে এটি প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার চলবে—যা দিয়ে পুরো কর্মসপ্তাহের দৈনিক যাতায়াত সামলানো সম্ভব। ঝাও বলেন, “ঠান্ডায় প্রতিশ্রুত দূরত্বের অর্ধেকও পাচ্ছি না।” স্বাভাবিক আবহাওয়ায় সপ্তাহে প্রায় একবার চার্জ দিলেই চলত, এখন দিতে হয় সপ্তাহে প্রায় দুবার। এই সীমাবদ্ধতায় গাড়ি ব্যবহারের ধরনও বদলে গেছে। তিনি বলেন, “এখন বেশির ভাগ সময় সপ্তাহান্তে কাছাকাছি যাতায়াত, টুকিটাকি কাজ বা শপিং মলে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করি। দূরে গেলে বাড়ির হাইব্রিড গাড়িটা নিই। ওটাতে এসব সমস্যা নেই।”
এক দশকের বেশি সময় ধরে দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের পর চীনের প্রথম দিকের ইভি ব্যবহারকারীরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, ঝাওয়ের অভিজ্ঞতা তারই প্রতিফলন। গাড়ির বয়স বাড়ার সঙ্গে সময়, অর্থ ও সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি খরচ ক্রমেই মালিকদের ওপর বর্তাচ্ছে। আবহাওয়া কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে গাড়িগুলোকে, বিশেষ করে ব্যাটারিকে। পাশাপাশি পুরোনো হার্ডওয়্যার ও বন্ধ হয়ে যাওয়া সফটওয়্যার আপডেট নেভিগেশন থেকে চালক-সহায়ক ফিচার—সবকিছুকেই প্রভাবিত করছে। বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে পরিণত ইভি বাজারে দেখা দেওয়া এসব সমস্যায় পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি যাচাই হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চল, যেখানে ইভির ব্যবহার বাড়ছে, সেখানেও এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে।
স্টার্টআপের পতন, সফটওয়্যারের অবসান
চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা ২০১২ সালের মাত্র ১৩ হাজার থেকে বেড়ে বর্তমানে ২ কোটির বেশি হয়েছে। এ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে ৩০ লাখের বেশি চার্জিং স্টেশন। নজিরবিহীন এই সম্প্রসারণে একসময় গাড়িপ্রতি ৫৫ হাজার ইউয়ান পর্যন্ত সরকারি ভর্তুকি এবং বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো যানজটপূর্ণ শহরে লাইসেন্স প্লেট নীতির ভূমিকা ছিল। এসব শহরে ইভিই ছিল কার্যত একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প। এখন বাজার প্রবেশ করছে নতুন এক পর্যায়ে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কেনা প্রথম দফার গণবাজারের ইভিগুলো গুরুত্বপূর্ণ আট বছরের মেয়াদে পৌঁছাচ্ছে, যখন ব্যাটারির ওয়ারেন্টি শেষ হয়।
চীনে অধিকাংশ ইভি ব্যাটারির ওয়ারেন্টি আট বছর বা ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটারের। ব্যাটারির সক্ষমতা ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে। তবে বিভিন্ন নির্মাতার শর্তে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে এবং সেগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রেও অসংগতি আছে। ওয়ারেন্টি শেষ হলে ব্যাটারি বদলানোর খরচ প্রায়ই গাড়ির নিজের দামের সমান হয়ে যায়। শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, পুরো ব্যাটারি প্যাক বদলাতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ইউয়ানেরও বেশি লাগতে পারে। নতুন গণবাজারের ইভির দাম সাধারণত ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার ইউয়ান হওয়ায়, পুরোনো গাড়ির ব্যাটারি বদলের খরচ গাড়িটির অবশিষ্ট মূল্য ছুঁতে, এমনকি ছাড়িয়েও যেতে পারে।
ঝুঁকি শুধু যান্ত্রিক ত্রুটিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাইফাই, ডব্লিউএম মোটর ও নেটাসহ বেশ কয়েকটি ইভি স্টার্টআপ বন্ধ হয়ে গেছে বা কার্যক্রম গুটিয়ে এনেছে। আর্থিক সংকটে পড়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের গাড়ির মালিকেরা সফটওয়্যার আপডেট, খুচরা যন্ত্রাংশ ও বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন—এমন ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে ইনফোটেইনমেন্ট, নেভিগেশন ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাসহ চলমান সফটওয়্যার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ফিচারগুলো আপডেট ছাড়াই পড়ে থাকতে পারে। গাড়ি যান্ত্রিকভাবে ব্যবহারযোগ্য থাকলেও এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি মালিকদেরই বহন করতে হতে পারে। ক্রেতাদের কাছে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা ও আর্থিক সংকটে থাকা স্টার্টআপের পার্থক্য তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ব্যাটারি ক্ষয়ের বিজ্ঞান
ব্যাটারি কেন নষ্ট হয়, তা বুঝতে হলে এর ভেতরের রসায়ন দেখতে হবে। আধুনিক প্রায় সব ইভিতেই ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি মূলত দুটি প্রক্রিয়ায় ক্ষয় হয় বলে জানান গুয়াংঝোভিত্তিক ব্যাটারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লিডিঙ্কসের প্রতিষ্ঠাতা এবং চীনা গাড়ি নির্মাতা জিএসির ইভি ব্যাটারি উন্নয়নে অভিজ্ঞ মেই আও। তিনি সিএনএকে বলেন, “একটি হলো ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া—ব্যাটারি কম শক্তি জমা রাখতে পারে। অন্যটি হলো সময়ের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রোধ বেড়ে যাওয়া, যা বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।” চালকদের ক্ষেত্রে এর অর্থ, গাড়ি কম দূরত্ব যায় এবং ত্বরণ দুর্বল হয়।
ঠান্ডা আবহাওয়ায় সমস্যাগুলো আরও বাড়ে। তাপমাত্রা মাইনাস ১০ বা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ব্যাটারির ধারণক্ষমতা হয়তো মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমে, কিন্তু ব্যবহারকারীদের মনে হয় গাড়ির চলার দূরত্ব অর্ধেক হয়ে গেছে। এই ধারণাগত ব্যবধানের কারণ, গাড়ির ভেতর গরম রাখা ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য শক্তি খরচ হয়, ফলে গাড়ি চালানোর জন্য কম শক্তি অবশিষ্ট থাকে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক হাং দিন নগুয়েন ব্যাখ্যা করেন, তীব্র ঠান্ডায় চার্জ দিলে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়।
“এতে ধারণক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমে যায়,” বলেন তিনি। তাঁর মতে, গুরুতর ক্ষেত্রে এটি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় দ্রুত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা প্রায় ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মাঝারি তাপমাত্রার তুলনায় ব্যাটারির ধারণক্ষমতা কমার হার দশ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী তাপে ভেতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর আর্দ্রতায় তাপ অপসারণের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে ব্যাটারির ভেতরের তাপমাত্রা ও বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এসব ঝুঁকি কমাতে আধুনিক ইভিতে তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে, তবে চরম তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় থাকলে ব্যাটারি ও এর সহায়ক ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে।
মালিকদের আর্থিক বাস্তবতা
বেইজিংয়ের সরকারি খাতের ৩০ বছর বয়সী কর্মকর্তা শন পেং ২০২০ সালের আগস্টে ইভি কেনার পর গাড়িটির বয়সের ছাপ লক্ষ করেছেন। গাড়ির অপারেটিং সিস্টেম এখন ধীরে সাড়া দেয়, আর চলার দূরত্ব কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। চার্জ দেওয়ার গতিও কমেছে। পেং বলেন, এখন সাধারণ চার্জিং পয়েন্টে গাড়িটি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরে চার্জ হয়। নির্মাতাকে সমস্যাটি জানালে তাঁকে বলা হয়, তার বদলালে এটি ঠিক হতে পারে। মেরামতে “কয়েক হাজার ইউয়ান” খরচ হবে, আর গাড়িটির ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ায় সেই খরচ তাঁকেই দিতে হবে।
অস্বাভাবিক বেশি মেরামত খরচের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এক চীনা ইভি মালিক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি বদলাতে ৮০ হাজার ইউয়ান খরচ করেছেন বলে জানা গেছে—গাড়িটির মূল দামের প্রায় অর্ধেক। পোলস্টার ২-এর আরেক মালিককে ৫ লাখ ৪০ হাজার ইউয়ানের বিল ধরানো হয়, যা গাড়িটির মূল দামের চেয়েও অনেক বেশি। বেইজিংয়ের চিকিৎসা পেশাজীবী ফাং ই ২০১৫ সালে প্রায় ১০ লাখ ইউয়ানে টেসলা মডেল এক্স কিনেছিলেন। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আট বছরের ব্যাটারি ওয়ারেন্টি শেষ হলে তিনিও একই সংকটে পড়েন। টেসলার আনুষ্ঠানিক সার্ভিস সেন্টারে তাঁকে বলা হয়, মেরামতের জন্য গাড়িটি খুলে ব্যাটারি সাংহাইয়ের একটি কারখানায় পাঠাতে হবে এবং প্রতিটি ধাপেই বিপুল খরচ হবে।
ফাং বলেন, “কর্মীদের দেখে মনে হচ্ছিল, আমি যে মেরামত করাতে চাইছি, সেটাই তাঁদের কাছে বিস্ময়কর। কিন্তু আমি এই গাড়িটিকে ভালোবাসি। ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেলে কি পুরো গাড়িটাই ফেলে দিতে হবে?”
আনুষ্ঠানিক মেরামতের খরচ বহন করা কঠিন হওয়ায় অনেক মালিক অননুমোদিত ওয়ার্কশপে যান। ফাংয়ের ধারণা, তাঁর পরিচিত টেসলা মালিকদের ৬০ শতাংশের বেশি এখন তৃতীয় পক্ষের সেবার ওপর নির্ভর করেন। তিনি বলেন, “আনুষ্ঠানিক সেন্টারে যে কাজে ৪ থেকে ৫ হাজার ইউয়ান লাগে, ছোট ওয়ার্কশপে তা হয়তো ১ থেকে ২ হাজার ইউয়ানেই করা যায়।” সেই মেরামতের পর ফাং আর টেসলার আনুষ্ঠানিক সার্ভিস সেন্টারে যাননি। তবে এসব অনানুষ্ঠানিক মেরামত নেটওয়ার্কের ওপর তদারকি সীমিত। নির্মাতার নির্ধারিত পদ্ধতি ছাড়া উচ্চ ভোল্টেজের ব্যাটারি ব্যবস্থায় কাজ করায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
নিয়ন্ত্রণমূলক কঠোরতা ও পুনর্ব্যবহারের চ্যালেঞ্জ
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা আনতে উদ্যোগ নিচ্ছে বেইজিং। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে চীনা নিয়ন্ত্রকেরা গাড়ি স্ক্র্যাপ করার সময় ইভির ব্যাটারি গাড়ির সঙ্গে রাখার বাধ্যবাধকতা দেবে। উৎপাদন থেকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত ব্যাটারির গতিপথ অনুসরণে একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় তথ্য প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলা হবে। নতুন বিধিতে নির্মাতাদের ব্যাটারি অদলবদল সেবা, লিজিং পরিষেবা ও মেরামত প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাটারি গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে প্রক্রিয়াকরণের জট কমবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। এ কাঠামো নির্মাতাদের দায়বদ্ধতা কার্যকর করা, কার্বন ফুটপ্রিন্ট অনুসরণ এবং কারিগরি নির্দেশিকা মানসম্মত করার ব্যবস্থা তৈরি করবে।
তবে পুনর্ব্যবহারের অবকাঠামো এখনও অপর্যাপ্ত। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বাতিল হওয়া ইভি ব্যাটারি প্রক্রিয়াকরণের জন্য মাত্র ১৫৬টি প্রতিষ্ঠানকে সনদ দিয়েছে, অথচ এ কাজের ব্যবসায়িক লাইসেন্স আছে ৪০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের। ব্যবহৃত প্রতি এক হাজার ইভি ব্যাটারির চারটিরও কম সনদপ্রাপ্ত পুনর্ব্যবহারকারীরা প্রক্রিয়াকরণ করে। শুধু ২০২৩ সালেই অবসরে যাওয়া ইভি ব্যাটারির পরিমাণ আনুমানিক ৫ লাখ ৮০ হাজার টন। ২০২৭ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১১ লাখ ৪০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ না হলে এটি পরিবেশগত বিপদ তৈরি করবে।
বর্তমান পুনর্ব্যবহার পদ্ধতিতেও সমস্যা রয়েছে। পাইরোমেটালার্জি পদ্ধতিতে ছিন্ন করা ব্যাটারি ৮০০ থেকে ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম করা হয়। এতে বিপুল শক্তি খরচ হয় এবং লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বর্জ্য স্ল্যাগে হারিয়ে যায়। হাইড্রোমেটালার্জি পদ্ধতিতে শক্তিশালী অ্যাসিড দিয়ে উপাদানগুলো গলানো হয়, এতে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত তরল বর্জ্য তৈরি হয়। দুটি পদ্ধতিই কোবাল্টসমৃদ্ধ ব্যাটারির জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্মাতারা কোবাল্টবিহীন লিথিয়াম আয়রন ফসফেট রসায়নের দিকে ঝুঁকলে এসব পদ্ধতির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা কমে যায়। স্টেট কাউন্সিলের ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের শেষ ভাগেও অবসরে যাওয়া ব্যাটারির ৭৫ শতাংশের বেশি অযোগ্য ওয়ার্কশপে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ব্যাটারি অদলবদল ও দ্বিতীয় জীবন
কিছু নির্মাতা ব্যাটারির মালিকানা না রেখে অদলবদল ব্যবস্থাকে বিকল্প হিসেবে এগিয়ে নিচ্ছে। চীনের অন্যতম বড় ইভি নির্মাতা নিওর ২ হাজার ৭০০টির বেশি ব্যাটারি অদলবদল স্টেশন আছে। সেখানে গ্রাহকেরা কয়েক মিনিটে নিঃশেষ ব্যাটারি বদলে পুরো চার্জ করা ব্যাটারি নিতে পারেন। দেশটির শীর্ষ ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০টি শহরে ১ হাজারের বেশি স্টেশন চালুর লক্ষ্য নিয়েছে। সারা দেশে ৩০ হাজার স্টেশন গড়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও রয়েছে। এ মডেলে ব্যাটারি ও গাড়ি কেনা আলাদা হয়ে যায়, ফলে শুরুতে খরচ কমে এবং ব্যাটারির ক্ষয়ের দায় মালিকের ওপর থাকে না।
গাড়ি চালানোর উপযোগিতা হারানো ব্যাটারির জন্য দ্বিতীয় জীবনের ব্যবহার সাময়িক মূল্য তৈরি করতে পারে। অবসরে যাওয়া ইভি ব্যাটারিতে সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ধারণক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে, তাই সেগুলো স্থির বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা যায়। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে দ্বিতীয়বার ব্যবহৃত ইভি ব্যাটারির বাজার ৩৩০ থেকে ৩৫০ গিগাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ব্যাটারির অবস্থা যাচাইয়ের মানসম্মত পদ্ধতি না থাকা এবং কত দিন ব্যবহার করা যাবে তা অনিশ্চিত হওয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জ্বালানি গোষ্ঠী গাল্পের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান কার্লা তাভারেস বলেন, এ ধরনের ব্যাটারি ব্যবহারে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কারণ যাঁরা এগুলো পুনরায় ব্যবহার করেন, তাঁরা ভেতরের অবস্থা দেখতে পান না।
দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা ব্যাটারি কেনার সময় এক্সেল শিটে কত বছরের আয়ু ধরে হিসাব করব, তা এখনও জানি না। পাঁচ বছর হতে পারে, সাত হতে পারে, ১০-ও হতে পারে। আর এতে হিসাবের অনেক তফাত হয়।
নতুন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পুনর্ব্যবহার উন্নত করতে পারে। সরাসরি পুনর্ব্যবহার পদ্ধতিতে সক্রিয় উপাদানকে মৌলিক উপাদানে পুরোপুরি ভেঙে না ফেলে অক্ষত রেখে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়। এতে উচ্চ তাপমাত্রা বা প্রচুর অ্যাসিড ব্যবহারের প্রয়োজন এড়ানো যায়। বায়োলিচিং পদ্ধতিতে অণুজীব ব্যবহার করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ব্যাটারি বর্জ্য থেকে ধাতব আয়ন দ্রবীভূত করা হয়। তবে এসব প্রযুক্তি এখনও মূলত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। বড় পরিসরে প্রয়োগের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি এবং পরীক্ষামূলক প্রকল্পে বিনিয়োগও সীমিত।
প্রতিবেশী বাজারগুলোর জন্য শিক্ষা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইভি বাজার পরিণত হওয়ার পথে চীনের অভিজ্ঞতা সামনে কী আসতে পারে তার আভাস দেয়। থাইল্যান্ডে ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ৫৯ শতাংশ বেড়ে ৮৭ হাজার ছাড়িয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর প্রণোদনার কারণে ২০২৪ সালে বিক্রি বছরওয়ারি প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়ে ২৮ হাজার ছাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে ২০২৫ সালে নতুন গাড়ি নিবন্ধনের ৪৫ শতাংশ ছিল ইভি; বিক্রির তালিকায় শীর্ষে ছিল চীনা নির্মাতা বিওয়াইডি।
এনটিইউর হাং দিন নগুয়েন জোর দিয়ে বলেন, ব্যাটারির বয়সজনিত সমস্যা কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভোক্তাদের সমস্যা হয়ে ওঠে না; অবকাঠামো ও নীতিমালা ব্যবহারের বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলেও তা ঘটে। তিনি বলেন, “ঘন ও নির্ভরযোগ্য চার্জিং অবকাঠামো দ্রুত চার্জের ওপর নির্ভরতা কমায়।” তাঁর মতে, এতে ব্যাটারির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং গাড়ির চলার দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ কমে। দৈনন্দিন চার্জের সুযোগ সীমিত হলে দ্রুত চার্জই স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে দাঁড়ায়। এতে ব্যাটারির ওপর চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি খরচ মালিকদের ওপর বর্তায়।
রিসোর্সেস, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বালানি-সংক্রান্ত নয় এমন খরচ সর্বত্র ২০ শতাংশ কমানো গেলে ২০৩৫ সালের পর বিশ্বে ইভির বাজার-অংশ প্রায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিচ্ছন্ন না হলে বিদ্যুৎ খাতের নির্গমন গাড়ি বিদ্যুতায়নের সুফল পুষিয়ে দিতে পারে। গবেষণার সহলেখক শুয়াই পান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইভি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করে সময় নির্বাচন, উচ্চাভিলাষী নীতি গ্রহণ এবং সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর।”
চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা হলো, ব্যাটারির কার্যক্ষমতাকে ব্যবস্থা-পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সহায়তা থাকলেই ইভির ব্যবহার সফল হয়। অন্যথায় পুরোনো ব্যাটারির পরিণতি একক মালিকদেরই বহন করতে হয়। ব্যাটারির বয়সজনিত ক্ষয় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণের ব্যর্থতা নয়; পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের পূর্বানুমেয় ফল। আসল প্রশ্ন, গাড়ির পুরো জীবনকালজুড়ে প্রত্যাশা সামলাতে এবং মালিকদের সহায়তা দিতে বাজার কতটা ভালোভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।
মূল কথা
- চীনের প্রথম দিকের ইভি ব্যবহারকারীদের গাড়ির ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হয়ে প্রথম প্রজন্মের যানগুলো পুরোনো হওয়ায় ব্যাটারির ক্ষয়, চলার দূরত্ব কমে যাওয়া ও ব্যাটারি বদলের উচ্চ খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।
- চরম আবহাওয়ায় ব্যাটারির ক্ষয় দ্রুত হয়। ঠান্ডায় গরম রাখার চাহিদার কারণে ব্যবহারযোগ্য চলার দূরত্ব ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, আর গরমে স্থায়ী রাসায়নিক ক্ষতি হয়।
- ব্যাটারি বদলাতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ইউয়ানেরও বেশি খরচ হয়; অনেক ক্ষেত্রে তা পুরোনো গাড়ির অবশিষ্ট মূল্যের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি। ফলে মালিকেরা অননুমোদিত মেরামতের দোকানের দিকে ঝুঁকছেন।
- নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো কঠোর হচ্ছে। ২০২৬ সালের নতুন বিধিতে উৎপাদন থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত ব্যাটারির কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি বাধ্যতামূলক হবে, যদিও সনদপ্রাপ্ত পুনর্ব্যবহার সক্ষমতা এখনও সীমিত।
- চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারগুলোর দ্রুত ব্যবহার বাড়ানোর প্রণোদনার পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামোর বিস্তার ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।






