নৌবহরের আকারের মরীচিকা
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চীনের নৌবাহিনীতে এখন ৩৭০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। জাহাজের সংখ্যা বিবেচনায় এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম সামুদ্রিক বাহিনী। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বহরে রয়েছে ২৯৬টি যুদ্ধজাহাজ। পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ব্যবধান বেড়ে চীনের জাহাজের সংখ্যা ৪৩৫ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৯৪-এ দাঁড়াতে পারে। প্রথম নজরে এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক মনে হয় এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে প্রায়ই তুলে ধরা হয়। তবে এই সংখ্যাগত মাইলফলক আড়াল করে আরও জটিল এক বাস্তবতা, যা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সূচিপত্র
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোন দেশের জাহাজ বেশি, তা নয়; বরং সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কার্যকর নৌশক্তি প্রয়োগ করতে পারবে কি না। নৌ-কৌশলবিদদের ভাষায়, চীন মাহানীয় সমুদ্র-নিয়ন্ত্রণের বদলে করবেটীয় সমুদ্র-প্রবেশ অস্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিরায়ত নৌযুদ্ধ তত্ত্বের মতো কোনো নির্ণায়ক নৌবহরের সংঘর্ষে মার্কিন নৌবাহিনীকে হারানোর চেষ্টা বেইজিংয়ের লক্ষ্য নয়। বরং চীন চায়, মার্কিন হস্তক্ষেপ এত কঠিন, ব্যয়বহুল ও ধীর করে তুলতে, যাতে কোনো সংকটের পরিণতিকে প্রভাবিত করার মতো সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটন সেখানে পৌঁছাতে না পারে। লক্ষ্য হলো এমন একটি সাময়িক নিষিদ্ধ অঞ্চল তৈরি করা, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় টিকে থাকবে; বিশেষ করে তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে।
এই কৌশলের জন্য পুরো নৌবহরের আকারে সমতা বা শ্রেষ্ঠত্ব কোনোটিই প্রয়োজন নেই। দরকার এমন একটি নির্দিষ্ট সক্ষমতা-কাঠামো, যা রণাঙ্গনের দিকে এগিয়ে আসা মার্কিন বাহিনীকে শনাক্ত, অনুসরণ ও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। চীনা জাহাজের নিছক সংখ্যা মূলত এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় জনবল ও সক্ষমতা বাড়ায়, বিরোধপূর্ণ জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের চলাচলকে জটিল করে এবং কমান্ডারদের ঝুঁকি হিসাব আরও কঠিন করে তোলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নৌবহরের আকারের পরিসংখ্যান আধিপত্যের মাপকাঠি না থেকে বৃহত্তর প্রবেশ-অস্বীকৃতি কাঠামোর একটি উপাদানে পরিণত হয়।
প্রবেশ-অস্বীকৃতি কাঠামো
মার্কিন নৌপরিকল্পনাবিদদের সামনে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিংয়ের প্রবেশ-অস্বীকৃতি ও এলাকা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা সংক্ষেপে A2/AD নামে পরিচিত। এই ধারণায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, নজরদারি ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং সাবমেরিন বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়। এর মূলনীতি সহজ: প্রতিপক্ষকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া, অথবা ভেতরে ঢোকার পর তাদের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করা। চীনের ক্ষেত্রে এর অর্থ, মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পেরিয়ে প্রথম দ্বীপমালা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি করা।
এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ভাষায় সেন্সর ও আঘাত হানার অস্ত্র। সেন্সরের মধ্যে আছে আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ বিমান, দিগন্তের ওপারের রাডার, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং দক্ষিণ চীন সাগরের কৃত্রিম দ্বীপগুলোতে মোতায়েন করা নজরদারি সরঞ্জাম। এসব প্ল্যাটফর্মের কাজ হলো সামুদ্রিক এলাকায় পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি-সচেতনতা তৈরি করা এবং সম্ভাব্য সংঘাতস্থলের দিকে যাওয়ার পথে মার্কিন জাহাজ ও বিমানকে অনুসরণ করা। আঘাত হানার অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভান্ডার; এর মধ্যে DF-21D ও DF-26 রয়েছে, যেগুলো ১,৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে বড় যুদ্ধজাহাজকে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতার কারণে ‘বিমানবাহী রণতরী-ঘাতক’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে আরও উদ্বেগজনক অগ্রগতির কথা উঠে এসেছে। চীনের সামরিক শক্তি নিয়ে পেন্টাগনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র DF-27-এর কার্যকর মোতায়েন নিশ্চিত করা হয়েছে। অস্ত্রটি ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ফলে সমুদ্রে নৌযান ধ্বংসের সক্ষমতা বজায় রেখেই এটি হাওয়াই, আলাস্কা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডেও পৌঁছাতে পারে। হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল যুক্ত করা হলে, উড্ডয়নের সময় DF-27 অনির্দেশ্যভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারবে, যা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে।
বিতর্কিত ভূখণ্ডে সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলে চীন এই ক্ষেপণাস্ত্র কাঠামো আরও শক্তিশালী করেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে উডি দ্বীপ, ফায়ারি ক্রস রিফ ও মিসচিফ রিফ। এসব ঘাঁটিতে বিমানঘাঁটি, সাবমেরিন রাখার স্থাপনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, যা সামুদ্রিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেইজিংয়ের প্রভাব আরও গভীরে বিস্তৃত করে। স্থায়ী দ্বীপঘাঁটি ও চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে গভীর প্রতিরক্ষার নমনীয় ব্যবস্থা, যা আঞ্চলিক কোনো সংকটের সময় মার্কিন বাহিনীকে ভেদ করতে হবে।
সমুদ্রতলের চ্যালেঞ্জ
পৃষ্ঠের নৌবহরের সংখ্যা শিরোনাম জুড়ে থাকলেও, সমুদ্রতলের পরিস্থিতি আরও তাৎক্ষণিক কৌশলগত হুমকি তৈরি করে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন প্রায় ৭৯,০০০ টন ওজনের ১০টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন নির্মাণ করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত সাতটি সাবমেরিনের মোট ওজন ছিল ৫৫,৫০০ টন। হুলুদাওয়ের বোহাই শিপবিল্ডিং হেভি ইন্ডাস্ট্রি কেন্দ্রে এই উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চীনের পারমাণবিক সাবমেরিনবহর বেড়ে প্রায় ৩২টিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রয়েছে Type 094 Jin শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন এবং উল্লম্ব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা-সজ্জিত নতুন Type 093B নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন।
Type 093B-তে YJ-19 হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উন্নত জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে, JL-3 সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত Type 094 হলো চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার সমুদ্রভিত্তিক অংশ। এসব অগ্রগতি ইঙ্গিত দেয়, বেইজিং একই সঙ্গে প্রচলিত সমুদ্র-প্রবেশ অস্বীকৃতি এবং কৌশলগত পারমাণবিক সক্ষমতার টিকে থাকার ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, শব্দের আড়ালে থাকার ক্ষমতা ও সেন্সর-তথ্যের সমন্বয়ে চীনা সাবমেরিন এখনও মার্কিন সাবমেরিনের চেয়ে পিছিয়ে। তবে সংখ্যার এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ পরিকল্পনায় নতুন জটিলতা তৈরি করছে।
চীনের সমুদ্রতলের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার বিপদ স্পষ্ট হয়েছিল ২০০৬ সালের অক্টোবরে। তখন ওকিনাওয়ার কাছে USS Kitty Hawk বিমানবাহী রণতরীর পাঁচ মাইলের মধ্যে চীনের Song শ্রেণির একটি ডিজেল-বিদ্যুৎচালিত সাবমেরিন সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে ওঠে। আশপাশে এক ডজন পাহারাদার জাহাজ ও সাবমেরিনবিরোধী হেলিকপ্টার থাকা সত্ত্বেও, রণতরীর বহরটি সাবমেরিনটির এগিয়ে আসা শনাক্ত করতে পারেনি। এ ঘটনা মার্কিন সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ সক্ষমতায় বিপজ্জনক আত্মতুষ্টির চিত্র তুলে ধরে এবং দেখিয়ে দেয়, পারমাণবিক শক্তিচালিত না হলেও চীনা সাবমেরিন বিমানবাহী রণতরীর আঘাত হানার বহরকে হুমকিতে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল প্রতিক্রিয়া
চীনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন কার্যক্রমভিত্তিক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে, যা শত্রুর লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন করে এবং যুদ্ধক্ষমতা অটুট রাখে। নৌবাহিনীর Distributed Maritime Operations কৌশলে ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবাহী রণতরীর আঘাত হানার বহরে শক্তি কেন্দ্রীভূত করার বদলে বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় বাহিনী ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। এতে চীনা সেন্সরের পক্ষে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ কঠিন হয়। একই সঙ্গে কোনো একটি সম্পদ হারালেও মার্কিন যুদ্ধক্ষমতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি কমে।
এই নৌ-কৌশলের পরিপূরক হিসেবে বিমানবাহিনীর Agile Combat Employment ধারণায় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে বহু ছোট বিমানঘাঁটি, মহাসড়কের রানওয়ে এবং মিত্রঘাঁটিতে বিমান ছড়িয়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। গুয়ামের মতো বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘাঁটিতে বাহিনী কেন্দ্রীভূত না করে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো চীনের লক্ষ্য নির্ধারণের সমস্যা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখা।
২০১৯ সালে মধ্যম পাল্লার পারমাণবিক শক্তি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসায়, চুক্তিতে আগে নিষিদ্ধ থাকা স্থলভিত্তিক প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পথ খুলে যায়। প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাবিদেরা এখন প্রথম দ্বীপমালাজুড়ে থিয়েটার-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পক্ষে, যাতে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও কমান্ড সেন্টার হুমকির মুখে পড়ে। Tomahawk-এর মতো ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হাইপারসনিক অস্ত্র দূরবর্তী অবস্থান থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এতে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর কাজে লাগানোর মতো কার্যকর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতা এসব আধুনিকায়ন প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। অর্থসংকটের কারণে নৌবাহিনী সম্প্রতি Hypersonic Air Launched Offensive Anti Surface Warfare কর্মসূচি বাতিল করেছে। এর বদলে তারা সাবসনিক হলেও স্টেলথ সক্ষমতাসম্পন্ন AGM-158C Long Range Anti Ship Missile-এর ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে, স্থলভিত্তিক অবস্থান থেকে জাহাজ ও বিমানে আঘাত হানার জন্য সেনাবাহিনী দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা A2/AD মোকাবিলায় যৌথ বাহিনীর ভূমিকা যোগ করেছে।
টার্গেটিং চেইন ভেঙে দেওয়া
চীনের সমুদ্র-প্রবেশ অস্বীকৃতি কৌশল মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা বা রাডার স্থাপনা ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। বরং পরিকল্পনাবিদদের লক্ষ্য হলো টার্গেটিং চেইন ভেঙে দেওয়া—অর্থাৎ শনাক্তকরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ ও আক্রমণের সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা, যার মাধ্যমে A2/AD ব্যবস্থা কাজ করে। এই ধারার যেকোনো একটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যাতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সাড়া দেওয়ার আগেই নৌ ও বিমানবাহিনী আঘাত হানতে পারে।
এই পদ্ধতির অগ্রভাগে রয়েছে স্টেলথ প্ল্যাটফর্ম। B-21 Raider, F-35 Lightning II এবং বিদ্যমান B-2 Spirit বোমারু বিমানগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে তারা কঠোরভাবে সুরক্ষিত আকাশসীমা ভেদ করে কমান্ড সেন্টার ও রাডার স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। এসব অভিযান চীনের নজরদারি নেটওয়ার্ককে অন্ধ করে দেবে এবং প্রতিরক্ষাকারীদের সীমিত পরিস্থিতি-সচেতনতার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করবে। সাবমেরিনও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা দেয়। গোপনে চলাচলের ক্ষমতার কারণে তারা প্রায় বাধাহীনভাবে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করতে পারে এবং লুকিয়ে থেকে পৃষ্ঠের জাহাজ বা স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
A2/AD বলয় ভাঙার তৃতীয় উপায় হলো দূরপাল্লা থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র। AGM-158 JASSM-ER, LRASM এবং Tomahawk ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘনতম হুমকিপূর্ণ এলাকার বাইরে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে মার্কিন বাহিনীকে সক্ষম করে। এসব উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের পাশাপাশি QUICKSINK-এর মতো কর্মসূচিতে স্বল্পমূল্যের নির্ভুল অস্ত্রের বিপুল সরবরাহ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এসব অস্ত্রের বড় সংখ্যক মোতায়েন চীনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিঃশেষ করতে পারে।
কূটনীতি ও মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় এই কৌশলে আরও একটি স্তর যোগ করে। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে AUKUS চুক্তির আওতায় ক্যানবেরা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন পাবে, ফলে মিত্রদের সমুদ্রতলের সক্ষমতা বাড়বে। ফিলিপাইন, জাপান বা অন্য অংশীদার দেশে চলমান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি মোতায়েন করলে চীনকে একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করতে হবে, ফলে কেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা কমবে।
চীনের আড়ালে থাকা দুর্বলতা
চীনের সামরিক আধুনিকায়নের ব্যাপকতা চিত্তাকর্ষক হলেও, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে সমুদ্র-প্রবেশ অস্বীকৃতি কৌশলকে দুর্বল করে দিতে পারে এমন উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বেইজিংয়ের রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা সামরিক ক্ষেত্রে নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায়। চীনের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ, যার বার্ষিক মূল্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মাঝখানের সংকীর্ণ জলপথ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে আসে। মালাক্কা-সংকট নামে পরিচিত এই পরিস্থিতি একটি কৌশলগত অ্যাকিলিস হিল, যা চীনের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা না চালিয়েও প্রতিপক্ষ কাজে লাগাতে পারে।
ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান বেইজিংয়ের প্রতিপক্ষের জন্য এই দুর্বলতাকে আরও কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সামরিক স্থাপনা, বিশেষ করে ক্যাম্পবেল বে-র অগ্রবর্তী বিমানঘাঁটি থেকে ভারতীয় বাহিনী প্রণালির পশ্চিম দিকের প্রবেশপথের জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে এবং সম্ভাব্যভাবে বাধা দিতে পারে। পূর্ণ অবরোধ যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হলেও, নজরদারি, সামুদ্রিক টহল এবং বাধা দেওয়ার সক্ষমতার প্রদর্শনের মাধ্যমে ভারত অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। এতে যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ চলাচলের খরচ বিপুলভাবে বেড়ে যাবে, গুলি না ছুড়েও চীনের উৎপাদন খাতের সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হবে।
চীনের পরীক্ষিত নয় এমন বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা নিয়েও সামরিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭৯ সালের পর থেকে পিপলস লিবারেশন আর্মি বড় কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি। ফলে সেনাসদস্যদের মান, গোলাগুলির মধ্যে সরঞ্জামের নির্ভরযোগ্যতা এবং জটিল যৌথ অভিযান সমন্বয়ের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পূর্ব চীন সাগরের ওপর বিমান প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চল পুরোপুরি কার্যকর করতে না পারার ঘটনা বিস্তৃত এলাকায় সামুদ্রিক পরিস্থিতি-সচেতনতা পরিচালনায় চীনের সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়।
সামরিক বিষয় ছাড়াও, বেইজিংয়ের আগ্রাসী আচরণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। চীনের সম্প্রসারণবাদী নীতির কারণেই ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। সংকটের সময় এই কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বেইজিংয়ের বিকল্প সীমিত করতে পারে এবং ওয়াশিংটনকে প্রয়োজনীয় ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ ও জোটের সমর্থন দিতে পারে।
মূল কথা
চীনের নৌবাহিনীর আকার বাড়লেও, পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এই বৃদ্ধি একাই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণ করে না। নির্ণায়ক বিষয় হলো, সংকটের গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পর্যায়ে বেইজিংয়ের সমন্বিত প্রবেশ-অস্বীকৃতি ব্যবস্থা বিরোধপূর্ণ এলাকায় মার্কিন বাহিনীর কার্যকর প্রবেশ ঠেকাতে পারবে কি না। ঠিক এমন বিলম্ব তৈরি করার জন্যই চীন ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর ও সাবমেরিনের শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলেছে। তবে এই ব্যবস্থার টেকসই সক্ষমতা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে।
- চীনের নৌবাহিনীতে এখন ৩৭০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর রয়েছে ২৯৬টি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ চীনা জাহাজের সংখ্যা হবে ৪৩৫টি।
- জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র DF-27 চীনের হুমকির পাল্লা ৮,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়িয়েছে; এতে হাওয়াই ও আলাস্কাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
- ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন ১০টি পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণ করেছে, যার মোট ওজন ৭৯,০০০ টন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করেছে সাতটি, যার মোট ওজন ৫৫,৫০০ টন।
- যুক্তরাষ্ট্র Distributed Maritime Operations, Agile Combat Employment এবং চীনের লক্ষ্য নির্ধারণ নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর জবাব দিচ্ছে।
- জ্বানি আমদানির জন্য মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার অভাব গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দুর্বলতা।






