রেল যোগাযোগে নতুন উচ্চতায় বিপ্লব
আঞ্চলিক যোগাযোগে আরও একটি বাধা পেরিয়েছে চীন-লাওস রেলপথ। ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর চালু হওয়ার পর থেকে এ পথে যাত্রী ভ্রমণের সংখ্যা ৭ কোটি ছাড়িয়েছে। ৩১ মার্চ চায়না রেলওয়ে কুনমিং গ্রুপ কোম্পানি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১,০৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উচ্চগতির রেলপথটি উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাতায়াত ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনীতে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক ট্রেন চলেছে ৩,১০০টিরও বেশি। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে আধুনিক রেল যোগাযোগের টেকসই চাহিদার প্রমাণ দিয়ে এ সাফল্য বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যতম প্রধান প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে।
সূচিপত্র
রেলপথটি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের সঙ্গে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনকে যুক্ত করার তিন বছরের কিছু বেশি সময় পর এ মাইলফলক অর্জন করেছে। বিচিত্র ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে যাওয়া এ রেলপথ বড় শহরগুলোকে ৫৬০টিরও বেশি দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্ট থেকে প্রাচীন মন্দির-কমপ্লেক্স। এর ফলে দুটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অঞ্চলজুড়ে একটি সমন্বিত পর্যটন করিডর তৈরি হয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা যাকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মুকুটমণি বলেন, এ অর্জন তার রূপান্তরমূলক প্রভাব তুলে ধরে।
রেলপথটির সাফল্য শুধু যাত্রীর সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১২০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ৭ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক সীমান্তপারের রেলসেবা ব্যবহার করেছেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৃহত্তর বিশ্বের মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা যোগাযোগের বাস্তব প্রমাণ। এ যাত্রীরা এশিয়ার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ পরিবেশের কিছু অংশ পেরিয়ে যাওয়া পথে চলাচল করেন। পথে রয়েছে ১৬৭টি সেতু ও ৮৮টি টানেল। আগে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক দিয়ে বাসে যেতে প্রায় দুই দিন লাগলেও এখন ট্রেনে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টা। যাত্রীদের মধ্যে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, পর্যটক ও দৈনিক যাতায়াতকারীরা রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত থেকে শুরু করে সীমান্তপারের বাণিজ্য, নানা প্রয়োজনে তাঁরা এ সেবা ব্যবহার করেন। চলতি বছরের শুরুতে এক মাসে ২ কোটি ২৫ লাখ যাত্রার রেকর্ড দেখায়, বড় উৎসব ও ছুটির সময়ে বিপুল যাত্রী সামলানোর সক্ষমতা এ ব্যবস্থার রয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে তুলনীয় নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতার মান বজায় রয়েছে।
রেলপথটির কারিগরি বৈশিষ্ট্য এর উচ্চাভিলাষী পরিসরকে তুলে ধরে। স্ট্যান্ডার্ড গেজের রেলপথে ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলে, কার্স্ট পাহাড় কেটে এবং গভীর উপত্যকা পেরিয়ে। উচ্চগতির রেলের উপযোগী ঢাল বজায় রাখতে প্রকল্পে ব্যাপক টানেল ও সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে। এর ফলে ভৌগোলিক বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে উত্তর লাওসকে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিল এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সীমিত করেছিল।
স্থলবেষ্টিত থেকে স্থল-সংযুক্ত
কয়েক দশক ধরে লাওস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থলবেষ্টিত অল্প কয়েকটি দেশের একটি ছিল। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে জনপদগুলো বিচ্ছিন্ন থাকত এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত ছিল। চীন-লাওস রেলপথ এ ভৌগোলিক বাস্তবতা মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে; বিচ্ছিন্নতাকে যোগাযোগে রূপান্তর করে দেশটিকে আঞ্চলিক অর্থনীতির মধ্যে কর্মকর্তাদের ভাষায় একটি “স্থল-সংযুক্ত” কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ পরিবর্তন শুধু কথার বদল নয়; জাতীয় উন্নয়ন কৌশলে মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত। সড়কপথে পণ্য পরিবহন ও নদীপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা ও রেলভিত্তিক বাণিজ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
রেলপথটির নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বব্যাংক এর সম্ভাবনা স্বীকার করেছিল। ২০২০ সালে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছিল, বাণিজ্য সহজীকরণ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নতিসহ যথাযথ নীতিগত সংস্কার করা হলে দীর্ঘমেয়াদে রেল নেটওয়ার্ক লাওসের সামগ্রিক আয় সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ বাড়াতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ৫.৯ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি দেশটিকে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে প্রথম নির্ভরযোগ্য স্থলসংযোগ দিতে পারে। এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে সমুদ্রপথের বদলে রেলে ১৫ লাখ টন বাণিজ্যপণ্য পরিবহন হতে পারে। এতে ভিয়েনতিয়েন ও কুনমিংয়ের মধ্যে পরিবহন ব্যয় ৪০-৫০ শতাংশ এবং কুনমিং ও থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমবে।
নির্মাণের অর্থায়নে ছিল জটিল অংশীদারত্ব কাঠামো, যা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ব্যয়ের ৪০ শতাংশ এসেছে মূলধন বিনিয়োগ থেকে, যার ৩০ শতাংশ লাওসের এবং ৭০ শতাংশ চীনের। বাকি ৬০ শতাংশের অর্থ জুগিয়েছে লাও-চায়না রেলওয়ে কোম্পানির নেওয়া ঋণ। এ ব্যবস্থায় লাওসের অবদান ছিল আনুমানিক ১.৪-১.৬ বিলিয়ন ডলার, যার একটি অংশ এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণ থেকে। অন্যদিকে অধিকাংশ বিনিয়োগ দিয়েছে চীন। উচ্চ ব্যয় ছোট অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছিল। এ ব্যয় লাওসের ২০১৭ সালের জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান। বিপুল মূলধনি ব্যয় থেকে যথাযথ সুফল নিশ্চিত করতে সতর্ক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন ছিল।
উত্তর-পশ্চিম লাওসের উদমসাই প্রদেশের ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ভিলাসাই এ রূপান্তরের প্রতীক। পড়াশোনার জন্য তাঁর চাচার একসময় বাসে চীন পৌঁছাতে প্রায় তিন দিন লাগত। এখন ভিলাসাই ট্রেনে উঠে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে ইউনানের পু’আরে পৌঁছান। ভাড়া প্রায় ১৭৩ ইউয়ান (২৫ ডলার)। ভৌগোলিক কারণে আগে বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক গতিশীলতায় যাতায়াতের সময় কমার ব্যক্তিগত প্রভাব তাঁর গল্পে ফুটে উঠেছে।
রেলপথ সবকিছু বদলে দিয়েছে। এখন চীনে পড়াশোনা, ভ্রমণ এবং নতুন সুযোগ খুঁজে নেওয়া সহজ।
উত্তর লাওসের অভিভাবকেরা এখন সন্তানদের চীনা ভাষা শিখতে উৎসাহিত করছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, ভাষাগত দক্ষতা রেল খাত, সরবরাহব্যবস্থার কোম্পানি ও স্টেশনসংলগ্ন গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। এমনকি সত্তরোর্ধ্ব ব্যক্তিরাও প্রাথমিক মান্দারিন শেখার আশায় নৈশবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, যাতে নিজেদের জনপদ দিয়ে প্রবাহিত অর্থনৈতিক সুযোগে অংশ নিতে পারেন। এ সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সামাজিক গতিশীলতা ও শিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় রেলপথটির গভীর প্রভাবের প্রতিফলন। এর ফলে ভাষাশিক্ষা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কর্মশক্তিকে গড়ে তুলবে।
চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে কার্যক্রম সম্প্রসারণ
যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে নজিরবিহীন সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে। ছুটির মৌসুমের বাড়তি চাপ, ব্যবসায়িক যাত্রী ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে সেবা উন্নত করার জন্য দুই দেশের রেল প্রশাসকেরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। এতে দৈনিক ট্রেন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চীনা অংশে দৈনিক যাত্রীবাহী ট্রেনের সংখ্যা শুরুর দিকে আটটি থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ৮৬টিতে পৌঁছেছে। লাওস অংশেও দৈনিক চারটি ট্রেন থেকে সর্বোচ্চ ১৮টিতে উন্নীত হয়েছে। চীনে ট্রেন চলাচল দশ গুণ এবং লাওসে চার গুণ বাড়া দুই দেশের মধ্যে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনের বিপুল চাহিদা এবং ব্যবস্থাটির নকশায় রাখা কার্যক্রমগত নমনীয়তা তুলে ধরে।
২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এতে কুনমিং সরাসরি ভিয়েনতিয়েনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সীমান্তপারের যাত্রার সময় কমে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টায় দাঁড়ায়। ব্যস্ত সময়ে রেলপথটি প্রতিদিন ৬০ হাজারের বেশি যাত্রা সামলায়। এর মধ্যে রয়েছে চারটি সীমান্তপারের ট্রেনসেবা, যাতে প্রতিদিন ১,০০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল করেন। ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও ছুটির সময়ে চাহিদা দ্রুত বেড়ে গেলে এ সেবাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বহুভাষিক সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন যাত্রীর চাহিদার সঙ্গে সেবার মান খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়েছে। ট্রেনের কর্মীরা পুতুংহুয়া, দাই ভাষা, লাও ও ইংরেজিতে সহায়তা দেন। এতে আন্তর্জাতিক যাত্রী এবং রেলপথের পাশে বসবাসকারী জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে। শীত-বসন্তের ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে এখন প্রতিদিন ৭০টিরও বেশি যাত্রীবাহী ট্রেন চলে। আঞ্চলিক সংহতি গভীর হওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলো সংযোগকারী অবকাঠামো প্রকল্প শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যটন ও সীমান্তপারের সাংস্কৃতিক বিনিময়
দুই দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোকে যুক্ত করে রেলপথটি একটি সমন্বিত পর্যটন করিডর তৈরি করেছে, যা মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্রমণের ধরন মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। এখন পর্যটকেরা পাহাড়ি পথে দীর্ঘ বাসযাত্রা ছাড়াই সহজে কুনমিংয়ের ‘বসন্তের নগরী’র আকর্ষণ, শিশুয়াংবান্নার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জীববৈচিত্র্য, লুয়াং প্রাবাংয়ের ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের মন্দির এবং ভিয়েনতিয়েনের ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য দেখতে পারেন। আগে এ ধরনের দীর্ঘ বাসযাত্রা সাধারণ পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করত এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সীমিত রাখত।
পুরো রেলপথের অন্যতম ব্যস্ত টার্মিনাল হয়ে উঠেছে শিশুয়াংবান্না স্টেশন। চালুর প্রথম বছরেই সেখানে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার যাত্রার রেকর্ড হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দাই জনগোষ্ঠীর পানি ছিটানোর উৎসবের এক দিনে স্টেশনটিতে ২৭ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। এতে বোঝা যায়, সাংস্কৃতিক আয়োজন রেলযাত্রা বাড়ায় এবং সেবার মান বজায় রেখে মৌসুমি চাপ সামলানোর সক্ষমতা এ ব্যবস্থার রয়েছে।
বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে সীমান্তপারের রেলসেবা বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছে। ব্যাংককে ট্রেনে উঠে ভিয়েনতিয়েনে বদলি করে কুনমিং পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হওয়ায় ভ্রমণে নজিরবিহীন নমনীয়তা এসেছে। ফরাসি পর্যটক লিজ দুবো ও গিয়োম পাতিয়ে সম্প্রতি এ যাত্রাকে আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও কম কার্বন নিঃসরণকারী বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বেইজিং থেকে হ্যানয় ও তার বাইরেও রেলে এশিয়া ভ্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন।
রেলপথ চালুর পর থেকে লাওসের পর্যটন খাতে জোরালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম চার মাসে দেশটিতে ১৫ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক এসেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। চীনা পর্যটকের সংখ্যা ছিল অন্তত ৩ লাখ ৫১ হাজার। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পর বিদেশি পর্যটকের উৎস হিসেবে চীন তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। ২০২৪ সালে সীমান্তবর্তী স্টেশনে আসা ভিয়েতনামি পর্যটকদলের সংখ্যা ৪০.৭ শতাংশ বেড়েছে, যা রেলভিত্তিক পর্যটন ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধানে আসিয়ানের বৃহত্তর আগ্রহের প্রতিফলন।
পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক করিডর
যাত্রীসংক্রান্ত পরিসংখ্যান জনসাধারণের মনোযোগ পেলেও, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় রেলপথটির পণ্য পরিবহন সমানভাবে রূপান্তরমূলক প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর হিসাব অনুযায়ী, এ পথে ৭ কোটি ৬৮ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তপারের পণ্য ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টন, যার মধ্যে ইলেকট্রনিকস ও যন্ত্রপাতি থেকে কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য পর্যন্ত ৩,৮০০ ধরনের পণ্য রয়েছে।
২০২২ সালের শুরুর দিকে চালু হওয়া লানছাং-মেকং এক্সপ্রেস তাপমাত্রা-সংবেদনশীল কৃষিপণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান চাষিরা এখন সমুদ্রপথে কয়েক সপ্তাহের বদলে মাত্র তিন দিনে উন্নত মানের ফল কুনমিংয়ে পাঠাতে পারেন। এ দক্ষতা ভোক্তাবাজারের চিত্র বদলে দিয়েছে। উন্নত মানের থাই ডুরিয়ানের দাম বাক্সপ্রতি ১,৫০০-১,৬০০ ইউয়ান থেকে কমে প্রায় ৮০০ ইউয়ানে নেমেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, সরবরাহব্যবস্থার উন্নত দক্ষতার ফলে এখন “ডুরিয়ান কেনা নাগালের মধ্যে” এসেছে।
রেফ্রিজারেটেড কনটেইনার সেবা ব্যবহার করে লাওসের কলা সাত দিনে বেইজিং পৌঁছায়। সরবরাহব্যবস্থার পরিচালকেরা জানিয়েছেন, ফসল কাটার মৌসুমে এসব হিমশীতল কনটেইনার পুরোপুরি বুকড থাকে। ব্যস্ত সময়ে প্রতিদিন ১০০টির বেশি কনটেইনার সামলানোর সক্ষমতা রয়েছে স্থাপনাগুলোর। কুনমিংভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের উপমহাব্যবস্থাপক ঝাং দেহুয়ান জানান, হিমশীতল কনটেইনার এতটাই জনপ্রিয় যে পুরো মৌসুমজুড়েই সেগুলো বুকড থাকে। তাই কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের আগেভাগে সময়সূচি ঠিক করতে হয়।
শুল্ক ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এ প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে সময়সূচি নির্ধারণের সুযোগসহ নতুন “দ্রুত রেল শুল্ক ছাড়” মডেলে মোহান সীমান্ত চৌকি দিয়ে কনটেইনার যেতে সময় লাগে মাত্র ২-৫ ঘণ্টা; আগে লাগত সর্বোচ্চ ৪০ ঘণ্টা। মোহান দিয়ে সীমান্তপারের মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা চালুর সময় দিনে দুটি থেকে বেড়ে ১৮টিতে পৌঁছেছে এবং সর্বোচ্চ ২৩টি হয়েছে। এতে আসিয়ানের সঙ্গে চীনের ব্যস্ততম রেলবন্দর হিসেবে মোহানের ভূমিকা আরও দৃঢ় হয়েছে। সেবা নেটওয়ার্ক এখন দ্বিপক্ষীয় পথের বাইরেও বিস্তৃত। এতে চীনের ৩১টি প্রদেশ যুক্ত হয়েছে এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামসহ ১৯টি দেশ ও অঞ্চলে পৌঁছেছে।
আঞ্চলিক সংহতি ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ
চীন-লাওস রেলপথটি গড়ে উঠতে থাকা বৃহত্তর সর্ব-এশীয় রেল নেটওয়ার্কের দক্ষিণ প্রান্তের সংযোগ হিসেবে কাজ করছে। দ্বিপক্ষীয় পথ ছাড়িয়ে এর সংযোগ থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এবং ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর পর্যন্ত যেতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধন হওয়া থাইল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগ, যার মাধ্যমে ব্যাংকক ও ভিয়েনতিয়েনের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে, সংহতির পরবর্তী পর্যায়। এটি মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রকল্পটির ক্রমবর্ধমান ভৌগোলিক প্রভাবও তুলে ধরে।
ব্যাংকক-ভিয়েনতিয়েন সংযোগে থাই রাজধানী থেকে লাও সীমান্তে যেতে সময় কমে প্রায় ১০ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে থাইল্যান্ড উপসাগর থেকে চীনা সীমান্ত পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন রেল করিডর তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মালয়েশিয়া হয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড গেজের অবিচ্ছিন্ন রেলপথের কথা রয়েছে, যা কুনমিং থেকে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন রেল করিডর তৈরি করবে। এ সংযোগ বাস্তবায়িত হলে একসময় যাত্রীরা একটানা রেল নেটওয়ার্কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পুরো উপদ্বীপ পেরিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে বেইজিং যেতে পারবেন।
বর্তমানে থাইল্যান্ডের মিটার-গেজ ব্যবস্থা ও স্ট্যান্ডার্ড গেজের চীন-লাওস রেলপথের সংযোগস্থলে মালবাহী পণ্য অন্য ট্রেনে তুলতে হয়। তবে দ্বৈত গেজের রেলপথ বা পণ্য স্থানান্তরকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে এ বিচ্ছিন্নতা দূর করতে অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। আসিয়ান এক্সপ্রেস মালবাহী ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সুফল দেখিয়েছে। থাইল্যান্ড ও লাওস হয়ে মালয়েশিয়া থেকে চংছিং পর্যন্ত নয় দিনে পণ্য পৌঁছেছে; সমুদ্রপথে যেখানে লাগে ১৪-২১ দিন। এতে পণ্য পরিবহনকারীদের ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
রেল করিডরজুড়ে ১২টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠেছে। চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এসব অঞ্চলে ২.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। শুধু ভিয়েনতিয়েন সাইসেথা উন্নয়ন অঞ্চলেই রয়েছে ১৫০টি কোম্পানি এবং স্থানীয় কর্মীদের জন্য অন্তত ৭,০০০ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এখানে কর ছাড় এবং ৪২টি দেশের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার রয়েছে। বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় এসব দেশ লাওসের পণ্যে শুল্ক ছাড় দেয়।
অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা
৫.৯ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণ ব্যয়, যা লাওসের ২০১৭ সালের জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, রেলপথটির আর্থিক কাঠামোকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরদারিতে এনেছে। ঋণের বোঝা যথাযথ বলে প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত আয় প্রকল্পটি করতে পারবে কি না, বিশেষ করে দেশের বিদ্যমান বৈদেশিক ঋণের বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষাপটে, সমালোচকেরা শুরুতে এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে কার্যক্রমের তথ্য বলছে, পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুত প্রকল্পটি আর্থিকভাবে টেকসই হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। এতে অনিবার্য আর্থিক সংকট বা কথিত ঋণ-ফাঁদ কূটনীতির বয়ান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
লাও-চায়না রেলওয়ে কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক লিউ হং বলেন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন উভয়ই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির হারও অনেক বেশি। শুধু ২০২৩ সালেই লাওস অংশে ২৫ লাখ ৯৪ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৫.৮ শতাংশ বেশি। পণ্য পরিবহন হয়েছে ৪০ লাখ ৮৯ হাজার টন, যা ৮৩.১ শতাংশ বেশি। এ পরিসংখ্যান ২০৩১ সালের জন্য নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি, যা প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় এক দশক এগিয়ে থাকা কার্যক্রমগত সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়।
থাইল্যান্ডের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও আসিয়ান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. পিতি শ্রীসংনাম বলেন, এ প্রকল্প “ঋণ-ফাঁদ” হিসেবে চিহ্নিত করার ধারণার বিপরীত। তাঁর ব্যাখ্যা, ঋণদাতা জেনেশুনে অলাভজনক প্রকল্পে অর্থায়ন করে ঋণগ্রহীতার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেই ঋণ-ফাঁদ তৈরি হয়। যৌথ উদ্যোগের কাঠামোয় চীনের ৭০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এবং দেশটি পরিচালনাগত ঝুঁকিও ভাগ করে নেয়। তাই এ প্রকল্প শোষণমূলক ঋণ নয়, প্রকৃত বিনিয়োগ।
এই প্রকল্প ঋণ-ফাঁদের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি লাওসে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
রেলওয়ে কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক অনংদেথ ফেতকাইসোন নিশ্চিত করেছেন, ২০২৩ সালে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বছরে ২০ লাখ টনের ব্যয়-উসুলের সীমার দ্বিগুণ ছিল। এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং পরিচালনাগত মুনাফাও এসেছে। লাওসের প্রেসিডেন্ট থংলুন সিসৌলিথ বারবার বলেছেন, দেশকে স্থলবেষ্টিত থেকে স্থল-সংযুক্ত করার প্রচেষ্টাকে রেলপথটি জোরদার করছে। পর্যটন আয় ও সরবরাহব্যবস্থার সেবার মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে চীন-লাওস রেলপথে ৭ কোটির বেশি যাত্রা হয়েছে। ১২০টি দেশের ৭ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক ৩,১০০টি আন্তর্জাতিক ট্রেনে সীমান্ত পার হয়েছেন
- সীমান্তপারের যাতায়াত ও বাণিজ্যের বাড়তি চাহিদা মেটাতে চীনা অংশে দৈনিক ট্রেনের সংখ্যা ৮ থেকে বেড়ে ৮৬টি এবং লাওস অংশে ৪ থেকে বেড়ে ১৮টি হয়েছে
- ১,০৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথে ৭ কোটি ৬৮ লাখ টন পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩,৮০০ ধরনের ১ কোটি ৭০ লাখ টন সীমান্তপারের পণ্য রয়েছে
- রেফ্রিজারেটেড রেলসেবায় থাই ডুরিয়ান ও লাওসের কলা ৩-৭ দিনে চীনের বাজারে পৌঁছাচ্ছে। এতে সরবরাহ ব্যয় ২০-৩০ শতাংশ কমছে এবং ভোক্তাদের জন্য খুচরা দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে
- ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া থাইল্যান্ডের ভিয়েনতিয়েনগামী রেল সংযোগ করিডরটিকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যুক্ত হতে যাওয়া ভবিষ্যৎ সর্ব-এশীয় নেটওয়ার্কের দিকে সম্প্রসারিত করেছে
- বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাণিজ্য সহজীকরণ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নতির পরিপূরক সংস্কার হলে রেলপথটি লাওসের সামগ্রিক আয় সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ বাড়াতে পারে
- ২০২৩ সালে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ৪০ লাখ টন ছাড়িয়েছে, যা বছরে ২০ লাখ টন ব্যয়-উসুলের সীমার দ্বিগুণ। এতে ঋণের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত মুনাফা অর্জনে সহায়তা হয়েছে






