অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচলে তাৎক্ষণিক হুমকি
পরিশোধিত জ্বালানির সব রপ্তানি বন্ধে চীনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচল খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জেট জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়তে থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেইজিং এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া নিষেধাজ্ঞায় পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানি অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার জেট জ্বালানির প্রায় ৩২ শতাংশ চীন থেকে আমদানি হয়েছিল। তাই এই নিষেধাজ্ঞা আগে থেকেই নাজুক সরবরাহব্যবস্থার জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূচিপত্র
জ্বালানিসম্পদমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন পরিস্থিতির গুরুতরতা নিশ্চিত করে বলেছেন, বিকল্প জ্বালানিবাহী জাহাজ দ্রুত না পৌঁছালে এক মাসের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন শোধনাগারগুলোকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার বন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়া অন্তত দুটি জ্বালানিবাহী জাহাজের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং বিকল্প অপরিশোধিত তেল জোগাড়ে এশীয় শোধনাগারগুলোর হিমশিম খাওয়ার মধ্যে বিমান জ্বালানির দাম ও প্রাপ্যতা উভয়ই উড়োজাহাজ সংস্থা এবং যাত্রীদের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সবচেয়ে গুরুতর জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এটি। ভূরাজনৈতিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতার বদলে ব্যয়সাশ্রয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতাও এতে পরীক্ষা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার ঝুঁকির মূলে রয়েছে একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা: দেশটিতে জেট জ্বালানি পরিশোধনের কার্যত কোনো অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা নেই। সিডনি বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী স্কট চার্লটন জোর দিয়ে বলেছেন, দেশের বৃহত্তম বিমান চলাচলকেন্দ্রটি পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল; বিমানবন্দরে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার মতো কোনো শোধনাগার নেই। ট্যাংকারে আসা জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহের ওপর এই নির্ভরতা বড় সরবরাহকারীদের—যেমন চীন—হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে দেশটিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতা
বর্তমান সংকট কয়েক দশকের কৌশলগত সিদ্ধান্তের পরিণতি সামনে এনেছে, যার ফলে অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানির মজুত খুব কম এবং দেশে পরিশোধনের কোনো সক্ষমতা নেই। ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি শিল্প, বিজ্ঞান ও সম্পদ বিভাগ জানায়, অস্ট্রেলিয়ার কাছে মজুত রয়েছে মাত্র ২৯ থেকে ৩২ দিনের জেট জ্বালানি, যার পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি ২০ লাখ লিটার। এই মজুত রাখা হয় স্থলভাগের সংরক্ষণাগারে অথবা অস্ট্রেলিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে থাকা জাহাজে। উপকূল থেকে এই অঞ্চলের বিস্তৃতি ২২ থেকে ৩৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
এই মজুত অস্ট্রেলিয়ার ন্যূনতম অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদের জন্য নির্ধারিত ৯০ দিনের শর্তের তুলনায় অনেক কম। অস্ট্রেলিয়া বছরের পর বছর এই আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারেনি। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহে ধাক্কা লাগলে অন্য দেশকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা নেই দেশটির, আর নিজেদের সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন সামাল দেওয়ার সুরক্ষামূলক মজুতও অত্যন্ত সীমিত। পর্যাপ্ত মজুত না রাখার এই ব্যর্থতার কারণে এখন দেশটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ মজুতের বদলে জরুরি ব্যবস্থা ও কূটনৈতিক আবেদনের ওপর নির্ভরশীল।
সরবরাহব্যবস্থার কাঠামো এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ হয় ধারাবাহিকভাবে। বড় ট্যাংক খামগুলো পাইপলাইন ও হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যেগুলোতে যেকোনো সময়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি ধরে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। লবণগুহায় কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা বিস্তৃত ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার থাকা দেশগুলোর বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচল খাত উত্তর-পূর্ব এশিয়ার শোধনাগার থেকে ট্যাংকারের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের ওপর নির্ভর করে। সেই প্রবাহ বন্ধ হলেই ট্যাংক খালি হওয়ার ক্ষণগণনা শুরু হয়। সিডনি বিমানবন্দর এই ঝুঁকির উদাহরণ: পরের জ্বালানিবাহী জাহাজ না আসা পর্যন্ত পুনরায় মজুত করার আগে সেখানে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে।
এশিয়া জুড়ে ছড়াচ্ছে আঞ্চলিক সংকট
জ্বালানি সংকটে একা নয় অস্ট্রেলিয়া। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ধারাবাহিক সংকট দেখা দিয়েছে; প্রতিবেশী দেশগুলোও একই ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। থাইল্যান্ড ৬ মার্চ জেট জ্বালানিসহ পরিশোধিত তেলপণ্যের রপ্তানি নিষিদ্ধ করে এবং সরবরাহ সীমিত করে শুধু মিয়ানমার ও লাওসে। দক্ষিণ কোরিয়া গত বছরের মাত্রায় রপ্তানি সীমাবদ্ধ করেছে এবং আরও বিধিনিষেধ বিবেচনা করছে। নিজেদের কৌশলগত চাহিদা পর্যালোচনা করায় ভারত ও জাপানের শোধনাগারগুলোও নতুন রপ্তানি দরপত্র দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠেছে।
ভিয়েতনাম বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এপ্রিলে ফ্লাইট কমানোর প্রস্তুতি নিতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে। জেট জ্বালানির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আমদানি করে দেশটি; এর ৬০ শতাংশ আসে চীন ও থাইল্যান্ড থেকে। বড় আমদানিকারক পেট্রোলিমেক্স ও স্কাইপেক নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়েছে, তারা শুধু মার্চ মাস পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে পারবে। সংঘাত চলতে থাকলে অভ্যন্তরীণ জরুরি রুট ছাড়া অন্য বিমান চলাচল সীমিত করার আহ্বান জানিয়েছে স্কাইপেক। বিমান চলাচল কমাতে হলে উড়োজাহাজ রাখার জন্য অতিরিক্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে বিমানবন্দর পরিচালনাকারীদের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হ্যানয়ে বৈঠকের সময় ভিয়েতনামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে হোয়াই চুং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর কাছে বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিনও সহায়তার জন্য থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের কাছে আবেদন করেন। তবে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়া বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন বলে সরকারি নথিতে স্বীকার করেছে ভিয়েতনামি কর্তৃপক্ষ। সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ব্রুনেই ও ভারতের কথা উল্লেখ করা হলেও বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলো জেট জ্বালানির চেয়ে অন্য পেট্রোলিয়াম পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চাপে রয়েছে। নতুন সরবরাহকারী পাওয়া গেলেও দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় অনেক ফ্লাইট রুট অলাভজনক হয়ে উঠতে পারে বলে নথিতে সতর্ক করা হয়েছে।
ইরান সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে জ্বালানি সংকটকে আলাদা করে দেখা যায় না। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষের সংঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য হয়েছে এই জলপথে চলাচলকারী পরিবহন জাহাজ। ফলে প্রণালি দিয়ে ভবিষ্যতে যাতায়াত ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং অনেক জাহাজ কোম্পানি পুরো পথটিই এড়িয়ে চলছে।
এই বিঘ্ন এশিয়ার শোধনাগারগুলোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। চীনের মতো দেশ তাদের অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায়। কমসংখ্যক ট্যাংকার প্রণালি পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে, আর সরবরাহ ঘাটতি বা নিরাপত্তা উদ্বেগে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি শোধনাগার কার্যক্রম বন্ধ করায় এশিয়ার পরিশোধন সক্ষমতা তীব্রভাবে কমেছে। উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের অনুমান, যুদ্ধের কারণে এশিয়া জুড়ে প্রতিদিন ৬০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত অপরিশোধিত তেল পরিশোধন কমাতে হতে পারে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই এতে জ্বালানির প্রাপ্যতা আরও সংকুচিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার পর এশিয়ায় সাধারণত জ্বালানি পাঠানো উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি শোধনাগার পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
বাজারে এই চাপের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সিঙ্গাপুরে জেট জ্বালানির কাগুজে সোয়াপ লেনদেন হয়েছে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫৭ থেকে ১৬৩ ডলারে। সংঘাতের আগের প্রায় ৯২ ডলারের স্তর থেকে এটি ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি। ডিজেলের ডেরিভেটিভের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছেছে, আর পেট্রলের দাম হয়েছে ১৩৯.৮০ ডলার; ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যা ছিল ৭৯.৩০ ডলার। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ায়; সাধারণত জ্বালানি তাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনশীল ব্যয়। অর্থাৎ, বাস্তবে জ্বালানির ঘাটতি এড়ানো গেলেও উড়োজাহাজ সংস্থা ও যাত্রীদের জন্য উড্ডয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো
জ্বালানির দাম বাড়তে এবং সরবরাহ কমতে থাকায় অঞ্চলজুড়ে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো জরুরি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে যাত্রীদের ওপর। অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম উড়োজাহাজ সংস্থা এবং দেশটির জেট জ্বালানির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী কান্টাস জানিয়েছে, বাড়তি পরিচালন ব্যয় সামাল দিতে যাত্রীদের ভাড়া বাড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সংস্থাটি এখনো ফ্লাইট বাতিল করেনি, তবে শিল্প বিশ্লেষকদের সতর্কতা, মার্চের পর সরবরাহ না এলে ফ্লাইটের সময়সূচি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে এয়ার নিউজিল্যান্ড ইতোমধ্যে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের সময়সূচি থেকে ১,১০০টি ফ্লাইট বাদ দিয়েছে। ভিয়েতনামে সান ফুকোক এয়ারওয়েজ জ্বালানির দামের অস্থিরতার কারণে আগামী এক থেকে তিন মাসে ফ্লাইটের সময়সূচি সমন্বয়ের কথা নিয়ন্ত্রকদের জানিয়েছে। উড়োজাহাজ চলাচল কমাতে হলে অতিরিক্ত পার্কিংয়ের জায়গার ব্যবস্থা করতে বিমানবন্দর পরিচালনাকারীদের নির্দেশ দিয়েছে ভিয়েতনামের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
দেশের জ্বালানি সরবরাহ কতটা নাজুক, তা তুলে ধরে সিডনি বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী স্কট চার্লটন বলেছেন, আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নির্ভরতা তাৎক্ষণিক ঘাটতির বাইরেও নানা ঝুঁকি তৈরি করে।
এর অর্থ, ২৫ দিনের এই সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক নৌপথ, বৈশ্বিক পরিশোধন সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বাড়তে থাকা উত্তেজনার দিকে তাকালে বোঝা যায়, নির্গমনের মতোই জ্বালানি নিরাপত্তাও কেন গুরুত্বপূর্ণ।
টিকিটের দামের বাইরেও আর্থিক চাপ বাড়ছে। জ্বালানি আমদানিকারক পেট্রোলিমেক্স ও স্কাইপেক ভিয়েতনামের নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করে বলেছে, জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা দ্রুত তাদের ঋণসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে আরও নমনীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। মজুত ধরে রাখার ব্যয় বাড়া এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুরো অঞ্চলজুড়ে একই ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও জরুরি ব্যবস্থা
আসন্ন সরবরাহ সংকটের মুখে অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান জ্বালানির মজুত দীর্ঘায়িত করতে এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েকটি জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে। জলবায়ু ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন ঘোষণা করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়া হবে এবং আগামী ৬০ দিনের জন্য মানদণ্ড শিথিল করে বেশি সালফারযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে। এতে মাসে প্রায় ১০ কোটি লিটার পেট্রলের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। সরকার বাধ্যতামূলক মজুতের পরিমাণও কমিয়েছে: ডিজেলের মজুত ২৭০ কোটি লিটার থেকে কমিয়ে ২২০ কোটি লিটার এবং পেট্রলের মজুত ১০০ কোটি লিটার থেকে কমিয়ে ৭০ কোটি লিটার করা হয়েছে।
জ্বালানি নিষেধাজ্ঞার খবরের পর আতঙ্কে জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা দিলে সংসদে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন ক্রিস বোয়েন।
অস্ট্রেলীয়দের বলছি, যতটুকু জ্বালানি দরকার ততটুকুই কিনুন: এর বেশি নয়, কমও নয়। ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে মানুষকে জেরিক্যানে জ্বালানি ভরতে দেখেছি, বানিংসের জেরিক্যান শেষ হয়ে যেতে দেখেছি; আবার ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে গিয়ে বাড়তি দামে জ্বালানি বিক্রি করতেও দেখেছি। এটা অস্ট্রেলীয়দের কাজ নয়। এটা বিপজ্জনক। এমনটা করা উচিত নয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহের বৈচিত্র্য নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে জরুরি আলোচনার জন্য জাপান সফর করেছেন সম্পদমন্ত্রী ম্যাডেলিন কিং। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে বিকল্প সরবরাহপথ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে এসব আলোচনার। তবে এসব দেশও রপ্তানির চাপ এবং সরবরাহ কমে যাওয়ার মুখে রয়েছে। কিং জানিয়েছেন, আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিও থাকবে; যা এ অঞ্চলের বৃহত্তর জ্বালানি নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিফলন।
বৈশ্বিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সদস্য দেশগুলোকে জরুরি তেলের মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই পরিমাণ মোট বৈশ্বিক মজুতের এক-তৃতীয়াংশ এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ছাড়া ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলের তুলনায় অনেক বেশি। তবে ৯০ দিনের বাধ্যতামূলক মজুত ধরে রাখতে না পারায় সমন্বিত এই উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া পুরোপুরি অংশ নিতে পারছে না। ফলে বহুপক্ষীয় ভাগাভাগি ব্যবস্থার বদলে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দেশটিকে।
সামনের দিনগুলো অনিশ্চিত
আগামী কয়েক সপ্তাহেই বোঝা যাবে, বড় ধরনের বিমান চলাচল বিঘ্ন ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও তার আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা এই জ্বালানি সংকট সামাল দিতে পারবে কি না। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামলানো যায় এমন সরবরাহ সংকট থেকে শুরু করে রেশনিং প্রয়োজন হতে পারে এমন তীব্র ঘাটতি—বিভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে বিকল্প জ্বালানিবাহী জাহাজ নিয়মিত আসবে। এতে ফ্লাইটের সময়সূচি ঠিক রেখে দাম স্থিতিশীল হতে পারে, যদিও তা আগের চেয়ে বেশি থাকবে।
তবে জাহাজ চলাচলে বিলম্ব অব্যাহত থাকলে বা এশিয়ার আরও রপ্তানিকারক দেশ নিষেধাজ্ঞা দিলে অস্ট্রেলিয়ার বড় বিমানবন্দরগুলোতে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জরুরি ও সামরিক ফ্লাইটকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইট কমাতে এবং জ্বালানি রেশনিং চালু করতে পারে। ২৯ থেকে ৩২ দিনের সামান্য মজুতের অর্থ, কয়েক সপ্তাহের বেশি যেকোনো বিঘ্নে এসব জরুরি ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
যাত্রীদের জন্য তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে বিমানভাড়া বৃদ্ধি, জ্বালানি সারচার্জ এবং কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট বাতিল বা একীভূত হওয়ার ঝুঁকি। ছোট উড়োজাহাজে পরিচালিত আঞ্চলিক ফ্লাইট বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে, কারণ এসব পরিষেবার মুনাফার ব্যবধান সাধারণত কম এবং ব্যয় বেড়ে গেলে তা সামাল দেওয়ার সুযোগও সীমিত। এই সংকট মনে করিয়ে দিচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কতটা পরস্পরনির্ভর এবং ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কত দ্রুত স্থানীয় বিমানবন্দরে বাস্তব বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- চীন ২০২৬ সালের ১১ মার্চ থেকে জেট জ্বালানিসহ পরিশোধিত জ্বালানির সব রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিমান চলাচলের জ্বালানির ৩২ শতাংশ আসত চীন থেকে
- অস্ট্রেলিয়ার কাছে মাত্র ২৯ থেকে ৩২ দিনের জেট জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং দেশে জ্বালানি পরিশোধনের সক্ষমতা নেই; ফলে দেশটি পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীল
- বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানিবাহী জাহাজ না এলে এক মাসের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন
- ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোও জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করেছে, যার ফলে একাধিক দেশকে প্রভাবিত করা আঞ্চলিক সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে
- জেট জ্বালানির দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা সংঘাতের আগের দামের চেয়ে ৭০ শতাংশেরও বেশি। এতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো ভাড়া বাড়ানো ও ফ্লাইট কমানোর কথা ভাবছে
- বিকল্প উৎস খুঁজতে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরবরাহ বাড়াতে অস্ট্রেলীয় সরকার জ্বালানির মানদণ্ড শিথিল করেছে এবং বাধ্যতামূলক মজুতের পরিমাণ কমিয়েছে






