নজিরবিহীন সরবরাহ সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক উত্থানে মেমোরি চিপের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের চেহারা বদলে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। বৈশ্বিক মেমোরি চিপ বাজারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণকারী স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার মধ্যেও চীনে তাদের উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াচ্ছে। সরবরাহ সংকটের প্রেক্ষাপটে হিসাব-নিকাশ করেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংকটের কারণে মেমোরির দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে এবং এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নির্মাতারা হিমশিম খাচ্ছে; একই সময়ে স্মার্টফোন ও ব্যক্তিগত কম্পিউটার বাজারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সূচিপত্র
শিল্প বিশ্লেষকদের ভাষায়, গত ১৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে মেমোরির সবচেয়ে তীব্র সংকট চলছে। গোল্ডম্যান স্যাকস সম্প্রতি ২০২৬ সালে ডিআরএএমের সরবরাহ ঘাটতির পূর্বাভাস মোট চাহিদার ৪.৯ শতাংশে উন্নীত করেছে; আগের পূর্বাভাস ছিল ৩.৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ন্যান্ড ফ্ল্যাশের ঘাটতি ৪.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংকটির মতে, ২০০০-এর দশকের শেষভাগের পর বাজারে এত কঠোর পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। এআই অবকাঠামোর দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরির অপ্রতিরোধ্য চাহিদা তৈরি হওয়ায় এই সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। বড় ভাষা মডেল চালানো ডেটা সেন্টারে গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিটের পাশাপাশি ব্যবহৃত বিশেষায়িত চিপ হলো এই মেমোরি। এআই গণনার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রুত ডেটা স্থানান্তর নিশ্চিত করতে এইচবিএম চিপগুলোকে ত্রিমাত্রিক বিন্যাসে একটির ওপর আরেকটি সাজানো হয়। ফলে প্রচলিত মেমোরি পণ্যের তুলনায় এগুলো অনেক বেশি জটিল ও মূল্যবান।
নির্মাতারা এআইয়ের জন্য লাভজনক এসব যন্ত্রাংশকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ভোক্তা ইলেকট্রনিকসে ব্যবহৃত প্রচলিত মেমোরি চিপের উৎপাদন ধসে পড়েছে। ইউএসবি ড্রাইভে ব্যবহৃত ফ্ল্যাশ চিপ থেকে শুরু করে সার্ভার চালানো উন্নত ডিআরএএম—প্রায় সব ধরনের মেমোরিতেই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির পর কিছু খাতে দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। চলতি প্রান্তিকে ডিআরএএমের চুক্তিমূল্য ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দ্বিমুখী সংকটে ডিভাইসের দাম বাড়তে পারে, শত শত কোটি ডলারের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প বিলম্বিত হতে পারে এবং এআইনির্ভর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে—এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতিগুলো মূল্যস্ফীতির চাপ ও বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যমান উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা
দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক তদারকি কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শানসি প্রদেশের শিয়ান শহরে চিপ তৈরির কারখানায় স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ৪৬৫.৪ বিলিয়ন ওন, অর্থাৎ প্রায় ৩০৮.৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই বিনিয়োগ ৬৭.৫ শতাংশ বেশি। বিদেশে স্যামসাংয়ের একমাত্র মেমোরি চিপ কারখানাটি কোম্পানির বৈশ্বিক ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ জোগায়। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চার বছর বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ থাকার পর এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে ফের শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালে ৬৯৮.৪ বিলিয়ন ওন বিনিয়োগের পর ওই কারখানায় মূলধনী ব্যয় প্রায় বন্ধ রেখেছিল কোম্পানিটি।
চীনে নিজেদের কার্যক্রমে আরও আগ্রাসী সম্প্রসারণ কৌশল নিয়েছে এসকে হাইনিক্স। জিয়াংসু প্রদেশের উশি কারখানায় কোম্পানিটি ৫৮১.১ বিলিয়ন ওন বিনিয়োগ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০২ শতাংশ বেশি। লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ান কারখানায় বিনিয়োগ করেছে ৪৪০.৬ বিলিয়ন ওন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি। উশি কারখানা এসকে হাইনিক্সের মোট ডায়নামিক র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি উৎপাদনের ৩০ শতাংশেরও বেশি জোগায়। আর দালিয়ান কারখানাটি কোম্পানির প্রধান ন্যান্ড উৎপাদনকেন্দ্র। স্যামসাংয়ের মতো এসকে হাইনিক্সও ২০২৩ সালে চীনের এই দুই কারখানায় কোনো বিনিয়োগ করেনি। সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় গত দুই বছরে সেখানে ব্যয় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে কোম্পানিটি।
অন্য কোথাও নতুন কারখানা নির্মাণ না করে চীনের বিদ্যমান কারখানাগুলো সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তের পেছনে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের বাস্তবতা রয়েছে। আধুনিক উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং পূর্ণ উৎপাদনে আনতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগে। এআইয়ের কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক ঘাটতির প্রেক্ষাপটে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর একমাত্র কার্যকর পথ হলো বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো। শিয়ান ও উশি—দুই কারখানাতেই বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে; সেখানে প্রতিষ্ঠিত সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ কর্মী এবং পরিণত উৎপাদন-পরিবেশ রয়েছে, যা অন্য কোথাও গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লাগবে।
নতুন কারখানা তৈরি করতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর লাগে। তাই চীনে বিদ্যমান উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম আরও দক্ষ করে তুললে অনেক দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব,
বলেন সেজং ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সাবেক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট লি বিয়ং-চুল। তিনি ১৫ বছর কোম্পানিটির চীন শাখায় কাজ করেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ায় কোরীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো বিদ্যমান উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হলে চীনে উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কথা ভাবা ছাড়া কোম্পানিগুলোর সামনে বিকল্প নাও থাকতে পারে।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত টানাপোড়েন
চীনে নতুন করে বিনিয়োগের প্রবাহ শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি সম্পর্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল এক সময়ে। ২০২৫ সালের আগস্টে বাইডেন প্রশাসন ‘ভেরিফায়েড এন্ড ইউজার’ মর্যাদা বাতিল করে। এর ফলে আগে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি চিপ উৎপাদনের সরঞ্জাম চীনের কারখানায় পাঠাতে পারত। বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় দুই কোম্পানিকেই এখন চীনে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন সরঞ্জাম আমদানির জন্য প্রতিবছর অনুমোদন নিতে হবে। ভবিষ্যতে উৎপাদন লাইন সচল রাখা ও উন্নত করার সক্ষমতা নিয়ে এতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ওয়াশিংটনের কৌশলে এটিই সর্বশেষ পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামরিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে, দুর্বল করতে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ক্রমেই বেশি করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান উন্নত লজিক ও মেমোরি চিপকে মৌলিক প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে হবে। আগের নীতিতে মাত্র কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে থাকাই যথেষ্ট বলে মনে করা হতো, এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনকেন্দ্র গড়ার অঙ্গীকার না করলে বিদেশি মেমোরি চিপ নির্মাতাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। স্যামসাং বর্তমানে টেক্সাসের টেলরে ফাউন্ড্রি কমপ্লেক্স নির্মাণে ৩৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে; এ বছর উৎপাদন শুরুর কথা রয়েছে। অন্যদিকে, এসকে হাইনিক্স ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েতে ৩.৮৭ বিলিয়ন ডলারের উন্নত প্যাকেজিং কারখানা তৈরি করছে। তবে শিল্প বিশ্লেষকেরা শুল্কের হুমকিকে ব্যাপকভাবে অবাস্তব বলে মনে করছেন। কারণ মেমোরি চিপ উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি হওয়া মানসম্মত পণ্য; চুক্তির ভিত্তিতে তৈরি যন্ত্রাংশ নয়। ফলে উৎপাদন খরচের পরিবর্তনে এগুলোর দাম অত্যন্ত সংবেদনশীল।
কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমের উচ্চ ব্যয়, নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা এবং অনুন্নত শিল্প-পরিবেশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ব্যয় পূর্ব এশিয়ার তুলনায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে মেমোরি উৎপাদনে বিশেষ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফাউন্ড্রি কার্যক্রমে উৎপাদন ব্যয় চুক্তিমূল্যে সমন্বয় করা গেলেও মেমোরি চিপ হলো পণ্যদ্রব্য, যেখানে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ওপরই মুনাফা নির্ভর করে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বড় মেমোরি নির্মাতা মাইক্রন টেকনোলজিও দেশের বাইরে জাপান, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরে প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র বজায় রেখেছে।
চাপ থাকা সত্ত্বেও কোরীয় সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেই রয়ে গেছে। চীনা সরকারি কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। সম্প্রতি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশনের প্রধান ঝেং শানজিয়ে বেইজিংয়ে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের নির্বাহী চেয়ারম্যান লি জে-ইয়ংয়ের সঙ্গে দেখা করে চীনের অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরণের সুযোগ কাজে লাগাতে এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে কোম্পানিটিকে আহ্বান জানান। জবাবে লি বলেন, স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক কৌশলে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লি এবং এসকে হাইনিক্সের প্রধান নির্বাহী কোয়াক নোহ-জং—দুজনই বেইজিংয়ে চায়না ডেভেলপমেন্ট ফোরামে অংশ নেন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এই আয়োজনে তাঁদের উপস্থিতি, ভূরাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চীনা বাজারে কোম্পানিগুলোর অঙ্গীকার অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়।
কোরীয় নির্মাতাদের কৌশলগত দ্বিধার কারণ, চীন তাদের পণ্যের বিশাল শেষ বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র—দুই-ই। স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের স্থানীয় উৎপাদন কার্যক্রম থেকে চীনের অভ্যন্তরীণ মেমোরি চিপের চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। এসব কারখানায় কোনো ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে। স্মার্টফোন উৎপাদন থেকে গাড়ি নির্মাণ—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে কোরীয় কোম্পানি এবং চীনের প্রযুক্তি-পরিবেশ উভয়েরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
ভোক্তা বাজারে সংকটের চাপ
এআই কোম্পানিগুলো যখন উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরির সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যস্ত, তখন উৎপাদন সক্ষমতা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ায় প্রচলিত মেমোরি বিভাগে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এসকে হাইনিক্সের ডিআরএএম বিপণন বিভাগের প্রধান পার্ক জুন দক বিশ্লেষকদের বলেন, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং সার্ভার-সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রবল চাহিদার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও মোবাইল গ্রাহকেরা মেমোরি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সমস্যায় পড়ছেন। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিডিআর৫ ডিআরএএম চিপের দাম ৩১৪ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের বাজারে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা শাওমি ও রিয়েলমি সতর্ক করে বলেছে, মেমোরির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তাদের হ্যান্ডসেটের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়াতে হতে পারে। রিয়েলমি ইন্ডিয়ার প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ফ্রান্সিস ওং এই মূল্যবৃদ্ধিকে স্মার্টফোনের আবির্ভাবের পর নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নির্মাতারা ক্যামেরা, প্রসেসর বা ব্যাটারির খরচ কমাতে পারলেও স্টোরেজের ব্যয় এড়ানো যায় না; তা পুরোপুরি নিজেরা বহন করতে হবে, নয়তো ক্রেতাদের ওপর চাপাতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি ও কাউন্টারপয়েন্টের ধারণা, এ বছর বিশ্বে স্মার্টফোন সরবরাহ অন্তত ২ শতাংশ কমবে, যা আগের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের বিপরীত। গত বছর ৮.১ শতাংশ বৃদ্ধির পর ২০২৬ সালে পিসির বাজার ৪.৯ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
টোকিওর ইলেকট্রনিকস-বিপণি এলাকা আকিহাবারায় মজুতদারি ঠেকাতে খুচরা বিক্রেতারা হার্ডডিস্ক ড্রাইভ ও সলিড-স্টেট ড্রাইভ কেনার পরিমাণ সীমিত করতে শুরু করেছেন। কিছু দোকানে একজন ক্রেতাকে সর্বোচ্চ আটটি মেমোরি পণ্য কেনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে; বিক্রেতাদের ভাষ্য, এক-তৃতীয়াংশ পণ্য ইতিমধ্যে শেষ। গেমারদের মধ্যে জনপ্রিয় ৩২ গিগাবাইট ডিডিআর৫ মেমোরি কিটের দাম অক্টোবরে প্রায় ১৭ হাজার ইয়েন থেকে বেড়ে ৪৭ হাজার ইয়েন ছাড়িয়েছে। উচ্চক্ষমতার ১২৮ গিগাবাইট কিটের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ইয়েনে পৌঁছেছে। অব্যবহৃত ডেটা সেন্টার সার্ভার থেকে খুলে নেওয়া পুনর্ব্যবহৃত মেমোরি চিপের দ্বিতীয় বাজারও জমজমাট হয়ে উঠেছে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এক পুনর্বিক্রেতা জানিয়েছে, হংকংভিত্তিক মধ্যস্থতাকারীরা চীনা ক্রেতাদের কাছে চিপ সরবরাহে তৎপর হওয়ায় তাদের মাসিক বিক্রি ৫ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৮ লাখ ডলার বা তারও বেশি হয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টরের উচ্চমূল্য থেকে লাভবান হওয়া সত্ত্বেও স্যামসাংও এই সংকটের বাইরে নয়। চতুর্থ প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোবাইল ব্যবসার মুনাফা ১০ শতাংশ কমেছে। সহ-প্রধান নির্বাহী টিএম রো সামনে কঠিন বছর আসছে বলে সতর্ক করেছেন এবং স্বীকার করেছেন, চিপের আকাশছোঁয়া দাম ডিভাইস উৎপাদনের খরচে অনিবার্যভাবেই প্রভাব ফেলবে। এ বছর এআই-সুবিধাযুক্ত গ্যালাক্সি ডিভাইসের ব্যবহার দ্বিগুণ করে ৮০ কোটি ইউনিটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। তবে সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ যে যন্ত্রাংশের ঘাটতি মোকাবিলা করতে কাজ করছে, সেই একই ঘাটতির কারণে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বাধার মুখে পড়তে পারে। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন ও মেটাসহ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মেমোরি সরবরাহকারীদের কাছে নির্দিষ্ট শেষসীমাহীন ক্রয়াদেশ চেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দাম যা-ই হোক, যত সরবরাহ পাওয়া যায় সব কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। অন্যদিকে, চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবা, বাইটড্যান্স ও টেনসেন্ট বাড়তি সরবরাহ বরাদ্দ পেতে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের সঙ্গে আলোচনা করতে নির্বাহীদের পাঠিয়েছে।
বাজারে মৌলিক পরিবর্তন
বর্তমান সংকট শুধু সাময়িক সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা নয়। প্রযুক্তি শিল্প মেমোরি চিপ নির্মাতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করে, তাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এটি। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের সম্মিলিত বাজারমূল্য ১.১৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা প্রথমবারের মতো চীনের ইন্টারনেট জায়ান্ট আলিবাবা ও টেনসেন্টের সম্মিলিত ১.০৭ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যকে ছাড়িয়ে যায়। এই মাইলফলক দেখায়, এআইতে বিনিয়োগের উন্মাদনা সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন থেকে হার্ডওয়্যার অবকাঠামোর দিকে সরে গেছে। এর ফলে মেমোরি চিপ সাধারণ যন্ত্রাংশের অবস্থান ছাড়িয়ে জাতীয় প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে।
আর্থিক বাজারগুলো বুঝতে পেরেছে, প্রচলিত ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের চক্রের বাইরেও এআই উন্নয়নে মেমোরি চিপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এআই প্রশিক্ষণ ও ইনফারেন্স কার্যক্রমে এখন সামগ্রিক ব্যবস্থার কর্মক্ষমতা নির্ধারণকারী প্রধান সীমাবদ্ধতা উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরি। ফলে এসকে হাইনিক্স, যারা এনভিডিয়াকে চিপ সরবরাহ করে, এবং স্যামসাংয়ের মতো সরবরাহকারীরা বৈশ্বিক প্রযুক্তি কাঠামোর কেন্দ্রে চলে এসেছে। উচ্চ মুনাফার এইচবিএম ও সার্ভার ডিডিআর৫ পণ্যের জোরে ২০২৫ সালে পুরো বছরের হিসাবে প্রথমবারের মতো স্যামসাংয়ের চেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে এসকে হাইনিক্স। এদিকে গত বছর স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ১২৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ২৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগের সেমিকন্ডাক্টর উত্থানের চেয়ে এই সুপারসাইকেল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। স্মার্টফোন ও পিসি বদলের চক্রের সঙ্গে যুক্ত আগের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাগুলো সাধারণত এক থেকে দুই বছর স্থায়ী হতো। সিটিগ্রুপ ও কেবি সিকিউরিটিজের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান সংকট ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। এসকে হাইনিক্সের ইয়ংইন ক্লাস্টারের প্রথম পর্যায় এবং মাইক্রনের নিউইয়র্ক কারখানার মতো নতুন উৎপাদনকেন্দ্র কত বড় পরিসরে চালু হয়, তার ওপর সংকটের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে। পাশাপাশি বিগ টেক কোম্পানিগুলো এআইয়ে বিপুল বিনিয়োগ থেকে সফলভাবে আয় করতে পারে কি না এবং মূলধনী ব্যয় অব্যাহত রাখে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এআই প্রশিক্ষণ থেকে ইনফারেন্সে উত্তরণ, স্বচালিত যান ও রোবটের মতো ‘ফিজিক্যাল এআই’ অ্যাপ্লিকেশনের আবির্ভাব এবং এজেন্টভিত্তিক এআই সেবার বিকাশ—সবই বর্তমানের এইচবিএমকেন্দ্রিক ব্যবহারের বাইরে মেমোরির চাহিদা বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বর্তমান উত্থান ব্যাহত করতে পারে এমন ঝুঁকিও রয়েছে। গুগল সম্প্রতি জানিয়েছে, তাদের টার্বোকোয়ান্ট অ্যালগরিদম মেমোরির প্রয়োজন বর্তমান মাত্রার ছয় ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনতে পারে। এ ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া ওপেনএআই বা সফটব্যাংকের মতো বড় এআই বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নের সংকটে পড়লে এবং অবকাঠামো নির্মাণের গতি কমালে বর্তমান সংকট দ্রুত উল্টে যেতে পারে। সেমির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জামের বিক্রি ১৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০১৮-২০১৯ সালের মন্দার অভিজ্ঞতায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরির পর কারখানা অলস পড়ে থাকায় নির্মাতারা এখন বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ে সতর্ক।
আপাতত কোরীয় নির্মাতাদের এআই গ্রাহকদের সরবরাহ নিশ্চিত করার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি চীনের উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে হুমকির মুখে ফেলা জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও সামলাতে হবে। শিয়ান ও উশিতে বিনিয়োগ তাৎক্ষণিক ঘাটতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সেতু হিসেবে কাজ করছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা মেটানো এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়া এড়ানোর মধ্যে এই কোম্পানিগুলোকে কতটা নাজুক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, তাও এতে স্পষ্ট হয়েছে। শিল্পের এক নির্বাহী বলেছেন, সবাই সরবরাহের জন্য আকুতি জানাচ্ছে। মেমোরি বরাদ্দ নিশ্চিত করতে না পারলে কোম্পানিগুলো একেবারেই কার্যক্রম চালাতে অক্ষম হতে পারে। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চীনের কারখানাগুলো তাই অপরিহার্য।
মূল কথা
- গোল্ডম্যান স্যাকসের ভাষায়, গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র বৈশ্বিক এআই মেমোরি সংকট মোকাবিলায় স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স চীনের চিপ কারখানায় বিনিয়োগ যথাক্রমে ৬৭.৫ শতাংশ ও ১০০ শতাংশেরও বেশি বাড়িয়েছে
- শিয়ান ও উশি কারখানা স্যামসাংয়ের ন্যান্ড উৎপাদনের ৪০ শতাংশ এবং এসকে হাইনিক্সের ডিআরএএম উৎপাদনের ৩০ শতাংশেরও বেশি জোগায়। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এগুলো গুরুত্বপূর্ণ
- ২০২৫ সালের আগস্টে ‘ভেরিফায়েড এন্ড ইউজার’ মর্যাদা বাতিলের পর চীনে সরঞ্জাম পাঠাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ অনুযায়ী প্রতিবছর অনুমোদন নিতে হয়। কোরীয় কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়াতে অঙ্গীকার না করলে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন
- কিছু বিভাগে মেমোরি চিপের দাম ৩০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এতে স্মার্টফোন ও পিসি নির্মাতারা দাম বাড়াতে বা সরবরাহ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৬ সালে বিশ্বে স্মার্টফোন বিক্রির পরিমাণ ২ শতাংশ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে
- স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের সম্মিলিত বাজারমূল্য আলিবাবা ও টেনসেন্টকে ছাড়িয়ে ১.১৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এআই অবকাঠামোর চাহিদায় এশিয়ার প্রযুক্তি বাজার বদলে যাচ্ছে এবং মেমোরি চিপ কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে
- শিল্প বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, ২০২৭ সাল পর্যন্ত সংকট চলতে পারে। তবে এআই বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া অথবা মেমোরির প্রয়োজন কমাতে পারে এমন গুগলের টার্বোকোয়ান্ট অ্যালগরিদমের মতো প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ঝুঁকি রয়েছে






