নৌ-সমতায় পৌঁছানোর কাউন্টডাউন
২০৩০ সালের মধ্যে পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির (পিএলএএন) বহর ৪৩৫টি জাহাজে উন্নীত করতে দ্রুত এগোচ্ছে বেইজিং। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যা ৩০০-এর নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ব্যবধান তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রভাবশালী নৌশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর সামুদ্রিক শক্তির ভারসাম্যে এটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সূচিপত্র
বর্তমান নির্মাণের গতি অপরিবর্তিত থাকলে, এ দশকের শেষ নাগাদ চীনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যা মার্কিন নৌবাহিনীর চেয়ে প্রায় ১৪১টি বেশি হতে পারে। এই সংখ্যাগত সুবিধা তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত অঞ্চল ঘিরে সামরিক হিসাব-নিকাশে মৌলিক পরিবর্তন আনছে। চীনের দ্রুতগতির নৌবহর নির্মাণ এখন আর কেবল প্রচলিত সক্ষমতার ব্যবধান কমাচ্ছে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে ক্রমেই সতর্ক করা হচ্ছে। বরং এটি এমন এক কাঠামোগত সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে শুরু করেছে, যা কাটিয়ে ওঠা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হতে পারে।
পেন্টাগনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানে পিএলএএনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যা ৩৭০টির বেশি। ২০২৫ সালের শেষ হওয়ার আগেই বহরটি প্রায় ৩৯৫টি জাহাজে পৌঁছাতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ২০৩০ সালের মধ্যে ৪৩৫টিতে উন্নীত হতে পারে। তুলনায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ ছিল ২৯৬টি। বর্তমান অর্থায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর জাহাজের সংখ্যা কমে প্রায় ২৯৪টিতে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ মার্কিন বিশ্লেষকেরা ক্রমেই বলছেন, চীনের হাতে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী আছে কি না, সেটি এখন আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। মূল উদ্বেগ হলো, ওয়াশিংটন এখনো আঞ্চলিক পর্যায়ে বেইজিংকে প্রতিহত করতে পারবে কি না। কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ মূল্যায়নে আইনপ্রণেতাদের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
পিএলএএন বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী। তাদের বহর ক্রমে বাড়ছে, যাতে ইতোমধ্যে বিমানবাহী রণতরি, সাবমেরিন, উভচর জাহাজ, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট এবং সহায়ক জাহাজ রয়েছে।
এই মূল্যায়নে সংখ্যাগত বৈষম্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। চীনের হাতে বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ থাকায় এই বৈষম্য আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জাহাজ নির্মাণের মাত্র ০.১৩ শতাংশ সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এই শিল্পগত অসমতা ইঙ্গিত দেয়, সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেতে ওয়াশিংটন কেবল বেইজিংয়ের চেয়ে বেশি জাহাজ নির্মাণ করতে পারবে না।
সামুদ্রিক শক্তির শিল্পভিত্তি
চীনের সম্ভাব্য ৪৩৫ জাহাজের নৌবহর বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে এমন একটি জাতীয় শিল্পব্যবস্থা, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বড় পরিসরে নৌযান নির্মাণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম। চীনা জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো একই সঙ্গে ডেস্টয়ার, ফ্রিগেট, করভেট, সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরি, উভচর আক্রমণকারী জাহাজ, রসদ সরবরাহকারী জাহাজ এবং কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ তৈরি করছে—যে গতিতে এখন কোনো পশ্চিমা দেশ এগোতে পারছে না।
পিএলএএনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩৭০টির বেশি। এই হিসাবে প্রায় ৬০টি ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত HOU BEI-শ্রেণির টহলযান অন্তর্ভুক্ত নয়। কার্যক্রমগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আনুষ্ঠানিক যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের হিসাবের বাইরে রয়েছে এগুলো। তবে বাদ পড়া এসব টহলযানেও জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তাইওয়ান ঘিরে কোনো সংঘাত, অবরোধ অভিযান বা দক্ষিণ চীন সাগরে মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে বড় আকারের প্রধান যুদ্ধজাহাজ। বেইজিং দ্রুতগতিতে Type 055 ও Type 052D ডেস্টয়ার এবং আধুনিক বহুমুখী ফ্রিগেট নির্মাণ করছে। ক্রুজার-আকারের ডেস্টয়ার Type 055 বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ধারণক্ষমতা এবং উন্নত রাডারব্যবস্থা পিএলএএনকে দূর সমুদ্রে কমান্ড পরিচালনার সক্ষমতা দিচ্ছে।
বিমানবাহী রণতরির বহরও বাড়াচ্ছে চীন। বিমানবাহী রণতরি Fujian-এর সমুদ্র পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় নয়টি রণতরি তৈরির লক্ষ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। চীনের আগের স্কি-জাম্প রণতরিগুলোর বিপরীতে Fujian-এ ক্যাটাপল্ট উৎক্ষেপণব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এতে রণতরিতে থাকা বিমানের পাল্লা, বহনক্ষমতা এবং উড্ডয়নের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
চীনা নৌ পরিকল্পনাকারীদের নজর ক্রমেই রসদ ব্যবস্থাপনার দিকেও পড়ছে। উপকূলীয় জলসীমার বাইরে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালাতে রসদ সরবরাহকারী জাহাজ, মেরামতকারী জাহাজ এবং বহরকে সহায়তা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য। আগের দশকগুলোর মতো বেইজিং এখন আর শুধু উপকূলীয় জলসীমা রক্ষায় মনোযোগী বলে মনে হয় না। তাদের নতুন বহর-ব্যবস্থা ক্রমেই বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিকজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার উপযোগী হয়ে উঠছে।
এই রূপান্তর ইঙ্গিত দেয়, চীনা নেতারা নৌক্ষমতাকে ক্রমেই শুধু প্রতিরক্ষামূলক হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন না। আঞ্চলিক কৌশলগত ভূগোল নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রধান উপায় হিসেবে তাঁরা একে দেখছেন। চীন একই সঙ্গে আরও Type 075 উভচর আক্রমণকারী জাহাজ এবং Type 071 ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ডক নির্মাণ করছে। বড় পরিসরের দূরপাল্লার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সমুদ্রপথে সৈন্য ও সরঞ্জাম পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি করে এসব জাহাজ।
তাইওয়ান ও প্রতিপক্ষের প্রবেশ ঠেকানোর কৌশল
চীনের দ্রুতগতির নৌবহর সম্প্রসারণ মূলত তাইওয়ান, পূর্ব চীন সাগর এবং বৃহত্তর দক্ষিণ চীন সাগরকেন্দ্রিক সামরিক কৌশলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। চীনের ক্রমবর্ধমান নৌবহর তাইওয়ান ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ চালানোর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা জোগায়। সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ ঠেকানো, বিলম্বিত করা বা খণ্ডিত করার সক্ষমতাও তৈরি করে এটি।
বড় নৌবাহিনী বেইজিংকে একই সময়ে একাধিক সামুদ্রিক উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় অব্যাহত চাপ বজায় রাখতে সক্ষম করে। এর মধ্যে রয়েছে বিরোধপূর্ণ দ্বীপ, বিতর্কিত নৌপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ। ডেস্টয়ার, ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ফ্রিগেট, সাবমেরিন ও উভচর জাহাজের ক্রমবর্ধমান বহর কাছাকাছি প্রতিপক্ষকে বিপুল শক্তিতে চাপে ফেলার ওপর জোর দেওয়া প্রতিপক্ষের প্রবেশ ও এলাকাভিত্তিক চলাচল ঠেকানোর কৌশলকে ক্রমেই জোরদার করছে।
এই কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান, সাবমেরিন এবং পৃষ্ঠযুদ্ধজাহাজের ঘন স্তর তৈরি করা হয়। এর ফলে হস্তক্ষেপের সামরিক ব্যয় রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমার বাইরে চলে যেতে পারে। তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে বেইজিংয়ের লক্ষ্য অর্জনের জন্য চীনা যুদ্ধজাহাজের বিশ্বজুড়ে মার্কিন নৌবাহিনীকে পরাজিত করার দরকার হবে না। বরং চীনের উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় সাময়িক স্থানীয় শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করাই যথেষ্ট। তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করা বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখানোর জন্য যতক্ষণ প্রয়োজন, এই সুবিধা ততক্ষণ বজায় রাখতে হবে।
৪৩৫ জাহাজের পিএলএএন একই সময়ে তাইওয়ানের কাছে, দক্ষিণ চীন সাগরে এবং পূর্ব চীন সাগরের আশপাশে টহল বজায় রাখতে পারবে, তাও কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত বাহিনী নিঃশেষ না করে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিকের অন্য কোথাও কোনো সংকটের সঙ্গে একটি আঞ্চলিক সংকট মিলে গেলেও বেইজিং অব্যাহত সামুদ্রিক চাপ বজায় রাখতে পারবে।
তাই চীনা নৌবাহিনীর সংখ্যাগত বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সময় দ্রুত ও বারবার বাহিনী মোতায়েন করার বেইজিংয়ের সক্ষমতার ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। চীনের নিকটবর্তী সমুদ্রকেন্দ্রিক মনোযোগের কারণে তাদের জাহাজের মার্কিন জাহাজের মতো দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার সক্ষমতা প্রয়োজন হয় না; তারা মূল ভূখণ্ডের ঘাঁটি, রসদকেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার কাছাকাছি পরিচালিত হতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রকে গুয়াম ও জাপান থেকে ফিলিপাইন সাগর এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাহিনী মোতায়েন ও রসদ সরবরাহ বজায় রাখতে হয়। বেইজিং নিজ ভূখণ্ডের কাছাকাছি লড়াই করে, আর ওয়াশিংটনকে মহাসাগর পেরিয়ে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা বেশি থাকলেও চীনের বড় নৌবহর স্থানীয় এলাকায় বেশি শক্তি সমাবেশ করতে পারে।
এই অসমতাই ব্যাখ্যা করে কেন সংখ্যাগত তুলনা কৌশলগতভাবে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ের হাতে এমন যথেষ্ট জাহাজ থাকতে পারে, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সক্ষমতার সমকক্ষ না হয়েও আঞ্চলিক জলসীমায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
সক্ষমতার ব্যবধান ও আকাশশক্তির সুবিধা
চীন বেশি জাহাজ নির্মাণ করলেও টনেজ, দূর সমুদ্রে দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চালানোর সক্ষমতা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, রসদ সমন্বয় এবং বিমানবাহী রণতরির বিমানশক্তিতে মার্কিন নৌবাহিনী এখনো স্পষ্টভাবে এগিয়ে। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজগুলোর সম্মিলিত স্থানচ্যুতি প্রায় ৪৫ লাখ টন। বর্তমানে চীনের বহরে জাহাজের সংখ্যা বেশি হলেও সেগুলোর মোট স্থানচ্যুতি প্রায় ৩২ লাখ টন।
চীনের বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরি রয়েছে, যেগুলো ক্রমে আরও উন্নত সেবা কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে। এর বিপরীতে মার্কিন নৌবাহিনী প্রায় ১১টি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করছে। বর্তমানে সেবায় যুক্ত বহু চীনা যুদ্ধজাহাজের তুলনায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে সাধারণত বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর সক্ষমতা এবং উন্নত সেন্সর রয়েছে।
যুদ্ধপরিস্থিতিতে জটিল বিমানবাহী রণতরি-নির্ভর আক্রমণকারী বহরের অভিযান, সাবমেরিন টহল এবং বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক রসদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। পারস্য উপসাগর, ভূমধ্যসাগর, আর্কটিক এবং ইন্দো-প্যাসিফিকসহ একই সময়ে একাধিক অঞ্চলে অভিযান চালানোর ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন মার্কিন কমান্ডাররা।
তবে মানগত ব্যবধান কমে আসছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো জাহাজের বদলি তৈরির চেয়ে দ্রুত নতুন জাহাজ সেবায় যুক্ত করছে চীন। Virginia-শ্রেণির সাবমেরিন, Ford-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরি এবং নতুন ডেস্টয়ারসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচিতে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্পগত বাধা অব্যাহত রয়েছে।
কংগ্রেসের প্রতিনিধিসহ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, নৌক্ষমতার ক্ষেত্রে চীনের হাতে শুধু সংখ্যাগত সুবিধাই নেই। বেইজিং মানগত দিক থেকেও ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। পিএলএ নেভি তাদের চতুর্থ বিমানবাহী রণতরি নির্মাণ করছে, নতুন কম দৃশ্যমান Type 055 ডেস্টয়ার যুক্ত করছে এবং নতুন Type 076 উভচর আক্রমণকারী জাহাজের আগমন ত্বরান্বিত করছে।
এই যুদ্ধজাহাজগুলোতে ক্রমেই উন্নত আকাশ থেকে আকাশে, পৃষ্ঠ থেকে পৃষ্ঠে এবং পৃষ্ঠ থেকে স্থলভাগে আঘাত হানার অস্ত্র যুক্ত হচ্ছে। এগুলো দূরপাল্লা থেকে নির্ভুলভাবে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, পিএলএ নেভির Type 055 ডেস্টয়ার YJ-21 হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে। এই অস্ত্র কয়েক হাজার মাইল পথ ঘণ্টায় ৫ ম্যাকের বেশি গতিতে পাড়ি দিতে পারে।
এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও, সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য বিমানশক্তির ক্ষেত্রে পিএলএ নেভি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। তারা এখন অতি অল্পসংখ্যায় J-35 পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ বিমানবাহী রণতরিভিত্তিক যুদ্ধবিমান সেবায় যুক্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে শত শত F-35C এবং F-35B।
মার্কিন নৌবাহিনীর America-শ্রেণির একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজে সর্বোচ্চ ২০টি F-35B মোতায়েন করা যায়। পঞ্চম প্রজন্মের বিমান দিয়ে পূর্ণভাবে সজ্জিত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি থেকে সর্বোচ্চ ৯০টি F-35C উড্ডয়ন করতে পারে। এর অর্থ, সমুদ্র থেকে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ বিমান ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য আক্রমণ চালাতে পারবে না চীন। উভচর যুদ্ধজাহাজ থেকে উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে সক্ষম F-35B-র সমতুল্য কোনো বিমান পিএলএ নেভির নেই।
আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশপথ থেকে চীনা যুদ্ধজাহাজকে ঝুঁকির মধ্যে রাখার সক্ষমতা, পৃষ্ঠযুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে পিএলএ নেভির সম্ভাব্য যেকোনো সুবিধা পুষিয়ে দিতে পারে।
ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন জাহাজ নির্মাণভিত্তি
দীর্ঘমেয়াদে বাহিনী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় শিল্প সক্ষমতার ঘাটতিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-চ্যালেঞ্জের প্রধান কারণ; কৌশলগত ঘাটতি তুলনামূলক কম। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত ৩৮১টি চালকযুক্ত যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ এবং ১৩৪টি বড় চালকবিহীন জাহাজ রাখার লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণ হতে এখনো কয়েক দশক লাগবে।
বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজের সংখ্যা কমে প্রায় ২৮৩টিতে দাঁড়াতে পারে, এরপর সামান্য বৃদ্ধি শুরু হবে। চীন যখন দ্রুত সম্প্রসারণ চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই সাময়িক পতন ঘটবে। তাইওয়ান ঘিরে সবচেয়ে বিপজ্জনক বছরগুলোতে এই সময়গত ব্যবধান সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়াতে পারে।
চীনের বিশাল বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মাণব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কর্মী, অবকাঠামো এবং উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে মার্কিন জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোর নেই। চীনা কারখানাগুলো একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ ও যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করায়, খণ্ডিত মার্কিন শিল্প নেটওয়ার্কে অনুপলব্ধ বৃহৎ উৎপাদনের সুবিধা নিতে পারে বেইজিং।
মার্কিন নৌযান নির্মাণশিল্পও সংকুচিত শিল্পশ্রমিক, বেশি শ্রমব্যয় এবং উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতার চাপে রয়েছে। ফলে বিদায় নেওয়া যুদ্ধজাহাজের জায়গায় দ্রুত নতুন জাহাজ যুক্ত করে বহরের বর্তমান সংখ্যা বজায় রাখতেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমেই অসুবিধা হচ্ছে, সম্প্রসারণ তো দূরের কথা।
জাহাজ নির্মাণের বাজেট বাড়ানোর বিষয়ে কংগ্রেসে বারবার আলোচনা হয়েছে। তবে শুধু অতিরিক্ত অর্থায়নে কয়েক দশক ধরে জমে থাকা শিল্পগত সীমাবদ্ধতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। Virginia-শ্রেণির সাবমেরিন কর্মসূচি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্ভাব্য তাইওয়ান সংঘাতে আক্রমণকারী সাবমেরিন ওয়াশিংটনের অন্যতম নির্ণায়ক সুবিধা।
তবে উৎপাদনে বারবার বিলম্বের কারণে সেবায় যুক্ত হওয়া সাবমেরিনের সংখ্যা কমেছে, ঠিক যখন পুরোনো Los Angeles-শ্রেণির সাবমেরিনগুলো অবসরে যাচ্ছে। Ford-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরি কর্মসূচিতেও একইভাবে বছরের পর বছর বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি ঘটেছে, ফলে পুরোনো Nimitz-শ্রেণির রণতরি প্রতিস্থাপনের গতি কমেছে।
মার্কিন নৌ পরিকল্পনাকারীরা ক্রমেই সতর্ক করছেন, একই সময়ে পর্যাপ্তসংখ্যক জাহাজ মোতায়েন করা না গেলে প্রযুক্তিগতভাবে শ্রেষ্ঠ বহরও কৌশলগতভাবে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে, প্রতিটি জাহাজের সক্ষমতায় এগিয়ে থেকেও কার্যকর প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক বাহিনী সমাবেশের সক্ষমতা হারাতে পারে ওয়াশিংটন।
কৌশলগত পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক জোট
দেশীয় নৌযান নির্মাণের সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মিত্রভিত্তিক জাহাজ নির্মাণ অংশীদারত্বের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ওয়াশিংটন। এ ধরনের অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে মার্কিন কারখানার ওপর চাপ কমাতে পারে। উন্নত সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম দ্রুত তৈরির ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জাহাজ নির্মাতাদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশটির জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌপ্ল্যাটফর্মগুলোর কিছু তৈরি করে। প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্থাপনাগুলো সহায়তা করতে পারবে কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
তবে এসব পদক্ষেপের সুফল পেতে এখনো কয়েক বছর লাগবে। ফলে এই নির্ণায়ক দশকের বাকি সময় যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
আরও নৌসম্পদ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে, চালকবিহীন ব্যবস্থা দ্রুত উন্নয়ন করে, হাইপারসনিক অস্ত্রের বিস্তার ঘটিয়ে এবং AUKUS ও QUAD-সহ জোটগুলো শক্তিশালী করে সাড়া দিয়েছে ওয়াশিংটন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরিচালিত সামুদ্রিক অভিযানের ওপরও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই বেশি জোর দিচ্ছে। ছোট ছোট বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিলে চীনের লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন হতে পারে এবং বেইজিংয়ের সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব কিছুটা পুষিয়ে যেতে পারে।
বড় আকারের চালকবিহীন পৃষ্ঠজাহাজ এবং স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের ব্যবস্থা ভবিষ্যতে প্রচলিত যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব পুষিয়ে দিতে পারে বলে আশা করছেন মার্কিন পরিকল্পনাকারীরা। তবে এসব ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমের উপযোগী হতে এখনো কয়েক বছর বাকি। প্রধান পৃষ্ঠযুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় অভিযান চালানোর সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ধারণক্ষমতার বিকল্প হিসেবে এগুলো এখনো কাজ করতে পারে না।
তাই একই সময়ে বাস্তবসম্মতভাবে পূর্ণতা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের চেয়ে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ।
জাপান ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত আঞ্চলিক সরকারগুলো ক্রমবর্ধমান কৌশলগত উদ্বেগ নিয়ে চীনের নৌবহরের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের আশঙ্কা, চীনের বড় নৌবহর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
আর্থিক দিকটিও চ্যালেঞ্জকে আরও তীব্র করছে। মার্কিন বহরের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া বা নৌযান উৎপাদন বাড়াতে বছরে কয়েক হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। একটি Ford-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরির দাম প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তবে এর সঙ্গে এসকর্ট জাহাজ, বিমান এবং আজীবনের পরিচালন ব্যয় যোগ হয় না। Virginia-শ্রেণির একটি আক্রমণকারী সাবমেরিনের দাম প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পানির নিচে শ্রেষ্ঠত্ব পুনর্গঠনে বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি এতে স্পষ্ট হয়।
অন্যদিকে, চীনের কম শিল্পব্যয়ের কারণে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনীয় কর্মসূচির চেয়ে অনেক দ্রুত এবং কম খরচে নতুন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের নৌবহর ৪৩৫টি জাহাজে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে; তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে প্রায় ২৯৪টি
- বিশ্বের জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ বেইজিংয়ের হাতে, আর ওয়াশিংটনের হাতে ০.১৩ শতাংশ
- সংখ্যাগত ব্যবধান তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে কৌশলগত চাপ তৈরি করছে
- বিমানবাহী রণতরির বিমানশক্তি, স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং দূর সমুদ্রে অভিযানের অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে
- জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে শিল্প অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে
- ২০৩০ সালের আগে নৌবহরের পতন ঠেকাতে ওয়াশিংটন সক্ষম হবে কি না, তার ওপর ইন্দো-প্যাসিফিকের শক্তির ভারসাম্য নির্ভর করতে পারে






