গভীর সমুদ্রের জন্য ভাসমান গবেষণাগার
সমুদ্র অনুসন্ধানের সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করবে—এমন এক নজিরবিহীন সামুদ্রিক গবেষণা স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছে চীন। সাংহাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা ‘ডিপ-সি অল-ওয়েদার রেসিডেন্ট ফ্লোটিং রিসার্চ ফ্যাসিলিটি’ হলো উন্মুক্ত সমুদ্রে আবহাওয়া যেমনই হোক, নিরবচ্ছিন্ন বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম চালানোর জন্য তৈরি বিশ্বের প্রথম অতি-বৃহৎ ভাসমান প্ল্যাটফর্ম। ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকা ৭৮ হাজার টনের এই কাঠামোতে গবেষণা জাহাজের চলাচলের সক্ষমতার সঙ্গে স্থায়ী স্থাপনার স্থিতিশীলতা যুক্ত করা হয়েছে। এতে নতুন ধরনের সামুদ্রিক অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, যেখানে সরবরাহ ছাড়াই সর্বোচ্চ চার মাস ২৩৮ জন গবেষক থাকতে পারবেন।
সূচিপত্র
সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে প্রকল্পটি চীনের জাতীয় বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো কর্মসূচির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠছে। এর আকার পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির ফুজিয়ান বিমানবাহী রণতরির কাছাকাছি। এটি ১৩৮ মিটার লম্বা ও ৮৫ মিটার চওড়া, আর এর প্রধান ডেক জলরেখা থেকে ৪৫ মিটার উঁচু। প্ল্যাটফর্মটি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারে, যা প্রচলিত গবেষণা জাহাজের গতির সমান। এরপর ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি নিয়ে এটি ডুবিয়ে স্থিতিশীল গবেষণাগারে রূপান্তর করা যায়, যেখানে ১০ হাজার মিটার বা প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ ফুট গভীরতায় পরীক্ষা চালানো সম্ভব।
এই ভাসমান কৃত্রিম দ্বীপ সামুদ্রিক গবেষণার বিদ্যমান সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করবে। চীনের উন্নত গভীর-সমুদ্র গবেষণাগার, সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা জাহাজ ও গভীর-সমুদ্রের ডুবযান থাকলেও আধুনিক সামুদ্রিক বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় দ্রুত যাতায়াত ও দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থানের সমন্বয় কোনোটিই দিতে পারে না। নতুন স্থাপনাটি আধা-নিমজ্জিত তেল প্ল্যাটফর্মের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গবেষণা জাহাজের চলাচলের সক্ষমতা মেলাচ্ছে। ফলে এটি নিজে চলতে সক্ষম এমন একটি বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফর্ম, যা দূরবর্তী জলসীমায় দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারবে।
প্রকল্পটি জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর বড় প্রকল্প হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে বেইজিংয়ের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ে গভীর ও দূরবর্তী জলসীমার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিষয়ক একটি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইনস্টিটিউটটি গবেষণা কার্যক্রম সমন্বয় করবে এবং বাস্তব অবকাঠামোর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সংযোগ ঘটাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য, প্ল্যাটফর্মটি সমুদ্রবিজ্ঞানে আমূল পরিবর্তন আনবে। বাস্তব আকারে পরীক্ষা চালানোর এমন সুযোগ কোনো গবেষণাগার বা বিদ্যমান জাহাজ দিতে পারে না।
পারমাণবিক বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী প্ল্যাটফর্মের প্রকৌশল
কর্মকর্তারা স্থাপনাটির বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যের ওপর জোর দিলেও প্রকৌশল নকশায় দেখা যায়, এটি তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত কঠিন ভৌত চাপ সহ্য করার জন্য। প্ল্যাটফর্মটিতে উন্নত মেটাম্যাটেরিয়াল স্যান্ডউইচ প্যানেল রয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশায় সাজানো, ভাঁজ করা ধাতব নলের অতি ক্ষুদ্র জালিকা। চরম চাপে এসব উপাদান ভেতরের দিকে সংকুচিত হয়ে শক্তি শোষণ করে; চেপে ধরলে এগুলো আরও ঘন ও শক্ত হয়। ফলে বিধ্বংসী অভিঘাত কার্যকরভাবে মৃদু সংকোচনে রূপ নেয়।
পারমাণবিক বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী এই নকশা জরুরি বিদ্যুৎব্যবস্থা, সুরক্ষিত যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং নৌচালনা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে সুরক্ষা দেয়। সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প দলের প্রধান অধ্যাপক ইয়াং দে ছিং ‘চাইনিজ জার্নাল অব শিপ রিসার্চ’-এ প্রকাশিত সমকক্ষ-পর্যালোচিত এক গবেষণাপত্রে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, গভীর-সমুদ্রের স্থাপনাটির সব আবহাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সক্ষমতা প্রয়োজন, তাই অপরিহার্য ব্যবস্থাগুলোর সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। আধা-নিমজ্জিত দ্বৈত-হালের কাঠামোটি প্রবল সমুদ্র পরিস্থিতিতে অসাধারণ স্থিতিশীলতা দেয়; এর মধ্যে এমন ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ও রয়েছে, যা প্রচলিত ভূপৃষ্ঠের জাহাজকে অচল করে দিতে পারে।
দ্বৈত-হালের নকশার ফলে প্ল্যাটফর্মটি উত্তাল সমুদ্রে অবস্থান ধরে রেখেই শত শত টন ওজনের গভীর-সমুদ্রের সরঞ্জাম পরীক্ষা করতে পারে। এর ফলে প্রকৌশলীরা উপকূলের কাছাকাছি পরীক্ষামূলক পরিবেশ বা গবেষণাগারের মডেলের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব সমুদ্র পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবেন। ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি নিয়ে প্ল্যাটফর্মটিকে আংশিক ডুবিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা ভূপৃষ্ঠের ঢেউয়ে প্রচলিত জাহাজের কাজ ব্যাহত হলেও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করে। এতে গবেষণার স্থানটি কার্যত ভূপৃষ্ঠের আবহাওয়ার প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
বিজ্ঞানের বাইরে: কৌশলগত প্রভাব
স্থাপনাটির দ্বৈত ব্যবহারের সক্ষমতা বিশ্বের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে বেসামরিক বৈজ্ঞানিক স্থাপনা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করলেও, সামরিক মানের টিকে থাকার সক্ষমতা ও কৌশলগতভাবে চলাচলের ক্ষমতা সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান ও সম্পদ আহরণের বাইরেও ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। জাহাজটির ১২০ দিনের কার্যক্ষমতা অনেক পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরির চেয়েও বেশি। ফলে বেসামরিক গবেষণার পরিচয়ে বিতর্কিত সামুদ্রিক এলাকায় দীর্ঘ সময় উপস্থিত থাকা সম্ভব হবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরে প্ল্যাটফর্মটি নমনীয় সম্পদ হিসেবে কাজ করতে পারে—স্থিতিস্থাপক কমান্ডকেন্দ্র, রসদ সরবরাহকেন্দ্র বা নজরদারি স্টেশন হিসেবে। বিতর্কিত জলসীমায় দ্রুত মোতায়েন হয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সক্ষমতা স্থায়ী উপস্থিতি ছাড়াই সেখানে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। এতে স্থায়ী কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের সঙ্গে জড়িত কূটনৈতিক জটিলতা এড়ানো যাবে। এই পদ্ধতি বেইজিংয়ের নথিভুক্ত ‘গ্রে-জোন’ কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বেসামরিক সম্পদ মোতায়েন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সীমারেখা অস্পষ্ট করা হয়।
শান্তিপূর্ণ চেহারার আড়ালে শক্তিশালী সক্ষমতা—চীনের ভাসমান দ্বীপকে কৌশলগতভাবে এতটা উদ্বেগজনক করে তুলেছে ঠিক এ দ্বৈত পরিচয়ই। এটি আবিষ্কারের জন্য তৈরি একটি জাহাজ, অবশ্যই; তবে বেইজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেখানে সবচেয়ে গভীর, সেই জলসীমায় প্রতিরোধ, উপস্থিতি ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্যও এটি তৈরি।
প্রকল্পটির সময় এমন এক সময়ে, যখন আঞ্চলিক সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। ভিয়েতনাম সম্প্রতি স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জে নিজস্ব দ্বীপ নির্মাণকাজ জোরদার করেছে। অ্যালিসন রিফ, কলিন্স রিফ ও ইস্ট রিফসহ একাধিক প্রবালপ্রাচীরে খনন ও ভরাটের কাজ চলছে। চীনের চলাচলক্ষম প্ল্যাটফর্ম এসব অগ্রগতির পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। স্থায়ীভাবে ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিবেশগত ও আইনি জটিলতা ছাড়াই এটি তুলনীয় কৌশলগত সুবিধা দেবে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, হ্যানয় আগে ছোট কংক্রিটের বাংকারসদৃশ কাঠামো থাকা ফাঁড়িগুলো সম্প্রসারণ করে বড় কৃত্রিম স্থাপনায় রূপ দিয়েছে।
সমুদ্র অনুসন্ধানের কাঠামো
ভাসমান গবেষণা দ্বীপটি তিনটি স্বতন্ত্র অংশের সমন্বয়ে গড়া একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। আধা-নিমজ্জিত দ্বৈত-হালের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মটি হবে প্রধান পরিচালনাকেন্দ্র। সেখানে বাস্তব সমুদ্র পরিস্থিতিতে শত শত টন ওজনের গভীর-সমুদ্রের সরঞ্জাম পরীক্ষা করা যাবে। এর সঙ্গে থাকবে জাহাজভিত্তিক গবেষণাগার, যা চলমান গবেষণার সুযোগ দেবে, এবং উপকূলভিত্তিক সহায়ক অবকাঠামো, যা রসদ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কর্মীদের পালাবদল সামলাবে। এই তিনটি অংশ একসঙ্গে প্রকৌশল পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণকে একটি পরিচালন কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করবে।
সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষক অধ্যাপক ইয়াং জিয়ানমিন প্ল্যাটফর্মটির বহুমুখী পরিচালন সক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। জাহাজটি গবেষণা জাহাজের কাছাকাছি গতিতে চলতে পারে, এরপর নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছে ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি নিয়ে স্থিতিশীল গবেষণা মোডে যেতে পারে। এর অতিভার বহনক্ষমতা, দীর্ঘ সময় অবস্থানের সক্ষমতা এবং টাইফুন প্রতিরোধের শক্তি বিদ্যমান বিকল্পগুলোর তুলনায় কঠিনতর সমুদ্র পরিস্থিতিতে, দীর্ঘ সময় এবং আরও গভীর জলসীমায় কাজ করার সুযোগ দেবে। ব্যালাস্ট নেওয়ার পর ভূপৃষ্ঠের ঢেউয়ের প্রভাব নির্বিশেষে প্ল্যাটফর্মটি স্থিতিশীল থাকবে। ফলে সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পরিমাপ এবং ভারী সরঞ্জাম মোতায়েনের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যাবে।
স্থাপনাটি সমুদ্রের ১০ হাজার মিটার গভীরতায় কাজ করতে পারায় হ্যাডাল অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর অংশগুলো মূলত গভীর-সমুদ্রের খাতে অবস্থিত। প্রচণ্ড চাপ ও সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঘেরা এসব চরম পরিবেশে অনন্য জীবসমাজ রয়েছে, যা জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এবং জৈবপ্রযুক্তিতে সম্ভাব্য প্রয়োগের পথ খুলতে পারে। প্ল্যাটফর্মটি শুধু জীববৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহেই নয়, ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং এসব দূরবর্তী এলাকায় ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক খননকাজে ব্যবহারের সরঞ্জাম পরীক্ষাতেও সহায়তা করবে।
নীল অর্থনীতির নকশা
বাণিজ্যিক সম্পদ আহরণ থেকে জীবনের উৎপত্তি-সংক্রান্ত মৌলিক প্রশ্ন—প্ল্যাটফর্মটির বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের ক্ষেত্র বিস্তৃত। গভীর-সমুদ্রের খননব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সরঞ্জাম এবং সমুদ্রের তেল-গ্যাস অবকাঠামো পরীক্ষার জন্য স্থাপনাটি উন্মুক্ত সমুদ্রে পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে। নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগার পরিবেশের বদলে বাস্তব সমুদ্র পরিস্থিতিতে পূর্ণ আকারের সরঞ্জাম পরীক্ষা করা গেলে গবেষকেরা সামুদ্রিক সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার দ্রুত এগিয়ে নিতে পারবেন এবং দূরবর্তী কর্মক্ষেত্রে সরঞ্জাম মোতায়েনের আগেই প্রকৌশলগত ত্রুটি শনাক্ত করতে পারবেন।
চরম গভীরতায় অনুসন্ধান চালানোর সক্ষমতা এমন পরিবেশ নিয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করবে, যেগুলো এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, স্থাপনাটি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের ধরন উন্মোচনে এবং উচ্চচাপ ও স্বল্প আলোয় জীবন কীভাবে খাপ খাইয়ে নেয়, তা বুঝতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি, প্ল্যাটফর্মটির আবহাওয়াবিদ্যাগত সক্ষমতা টাইফুনের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করতে পারে, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলজুড়ে জনপদগুলোর দুর্যোগ প্রতিরোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রচেষ্টাকে জোরদার করবে।
সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিয়াও লংফেই চীনের গবেষণা ব্যবস্থায় স্থাপনাটির অনন্য অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। দেশটিতে বিভিন্ন সামুদ্রিক গবেষণা স্থাপনা থাকলেও দ্রুত চলাচলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানোর সক্ষমতা আছে, এমন প্ল্যাটফর্মের অভাব ছিল। আধা-নিমজ্জিত প্ল্যাটফর্মের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে গবেষণা জাহাজের সক্ষমতা একীভূত করে নতুন কাঠামোটি সেই ঘাটতি পূরণ করছে। বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ এবং পানির নিচের প্রকৌশল সরঞ্জাম ও গভীর-সমুদ্র অনুসন্ধান পদ্ধতির প্রয়োগ বাড়াতেও প্ল্যাটফর্মটির ভূমিকার কথা বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়।
বৈশ্বিক সামুদ্রিক প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে
ভাসমান দ্বীপ প্রকল্পটি বেইজিংয়ের ভাষায় ‘নীল অর্থনীতি’ গড়ে সমুদ্রাঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর চীনা কৌশলের অংশ। এ উদ্যোগের মধ্যে প্রশান্ত, ভারত ও উত্তর মহাসাগরজুড়ে সমুদ্রতল মানচিত্রায়নের বিস্তৃত কার্যক্রম রয়েছে। ডুবোজাহাজ চলাচল ও ডুবোজাহাজবিরোধী যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য সংগ্রহে এতে বহু গবেষণা জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত জরিপ চালানো জাহাজগুলোর সংগৃহীত তথ্য চীনা ডুবোজাহাজের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুতিতে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।
মার্কিন নৌবাহিনীর নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস কংগ্রেশনাল কমিশনের কাছে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, চীন জরিপ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এসব তথ্য ডুবোজাহাজের চলাচল ও আত্মগোপন, পাশাপাশি সমুদ্রতলে সেন্সর বা অস্ত্র স্থাপনে সহায়তা করে। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের প্রশাসনে সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় নামে পরিচিত বেসামরিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সংযোগ একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। চীনা গবেষকেরা সমুদ্রে সামরিক অভিযানের জন্য সবচেয়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনকে নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতায় রূপান্তরের অঙ্গীকার করেছেন।
চীনের সমুদ্র মানচিত্রায়নের ব্যাপকতা পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কয়েক দশক ধরে সমুদ্রের যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞানে মার্কিন নৌবাহিনীর অসম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল। চীনের বিস্তৃত জরিপ কার্যক্রম এবং ভাসমান গবেষণা দ্বীপের মতো প্ল্যাটফর্ম সেই সুবিধা ক্ষয় করার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিতর্কিত জলসীমায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চালাতে সক্ষম পারমাণবিক বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী চলনশীল প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য বিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও কৌশলগত সামরিক সম্পদের মধ্যে প্রচলিত পার্থক্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
যা জানা দরকার
- ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকা বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী ভাসমান গবেষণা প্ল্যাটফর্মের নির্মাণ শুরু করেছে চীন
- ৭৮ হাজার টনের আধা-নিমজ্জিত দ্বৈত-হালের স্থাপনাটিতে সরবরাহ ছাড়াই চার মাস ২৩৮ জন গবেষক থাকতে পারবেন। উন্নত মেটাম্যাটেরিয়াল প্যানেলের মাধ্যমে এটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ সহ্য করতে পারবে
- সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে প্ল্যাটফর্মটি ১০ হাজার মিটার পর্যন্ত গভীরতায় গবেষণার পাশাপাশি গভীর-সমুদ্রের খনন এবং সমুদ্রের তেল সরঞ্জাম পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে
- প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কিত জলসীমায়, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে, প্ল্যাটফর্মটি চলনশীল কমান্ডকেন্দ্র বা নজরদারি স্টেশন হিসেবে কাজ করতে সক্ষম দ্বৈত-ব্যবহারের সম্পদ
- প্রকল্পটি চীনের বিস্তৃত সমুদ্রতল মানচিত্রায়ন কার্যক্রমের পরিপূরক। নৌ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কার্যক্রম ডুবোজাহাজ যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ায় এবং পানির নিচে মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে






