পাইপলাইন বিকল্প অপ্রতুল, হরমুজ অবরোধে এশিয়ার জ্বালানি দুর্বলতা স্পষ্ট

পড়তে 9 মিনিট
Tankers showing caution around Strait of Hormuz after U.S. attack on ...

কৌশলগত জলপথ বন্ধে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা

আরব উপদ্বীপ ও ইরানকে আলাদা করা সরু জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বিশ্বের তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য চলাচল-নিষিদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা শুরুর পর তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল বন্ধের উদ্যোগ নেয়। এর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে গুরুতর বিঘ্নগুলোর একটি দেখা দিয়েছে। অস্থির লেনদেনে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে।

সূচিপত্র
  1. কৌশলগত জলপথ বন্ধে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা
  2. সরবরাহ বিঘ্নের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এশিয়ায়
  3. পাইপলাইনের বিকল্পে স্বস্তি সীমিত
  4. নিরাপত্তাঝুঁকি রয়ে গেছে
  5. অবকাঠামো কেন এখনো অপ্রতুল
  6. ভারতের জরুরি সরবরাহ-বৈচিত্র্য উদ্যোগ
  7. প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও সমান্তরাল সংকট
  8. বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে অর্থনৈতিক প্রভাব
  9. প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে নতুন বিকল্প
  10. জেনে রাখুন

সবচেয়ে সরু অংশে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া এই সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। এই পরিমাণ বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশ। জলপথটি বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ১৫০টি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার প্রতিকূল জলসীমা দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে নোঙর করে থাকে। এতে সরবরাহে এমন ধাক্কা লাগে, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

সরবরাহ বিঘ্নের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এশিয়ায়

বিশ্বের তেলপ্রবাহের ভৌগোলিক বিন্যাসের কারণে এই সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল এশিয়া। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৮৩ শতাংশ যায় এশীয় বাজারে। হরমুজ দিয়ে প্রবাহিত অপরিশোধিত তেলের মোট পরিমাণের ৪৪ শতাংশের গন্তব্য চীন ও ভারত। সংকটের আগে দেশ দুটি মিলিয়ে প্রতিদিন ৮২ লাখ ব্যারেল তেল পেত।

পরম পরিমাণে কম হলেও নিজেদের উৎপাদনের তুলনায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নির্ভরতা আরও বেশি। দেশ দুটিতে কার্যত নিজস্ব অপরিশোধিত তেল উৎপাদন নেই, ফলে তাদের অর্থনীতি আমদানি স্থিতিশীলতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাইওয়ানও একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নে এসব উৎপাদনশীল অর্থনীতির শিল্প উৎপাদন হুমকিতে পড়বে।

এমনকি চীনও এই সংকটের প্রভাব পুরোপুরি এড়াতে পারবে না। দেশটিতে দৈনিক প্রায় ৪৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদিত হয় এবং আনুমানিক ১২০ কোটি ব্যারেলের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত রয়েছে। বেইজিং দ্রুত যানবাহনের বিদ্যুতায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ করলেও অর্থনীতি সচল রাখতে দেশটির বিপুল পরিমাণ পেট্রোলিয়াম আমদানি দরকার। বর্তমান সংকট এসব আগাম প্রস্তুতির সীমা যাচাই করছে।

বিজ্ঞাপন

পাইপলাইনের বিকল্পে স্বস্তি সীমিত

হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের সক্ষমতা আছে—এমন কার্যকর অবকাঠামো রয়েছে শুধু সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের। সৌদি ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা পেট্রোলাইন নামেও পরিচিত, পারস্য উপসাগরের কাছে আবকাইক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পর্যন্ত ১,২০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনটি ৩৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ; এটি হাবশান থেকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ পর্যন্ত গেছে।

তবে এসব বিকল্প পথের সক্ষমতা হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত তেলের তুলনায় অনেক কম। সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের নিশ্চিত করেছেন, ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেলের পূর্ণ কার্যক্ষমতায় পৌঁছেছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পশ্চিম উপকূলের দেশীয় শোধনাগারগুলোতে যায়, ফলে রপ্তানির জন্য থাকে মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইনটি দৈনিক ১৫ লাখ থেকে ১৮ লাখ ব্যারেল পরিবহন করতে পারে, যদিও কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনার কারণে প্রকৃত পরিবহন এর চেয়ে কম হয়েছে।

দুটি বিকল্প পাইপলাইন মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল পরিবহন করতে পারে, যা হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এসব পাইপলাইন সাধারণত পূর্ণ সক্ষমতায় চলে না। হিসাব বলছে, সংকটের আগে প্রকৃত অব্যবহৃত সক্ষমতা ছিল দৈনিক মাত্র ২৬ লাখ ব্যারেল। সর্বোচ্চ ব্যবহার করলেও ঘাটতি বিপুলই থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তাঝুঁকি রয়ে গেছে

এসব বিকল্প পথ ঝুঁকি দূর করার বদলে নতুন ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করছে। ইয়ানবু দিয়ে রপ্তানি করা সৌদি তেলকেও লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পেরোতে হয়। ইয়েমেনের হুতি বাহিনী এর আগে এই জলপথের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। ফুজাইরাহ টার্মিনাল হরমুজের বাইরে হলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্লার এত কাছে যে ১৬ মার্চের হামলার পর সেখানে জাহাজে তেল তোলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ফুজাইরাহর মজুতকেন্দ্রগুলোতেও হামলা হয়েছে, ফলে ট্যাংকারগুলোকে যাত্রা শুরুর আগে আংশিকভাবে তেল বোঝাই করতে হচ্ছে।

অবকাঠামো কেন এখনো অপ্রতুল

বিকল্প রপ্তানি পথ নিয়ে কয়েক দশকের কৌশলগত অবহেলার চিত্র বর্তমান সংকটে স্পষ্ট হয়েছে। ১৯৮০-এর দশক থেকেই হরমুজ যে বড় ধরনের ঝুঁকি—তা জানা থাকলেও উপসাগরীয় উৎপাদকরা বিকল্প সক্ষমতার চেয়ে দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সামুদ্রিক হামলা এড়াতে সৌদি আরব ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সম্প্রসারণে সত্যিকারের সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরির বদলে সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধার কারণে নতুন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণে সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের কোনো বিকল্প পথই নেই, ফলে তারা পুরোপুরি হরমুজ দিয়ে চলাচলের ওপর নির্ভরশীল। একসময় সৌদি আরবের সঙ্গে লেবাননের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলকে যুক্ত করা ট্রান্স-অ্যারাবিয়ান পাইপলাইন ১৯৯০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এখন এটি পরিত্যক্ত ঐতিহ্যস্থল হিসেবে পড়ে আছে।

জ্বালানিবিষয়ক ইতিহাসবিদ এবং এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ভাইস চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল ইয়েরগিন বলেন, তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক উদ্বেগে মনোযোগী নীতিনির্ধারকদের কাছে দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতিটি অসম্ভাব্য মনে হয়েছিল। প্রচলিত ধারণা ছিল, প্রণালি খোলা রাখতে ভোক্তা দেশগুলো যথেষ্ট সামরিক সুরক্ষা দেবে, ফলে ব্যয়বহুল বিকল্প অবকাঠামো তৈরির অর্থনৈতিক প্রণোদনা কম থাকবে।

দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি সব সময়ই ছিল, কিন্তু সেটিকে খুব একটা সম্ভাব্য মনে হয়নি। জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য বা নিরাপত্তা আসবে এই বিষয়টি থেকে যে ভোক্তা দেশগুলো তেল সুরক্ষায় সেখানে থাকবে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের জরুরি সরবরাহ-বৈচিত্র্য উদ্যোগ

দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা বদলানোর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায়। সংকটের আগে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ দৈনিক ২৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ ব্যারেল, হরমুজ দিয়ে আসত। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির শোধনাগারগুলো এখন হরমুজের বাইরে থেকে ৭০ শতাংশ সরবরাহ সংগ্রহ করছে। তারপরও উল্লেখযোগ্য সরবরাহ ঘাটতি রয়ে গেছে।

ভারতের শোধনাগারগুলো দ্রুত সৌদি আরবের ইয়ানবু টার্মিনাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে ঝুঁকেছে। পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে ইয়ানবু থেকে ভারতে সৌদি অপরিশোধিত তেল বোঝাই বেড়ে ৮৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়; আগের মাসগুলোতে এ পথে কোনো তেল আসেনি। ফুজাইরাহ পাইপলাইন দিয়েও অতিরিক্ত তেল আসছে। তবে সংঘাতপূর্ণ এলাকার কাছে চলাচল আড়াল করতে কিছু জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখায় এসব সরবরাহের হিসাব রাখা কঠিন।

নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১০ লাখ টন সরবরাহ বহনকারী ২০টি বৃহৎ গ্যাসবাহী জাহাজের ব্যবস্থাও করেছে। জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরের বিকল্প পথ দিয়ে আসছে। সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে, জরুরি এসব চালান পৌঁছাচ্ছে, তবে এগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে হারানো সরবরাহ পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে না বলেও স্বীকার করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও সমান্তরাল সংকট

সংবাদ শিরোনামে অপরিশোধিত তেল প্রাধান্য পেলেও এলএনজি বাজারেও সমান গুরুতর সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার প্রায় সব উৎপাদনই হরমুজ দিয়ে পরিবহন করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও গ্যাস রপ্তানির জন্য একই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দেশ দুটি মিলে বিশ্বের এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশের জোগান দেয়, যার প্রধান গন্তব্য এশিয়ার বাজার।

অপরিশোধিত তেলের বিপরীতে এলএনজি পরিবহনের কোনো বিকল্প পাইপলাইন নেই। তরলীকরণ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে বা সেখান থেকে ট্যাংকারে গ্যাস তোলা সম্ভব না হলে, সেই গ্যাস বাজারে পৌঁছানো যায় না। সংঘাত শুরুর কিছুক্ষণ পরেই কাতার এনার্জি চুক্তিগত দায়বদ্ধতা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। বছরে স্বাভাবিকভাবে ১১২ বিলিয়ন ঘনমিটারের বেশি গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব দেশ এলএনজির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হরমুজ দিয়ে আমদানি করে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পাকিস্তানের ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, আর বাংলাদেশের বিদ্যুতের ২৫ শতাংশের জোগান দেয় গ্যাস। একেকটি লেনদেন পর্বে দাম ৩৯ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এসব সরকার পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা জারি করেছে; এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে অর্থনৈতিক প্রভাব

সরবরাহ বিঘ্নে বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পেট্রল, ডিজেল, জেট জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামও দ্রুত বেড়েছে। উত্তর গোলার্ধের কৃষকেরা এখন বপনের মৌসুমে প্রবেশ করছেন। উৎপাদন উপকরণের বাড়তি ব্যয় কয়েক মাস পর খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।

এশীয় সরকারগুলো জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে দাম নিয়ন্ত্রণ—বিভিন্ন জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ধরে রাখতে চীন শোধনাগারগুলোকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানির দামের সর্বোচ্চ সীমা ঘোষণা করেছে। প্রায় ১৫০ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো কৌশলগত মজুত থাকায় জাপানে তাৎক্ষণিক ঘাটতি দেখা দেয়নি, তবে দাম বাড়ার চাপ অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার সুপারিশ করার পরিকল্পনা করছে। সংস্থাটির ইতিহাসে এটি হবে সমন্বিত মজুত ছাড়ার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। তবু এত বড় পদক্ষেপেও অনির্দিষ্টকাল ধরে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।

প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে নতুন বিকল্প

মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সীমিত থাকায় এশীয় ক্রেতারা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে উত্তর আমেরিকার দিকে ক্রমেই বেশি নজর দিচ্ছেন। কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো—বিশেষ করে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কিটিমাটে এলএনজি কানাডা প্রকল্প এবং ভ্যাঙ্কুভার পর্যন্ত সম্প্রসারিত ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইন—এমন পথ দিচ্ছে, যা শুধু হরমুজ নয়, মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরের মতো অন্যান্য সংকীর্ণ জলপথও এড়িয়ে যায়।

২০২৫ সালের জুন থেকে চালু এলএনজি কানাডা টার্মিনাল থেকে কার্গো সরাসরি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠানো হয় এবং ১০ থেকে ১১ দিনে উত্তর-পূর্ব এশিয়ার টার্মিনালে পৌঁছায়। পানামা খাল পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে এলএনজি আসতে যে ২৪ দিন লাগে, তার তুলনায় এটি সুবিধাজনক। একইভাবে, আলবার্টা থেকে ট্রান্স মাউন্টেন সম্প্রসারণ পাইপলাইন দিয়ে—যার দৈনিক সক্ষমতা ৮ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল—কানাডীয় অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্যের সংকীর্ণ জলপথ পুরোপুরি এড়িয়ে আসে।

তবে এসব বিকল্পের সরবরাহ বাড়াতে কয়েক বছর লাগবে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বিবেচনাধীন এলএনজি কানাডার দ্বিতীয় পর্যায়ে বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টন সক্ষমতা যোগ হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনপুষ্ট প্রস্তাবিত আলাস্কা এলএনজি প্রকল্পের এখনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নেই, এবং ২০৩১ সালের আগে রপ্তানি শুরুর সম্ভাবনা নেই।

বিজ্ঞাপন

জেনে রাখুন

  • হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ।
  • হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের ৮৪ শতাংশ এবং এলএনজির ৮৩ শতাংশ যায় এশিয়ায়। অপরিশোধিত তেলের প্রবাহের ৪৪ শতাংশ পায় চীন ও ভারত, দুই দেশ মিলিয়ে।
  • সৌদি আরবের ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন মিলিয়ে দৈনিক মাত্র ৬০ লাখ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল বিকল্প পথে নিতে পারে, যা হরমুজের স্বাভাবিক প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশ।
  • ভারত আমদানির পথ বদলে হরমুজের বাইরে থেকে ৭০ শতাংশ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। তবে ঘাটতি রয়ে গেছে, যা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জরুরি চালান আনতে হচ্ছে।
  • কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে, যার সবই হরমুজ দিয়ে যায়। প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য কোনো বিকল্প পাইপলাইন নেই।
  • ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছেছে। একেকটি লেনদেন পর্বে এলএনজির বেঞ্চমার্ক দাম বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।
  • সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা কৌশলগত মজুত থেকে ঐতিহাসিক ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার পরিকল্পনা করছে।
  • কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো ভূরাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বিকল্প দিচ্ছে, তবে সরবরাহ বাড়াতে কয়েক বছরের উন্নয়ন দরকার।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে