স্পর্শানুভূতিনির্ভর খাবারের উত্থান
সম্প্রতি এক সপ্তাহান্তের বিকেলে সিউলের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া হোয়াং ইন-উ ‘বাটার রাইস কেক’ নামে এক খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেগুলো চেখে দেখার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। অনেক তরুণ কোরীয়ের মতো তিনিও সেখানে গিয়েছিলেন, কারণ তাঁর প্রেমিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিষ্টান্নটি দেখেছিলেন এবং দুজনে মিলে খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে চেয়েছিলেন। কোরিয়ার সাম্প্রতিক খাবারের উন্মাদনাগুলো একে একে চেখে দেখতে গিয়ে হোয়াং এমন একটি প্রবণতা লক্ষ করেন, যা মিষ্টি বা ঝালের চেয়েও গভীর। তিনি দ্য কোরিয়া টাইমসকে বলেন, “বেশির ভাগ খাবারই চিবোতে নরম বা কোমল, তাই সেগুলো উপভোগ করতে বেশি চাপ বা শক্তি লাগে না।” তাঁর এই পর্যবেক্ষণে কোরীয় খাদ্যসংস্কৃতির একটি নীরব কিন্তু নির্ণায়ক পরিবর্তন ধরা পড়ে: মুখে কোনো খাবার কীভাবে টানে, বাধা দেয়, ভেঙে পড়ে বা গলে যায়—অর্থাৎ তার টেক্সচার—এখন খাবার গ্রহণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
সূচিপত্র
কোরিয়ার ভাইরাল মিষ্টান্ন, পানীয় এবং মৌসুমি সামুদ্রিক খাবারের ক্ষেত্রে এখন আর শুধু স্বাদ নয়, খাবারটি মুখে কেমন লাগে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ভোক্তাদের আচরণে বৃহত্তর রূপান্তর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং কোরীয় রন্ধন উদ্ভাবনের বিশ্বব্যাপী বিস্তার। মার্শম্যালোভিত্তিক কুকি থেকে ফেনাযুক্ত কফি—নতুন প্রজন্মের কাছে খাবারের অভিজ্ঞতার প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছে টেক্সচার।
ক্কুদক ক্কুদকের অর্থ
এই প্রবণতা বুঝতে হলে প্রথমে কোরীয় ধারণা “ক্কুদক ক্কুদক” বুঝতে হবে। কোরিয়ান ভাষার জাতীয় ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, শব্দটি মূলত এমন কোনো পৃষ্ঠকে বোঝাত, যা জমে যাওয়ার পর আংশিকভাবে শুকিয়ে বা শক্ত হয়ে গেছে। আর্দ্র অথচ চিবোতে মজাদার খাবার ভাইরাল প্রবণতায় আধিপত্য বিস্তার করায় শব্দটির অর্থ বদলে এখন এটি একটি স্বতন্ত্র টেক্সচার বোঝায়: ঘন, স্থিতিস্থাপক এবং নরম—তবে চোয়ালকে কাজে লাগানোর মতো যথেষ্ট বাধাসহ।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোরীয় খাবার নিয়ে লেখালেখি করা খাদ্যবিষয়ক কলাম লেখক কিম সে-বম এই পছন্দের শিকড় খুঁজে পান ঐতিহ্যবাহী কোরীয় খাবারের ধরনে। তিনি দ্য কোরিয়া হেরাল্ডকে বলেন, “কোরীয়রা চিবোতে শক্ত ও আঁশযুক্ত অনেক খাবার খেয়ে বড় হয়েছে, যেমন চিবোতে হয় এমন রাইস কেক, শুকনো সামুদ্রিক খাবার এবং মসলামাখা শাকপাতা। এর ফলে আমাদের চোয়ালের পেশি স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী হয়েছে। অনেকেই এমন খাবার পছন্দ করেন, যা মুখে চাপ দেওয়ার মতো কিছু দেয়।” খাওয়ার এই শারীরিক তৃপ্তি—সামান্য বাধা, যা খাওয়াকে আরও পরিতৃপ্তিকর করে তোলে—অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ভোক্তাদের জন্য মানসিক ভরসা হয়ে উঠেছে। বাজেট সংকুচিত হলে সমৃদ্ধ ও ঘন টেক্সচার খরচটিকে সার্থক মনে করায়।
ভাইরাল হওয়া খাবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কোরীয়দের মধ্যে তালুতে লেগে থাকে এমন চিবোতে নরম ও আঠালো টেক্সচারের প্রতি স্পষ্ট ঝোঁক আছে।
এখন মুকবাং ভিডিও থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন—সবখানেই শব্দটি দেখা যায়। ইউটিউবাররা জানান, “ক্কুদক ক্কুদক” লেখা থাম্বনেইল নিয়মিতভাবেই বেশি ভিউ পায়। টেক্সচার নিজেই এখন কনটেন্টে পরিণত হয়েছে; খাওয়া ব্যক্তিগত কাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাগ করে নেওয়ার দৃশ্যে রূপ নিয়েছে।
ভাইরাল প্রবণতার চক্র: দুবাই থেকে সিউল, আবার ফিরে
দুবাই চিউই কুকি, যা স্থানীয়ভাবে “দুজ্জোনকু” নামে পরিচিত, টেক্সচার কীভাবে কোনো খাবারকে ভাইরাল জনপ্রিয়তা দেয় তার উদাহরণ। নামের সঙ্গে মিল থাকলেও মিষ্টান্নটি দুবাইয়ের নয়, এমনকি প্রযুক্তিগতভাবে কুকিও নয়। দুবাই চকোলেট বার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটি তৈরি করা কোরীয় উদ্ভাবন। ওই চকোলেট বারে থাকে পেস্তা ক্রিম এবং কাতায়েফি নামে কুচানো ফিলো ডো। কোরীয় সংস্করণে চকোলেটের আবরণের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে মার্শম্যালোভিত্তিক ডো, যা আঠালো ভাব, স্থিতিস্থাপকতা ও মচমচে টেক্সচারের স্তরবিন্যাস তৈরি করে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে স্থানীয় একটি মিষ্টান্নের দোকান এই নতুন সংস্করণ তৈরি করলে প্রবণতাটির শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে পণ্যটি বিক্রি হয়ে যায় এবং দামও বেড়ে যায়। সেলিব্রিটি ও কে-পপ তারকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুকিগুলো নিয়ে পোস্ট করলে চাহিদা আরও বেড়ে যায়। জনপ্রিয়তার শীর্ষে বেকার সিওং জং-মিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১,০০০টি কুকি বিক্রি করে ফেলেন এবং একজন ক্রেতার জন্য সর্বোচ্চ চারটি কেনার সীমা চালু করেন। প্যারিস বাগেট ও আ টুসম প্লেসসহ বড় চেইনগুলোও নিজেদের সংস্করণ আনে। ফলে “দুবাই-স্টাইল” নির্দিষ্ট কোনো রেসিপির বদলে টেক্সচারের বৈপরীত্য বোঝানোর সংক্ষিপ্ত নামে পরিণত হয়।
তবে উত্থানের মতো পতনও ছিল দ্রুত। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দোকানের প্রদর্শনীতে অবিক্রীত কুকি পড়ে থাকত। সিওং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “এখন ক্রেতারা এলে, ওটার দিকে তাকানও না।” এই উত্থান-পতনের ধরন কোরীয় খাবারের প্রবণতায় পরিচিত। আগের জনপ্রিয়তার ঢেউগুলোও একই পথ অনুসরণ করেছে: ২০১৮-২০১৯ সালে “ফ্যাটকারন” (বড় আকারের ম্যাকারন), ২০২২ সালে পোকেমন ব্রেড এবং ২০২৩-২০২৪ সালে তাংহুলু (চিনির প্রলেপ দেওয়া ফলের শিক)।
মিষ্টান্নের বাইরে: সব ধরনের খাবারেই টেক্সচার
মুখে খাবারের অনুভূতির ওপর এই গুরুত্ব এখন মিষ্টি খাবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে স্টারবাকস কোরিয়া “অ্যারোকানো” বাজারে আনে—বাতাস সঞ্চালনের প্রযুক্তিতে মাইক্রোফোম মেশানো আমেরিকানো। পানীয়টিতে বাতাস প্রবেশ করিয়ে কোম্পানিটি স্বাদে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এনে কফির মুখের অনুভূতি বদলে দেয়, ফলে পানীয়টি আরও হালকা ও মসৃণ লাগে। এর সাড়া রেকর্ড গড়ে: এক সপ্তাহে ১ মিলিয়নের বেশি কাপ বিক্রি হয়, যা কোম্পানির স্থানীয় ইতিহাসে কোনো ঠান্ডা পানীয়ের জন্য এই মাইলফলকে পৌঁছানোর দ্রুততম ঘটনা। পেইক’স কফি ও কম্পোজ কফিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত একই ধরনের ফেনাযুক্ত সংস্করণ আনে। এতে দেশের প্রতিযোগিতামূলক ক্যাফে খাতে টেক্সচার নতুন লড়াইয়ের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
টেক্সচারের নতুন উপস্থাপনায় মৌসুমি উপাদানও নতুনভাবে নজরে এসেছে। বসন্ত এলে ওয়েবফুট অক্টোপাস (চুক্কুমি) এবং আইস গোবি মাছের সাশিমি অনলাইনে জনপ্রিয়তা পায়; স্বাদের পাশাপাশি এগুলোর আলাদা মুখের অনুভূতিও কদর পায়। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে ধরা চুক্কুমির ডিমে থাকে দানাদার, চিবোতে মজাদার অনুভূতি। বসন্তের শুরুতে অল্প সময়ের জন্য পাওয়া আইস গোবির টেক্সচার কোমল, প্রায় জেলির মতো। অক্টোপাসকে “নিখুঁত” টেক্সচারে রান্নার পদ্ধতি দেখানো ছোট ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, পরিচিত উপাদানকে ভাইরাল অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই খাবারটি নতুন নয়; বদলেছে সেটিকে কীভাবে উপস্থাপন ও ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে।
টেক্সচারের কারণেই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নও আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইয়াকগওয়া (মধুর প্রলেপ দেওয়া কুকি) এবং গেসং জুয়াক (সিরার প্রলেপ দেওয়া ভাজা রাইস কেক) তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় চিরাচরিত মিষ্টির প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এসব খাবারের অত্যন্ত মিষ্টি ও আঠালো টেক্সচার সমকালীন পছন্দের সঙ্গে মেলে।
পর্দা থেকে খাবার টেবিল
স্বাদকে পুরোপুরি ডিজিটাল মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া যায় না, কিন্তু টেক্সচারকে দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়। ছোট ভিডিওনির্ভর পরিবেশে খাওয়ার অভিজ্ঞতা শুরু হয় টেবিলে নয়, পর্দায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে এসব খাবারকে খুব কমই কেবল স্বাদের দিক থেকে দেখানো হয়; বরং দেখানো হয় বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে। কোনো হাত আঠালো পৃষ্ঠ টেনে আলাদা করছে। একটি টুকরা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করার মতো যথেষ্ট সময় ধরে প্রসারিত হচ্ছে। দৃশ্যের এই ভাষা স্পর্শের অনুভূতিকে এমন কিছুতে রূপ দেয়, যা পর্দার মাধ্যমেই উপভোগ করা যায়। ফলে খাবার খাওয়ার আগেই তা অভিজ্ঞতা হিসেবে কল্পনা করা সম্ভব হয়।
ইনহা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লি উন-হুই কোরিয়ার স্ন্যাকস ও মিষ্টান্নের বাজারকে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল বাজার বলে বর্ণনা করেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “খাবার আর শুধু খাওয়ার জিনিস নয়। অভিজ্ঞতা ও আখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে এগুলো কনটেন্ট গ্রহণের একটি রূপ হয়ে উঠছে।” বিশেষ করে ২০ ও ৩০ বছর বয়সী তরুণ ভোক্তারা অনলাইনে দেখা প্রবণতায় অভূতপূর্ব দ্রুততায় সাড়া দেন, ফলে নির্দিষ্ট খাবারের জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত বাড়ে, তেমনি দ্রুত কমেও যায়।
খাবারের সঙ্গে এই মধ্যস্থতাপূর্ণ সম্পর্ক রন্ধনস্রষ্টাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ভাইরাল কোরীয় মিষ্টি আলু রান্নার কৌশলটিতে আলু সেঁকার মাঝপথে বরফজলে ডুবিয়ে রাখা হয়। কাস্টার্ডের মতো মসৃণ, কোমল ভেতরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পদ্ধতিটি লাখ লাখ ভিউ পায়। খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, টেক্সচারটি মূলত ব্যবহৃত মিষ্টি আলুর নির্দিষ্ট জাতের ওপর নির্ভর করে। তবু পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ ভিডিওতেই এর দৃশ্যমান ও স্পর্শানুভূতির প্রতিশ্রুতি সহজে বোঝা যায়।
বিশ্বজুড়ে বিস্তার ও সাংস্কৃতিক রপ্তানি
টেক্সচারের প্রতি কোরিয়ার আকর্ষণ আর উপদ্বীপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতিরিক্ত মচমচে আবরণের জন্য পরিচিত দুইবার ভাজা কোরীয় ফ্রায়েড চিকেন ২০২৫ সালের এক বৈশ্বিক জরিপে সবচেয়ে পছন্দের কোরীয় খাবারের শীর্ষে ছিল। ২২টি বড় শহরের ১১,০০০ ভোক্তার মধ্যে ১৪ শতাংশ এটিকে নিজেদের প্রিয় খাবার বলেছেন। আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের মধ্যে কোরীয় খাবার নিয়ে সন্তুষ্টির হার ছিল ৯৪.২ শতাংশ; ৮০ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, তাঁরা আবারও এটি খাবেন।
“মুকবাং” প্রবণতার মাধ্যমে এই প্রভাব আরও ছড়িয়েছে। এতে নির্মাতারা লাখ লাখ দর্শকের কাছে নিজেদের খাওয়ার অভিজ্ঞতা সরাসরি তুলে ধরেন। এই সাংস্কৃতিক রপ্তানি মুকবাং বার্গারের মতো ভার্চুয়াল ডাইনিং ব্র্যান্ডকে অনুপ্রাণিত করেছে। ব্র্যান্ডটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে রুবি টিউসডের ২০০টি শাখায় সম্প্রসারিত হয়েছে। এতে দৃশ্যত আকর্ষণীয় এবং ভাগ করে খাওয়ার উপযোগী বড় আকারের স্লাইডার রয়েছে, যা বিনোদন হিসেবে খাওয়ার কোরীয় ধারণা মার্কিন ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী চেইনগুলোও বিষয়টি লক্ষ করেছে। সুইটগ্রিন শসার কিমচি ও আপেল কিমচি সসসহ রোস্ট করা মুরগির কোরীয় বিবিকিউ মেনু এনেছে, যেখানে স্পষ্টভাবে “টেক্সচার ও স্বাদের স্তরবিন্যস্ত মিশ্রণ”-এর কথা তুলে ধরা হয়েছে। নেসলে ২০২৬ সালের প্রবণতার পূর্বাভাসে টেক্সচারকে “খাবার ও পানীয়ের নতুন সীমান্ত” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগে মচমচে টেক্সচার আধিপত্য বিস্তার করলেও এখন “মখমলের মতো” মসৃণ অনুভূতির উল্লেখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বাধার মনস্তত্ত্ব
ভোক্তাবিষয়ক গবেষণায়ও দেখা যায়, গুরুত্বের বিচারে টেক্সচার অন্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। ইনোভা মার্কেট ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, খাবার তৈরির ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরীয় ভোক্তারা স্বাদ ও টেক্সচারকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেন—বিশ্বের গড়ের তুলনায়ও তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট স্পর্শানুভূতির পছন্দ মেটাতে পারে এমন উদ্ভাবনী খাবারের চাহিদা বাড়ছে।
টেক্সচারযুক্ত খাবারের আকর্ষণ এর বহুইন্দ্রিয় বৈশিষ্ট্যে। মূল্যস্ফীতির চাপে বাজেট সংকুচিত হলে, ভোক্তারা খরচটিকে সার্থক মনে করার উপায় হিসেবে ক্রমেই শারীরিক অনুভূতির দিকে ঝুঁকছেন। মিষ্টান্নবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি করা ২৬ বছর বয়সী এক ইউটিউবার দ্য কোরিয়া হেরাল্ডকে বলেন, “মানুষ একা খেলেও শুধু স্বাদ নয়, দৃষ্টি ও শ্রবণেন্দ্রিয়কে উদ্দীপিত করে এমন খাবার খোঁজে বলে মনে হয়। আজকাল মানুষ তীব্র টেক্সচারের খাবারের প্রতি সত্যিই আগ্রহী।”
ইনস্টিটিউট অব কুলিনারি এডুকেশনের খাদ্যবিজ্ঞানী শন মাতিয়েভিচ ব্যাখ্যা করেন, রাসায়নিক স্তরেও টেক্সচার মানুষের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। ভাইরাল মিষ্টি আলুর পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “স্টার্চ গরম হয়, ঠান্ডা হয় এবং আবার গরম হলে তার গঠনে সামান্য পরিবর্তন আসতে পারে।” এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে ভোক্তাদের কাঙ্ক্ষিত মসৃণ, কাস্টার্ডের মতো ঘনত্ব তৈরি হয়। এতে দেখা যায়, খাবারের এই শারীরিক রূপান্তর কীভাবে মানসিক তৃপ্তিতে রূপ নেয়।
ইন্দ্রিয়নির্ভর উদ্ভাবনের পরবর্তী ঢেউ
সামনে এই প্রবণতা একক অনুভূতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও জটিল মিশ্রণের দিকে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এখন চিবোতে মজাদার টেক্সচার আধিপত্য বিস্তার করলেও ভবিষ্যতে এক কামড়েই বৈপরীত্যপূর্ণ টেক্সচারের স্তর পাওয়া যায় এমন পণ্য আসতে পারে: নরম উপাদানের মধ্যে মচমচে কণা, অথবা পর্যায়ক্রমে বাধা ও নরম অনুভূতির স্তর।
বাঞ্চান (সাইড ডিশ) এবং মিশ্র ভাতের বাটির প্রতি কোরীয় রন্ধনশৈলীর ঐতিহ্যগত গুরুত্ব এই পদ্ধতির ভিত্তি আগেই তৈরি করেছে। বিবিমবাপের নরম ভাতের সঙ্গে মচমচে সবজি, চিবোতে মজাদার মাংস এবং কুড়মুড়ে সামুদ্রিক শৈবাল মেশে। কোরীয় খাবারে দীর্ঘদিনের টেক্সচারের সামঞ্জস্যের এটি একটি উদাহরণ। আধুনিক উদ্ভাবকেরা এই নীতি নতুন আঙ্গিকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন—বাইরে মচমচে ও ভেতরে ঘন বাটার রাইস কেক থেকে শুরু করে তরল ও ফেনার মাঝামাঝি অনুভূতির অ্যারেটেড কফি পর্যন্ত।
এই প্রবণতার গতি কমার কোনো লক্ষণ নেই। লি উন-হুইয়ের কথায়, “এই প্রবণতাগুলো অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়, আর সেই গতিই বাজারকে রূপ দিচ্ছে।” ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো উদ্ভাবন ও নিজস্বতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এবং নিছক নতুনত্বের জন্য নতুন কিছু না করে সত্যিকারের স্পর্শানুভূতির তৃপ্তি দেয় এমন পণ্য তৈরি করা।
যা জানা জরুরি
- দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাইরাল খাবারের প্রবণতায় স্বাদের বদলে টেক্সচারই প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে; ভোক্তারা “ক্কুদক ক্কুদক” নামে বর্ণিত—চিবোতে মজাদার ও স্থিতিস্থাপক—নির্দিষ্ট মুখের অনুভূতি খুঁজছেন।
- দুবাই চিউই কুকি (দুজ্জোনকু) কোরীয় খাবারের প্রবণতার উত্থান-পতনের চক্রের উদাহরণ: ২০২৪ সালে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর বাজারে পণ্যটির আধিক্যের কারণে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এর জনপ্রিয়তা কমে যায়।
- স্টারবাকস কোরিয়ার অ্যারোকানো কফি স্বাদ না বদলে বাতাস সঞ্চালনের প্রযুক্তিতে মুখের অনুভূতি পাল্টে এক সপ্তাহে ১ মিলিয়নের বেশি কাপ বিক্রি করে। এতে ক্যাফে খাতে অনুকরণে তৈরি পণ্যের ঢেউ শুরু হয়।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ছোট ভিডিও, খাবার মুখে তোলার আগেই টেক্সচার দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে ধরে এই প্রবণতাগুলোকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
- ২০২৫ সালে বৈশ্বিক জরিপে কোরীয় ফ্রায়েড চিকেন সবচেয়ে জনপ্রিয় কোরীয় খাবারের শীর্ষে ছিল; টেক্সচারনির্ভর খাবারের প্রতি আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের সন্তুষ্টির হার ছিল ৯৪.২ শতাংশ।
- বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রবণতা একেকটি পণ্যের মধ্যে একাধিক অনুভূতির জটিল, স্তরবিন্যস্ত টেক্সচারের দিকে এগোবে; এতে কোরীয় রন্ধনশৈলীর টেক্সচারের বৈচিত্র্যের ঐতিহ্যকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে।






