তীব্র প্রতিবাদের মধ্যে বিতর্কিত আইন পাস করল সংসদ
ভারতের সংসদ ২৫ মার্চ ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬ পাস করেছে। এর পরপরই একাধিক শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের সদস্যরা তীব্র সমালোচনা করেন। ২০১৯ সালের ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি আইন সংশোধনের লক্ষ্যে আনা বিলটি এখন আইনে পরিণত হতে রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায়। সরকারের দাবি, সংশোধনীগুলো কল্যাণ সুবিধা সহজে পৌঁছে দেবে এবং শোষণ ঠেকাবে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলো বিলটি কেড়ে নেবে এবং সরকারি নথি থেকে আইনিভাবে স্বীকৃত হাজারো ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির পরিচয় মুছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
সূচিপত্র
- তীব্র প্রতিবাদের মধ্যে বিতর্কিত আইন পাস করল সংসদ
- এক দশকের অগ্রগতির উল্টো পথে
- স্বনির্ধারণের বদলে চিকিৎসাগত যাচাই
- ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে স্বীকৃতির পরিসর সংকুচিত
- পরিচয় মুছে দেওয়ার নকশা
- সারা দেশে বিক্ষোভ
- সম্প্রদায়ের সহায়তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য
- সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সরকারের যুক্তি
- অধিকার সংকোচনের বৈশ্বিক প্রবণতা
- মূল বিষয়গুলো
এক দশকের অগ্রগতির উল্টো পথে
বর্তমান বিতর্ক এক দশকের কিছু বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামো থেকে নাটকীয় সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় ঐতিহাসিক রায় দেন, যা নালসা রায় নামে পরিচিত। দুই বিচারপতির বেঞ্চ ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং বলেন, লিঙ্গের স্ব-পরিচয়ের অধিকার সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত, যে অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পক্ষে লেখা রায়ে বিচারপতি কে. এস. রাধাকৃষ্ণন লিঙ্গ নির্ধারণে তথাকথিত ‘জৈবিক পরীক্ষা’ স্পষ্টভাবে নাকচ করেন। রায়ে বলা হয়, ‘লিঙ্গপরিচয় ব্যক্তির মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এবং ‘কারও লিঙ্গ ঘোষণা করার জন্য যৌন পুনর্নির্ধারণ অস্ত্রোপচারের ওপর জোর দেওয়া অনৈতিক ও বেআইনি।’ চিকিৎসা পদ্ধতির শর্ত ছাড়াই স্ব-পরিচিত লিঙ্গের আইনি স্বীকৃতি দিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দেন আদালত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে সংসদ ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) আইন পাস করে। সেই আইনেরও বিভিন্ন বিধানের সমালোচনা করেছিলেন অধিকারকর্মীরা। তা সত্ত্বেও আইনটি লিঙ্গপরিচয় যে ব্যক্তির নিজের উপলব্ধির ওপর নির্ভরশীল, সেই মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করে এবং অস্ত্রোপচারের শর্ত থেকে আইনি স্বীকৃতিকে আলাদা রাখে। ২০২৬ সালের সংশোধনী বিল এখন এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা উল্টে দিতে চাইছে।
স্বনির্ধারণের বদলে চিকিৎসাগত যাচাই
নতুন বিলে প্রস্তাবিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে। ২০১৯ সালের আইনে স্বঘোষণার ভিত্তিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা পরিচয়পত্র দিতেন। ২০২৬ সালের বিল ‘নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী লিঙ্গপরিচয়’-এর অধিকার পুরোপুরি বাতিল করে এর বদলে দুই ধাপের বাধ্যতামূলক চিকিৎসাগত মূল্যায়ন চালুর প্রস্তাব করেছে।
প্রথমে আবেদনকারীদের মুখ্য চিকিৎসা কর্মকর্তা বা উপমুখ্য চিকিৎসা কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন মেডিকেল বোর্ডের কাছ থেকে সনদ নিতে হবে। ক্রোমোজোমের ধরন, জননগ্রন্থির বিকাশ, হরমোন উৎপাদন বা প্রাথমিক যৌন বৈশিষ্ট্যসহ নির্দিষ্ট জৈবিক মানদণ্ড পূরণ হয় কি না, বোর্ডগুলো তা যাচাই করবে। এই চিকিৎসাগত ছাড়পত্রের পরও সনদ দেওয়ার আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের ‘অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের’ কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন নেওয়ার বিবেচনাধীন ক্ষমতা থাকবে।
অধিকারকর্মীদের ভাষায়, এটি অপমানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী গ্রেস বানু দিল্লিতে এক গণশুনানিতে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
অচেনা মানুষ আমাদের শরীর খুঁটিয়ে দেখবে, আমরা কে তার প্রমাণ চাইবে; আমাদের গোপনীয়তা ধ্বংস হবে, মর্যাদা পদদলিত হবে। আমার লিঙ্গ আমার হয়ে ঠিক করার অধিকার কাউকে কে দিয়েছে?
ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে স্বীকৃতির পরিসর সংকুচিত
সংশোধনীটি ‘ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি’র আইনি সংজ্ঞা নাটকীয়ভাবে সংকুচিত করেছে। ২০১৯ সালের আইনে ট্রান্স পুরুষ, ট্রান্স নারী, জেন্ডারকুইয়ার ব্যক্তি এবং ইন্টারসেক্স ব্যক্তিসহ বিস্তৃত শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। নতুন বিল স্বীকৃতি সীমাবদ্ধ করেছে নির্দিষ্ট কিছু নামযুক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে—যেমন কিন্নর, হিজড়া, আরাবানি, যোগতা ও নপুংসক—এবং যৌন বৈশিষ্ট্যে নির্দিষ্ট ‘জন্মগত ভিন্নতা’ থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে।
এই সংজ্ঞায় ‘ভিন্ন যৌন অভিমুখিতা এবং নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী যৌন পরিচয় থাকা ব্যক্তিদের’ স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী হিজড়া বা কিন্নর সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নন—এমন হাজারো ট্রান্স পুরুষ ও ট্রান্স নারীর জন্য এতে আইনি শূন্যতা তৈরি হবে। প্রতিবাদে পদত্যাগ করা ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রান্সজেন্ডার পারসনসের সদস্য ঋতুপর্ণা নেওগ উল্লেখ করেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচয়—যেমন মণিপুরের নুপি মানবা ও নুপি মানবি—তালিকায় নেই।
এর মানে কি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আমরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোয় নেই? এর মানে কি গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ট্রান্স মানুষদের মুছে ফেলা হবে?
বিলটি ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের জন্য পৃথক আইনি শ্রেণিও বিলুপ্ত করছে। তাদের এমন এক চিকিৎসানির্ভর ‘জন্মগত ভিন্নতা’র কাঠামোয় ফেলা হচ্ছে, যা সংশোধনের প্রয়োজন আছে বলে ইঙ্গিত দেয়। ইন্টারসেক্স অধিকারকর্মী ড্যানিয়েলা মেনডনকা এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ করেন।
জন্মগত ভিন্নতা বলতে এমন কিছুকে বোঝায়, যা সংশোধন করা যায়। কিন্তু আমি যদি সংশোধন না করতে চাই? আপনারা কি আমাকে তা করতে বাধা দিচ্ছেন?
পরিচয় মুছে দেওয়ার নকশা
সাংবিধানিক দিক থেকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিধানটি সম্ভবত মাত্র সাত শব্দের একটি ধারায় রয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, নিজের উপলব্ধি অনুযায়ী পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির শ্রেণিতে ‘অন্তর্ভুক্ত হবেন না, এবং কখনো অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলেও গণ্য হবেন না’। অতীতেও কার্যকর হওয়ার মতো এই ভাষার মাধ্যমে ২০১৯ সালের আইনে স্বীকৃতি পাওয়া হাজারো মানুষের আইনি পরিচয়কে অবৈধ ঘোষণা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
২০১৯ সাল থেকে সরকার ৩২ হাজারের বেশি ট্রান্সজেন্ডার সনদ দিয়েছে। বিদ্যমান এই সনদগুলোর কী হবে, তা ব্যাখ্যা করার মতো কোনো অন্তর্বর্তী বিধান বিলে নেই। শুধু ঘোষণা করা হয়েছে, ওই ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তাঁরা কখনো তা ছিলেনই না।
এ ছাড়া লিঙ্গ-স্বীকৃতিমূলক অস্ত্রোপচার করে—এমন প্রতিটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানকে ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবরণ সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিতে’ হবে। সমালোচকদের মতে, এতে বাধ্যতামূলক তথ্য জানানোর ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যা সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের পুট্টাস্বামী রায়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্যগত গোপনীয়তার সুরক্ষা লঙ্ঘন করে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, সম্মতি ছাড়া নিজের তথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর অধিকারও গোপনীয়তার অন্তর্ভুক্ত।
সারা দেশে বিক্ষোভ
১৩ মার্চ বিলটি উত্থাপনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের বিভিন্ন শহরে সমন্বিত বিক্ষোভ শুরু হয়। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কলকাতা, পুনে, গোয়া ও ভুবনেশ্বরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়। শিক্ষার্থী সংগঠন, নাগরিক সমাজের গোষ্ঠী এবং এলজিবিটিকিউ সংগঠনগুলো সংবাদ সম্মেলন, পথসভা ও স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচির আয়োজন করে।
বিল পাসের পরপরই আইনসৃষ্ট ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রান্সজেন্ডার পারসনসের দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধি কল্কি সুব্রামানিয়াম সামাজিক ন্যায়বিচারমন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমারকে লেখা পদত্যাগপত্রে বলেন:
আইনসৃষ্ট প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন আইন বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়াই আমার প্রধান দায়িত্ব। আমার বা সম্প্রদায়ের অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই বিল এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যকেই ক্ষুণ্ন করে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধি ঋতুপর্ণা নেওগও একই ধরনের পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি লেখেন, ‘এনসিটিপি থেকে আমাদের কয়েকজন সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি বলে মনে হয়েছে।’
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও প্রতিবাদে যোগ দেয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বিলটিকে ট্রান্সজেন্ডার অধিকারগুলোর ওপর ‘নির্লজ্জ আক্রমণ’ বলেন। আরজেডি সাংসদ মনোজ কুমার ঝা বলেন, বিলটি ‘আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া উচিত’। সংসদীয় বিতর্কে কংগ্রেস সাংসদ রেণুকা চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন: ‘আমাদের—নারী-পুরুষকে—যদি মেডিকেল বোর্ডের সামনে লিঙ্গের প্রমাণ দিতে না বলা হয়, তবে ট্রান্স ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার আমরা কে?’
সম্প্রদায়ের সহায়তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য
বিলটিতে নতুন কিছু অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে, যেগুলোর শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এসব বিধান এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে যে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় প্রায়ই স্বনির্ধারিত নয়, বরং জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ‘শিশুদের বাইরে নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে প্রকাশ করতে বাধ্য করা’ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কাউকে ‘অঙ্গহানি, পৌরুষহানি, খোজাকরণ, অঙ্গচ্ছেদ অথবা কোনো অস্ত্রোপচার, রাসায়নিক বা হরমোনজনিত পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে যে কারও বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।
সরকার এসব বিধানকে শোষণ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরলেও অধিকারকর্মীদের যুক্তি, এতে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখা সহায়তা কাঠামোগুলোই অপরাধের আওতায় আসবে। অনেক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে তাঁদের জন্মপরিবার পরিত্যাগ করে। পরে তাঁরা বেছে নেওয়া পরিবার, সম্প্রদায়ের সংগঠক এবং ঐতিহ্যবাহী হিজড়া জামাতের সহায়তায় টিকে থাকেন। নতুন আইনে কোনো তরুণকে তার লিঙ্গপরিচয় খুঁজে দেখার পথে সহায়তা করলেও বিচারের মুখে পড়তে হতে পারে।
ট্রান্স ও ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের অধিকারকর্মী কানমানি এর পরিণতি নিয়ে সতর্ক করেন।
আপনারা প্রত্যেক মা-বাবা ও পরিবারকে ক্ষমতা দিচ্ছেন, যারা কোনো ট্রান্স ব্যক্তির ওপর নির্যাতন চালাতে চায়; পাশাপাশি যারা তাকে সহায়তা করে, তাদের ওপরও নির্যাতন চালানোর ক্ষমতা দিচ্ছেন। প্রতিটি এনজিও, প্রতিটি হিজড়া আরাবানি জামাত এই হুমকির মুখে পড়বে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৭১ সালের ক্রিমিনাল ট্রাইবস আইনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই আইনে নপুংসকসহ পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী করা হয়েছিল এবং তাদের অপহরণকারী বলে ধরে নেওয়া হতো। ২০১৪ সালের নালসা রায়ে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে ‘নিষ্ঠুর ও বর্বর মানসিকতার নৃশংস আইন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সরকারের যুক্তি
সামাজিক ন্যায়বিচারমন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার সংশোধনীগুলোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, বিদ্যমান ‘ট্রান্সজেন্ডার’ সংজ্ঞাটি খুব অস্পষ্ট এবং এর অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, কল্যাণ সুবিধা যেন শুধু তাঁদের কাছে পৌঁছায়, যাঁদের সত্যিই সুরক্ষা প্রয়োজন এবং জৈবিক অবস্থার কারণে ‘চরম ও নিপীড়নমূলক’ বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিবর্তনগুলো জরুরি।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে: ‘আইনের আওতায় দেওয়া সুরক্ষা ও সুবিধার পরিসর ব্যাপক। খেয়াল রাখতে হবে, অর্জনযোগ্য কোনো বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিগত পছন্দ বা ব্যক্তির দাবি করা স্ব-উপলব্ধ পরিচয়ের ভিত্তিতে যেন এই স্বীকৃতি দেওয়া না হয়।’
খবরে বলা হয়েছে, ২২ মার্চের এক বৈঠকে বিক্ষোভকারী সম্প্রদায়ের সদস্যদের সরকারপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের প্রস্তাব বিবেচনা করা যাবে না, কারণ সেগুলো বিলের আওতাভুক্ত নয়। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্যদের নাকি বলেছেন, এই আইন নিয়ে ‘আপনাদের সবার সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই’।
অধিকার সংকোচনের বৈশ্বিক প্রবণতা
ট্রান্সজেন্ডার অধিকার ক্ষয়ের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের এই আইনটি এসেছে। ট্রান্সজেন্ডার ইউরোপ অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের ট্রান্স রাইটস ইনডেক্সে তাদের ১৩ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে অর্জিত অধিকারের চেয়ে কেড়ে নেওয়া অধিকার বেশি। হাঙ্গেরি সংবিধান সংশোধন করে মাত্র দুটি লিঙ্গকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৫ সালে রায় দিয়েছেন, সমতা-সংক্রান্ত আইনের উদ্দেশ্যে ‘লিঙ্গ’ বলতে জৈবিক লিঙ্গ বোঝায়। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রান্স লেজিসলেশন ট্র্যাকার অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালেই ৪২টি অঙ্গরাজ্যে ট্রান্সবিরোধী ৭৪০টি বিল বিবেচনাধীন ছিল।
সমালোচকদের মতে, ভারতের বিলটির আদর্শিক ভাষা এই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে মেলে: স্বনির্ধারণের বদলে রাষ্ট্রীয় ও চিকিৎসাগত যাচাই বসানো, নজরদারি বৈধ করতে শোষণ থেকে সুরক্ষার যুক্তি দেখানো এবং ট্রান্স পরিচয় সহজাত নয়, অর্জিত—এমন দাবি করা।
মূল বিষয়গুলো
- সংসদ ২৫ মার্চ ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬ পাস করেছে; এটি রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায়
- ২০১৪ সালের নালসা রায়ে সুপ্রিম কোর্টের স্বীকৃত স্ব-পরিচিত লিঙ্গের অধিকার বিলটি বাতিল করছে
- ক্রোমোজোম ও যৌনাঙ্গসহ জৈবিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে মেডিকেল বোর্ডকে এখন ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় সনদ দিতে হবে
- সংজ্ঞাটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী পরিচয়—হিজড়া, কিন্নর, আরাবানি ও যোগতা—পর্যন্ত সীমিত করা হয়েছে; বাদ পড়েছেন বহু ট্রান্স পুরুষ, ট্রান্স নারী ও নন-বাইনারি ব্যক্তি
- অতীতেও কার্যকর একটি ধারা ২০১৯ সাল থেকে দেওয়া ৩২ হাজারের বেশি বিদ্যমান ট্রান্সজেন্ডার সনদ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি করেছে
- পরামর্শ না করার প্রতিবাদে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রান্সজেন্ডার পারসনসের দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন
- দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন শহরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে
- কংগ্রেস, আরজেডি, ডিএমকে ও টিএমসিসহ বিরোধী দলগুলো বিল প্রত্যাহার বা কমিটির কাছে পাঠানোর দাবি জানিয়েছে
- নতুন ফৌজদারি বিধান সম্প্রদায়ের সহায়তা নেটওয়ার্ক ও বেছে নেওয়া পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে
- গোপনীয়তা, মর্যাদা ও সমতার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অধিকারকর্মীরা






