মানবজাতির প্রাচীনতম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দৌড়
মঙ্গলগ্রহ থেকে ভৌত নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার এমন লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে চীন, যা আগে কোনো দেশ অর্জন করতে পারেনি। ২০২৮ সালে দুটি রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে তিয়ানওয়েন-৩ মিশনের। ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৫০০ গ্রাম মঙ্গলগ্রহের উপাদান পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য এর, যা গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানে ঐতিহাসিক প্রথম অর্জনের পাশাপাশি বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। মিশনের প্রধান নকশাবিদ লিউ জিঝং মার্চে চীনের বার্ষিক রাজনৈতিক অধিবেশনে জানান, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে প্রকল্পটি অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং এ বছর ফ্লাইট মডেল তৈরির পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এই সময়সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলগ্রহে যাওয়া ও ফিরে আসার প্রতিযোগিতায় অন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলোকে পেছনে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে চীনের। এর তাৎপর্য জাতীয় মর্যাদার গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত।
সূচিপত্র
বহু বছরের পরিকল্পনার পরিণতি এই মিশন, যা মঙ্গলগ্রহে চীনের আগের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২০২১ সালে তিয়ানওয়েন-১ মিশনের অংশ হিসেবে ঝুরং রোভার মঙ্গলে অবতরণ করে। এর মধ্য দিয়ে মঙ্গলপৃষ্ঠে রোভার চালানো দ্বিতীয় দেশ হয় চীন। ওই মিশনে পৃষ্ঠের নিচে মাটি ও নুড়ির সঙ্গে মিশে থাকা জলীয় বরফের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিস্তারিত পরীক্ষাগার বিশ্লেষণের জন্য ভৌত নমুনা ফিরিয়ে আনার বৈজ্ঞানিক আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় এ আবিষ্কার। পৃথিবী থেকে লাখ লাখ কিলোমিটার দূরে ক্ষুদ্রায়তনের যন্ত্রপাতি বহন করতে হয় রোবট অনুসন্ধানযানগুলোকে। অন্যদিকে, ফিরিয়ে আনা নমুনা বিশ্লেষণে পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষাগার-সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা অণুবীক্ষণিক জীবাশ্ম, জৈব যৌগ এবং রাসায়নিক চিহ্ন খুঁজতে পারবেন, যা ইঙ্গিত দিতে পারে যে আমাদের প্রতিবেশী গ্রহে কখনো প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না।
বিষয়টির গুরুত্ব বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের চেয়েও বড়। সফল হলে, সম্ভাব্য প্রাণধারণে সক্ষম অন্য কোনো গ্রহ থেকে মানবজাতির উপাদান সংগ্রহ করে আনার ঘটনা হবে তিয়ানওয়েন-৩, যা গ্রহ অনুসন্ধানে চীনকে নেতৃত্বের আসনে বসাবে এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে। সংবাদমাধ্যমকে মিশনটির ঘোষণা দেওয়ার সময় লিউ জিঝং একে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, অগ্রণী এবং বড় মাপের মহাকাশ প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিয়ানওয়েন-৩ মিশন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, উদ্ভাবনী ও অগ্রণী একটি বড় মাপের মহাকাশ প্রকল্প। আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে মঙ্গলগ্রহের নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে মানবজাতি প্রথম সাফল্য অর্জন করবে। এতে মহাকাশবিজ্ঞান, মহাকাশপ্রযুক্তি ও মহাকাশের ব্যবহারিক প্রয়োগের সমন্বিত উচ্চমানের উন্নয়ন ব্যাপকভাবে এগিয়ে যাবে।
অভূতপূর্ব এক মিশনের প্রকৌশল
একটি মাত্র উৎক্ষেপণের ওপর নির্ভরশীল আগের মঙ্গল মিশনগুলোর বিপরীতে, তিয়ানওয়েন-৩-এ রয়েছে জটিল দুই-উৎক্ষেপণ পরিকল্পনা, যার জন্য একাধিক মহাকাশযানের মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় দরকার। ২০২৮ সালের শেষ দিকে মঙ্গলে যাওয়ার উপযুক্ত উৎক্ষেপণ-সময়ে দুটি লং মার্চ ৫ রকেট উড্ডয়ন করবে। প্রতিটি রকেটে থাকবে মিশনের আলাদা উপাদান। একটি রকেট বহন করবে অরবিটার ও পৃথিবীতে ফেরার যান, আর অন্যটি নেবে আরোহনযান ও সার্ভিস মডিউল-সজ্জিত ল্যান্ডার। একই সঙ্গে অবতরণ ও প্রত্যাবর্তন ব্যবস্থা মঙ্গলে পাঠাতে বিপুল শক্তির প্রয়োজন। দুই রকেটের এই পদ্ধতিতে সেই চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিটি অংশে নিজ নিজ কাজের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মিশনের ধাপগুলো তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলবে এবং এতে রয়েছে ১৩টি স্বতন্ত্র পর্যায়। সাত থেকে আট মাসের আন্তগ্রহ ভ্রমণের পর ল্যান্ডারটি মঙ্গলপৃষ্ঠের ১৭ থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে সতর্কভাবে বাছাই করা স্থানে অবতরণ করবে। সেখানে প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা ও বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্য রাখা হয়েছে। অবতরণের সময় মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব যেন গতি কমানোর জন্য যথেষ্ট থাকে, সে জন্য মহাকাশযানটিকে গ্রহটির বৈশ্বিক গড় উচ্চতার চেয়ে অন্তত তিন কিলোমিটার নিচে অবতরণ করতে হবে। পৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর ল্যান্ডারটি প্রায় এক বছর কাজ করবে। এ সময় পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ, গভীর খনন এবং কয়েক শ মিটার দূরের স্থান থেকে ড্রোনের সহায়তায় নমুনা আনার মতো একাধিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আরোহন পর্ব। নমুনা সংগ্রহ ও সিল করার পর ল্যান্ডারকে উৎক্ষেপণমঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে আরোহনযানটিকে মঙ্গলপৃষ্ঠ থেকে উড্ডয়ন করতে হবে। গ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে প্রথমবারের মতো মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে এটি। কক্ষপথে অপেক্ষমাণ অরবিটারের সঙ্গে মিলিত হয়ে ডক করতে হবে আরোহনযানটিকে এবং ফেরার যান পৃথিবীর পথে রওনা হওয়ার আগে মূল্যবান নমুনাগুলো হস্তান্তর করতে হবে। মঙ্গলের কক্ষপথে এ ধরনের মিলন কখনো চেষ্টা করা হয়নি। যোগাযোগে ২০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্ব হওয়ায় পৃথিবী থেকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে না; তাই পরিবেশটিতে অত্যন্ত নির্ভুল দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
প্রাচীন প্রাণের প্রমাণের খোঁজে খনন
তিয়ানওয়েন-৩ মিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য হলো জৈবচিহ্নের সন্ধান: মঙ্গলে একসময় প্রাণ ছিল এমন ভৌত বা রাসায়নিক নির্দেশক। আগের মিশনগুলোতে জৈব অণু ও প্রাচীন হ্রদের তলদেশের সন্ধান মিলেছে। তবে পৃথিবীর উন্নত পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের সুযোগ অতীতে অণুজীবের প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার সেরা সম্ভাবনা দেবে। এই সম্ভাবনা বাড়াতে মিশন পরিকল্পনাকারীরা উচ্চাভিলাষী নমুনা সংগ্রহ পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মঙ্গলপৃষ্ঠের দুই মিটার নিচ পর্যন্ত খনন, যা আগে কোনো মঙ্গল মিশনে চেষ্টা করা হয়নি এবং অন্য কর্মসূচিগুলোর পরিকল্পিত অগভীর নমুনা সংগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
জীবজগতের উৎস অনুসন্ধানে এই গভীরতা গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলের বৈশ্বিক চৌম্বকক্ষেত্র নেই এবং বায়ুমণ্ডলও পাতলা। ফলে এর পৃষ্ঠে অবিরাম মহাজাগতিক বিকিরণ আঘাত হানে এবং অত্যন্ত জারক রাসায়নিকের সংস্পর্শে জৈব উপাদান সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়। এই প্রতিকূল পৃষ্ঠস্তরের নিচে খনন করে এমন পলিতে পৌঁছানোর আশা করছে মিশনটি, যা কোটি কোটি বছর ধরে বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত ছিল। সেখানে জৈব যৌগ, এমনকি এমন সময়ের অণুবীক্ষণিক জীবাশ্মও সংরক্ষিত থাকতে পারে, যখন মঙ্গলে তরল পানি ও অপেক্ষাকৃত ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল। কঠিন মঙ্গলীয় পরিবেশে নমুনার অখণ্ডতা বজায় রেখে খননযন্ত্রটিকে শিলাস্তরের মতো বাধা শনাক্ত করে এড়াতে হবে।
অবতরণস্থল বাছাইয়ের প্রক্রিয়াতেও মিশনের জীববৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের লক্ষ্য প্রতিফলিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রাথমিকভাবে ৮০টির বেশি সম্ভাব্য স্থানের তালিকা থেকে ৮৬টি স্থান চিহ্নিত করেছেন। এরপর সেগুলো যাচাই করে আমাজোনিস প্লানিশিয়া, ইউটোপিয়া প্লানিশিয়া ও ক্রাইসে প্লানিশিয়ায় কেন্দ্রীভূত ১৯টি প্রধান স্থানে নামিয়ে এনেছেন। এসব অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন উপকূলরেখা, বদ্বীপের পলি, কাদামাটির খনিজ এবং গিরিখাতের ব্যবস্থা। পানিসমৃদ্ধ পরিবেশে এসব বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়, যেখানে প্রাণের উদ্ভব ও সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ও প্রকৌশলগত নিরাপত্তার মধ্যে সর্বোত্তম ভারসাম্য রাখা তিনটি চূড়ান্ত সম্ভাব্য স্থান বেছে নেবে দলটি। অতীতে পানির উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয় এমন জলযুক্ত খনিজ আছে, এমন স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিরাপদ অবতরণের জন্য ঢালের কোণ ৮ ডিগ্রির নিচে এবং পাথরের পরিমাণ ১০ শতাংশের কম হওয়ার কঠোর শর্তও পূরণ করতে হবে।
বেইজিংয়ের বৈশ্বিক অংশীদারদের আমন্ত্রণ
মিশনের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়ে চীনের আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত দিয়ে চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ২০২৫ সালের ১১ মার্চ ঘোষণা করে, তিয়ানওয়েন-৩-এ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাব আহ্বানে পৃথিবীতে ফেরার অরবিটারে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের তৈরি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির জন্য ১৫ কেজি এবং মঙ্গলের অরবিটারে আরও ৫ কেজি পেলোড বহনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশনে বৈজ্ঞানিক অংশীদারত্ব ভাগ করে নেওয়ার দিকে এটি বড় পদক্ষেপ। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২০২৫ সালের ৩০ জুন এবং চূড়ান্ত বাছাই একই বছরের অক্টোবরে হওয়ার কথা।
আগ্রহী আন্তর্জাতিক দলগুলো তিয়ানওয়েন-৩ মহাকাশযানের সহায়তা দরকার এমন সহযাত্রী পেলোড অথবা মিশনের সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের প্রস্তাব দিতে পারবে। নির্বাচিত অংশীদারদের ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের ফ্লাইট হার্ডওয়্যার সরবরাহ করতে হবে, যাতে ২০২৮ সালের উৎক্ষেপণের আগে তা মহাকাশযানে যুক্ত করা যায়। প্রস্তাবিত গবেষণা প্রাণের সন্ধান, মঙ্গলগ্রহের ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা অথবা বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের পরিপূরক হতে হবে। তবে মিশনের মূল্য বাড়ায় এমন নতুন ধারণাকেও স্বাগত জানানো হবে। এই সহযোগিতার কাঠামো তিয়ানওয়েন-৩-কে শুধু একটি জাতীয় প্রকল্পের বদলে মানবজাতির অভিন্ন বৈজ্ঞানিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের শিক্ষাবিদ হৌ জেংছিয়ান সম্প্রতি নেচার অ্যাস্ট্রোনমিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সহযোগিতার এ পদ্ধতির ওপর জোর দেন। তিনি জানান, লক্ষ্য নির্ধারণের পর্যায়ে চীন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল এবং গ্রহ-সুরক্ষা বিধি পূরণ হলে বিশ্বজুড়ে গবেষকদের জন্য ফিরিয়ে আনা নমুনায় প্রবেশাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হৌ আশা প্রকাশ করেন, মিশনটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে জানার অভূতপূর্ব সুযোগ দেবে। মঙ্গলীয় উপাদান প্রথমবারের মতো পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক উদ্যোগে অংশ নিতে চাওয়া ইউরোপীয়, এশীয় ও অন্যান্য মহাকাশ-সক্ষম দেশের অংশীদারত্বও এতে আকৃষ্ট হতে পারে।
গ্রহ-সুরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা
অন্য গ্রহ থেকে উপাদান ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে, যার সমাধানে মিশন পরিকল্পনাকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। মহাকাশ গবেষণা কমিটির প্রণীত গ্রহ-সুরক্ষা বিধিতে পৃথিবীর জীব দিয়ে মঙ্গলকে দূষিত করা এবং সম্ভাব্য মঙ্গলীয় প্রাণ দিয়ে পৃথিবীকে দূষিত করা, উভয়ই ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চীন এসব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে। কারণ, জৈবিক কোনো আবিষ্কার সত্যিই মঙ্গল থেকে এসেছে, পৃথিবী থেকে বহন করা দূষক নয়, তা নিশ্চিত করার ওপরই মিশনের বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে। মিশনের প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় চীনা বিজ্ঞান একাডেমির ভৌতবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের কাছে হেফেইয়ের উপকণ্ঠে বিশেষায়িত মঙ্গল নমুনা পরীক্ষাগার নির্মাণ করছে চীন। এই স্থাপনায় থাকবে অতি পরিচ্ছন্ন কক্ষ এবং জৈব-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এলাকা। সেখানে ফিরিয়ে আনা নমুনাগুলো বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কাছে উন্মুক্ত করার আগে ব্যাপক পরীক্ষা, জীবাণুমুক্তকরণ এবং জৈবিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। কঠোর বিশ্লেষণে সক্রিয় জৈব উপাদান নেই বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নমুনাগুলো পৃথিবীর পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য বিশ্বের নির্ধারিত পরীক্ষাগারগুলোতে উপাদান বিতরণ করা হবে।
মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোতে ইতিমধ্যে অগ্রগতি অর্জন করেছে প্রকৌশল দল। এর মধ্যে রয়েছে মঙ্গলপৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ ও সিল করা, পৃষ্ঠ থেকে আরোহন, কক্ষপথে মিলন এবং নমুনা স্থানান্তরের ব্যবস্থা। বিশেষ মাটির নমুনা সংগ্রহব্যবস্থা তৈরি করতে হবে মিশনটির জন্য। এর মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে নিরাপদে সিল করতে হবে, যাতে উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছায়। লিউ জিঝং বলেন, মঙ্গল থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনা অ্যাপোলো কর্মসূচির পর থেকে মহাকাশ অনুসন্ধানের সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং মিশন এবং এ ধরনের নমুনা ফিরিয়ে আনার সাফল্য এখনো কেউ অর্জন করেনি। এতে শুধু যান্ত্রিক ব্যবস্থার জটিলতাই নয়, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ও হেফাজতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত। মঙ্গলপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ ও পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ পর্যন্ত নমুনার অখণ্ডতা রক্ষা করতে হবে।
মহাকাশ অনুসন্ধানে বৈশ্বিক সমীকরণের পরিবর্তন
চীন যখন ২০২৮ সালের উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে এগোচ্ছে, তখন নাসার প্রতিদ্বন্দ্বী মঙ্গল নমুনা প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি (এমএসআর) বড় অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের একটি বরাদ্দ বিল কার্যত বর্তমান এমএসআর কাঠামো বাতিল করে দেয় এবং নমুনা প্রত্যাবর্তন মিশনের বদলে ভবিষ্যতের মঙ্গল প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য ১১ কোটি ডলার বরাদ্দ করে। এমএসআর-এর নতুন উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে সিনেটে অনুমোদন বিল বিবেচিত হলেও, ২০৩০-এর দশকের আগে মঙ্গলীয় নমুনা ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট পথ এখনো নেই যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে এই মাইলফলক অর্জনে চীনের প্রথম হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, আর এর সঙ্গে আসতে পারে বৈজ্ঞানিক ও কূটনৈতিক সুবিধা।
সময়সূচির এই পরিবর্তনের কৌশলগত তাৎপর্য বৈজ্ঞানিক মর্যাদার বাইরেও বিস্তৃত। প্রথম যে দেশ মঙ্গলীয় নমুনা ফিরিয়ে আনবে, বৈশ্বিক গবেষক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই মূল্যবান উপাদানের প্রাথমিক বণ্টন তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কয়েক দশক ধরে জ্যোতির্জীববিজ্ঞান গবেষণার গতিপথও এতে প্রভাবিত হতে পারে। মঙ্গলের নমুনা থেকে জানা যেতে পারে, আমাদের সৌরজগতের দুটি গ্রহে স্বাধীনভাবে প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল কি না। এমন আবিষ্কার জীববিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের ধারণা মৌলিকভাবে পাল্টে দিতে পারে এবং ইঙ্গিত দিতে পারে যে মহাবিশ্বজুড়ে প্রাণের অস্তিত্ব সাধারণ ঘটনা। অন্য কর্মসূচিগুলো বিলম্বের মুখে পড়লে চীন সফল হলে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও পেলোডের সুযোগ ক্রমেই বেইজিংয়ের মহাকাশ উদ্যোগগুলোর দিকে যেতে পারে।
গভীর মহাকাশে সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এগোচ্ছে চীনের অগ্রগতি। ২০২৫ সালে উৎক্ষেপিত তিয়ানওয়েন-২ বর্তমানে পৃথিবীর কাছের গ্রহাণু কামুওওয়ালেয়ার পথে রয়েছে। প্রায় ৭০ কোটি কিলোমিটার পাড়ি দেওয়ার পর এটি এ বছর লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ পৃথিবীতে ফিরবে। আরও দূরের পরিকল্পনায়, বৃহস্পতি ব্যবস্থার গবেষণা এবং শেষ পর্যন্ত গ্যাসীয় দানবটির বরফাচ্ছাদিত উপগ্রহগুলোর একটি ক্যালিস্টোকে প্রদক্ষিণ করতে ২০৩০ সালের দিকে তিয়ানওয়েন-৪ উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। চন্দ্র থেকে মঙ্গল, তারপর সৌরজগতের বাইরের অংশ অনুসন্ধানের এ ধারাবাহিক অগ্রগতি গভীর মহাকাশবিজ্ঞানে চীনের সুপরিকল্পিত পদ্ধতি এবং মহাকাশ অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির অঙ্গীকার তুলে ধরে।
প্রোটোটাইপ থেকে লাল গ্রহে
ফ্লাইট মডেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে এবং ২০২৬ সালে প্রোটোটাইপ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হার্ডওয়্যার নির্মাণের পর্যায়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিয়ানওয়েন-৩ দল নকশা যাচাই থেকে বাস্তব যন্ত্রাংশ সংযোজনের দিকে এগোচ্ছে। মিশনের ১৩টি পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ, মঙ্গলে যাত্রা, প্রবেশ, অবতরণ ও পৃষ্ঠে নামা, পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ, আরোহন, মঙ্গলের কক্ষপথে মিলন, পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরত্বজুড়ে প্রতিটি পর্যায় নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। উৎক্ষেপণ থেকে ২০৩১ সালে নমুনা ফেরানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তিন বছরের বেশি সময় লাগবে। জ্যোতির্জীববিজ্ঞানের অগ্রাধিকার পূরণে মহাকাশযানে উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি থাকবে।
মিশনের জন্য নির্বাচিত যন্ত্রপাতিতে প্রাণের সন্ধান প্রতিফলিত হয়েছে। ল্যান্ডারে থাকবে ভূগর্ভস্থ স্তর অনুসন্ধানের জন্য মঙ্গল ভূগর্ভভেদী রাডার এবং জৈব উপাদান ও খনিজ শনাক্ত করার জন্য রামান ও ফ্লুরোসেন্স বিশ্লেষক। নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভারের যন্ত্রপাতির সঙ্গে এ দুটির মিল রয়েছে। বিশেষায়িত ম্যাগনেটোমিটার ও উচ্চশক্তির কণা শনাক্তকারী যন্ত্রের সাহায্যে অরবিটারগুলো বায়ুমণ্ডল হারানোর প্রক্রিয়া ও চৌম্বকক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করবে। আর চিত্রগ্রহণব্যবস্থা মধ্য-অবলোহিত ও বহুবর্ণালী ব্যান্ডে পৃষ্ঠের গঠন মানচিত্রে তুলে ধরবে। মিশন বিজ্ঞানীদের নির্ধারিত নয়টি গবেষণার বিষয়কে সহায়তা করবে এসব যন্ত্র, যার আওতায় রয়েছে প্রাণসংশ্লিষ্ট উপাদান, পরিবেশগত অবস্থা এবং পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্য থেকে অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা পর্যন্ত ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস।
উন্নয়নকাজ চলার পাশাপাশি, চীনা সৃজনশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রদর্শনী হিসেবে নেতৃত্ব যে উদ্যোগকে বর্ণনা করেছে, তাতে অংশ নিতে দেশি ও বিদেশি বিজ্ঞানীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তিয়ানওয়েন-৩ প্রাচীন মঙ্গলীয় প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ খুঁজে পাক বা জীবহীন কিন্তু ভূতাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় এক জগতের গল্প বলা নমুনা ফিরিয়ে আনুক, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলা প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে এ মিশনের। পৃথিবীর বাইরে মানবজাতির পরবর্তী পদক্ষেপ এটি। এর পেছনে রয়েছে সেই দর্শন: পৃথিবী মানবজাতির দোলনা হলেও আমরা চিরকাল দোলনায় থাকতে পারি না।
মূল তথ্য
- লং মার্চ ৫ রকেটে ২০২৮ সালে দুটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে তিয়ানওয়েন-৩ মিশনের; ২০৩১ সালে নমুনা পৃথিবীতে ফেরানোর লক্ষ্য
- পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ ও ২ মিটার গভীর পর্যন্ত খননের মাধ্যমে অন্তত ৫০০ গ্রাম মঙ্গলীয় মাটি ও শিলা সংগ্রহের লক্ষ্য মিশনটির
- প্রধান বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য মঙ্গলে জৈবচিহ্ন এবং অতীত বা বর্তমান প্রাণের প্রমাণ খোঁজা
- মিশনের কাঠামোয় দুটি পৃথক মহাকাশযান রয়েছে, যেগুলো মঙ্গলের কক্ষপথে মিলিত হবে; এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি
- ২০২৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য মিশন উন্মুক্ত করেছে চীন; বিদেশি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির জন্য মোট ২০ কেজি পেলোড বহনের সুযোগ রয়েছে
- প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতার কারণে অবতরণস্থল বেছে নিতে হবে ১৭ থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে এবং মঙ্গলের গড় উচ্চতার অন্তত ৩ কিলোমিটার নিচে
- পৃথিবীর দূষণ ঠেকাতে কঠোর গ্রহ-সুরক্ষা বিধির অধীনে হেফেইয়ের বিশেষ নিয়ন্ত্রণস্থাপনায় ফিরিয়ে আনা নমুনাগুলো ব্যবস্থাপনা করা হবে
- মঙ্গল থেকে আরোহন ও কক্ষপথে মিলনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সফল উন্নয়নের পর ২০২৬ সালে ফ্লাইট হার্ডওয়্যার নির্মাণ পর্যায়ে প্রবেশ করবে মিশনটি






