নীরব জরিপ: ঢেউয়ের নিচের যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র তৈরি
চীন প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরজুড়ে ব্যাপক সমুদ্রতল নজরদারি অভিযান শুরু করেছে। এ কাজে কয়েক ডজন গবেষণা জাহাজ মোতায়েন করে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথের কাছাকাছি পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নৌ-ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত সমুদ্রতল জরিপ প্রচেষ্টাগুলোর একটি এই অভিযান। এতে পানির নিচের ভূপ্রকৃতি, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে ভবিষ্যতে সাবমেরিন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সূচিপত্র
- নীরব জরিপ: ঢেউয়ের নিচের যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র তৈরি
- নজরদারির বহর
- সমুদ্রতল কেন গুরুত্বপূর্ণ
- স্বচ্ছ মহাসাগর উদ্যোগ
- কৌশলগত সংকীর্ণ পথ লক্ষ্যবস্তু
- ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত উপস্থিতি
- বেসামরিক-সামরিক সমন্বয়ের বাস্তব প্রয়োগ
- আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ
- পরবর্তী প্রজন্মের পানির নিচের সক্ষমতা
- মূল কথা
এই উদ্যোগের ব্যাপকতা পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের মতে, কয়েক দশক ধরে পানির নিচের যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর এক অসম সুবিধা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌযুদ্ধ কলেজে চীনের সামুদ্রিক কৌশলবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রায়ান মার্টিনসন বেইজিংয়ের সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যাপ্তিকে অকপটে বিস্ময়কর বলে বর্ণনা করেছেন। চীনের এই প্রচেষ্টা এখন দীর্ঘদিনের সেই সুবিধা ক্ষয় করার হুমকি তৈরি করছে। এতে ঢেউয়ের নিচে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে উঠছে, যেখানে এত দিন মার্কিন সাবমেরিনগুলো তুলনামূলকভাবে বাধাহীনভাবে চলাচল করেছে।
নজরদারির বহর
এই অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছে চীন মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত গবেষণা জাহাজ ডং ফাং হং ৩। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এটি তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়াম এবং ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর কাছে বারবার জরিপ চালিয়েছে। রয়টার্স পর্যালোচিত জাহাজ-চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি আঁটসাঁট সমান্তরাল রেখায় বারবার চলাচল করেছে, যা পদ্ধতিগতভাবে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এটি জাপানের কাছে পানির নিচের বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম শক্তিশালী সামুদ্রিক সেন্সর পরীক্ষা করে। ২০২৫ সালের মে মাসে একই স্থানে ফিরে আসে। ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ জাহাজটি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী জলসীমায় এপার-ওপার চলাচল করছিল এবং বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ মালাক্কা প্রণালির প্রবেশপথগুলো জরিপ করছিল।
ডং ফাং হং ৩ একা কাজ করছে না। স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের পাঁচ বছরের বেশি সময়ের চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিন মহাসাগরজুড়ে চীনের ৪২টি গবেষণা জাহাজ সক্রিয় রয়েছে। অন্তত আটটি জাহাজের সমুদ্রতল মানচিত্র তৈরির কার্যক্রম নিশ্চিত হয়েছে, আর আরও দশটি জাহাজে এ ধরনের কাজের উপযোগী বিশেষ সরঞ্জাম রয়েছে। এসব জাহাজ চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের। জাহাজগুলো কখনো কখনো নিজেদের অবস্থান শনাক্তের ব্যবস্থা বন্ধ রাখে, তাই কার্যক্রমের প্রকৃত ব্যাপ্তি বিশ্লেষকদের নথিভুক্ত হিসাবের চেয়েও বড় হতে পারে। তবে দৃশ্যমান কার্যক্রমই ফিলিপাইন, হাওয়াই এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক অ্যাটলে মার্কিন স্থাপনাগুলোর আশপাশের সামরিকভাবে সংবেদনশীল জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত।
সমুদ্রতল কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই মানচিত্র তৈরির কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে হলে সাবমেরিন কীভাবে চলাচল করে ও যুদ্ধ করে, তা জানা দরকার। সাবমেরিনগুলো পানির পৃষ্ঠ থেকে কয়েক শ মিটারের মধ্যে চলাচল করে ও আত্মগোপন করে। সেখানে পানির নিচের ভূপ্রকৃতি, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রস্রোত নির্ধারণ করে শনাক্তকারী ব্যবস্থার কাছে সেগুলো কতটা দৃশ্যমান হবে। সোনার ব্যবস্থায় ব্যবহৃত শব্দতরঙ্গ সমুদ্রতলের গঠন ও পানির ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে বাঁকে ও প্রতিফলিত হয়। এসব শব্দগত বৈশিষ্ট্য এমন ছায়া তৈরি করে, যেখানে সাবমেরিন আত্মগোপন করতে পারে; আবার পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান থাকা প্রতিপক্ষের কাছে নিজের অবস্থানও প্রকাশ করে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার এবং বর্তমানে সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির গবেষক টম শুগার্ট ব্যাখ্যা করেছেন, পানির নিচের ভূপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে শব্দতরঙ্গের চলাচল বদলে যায়। তাপমাত্রার স্তর ও লবণাক্ততার তারতম্য পানির মধ্য দিয়ে শব্দ চলাচলে প্রভাব ফেলে। ফলে একই ধরনের সাবমেরিন অভিযান এক জায়গায় অদৃশ্য থাকতে পারে, অন্য জায়গায় আবার ধরা পড়তে পারে। সমুদ্রতলের উঁচু অংশে ধাক্কা এড়াতে এবং আত্মগোপনের উপযুক্ত স্থান শনাক্ত করতে কমান্ডারদের নির্ভুল তথ্য দরকার।
যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জাহাজগুলোর জরিপের তথ্য সম্ভাব্যভাবে অমূল্য। নিজের কাজে দক্ষ যেকোনো সামরিক সাবমেরিনার যে পরিবেশে কাজ করছেন, তা বোঝার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করবেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন বাহিনীর সাবেক প্রধান পিটার স্কট রয়টার্সকে এ বিষয়ে বলেন, তথ্য সংগ্রহ আক্রমণাত্মক সাবমেরিন মোতায়েন এবং সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ—দুই ধরনের অভিযানেই অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
স্বচ্ছ মহাসাগর উদ্যোগ
২০১৪ সালের দিকে চীন মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী উ লিশিন চীনা গবেষকদের ভাষায় ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ তৈরির একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের প্রস্তাব দেন। এই ধারণায় সেন্সর, বয়া এবং সমুদ্রতলের অ্যারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক স্থাপনের কথা রয়েছে, যা পানির অবস্থা ও পানির নিচের চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। শানডং প্রাদেশিক সরকারের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি দ্রুত অন্তত ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সরকারি সহায়তা পায়।
প্রকল্পটি দক্ষিণ চীন সাগরে শুরু হয়। চীন মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, সেখানে তারা গভীর সমুদ্র অববাহিকা জুড়ে একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। চীনা সরকারি সংস্থার নথি অনুযায়ী, এরপর নেটওয়ার্কটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত হয়েছে। জাপানের পূর্বে, ফিলিপাইনের পূর্বে এবং গুয়ামের আশপাশে শত শত সেন্সর মোতায়েন করা হয়েছে। ভারত মহাসাগরে নথিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে সেন্সর অ্যারের বর্ণনা রয়েছে; এর মধ্যে বিশ্বের দীর্ঘতম পানির নিচের পর্বতমালাগুলোর একটি নাইন্টি ইস্ট রিজ বরাবর স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত।
মার্কিন নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস কংগ্রেসের এক কমিশনে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, সোনারের কার্যকারিতা সর্বোত্তম করা এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সাবমেরিনগুলোর ওপর অবিরাম নজরদারি চালাতে চীন জলতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহের জন্য পানির নিচে নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ছে। প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে কিছু নৌ-বিশেষজ্ঞ পানির নিচের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানোর দাবি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তবে বিলম্বে পাওয়া তথ্যও প্রতিপক্ষের সাবমেরিন অভিযান সম্পর্কে মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য দেয়।
কৌশলগত সংকীর্ণ পথ লক্ষ্যবস্তু
ফিলিপাইনের পূর্বে চীন সবচেয়ে বিস্তৃত সমুদ্র জরিপ চালিয়েছে। এলাকাটি প্রথম দ্বীপমালার পাশে অবস্থিত। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জ উত্তরে জাপানি দ্বীপগুলো থেকে তাইওয়ান হয়ে দক্ষিণে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি চীনের উপকূলীয় সমুদ্র ও উন্মুক্ত প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নৌ-অ্যাটাশে এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান নেভাল ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পিটার লিভি বলেন, এই দ্বীপমালা চীনকে ঘিরে ফেলবে—এমন আশঙ্কা বেইজিংয়ের মধ্যে আছে বলে মনে হয়। বিস্তৃত মানচিত্র তৈরির কাজ ইঙ্গিত দেয়, উন্মুক্ত সমুদ্রে পৌঁছানোর পথ তৈরি করতে সামুদ্রিক এলাকা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা অর্জন করতে চায় চীন।
চলাচলের তথ্য দেখায়, চীনা জাহাজগুলো মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন থাকা গুয়াম এবং আরেকটি বড় আঞ্চলিক কেন্দ্র হাওয়াইয়ের আশপাশের জলসীমাও জরিপ করেছে। পাপুয়া নিউ গিনির একটি নৌঘাঁটির উত্তরের পানির নিচের শৈলশিরাও জাহাজগুলো পরীক্ষা করেছে। ওই ঘাঁটিতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশাধিকার পেয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর ও অস্ট্রেলিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ঘাঁটির মধ্যবর্তী নৌপথে অবস্থিত অস্ট্রেলীয় অঞ্চল ক্রিসমাস আইল্যান্ডের আশপাশেও তারা অনুসন্ধান চালিয়েছে। এই ধারা ইঙ্গিত দেয়, বেইজিং তার নিকটবর্তী উপকূলের বহু দূর পর্যন্ত অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পানির নিচের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা গড়ে তুলছে।
ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত উপস্থিতি
চীনের সমুদ্রবিজ্ঞানবিষয়ক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রশান্ত মহাসাগরের বাইরেও বিস্তৃত। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে চীনের তেল ও অন্যান্য সম্পদ আমদানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা চীনা জাহাজগুলো মানচিত্রে চিহ্নিত করেছে। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক খণ্ডকালীন অধ্যাপক এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ কর্মকর্তা জেনিফার পার্কার বলেন, সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে চীনের গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে। বিস্তৃত জরিপ থেকে ইঙ্গিত মেলে, সরবরাহপথ সুরক্ষিত রাখতে এবং একই সঙ্গে ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নৌ-তৎপরতা নজরদারি করতে বেইজিং ভারত মহাসাগরে আরও বেশি সাবমেরিন অভিযান চালাতে পারে।
নাইন্টি ইস্ট রিজ বরাবর সেন্সর অ্যারেটি মালাক্কা প্রণালির প্রবেশপথে অবস্থিত। চীনের তেল সরবরাহের বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে আসে। এ অবস্থান থেকে চীন নিজের সরবরাহপথের দুর্বলতা এবং এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ দিয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সাবমেরিন চলাচল—দুটিই নজরদারি করতে পারে। চীনা জাহাজগুলো আলাস্কার পশ্চিম ও উত্তরের সমুদ্রতলও মানচিত্রে চিহ্নিত করেছে। ২০৩০-এর দশকের মধ্যে মেরু অঞ্চলের একটি বড় শক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করা বেইজিংয়ের জন্য আর্কটিকে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এটি।
বেসামরিক-সামরিক সমন্বয়ের বাস্তব প্রয়োগ
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধীনে চীনা সরকারের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে বেসামরিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। বেইজিং এই পদ্ধতিকে বেসামরিক-সামরিক সমন্বয় বলে অভিহিত করে। চীন মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে এটি বিশেষভাবে স্পষ্ট। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে চীনা নৌবাহিনীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সামুদ্রিক শক্তি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার অঙ্গীকারের প্রশংসা করেন।
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সেন্সর অ্যারেগুলোর তত্ত্বাবধানকারী চীন মহাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ঝৌ ছুন ২০২৫ সালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সম্পর্কটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর কাজ তাঁকে নিজ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বিকাশ দেখিয়েছে। সমুদ্রে সামরিক বাহিনীর জন্য সবচেয়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্যকে নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতায় রূপান্তরের অঙ্গীকারও করেন তিনি। মানচিত্র তৈরির কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা উ এখন ছিংদাও ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি ফর মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মাধ্যমে নেটওয়ার্কটির তত্ত্বাবধান করছেন। এর অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে চীনের নৌবাহিনীর সাবমেরিন একাডেমি।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ
তথ্য সংগ্রহের এই বিস্তৃত কার্যক্রমের জেরে ইন্দো-প্যাসিফিকজুড়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে আঞ্চলিক শক্তিগুলো। জলতাত্ত্বিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভূমিকা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দীর্ঘদিনের ভারতের চীনা গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের কাছে, যেখানে ভারতের পারমাণবিক সাবমেরিন বহর মোতায়েন রয়েছে।
চীনা গবেষণা জাহাজের উপস্থিতির পর, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরে শি ইয়ান ৬-এর আগমনে নয়াদিল্লি তীব্র প্রতিবাদ জানালে শ্রীলঙ্কা বিদেশি গবেষণা জাহাজের সফরে ১২ মাসের স্থগিতাদেশ আরোপ করে। চীনা একটি প্রতিষ্ঠান ও শ্রীলঙ্কার একটি স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হওয়া চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেয় দেশটির সরকার। ওই চুক্তির ফলে শ্রীলঙ্কার জলসীমা ও জলতাত্ত্বিক তথ্য চীনের সহজে পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। নিজের সামুদ্রিক এলাকার তথ্যের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারটি জলতাত্ত্বিক গবেষণা তদারকির জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন একটি সংস্থাও গঠন করেছে।
পরবর্তী প্রজন্মের পানির নিচের সক্ষমতা
সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইঙ্গিত দেয়, চীন শুধু তথ্য সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ নেই; যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রতলকে সক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করার দিকেও এগোচ্ছে। চীনা বিজ্ঞানীরা পানির ২০০ মিটার গভীরে কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিনের ইগনিশন সফলভাবে পরীক্ষা করেছেন। সাধারণ সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত প্রায় ৩০ মিটার গভীরতা থেকে ছোড়া হয়; পরীক্ষাটি তার চেয়ে অনেক গভীরে হয়েছে। মেকানো-ইলেকট্রিকস ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট এবং কি ল্যাবরেটরি অব আন্ডারওয়াটার ইন্টেলিজেন্ট ইকুইপমেন্টের প্রকৌশলীরা চীনের পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী ট্যাকটিক্যাল মিসাইল টেকনোলজিতে গভীর পানির পরিবেশে পরীক্ষার একটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে গবেষণার ফল প্রকাশ করেছেন। কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ পেলে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রতলে স্থায়ী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা বেইজিংয়ের কৌশলগত বিকল্প বাড়াবে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, সমুদ্রতল সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান পানির নিচের অবকাঠামো বিঘ্নিত করার সক্ষমতাও বাড়ায়। ইন্টারনেট সংযোগের জন্য তাইওয়ান প্রায় পুরোপুরি সমুদ্রতলের তারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিকল্পিতভাবে তার কেটে দ্বীপটিকে ডিজিটাল অবরোধে ফেলার ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিরক্ষা-বিষয়ক বিশ্লেষণে উদ্ধৃত গবেষক জেসন সু মনে করেন, পিপলস লিবারেশন আর্মি গুরুত্বপূর্ণ তারের গুচ্ছ কেটে ব্যান্ডউইথ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন এবং মিত্রদের সমন্বয় ব্যাহত করতে পারে। আরেকটি চীনা গবেষণা জাহাজ তানসুও ই হাও অস্ট্রেলিয়াকে প্রদক্ষিণ করেছে এবং ডায়ামান্টিনা ট্রেঞ্চের ওপর থেমেছে। সেখানে এটি সমুদ্রতলের শব্দতরঙ্গ সেন্সরের রক্ষণাবেক্ষণ করতে অথবা সমুদ্রতলের তার সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ প্রকাশ্যে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় এ ধরনের জাহাজ না থাকলেই তিনি খুশি হতেন।
মূল কথা
- কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল জলসীমায় পদ্ধতিগতভাবে সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণে চীন প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরে ৪২টি গবেষণা জাহাজ মোতায়েন করেছে।
- শানডং প্রদেশের অন্তত ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অর্থায়নে পরিচালিত স্বচ্ছ মহাসাগর প্রকল্পে শত শত সেন্সর মোতায়েন করা হয়েছে। এসব সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য সাবমেরিন শনাক্ত ও আত্মগোপনের সক্ষমতা বাড়ায়।
- প্রথম দ্বীপমালা, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের কাছের জলসীমা, মালাক্কা প্রণালির প্রবেশপথ এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন স্থাপনার কাছের সমুদ্রপথসহ সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরিপের কাজ কেন্দ্রীভূত।
- বেসামরিক-সামরিক সমন্বয়ের ফলে বেসামরিক গবেষণা জাহাজগুলো নৌ-অভিযান, সমুদ্রতলে অস্ত্র স্থাপন এবং সম্ভাব্য অবকাঠামো বিঘ্নিত করার কাজে সহায়ক দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
- সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ ও নিরাপত্তা হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ভারত, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়াসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিধিনিষেধ আরোপ করছে বা নজরদারি জোরদার করছে।
- গভীর সমুদ্রে রকেট ইগনিশন এবং সেন্সর নেটওয়ার্কের উন্নত পরীক্ষা ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতের সামরিক অভিযানে সক্রিয় ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রতলকে প্রস্তুত করছে চীন।






