প্রযুক্তি রূপান্তরে হংকংয়ের বড় বাজি, দ্বিধায় আবাসন নির্মাতারা
হংকং সরকার তার উত্তর সীমান্তকে প্রযুক্তির শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তর করতে নজিরবিহীন আর্থিক অঙ্গীকার করছে। তবে শহরের আবাসন নির্মাতারা উৎসাহের বদলে সতর্কতার সঙ্গে সাড়া দিচ্ছেন। ফেব্রুয়ারিতে কর্মকর্তারা জানান, নর্দার্ন মেট্রোপলিস প্রকল্পে সহায়তার জন্য শহরের মুদ্রা প্রতিরক্ষা তহবিল থেকে ১৫ হাজার কোটি হংকং ডলার (প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার) তোলা হবে। চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পে এই তহবিল ব্যবহারের ঘটনা এটাই প্রথম। এ বিপুল অর্থায়ন অঞ্চলটির ইতিহাসে অবকাঠামো খাতে অন্যতম বৃহৎ অঙ্গীকার। তা সত্ত্বেও অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকি এবং অনিশ্চিত মুনাফা নিয়ে আবাসন খাতের নির্বাহীরা ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সূচিপত্র
আবাসন সংকটের সমাধান হিসেবে ২০২১ সালে প্রথম ঘোষিত নর্দার্ন মেট্রোপলিস উদ্যোগটি এখন আরও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার বা হংকংয়ের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্পের লক্ষ্য, দ্বিকেন্দ্রিক একটি শহর গড়ে তোলা। সেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণের জেলাগুলোতে কেন্দ্রীভূত থাকবে, আর উত্তরে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হবে উদ্ভাবন। চীনের প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি কেন্দ্র শেনঝেনের সীমান্তঘেঁষা এ উন্নয়ন এলাকায় অত্যাধুনিক গবেষণাগার থেকে শুরু করে ওষুধশিল্পের নতুন প্রতিষ্ঠান—সবকিছুর জন্য জায়গা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত এখানে ২৫ লাখ মানুষের বসতি হবে এবং ৬ লাখ ৫০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
সরকারের আর্থিক অঙ্গীকার সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সাড়া এখনও মৃদু। বড় আবাসন নির্মাতারা প্রকাশ্যে সমালোচনা এড়িয়ে চললেও, শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা ব্যক্তিগতভাবে প্রকল্পটির ব্যাপকতা ও অপরিচিত উন্নয়ন মডেল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। তাদের দ্বিধার মূলে রয়েছে হংকংয়ের প্রচলিত আবাসন উন্নয়ন পদ্ধতি এবং মূল ভূখণ্ড চীন থেকে আনা শিল্প পার্ক কৌশলের মৌলিক পার্থক্য। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো স্থানীয় বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি নিয়েও সতর্ক করেছে। রেডিও অনুষ্ঠানে ফোন করা শ্রোতারা প্রশ্ন তুলেছেন, এই বিনিয়োগে হংকংয়ের বাসিন্দাদের চেয়ে শেনঝেনই বেশি লাভবান হবে কি না।
কিছু অর্থনীতিবিদের ভাষায়, শহরটি এখন তার দীর্ঘতম মন্দার মুখে। খুচরা বিক্রি ও আবাসনের দাম এখনও ২০১৮ সালের সর্বোচ্চ স্তরের নিচে থাকায় ঝুঁকিও অনেক।
উন্নয়ন দর্শনের সংঘাত
এই টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন, যা হংকংয়ের প্রতিষ্ঠিত আবাসন নির্মাতাদের ভূমিকা কমিয়ে দিতে পারে। নর্দার্ন মেট্রোপলিস গড়ে তোলা হচ্ছে শিল্প পার্ক মডেলে। এতে একই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো খাতভিত্তিক কেন্দ্রে একত্রিত হয় এবং কঠোর সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলো পরিচালিত হয়। সীমান্তের ওপারে শেনঝেনসহ চীনের অন্যান্য শহরে এ পদ্ধতি সফল হয়েছে। তবে এটি হংকংয়ের ন্যূনতম সরকারি হস্তক্ষেপের ঐতিহ্যের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। সেখানে আবাসন নির্মাতারা সাধারণত পরিকল্পনা থেকে নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত নিজেদের অফিস ভবন, বিপণিবিতান ও আবাসিক কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
নতুন মডেলে সরকারি পরিকল্পনাবিদদের কাছে পেছনের সারিতে চলে যাবে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে তাদের হয়তো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কাছে আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণ, অথবা কর্তৃপক্ষের বাছাই করা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কারখানা ও অফিস তৈরির কাজ দেওয়া হবে। ঔপনিবেশিক আমল থেকে হংকংয়ের আবাসন নির্মাতারা যে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে এসেছেন, এটি তার থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি। তখন সরকারি সম্পৃক্ততা সীমিত থাকায় আবাসন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো বিপুল সম্পদ ও প্রভাব গড়ে তুলতে পেরেছিল।
অপরিচিত পরিচালন কাঠামোর কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সম্ভাব্য মুনাফা নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বড় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক নির্বাহী বিস্তারিত পরিকল্পনা নথির অভাব, নির্দিষ্ট অঞ্চলে অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কা এবং একই সঙ্গে অনেক এলাকায় উন্নয়ন ঘটানোর সরকারি প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। হংকংয়ের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালে খুচরা বিক্রি ৪৮ হাজার ৫২০ কোটি হংকং ডলারে পৌঁছালেও ২০২৪ সালে তা কমে ৩৭ হাজার ৬৮০ কোটি ডলারে নেমেছে। আবাসনের দামও ২০১৮ সালের সর্বোচ্চ স্তর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পড়েছে।
পুঁজি ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার সংঘাত
বাজারের অনিশ্চয়তার বাইরেও রাজনৈতিক প্রত্যাশা উন্নয়নকারীদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। ব্রিটিশ ধাঁচের পুঁজিবাদের অধীনে গড়ে ওঠা হংকংয়ের ব্যবসায়ী সমাজের ওপর এখন কর্মকর্তাদের ভাষায়, সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের মাধ্যমে “দেশ ও হংকংয়ের প্রতি ভালোবাসা” দেখানোর চাপ বাড়ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে হংকংবিষয়ক বেইজিংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা শিয়া বাওলং শেনঝেনে একটি আলোচনা সভা করেন। সেখানে ২৯ জন ব্যবসায়ী নেতাকে নর্দার্ন মেট্রোপলিসে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা তুলে ধরতে বলা হয়।
শিয়া বলেন, “হংকংয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি ব্যবসায়ী সমাজ।” তিনি নির্বাহীদের “সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশ ও হংকংয়ের প্রতি তাদের ভালোবাসা তুলে ধরার” আহ্বান জানান।
বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: নর্দার্ন মেট্রোপলিসে বিনিয়োগের সঙ্গে দেশপ্রেমের তাৎপর্য জড়িত। তবে ব্যবসায়ী সমাজের সাড়া ছিল পরিমিত। সাবেক প্রধান সচিব এবং একটি বড় ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী হেনরি তাং ইং-ইয়েন অনেক নির্বাহীর সংশয়ী অবস্থান তুলে ধরে বলেন, প্রকল্পগুলোকে অবশ্যই লাভজনক থাকতে হবে। প্রধান নির্বাহী জন লি পাল্টা জবাবে “প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জবাবি চিঠির মর্ম” বোঝার ওপর জোর দেন। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে এই ভূখণ্ডের প্রতি আবেগের প্রতিফলন থাকা উচিত।
এই টানাপোড়েন একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জকে সামনে আনে। জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য পদক্ষেপের মাধ্যমে বেইজিং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারলেও, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দরকার। মূল ভূখণ্ডে রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় নির্দেশ মেনে চলে। কিন্তু হংকংয়ের আবাসন নির্মাতারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কাজ করেন, যেখানে তাদের শেয়ারধারী ও ঋণদাতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
সীমান্তের দুই পারে সংযোগ
নর্দার্ন মেট্রোপলিস কেবল নগর সম্প্রসারণের প্রকল্প নয়; ১৯৯৭ সালে হস্তান্তরের পর থেকে হংকংকে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে আলাদা করে রাখা সীমান্তের ভৌত বিলুপ্তিরও ইঙ্গিত দেয়। প্রকল্পটি শাম চুন নদীর তীরে, যে নদী একসময় ব্রিটিশ হংকং ও কমিউনিস্ট চীনের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনরেখা ছিল। ১৯৬০-এর দশকে দুর্ভিক্ষ ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ এই নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন। আজও নদীটি বয়ে চলেছে, তবে ধারণাগত সীমান্ত ক্রমেই মুছে যাচ্ছে।
প্রকল্পটি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের স্বপ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে উপকূলের নয়টি শহরের সঙ্গে হংকং ও ম্যাকাওকে যুক্ত করে সিলিকন ভ্যালির প্রতিদ্বন্দ্বী একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচটি নতুন রেলপথ নর্দার্ন মেট্রোপলিসকে শেনঝেনের সঙ্গে যুক্ত করবে, যাতে প্রযুক্তি খাতের কর্মীরা সীমান্ত পেরিয়ে যাতায়াত করতে পারেন। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ওয়েস্ট কাউলুন স্টেশনে ব্যবহৃত যৌথ বিচারব্যবস্থার ব্যবস্থা—যেখানে মূল ভূখণ্ডের চীনা পুলিশ হংকংয়ের ভূখণ্ডে কাজ করে—নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্রেও চালু হতে পারে।
তবে এই সংযোগ হংকংয়ের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসওএএস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, পরিকল্পনাগুলো এই ভূখণ্ডের উন্নয়ন দর্শনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। হংকংয়ের উন্নয়ন ব্যুরোর বক্তব্য, প্রকল্পটি অঞ্চলের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কাজে লাগাবে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, অর্থ, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থাপনায় হংকংয়ের প্রচলিত শক্তিকে কম গুরুত্ব দিয়ে উন্নত উৎপাদনশিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যে খাতে শেনঝেন ইতিমধ্যেই আধিপত্য বিস্তার করেছে।
২০১৭ সাল পর্যন্ত অর্থসচিবের দায়িত্ব পালন করা জন সাং চুন-ওয়াহ প্রশ্ন তুলেছেন, হংকংয়ের বাণিজ্যিক শক্তি পরিত্যাগ করা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত কি না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় শেনঝেন ইতিমধ্যেই হংকংকে ছাড়িয়ে গেছে এবং সেখানে জমি ও শ্রমের খরচও কম। যে খাতে হংকং পিছিয়ে পড়েছে, সেখানে তারা কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে কেউ কেউ সন্দিহান।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে বিঘ্ন
বোর্ডরুম ও সরকারি দপ্তরের বাইরেও নর্দার্ন মেট্রোপলিস শতাব্দীপ্রাচীন জীবনযাত্রা ওলটপালট করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করেছে। নিউ টেরিটরিজের উপকূলীয় গ্রাম লাউ ফাউ শানে পরিবারগুলো ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শুকনো ঝিনুক উৎপাদন করে আসছে। চার দশক ধরে এসব জলসীমায় কাজ করা ৭২ বছর বয়সী কৃষক চ্যান তো-নগান অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে। সরকার এলাকাটিকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে।
চ্যান বলেন, “কীভাবে সবকিছু বদলে যাবে, তা সত্যিই জানি না। হয়তো আমাদের খামার আর এই সমুদ্রের দৃশ্যের ছবি তুলে রাখা শুরু করা উচিত।”
একইভাবে, প্রযুক্তি পার্ক নির্মাণের জন্য নির্ধারিত লোক মা চাউয়ের কাছে হা ওয়ান গ্রামে ৬৯ বছর বয়সী কোয়ক চি-ওয়াই তাঁর বাবার লাগানো গাছের পরিচর্যা করেন। গ্রামের অধিকাংশ পরিবারেরই নিজেদের জমি নেই। নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই তাদের আগামী বছর থেকেই স্থানান্তরিত হতে হতে পারে। এই জনগোষ্ঠীগুলো শিল্পায়নের আগের হংকংয়ের শেষ নিদর্শনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। জলাভূমি ও মাছের পুকুরঘেরা এসব এলাকা শহরটি যখন আর্থিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, তখনও অক্ষত ছিল।
উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে। চীনা সাদা ডলফিনসহ বিরল প্রজাতির আবাসস্থল প্রকল্পটির কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। গ্রিনপিস হংকংয়ের জ্যেষ্ঠ প্রচারক চ্যান হল-সিয়ন সতর্ক করে বলেন, ভূমি পুনরুদ্ধার অপরিবর্তনীয় এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করা বাস্তুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করে।
সরকারের বক্তব্য, উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলোর পরিবেশগত সংবেদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম। তবে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এখনও চলছে। এই দ্বিধা একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগকে স্থানীয় সংরক্ষণের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বের নজির ও সতর্কবার্তা
হংকংয়ের কর্মকর্তারা অন্য বড় নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করেছেন, যদিও সেসব অভিজ্ঞতা থেকে মিশ্র শিক্ষা মেলে। প্রেসিডেন্ট শি নিজে যে সিয়ংআন নতুন এলাকাকে বেইজিংয়ের সম্প্রসারণ হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে জোর দিয়েছেন, সেটি বিপুল সরকারি বিনিয়োগ সত্ত্বেও বাসিন্দা ও ব্যবসা আকৃষ্ট করতে হিমশিম খেয়েছে এবং “ভূতুড়ে শহর” নামে পরিচিতি পেয়েছে। খালি জায়গা পূরণ করতে এখন বেইজিং সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
অন্য দেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। সৌদি আরবের নিওম এবং ইন্দোনেশিয়ার নুসান্তারা প্রকল্পে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। লিবার রিসার্চ কমিউনিটির গবেষক ব্রায়ান ওং বলেন, এ মাত্রার নগর উন্নয়ন সাধারণত একটি অনুমানযোগ্য ধারা অনুসরণ করে: উচ্চাভিলাষী সূচনা, এরপর প্রকল্পের পরিসর কমানো, ঋণসংকট অথবা দীর্ঘসূত্রতা, যার ফলে আরও জটিলতা তৈরি হয়।
সিয়ংআনের সঙ্গে তুলনাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ হংকং সরকার নর্দার্ন মেট্রোপলিসের কিছু দিক চীনের “স্মার্ট সিটি” মডেল অনুসারে তৈরি করেছে। তবে মৌলিক পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে: সিয়ংআন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল, আর বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে স্বেচ্ছায় অংশ নিতে বেসরকারি আবাসন নির্মাতাদের রাজি করাতে হবে হংকংকে।
জনমত জরিপে দেখা যায়, উন্নয়নকারীদের দ্বিধার সঙ্গে জনসাধারণের সংশয়ও মিলে যায়। গ্রিনপিস ও হংকং পাবলিক ওপিনিয়ন রিসার্চ ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জরিপে মাত্র ৬ শতাংশ বাসিন্দা নর্দার্ন মেট্রোপলিস এবং পৃথক কাউ ই চাউ কৃত্রিম দ্বীপ প্রকল্প—দুটির নির্মাণকাজ একই সময়ে চালানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা উন্নয়নটিকে অনিবার্য বলে বর্ণনা করে চলেছেন। অর্থসচিব পল চ্যান রেডিও অনুষ্ঠানের সেই শ্রোতাদের জবাবে বিনিয়োগের পক্ষে সাফাই দিয়েছেন, যারা অভিযোগ করেছেন, সীমান্তপারের সংযোগের বদলে সম্পদ স্থানীয় বাসিন্দাদের উপকারে ব্যয় করা উচিত।
মূল বিষয়গুলো
- নর্দার্ন মেট্রোপলিস উন্নয়নে হংকং সরকার তার মুদ্রা প্রতিরক্ষা তহবিল থেকে ১৫ হাজার কোটি হংকং ডলার বরাদ্দ করেছে; ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এ ধরনের অর্থ তোলার ঘটনা এটাই প্রথম।
- শিল্প পার্ক মডেল নিয়ে আবাসন নির্মাতারা ব্যক্তিগতভাবে সংশয় প্রকাশ করছেন। এ মডেলে পরিকল্পনা ও উন্নয়নে তাদের প্রচলিত স্বায়ত্তশাসন কমে যায়।
- ২০ বছরে উত্তর হংকংয়ের ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে শেনঝেনের সঙ্গে সংযুক্ত প্রযুক্তি কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
- দেশপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে বিনিয়োগে ব্যবসায়ী নেতাদের চাপ দিচ্ছেন বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা। নির্বাহীরা অবশ্য বলছেন, প্রকল্প লাভজনক হওয়া জরুরি।
- ২০০ বছরের পুরোনো ঝিনুক চাষের গ্রামসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠী স্থানান্তরের ঝুঁকিতে রয়েছে, কিন্তু কোথায় পুনর্বাসন করা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই।
- জলাভূমি ও চীনা সাদা ডলফিনের আবাসস্থলসহ বন্যপ্রাণীর পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
- এই উন্নয়ন মূল ভূখণ্ড চীনের সঙ্গে ভৌত সংযোগের প্রতীক। এতে এমন যৌথ বিচারব্যবস্থা চালু হতে পারে, যার আওতায় মূল ভূখণ্ডের কর্মকর্তারা হংকংয়ের ভূখণ্ডে কাজ করবেন।
- চীনের সিয়ংআন নতুন এলাকার মতো অতীতের নজির দেখায়, রাষ্ট্রসমর্থিত প্রযুক্তি শহরগুলো বাসিন্দা ধরে রাখা ও ব্যবসা আকর্ষণে সমস্যায় পড়তে পারে।






