বছর শেষে বিশ্বের সবচেয়ে ঘন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে যাচ্ছে তাইওয়ান

পড়তে 11 মিনিট
Taiwan Spotlights Invasion Defense Lines During Chinese Drills - Naval News

প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ঐতিহাসিক মাইলফলক আসন্ন

২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনের আশা করছে তাইওয়ান। দ্বীপরাষ্ট্রটি ১,৪০০টিরও বেশি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষায়, এতে বিশ্বে উপকূলভিত্তিক সামুদ্রিক হামলার অস্ত্রের সবচেয়ে ঘন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এই অস্ত্রভান্ডারে দেশীয়ভাবে তৈরি হসিয়ুং ফেং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হারপুন ব্যবস্থা রয়েছে। সম্ভাব্য আগ্রাসীদের সমুদ্রপথে প্রবেশ ঠেকানোর সক্ষমতায় এটি তাইওয়ানের জন্য বড় পরিবর্তন।

সূচিপত্র
  1. প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ঐতিহাসিক মাইলফলক আসন্ন
  2. দেশীয় অস্ত্রভান্ডার: হসিয়ুং ফেংয়ের উৎপাদন বাড়ছে
  3. উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সংযোজন
  4. ‘সজারু কৌশল’ গড়ে উঠছে
  5. অসম যুদ্ধকৌশলে মিত্রবাহিনীর সমন্বয়
  6. ইলেকট্রনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
  7. সমন্বিত অভিযানের জন্য কমান্ড একীভূতকরণ
  8. মূল বিষয়গুলো

এই অর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে সি এয়ার কমব্যাট পাওয়ার ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান, যা অসম যুদ্ধের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর জন্য নেওয়া একটি বিশেষ বাজেট উদ্যোগ। উৎপাদনসূচি সম্পর্কে অবগত প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ন্যাশনাল চুং-শান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বছরের শেষ নাগাদ ১,০০০টি হসিয়ুং ফেং II ও III ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন শেষ করবে, যা নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা স্থলভিত্তিক ৪০০টি হারপুন ক্ষেপণাস্ত্র যোগ হলে মোট মজুতের ঘনত্ব বিশ্বের অন্য যেকোনো উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে যাবে।

ঘনত্বের হিসাব করতে অস্ত্রের সংখ্যা এবং তাইওয়ানের সীমিত ভৌগোলিক আয়তন, দুই বিষয়ই বিবেচনা করা হয়েছে। প্রায় ২৪৫ মাইল দীর্ঘ এবং সবচেয়ে প্রশস্ত স্থানে ৯০ মাইল চওড়া দ্বীপটিতে এই বিপুল অস্ত্রভান্ডার ছড়িয়ে থাকায় তাইওয়ান প্রণালি ও ফিলিপাইন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, পরস্পরকে আচ্ছাদিত করে এমন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি হবে। প্রতি বর্গমাইল ভূখণ্ডে নির্দিষ্ট জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্রের এমন তুলনীয় সংখ্যা বিশ্বের আর কোনো উপকূলীয় অঞ্চলে নেই।

বিজ্ঞাপন

দেশীয় অস্ত্রভান্ডার: হসিয়ুং ফেংয়ের উৎপাদন বাড়ছে

তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি হলো ন্যাশনাল চুং-শান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে দুই দশক ধরে চলা দেশীয় উন্নয়নকাজ। বর্তমান উৎপাদনসূচি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১৩১টি হসিয়ুং ফেং II ও বর্ধিত পাল্লার হসিয়ুং ফেং II ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ৭০টি হসিয়ুং ফেং III ও বর্ধিত পাল্লার হসিয়ুং ফেং III ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করে। ২০২০ সাল থেকে বিশেষ বাজেট কাঠামোর আওতায় এসব উৎপাদন লাইন চালু রয়েছে।

হসিয়ুং ফেং II হলো উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য উপযোগী সাবসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। রাডারের নজর এড়াতে এটি নিচু দিয়ে উড়ে এবং এতে শক্তিশালী ওয়ারহেড থাকে। অন্যদিকে, হসিয়ুং ফেং III তাইওয়ানের প্রধান সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র, যা ম্যাক ২-এর বেশি গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এই গতি শত্রুর প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দেয়; ফলে প্রতিরক্ষাকারী জাহাজকে শনাক্তকরণ, অনুসরণ ও প্রতিহত করার ধাপগুলো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।

দুই ব্যবস্থারই বর্ধিত পাল্লার সংস্করণ স্থলভিত্তিক অস্ত্রের নাগালের বাইরে থেকে নৌলক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুযোগ দেয়, যা উপকূল থেকে দূরে উভচর বাহিনী মোতায়েনের যেকোনো প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। এসব সংস্করণ আঘাত হানার সীমা আরও দূরে প্রসারিত করে। ফলে চীনা নৌকমান্ডারদের উপকূল থেকে দৃশ্যমান দূরত্বের অনেক বাইরের হুমকিও বিবেচনায় নিতে হয়।

এ বছর ব্যাপক উৎপাদন শেষ হলে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আধুনিক করার দিকে মনোযোগ দিতে চান। কর্মকর্তাদের হিসাবে, উন্নত চিপসেট ও নির্দেশনা-ব্যবস্থার ইলেকট্রনিক সরঞ্জামসহ ২৩২টি ক্ষেপণাস্ত্র উন্নত করা দরকার। এতে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নির্ভুলতা বাড়বে এবং ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অস্ত্রগুলো আরও প্রতিরোধী হবে। তাইওয়ানের জলসীমার কাছে চীনা নৌবাহিনীর জ্যামিং সক্ষমতার সাম্প্রতিক প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

উপকূলীয় প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সংযোজন

দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি, ২০২০ সালে চূড়ান্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্রচুক্তির প্রথম চালান পেতে শুরু করেছে তাইওয়ান। প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলারের হারপুন উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চুক্তিতে রয়েছে ১০০টি লঞ্চার ব্যবস্থা এবং ৪০০টি RGM-84L-4 Harpoon Block II ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লঞ্চযান ও রাডার ট্রাকও পৌঁছেছে। বাকি সব মিলিয়ে ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

হারপুন ব্লক II প্রমাণিত সাবসনিক সমুদ্রপৃষ্ঠ-ঘেঁষা আক্রমণ সক্ষমতা দেয়, যার উড্ডয়ন বৈশিষ্ট্য তাইওয়ানের সুপারসনিক হসিয়ুং ফেং III থেকে আলাদা। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এই সমন্বয়কে বলেন “হাই-লো মিক্স”; এতে স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠে। ধীরগতির হারপুন রাডার এড়াতে অত্যন্ত নিচু দিয়ে, ঢেউয়ের চূড়া ঘেঁষে উড়ে অনিশ্চিত দিক থেকে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছায়। অন্যদিকে, দ্রুতগতির হসিয়ুং ফেং III সুপারসনিক গতিতে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়, ফলে সময়ের ব্যবধান কমে গিয়ে স্তরে স্তরে সাজানো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়।

এই ভিন্নতা প্রতিরক্ষাকারী নৌবাহিনীকে একই সময়ে একাধিক ধরনের হুমকির মুখে ফেলে এবং তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা জটিল করে তোলে। শত্রু জাহাজকে একই সঙ্গে উচ্চতায় উড়ে আসা সুপারসনিক হুমকি ও নিচু দিয়ে আসা সাবসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি অনুসরণ করতে হয়। এতে সেন্সরের মনোযোগ ও প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের বরাদ্দ ভাগ হয়ে যায়। এই সমন্বয়ে যেকোনো একক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে আসন্ন সব হুমকি প্রতিহত করার সম্ভাবনা কমে যায়।

ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি চুক্তিতে রয়েছে চলমান লঞ্চযান ও রাডার ট্রাক, যা ছড়িয়ে মোতায়েনের মাধ্যমে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়। নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপিত উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির বিপরীতে, এসব চলমান ব্যবস্থা তাইওয়ানের দুর্গম ভূখণ্ডে স্থান বদলাতে পারে এবং আগে থেকে জরিপ করা নিক্ষেপস্থানের মধ্যে চলাচল করতে পারে, যাতে শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করা কঠিন হয়। এই চলাচলের সক্ষমতা নিশ্চিত করে যে আগাম হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক সহজে নিষ্ক্রিয় করা যাবে না; সংঘাত শুরুর আগে ব্যাটারিগুলো ছড়িয়ে পড়তে পারে বা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর পাল্টা হামলা এড়াতে অবস্থান বদলাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

‘সজারু কৌশল’ গড়ে উঠছে

তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্র বৃদ্ধি সামরিক কৌশলবিদদের ভাষায় জাতীয় প্রতিরক্ষার “সজারু কৌশল”-এর ধারালো কাঁটাগুলো তৈরি করছে। অসম যুদ্ধের এই নীতি স্বীকার করে যে প্রচলিত উপায়ে চীনের বিশাল নৌ ও বিমানবাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বাস্তবে অসম্ভব। খোলা সমুদ্রে পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো বড় নৌবহর তাইওয়ান গড়তে পারবে না। মূল ভূখণ্ডের সংখ্যাগত সুবিধার মুখে আকাশে আধিপত্য বজায় রাখাও সম্ভব নয়।

এর পরিবর্তে, তুলনামূলক সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে তাইওয়ান, যেগুলো যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীর ওপর অসহনীয় ক্ষতি চাপাতে পারে। এই ধারণার ভিত্তি জীবজগতের একটি উপমা: সজারু শিকারিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে না, বরং নিজেকে এমন বিপজ্জনক করে তোলে যাতে সফলভাবে আক্রমণ করা কঠিন হয়। দ্বীপের উপকূলজুড়ে ১,৪০০টিরও বেশি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে তাইওয়ান এমন একটি “মারাত্মক লাল রেখা” তৈরি করছে, যা অতিক্রম করা চীনা নৌবাহিনীর টাস্ক ফোর্সগুলোর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি উভচর পরিবহন জাহাজ, এসকর্ট জাহাজ এবং সহায়ক নৌযানের জন্য সম্ভাব্য হুমকি। প্রণালি পেরিয়ে কয়েক লাখ সেনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য এসব জাহাজ অত্যাবশ্যক। এই কৌশলে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে তাইওয়ান প্রণালি পেরিয়ে বিপুলসংখ্যক সেনা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থাকে। সমুদ্রপথ নিরাপদ না হলে দ্বীপ দখলের জন্য দরকারি স্থলবাহিনী চীন নিরাপদে পরিবহন করতে পারবে না।

এই কৌশল শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত ব্যবহারও। প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা একই সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাহাজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করার মতো ব্যাপক আক্রমণের কৌশল নিতে চান। আধুনিক যুদ্ধজাহাজে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা স্থলভিত্তিক ইউনিট থেকে একসঙ্গে একাধিক হুমকি তৈরি করে তাইওয়ানের বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত নিঃশেষ করে দিতে পারে, যাতে পরের দফার হামলা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপন

অসম যুদ্ধকৌশলে মিত্রবাহিনীর সমন্বয়

তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্র সম্প্রসারণ উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতার অংশ। প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বাহিনীও উল্লেখযোগ্যভাবে একই ধরনের সক্ষমতা গড়ে তুলছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জলসীমায় চীনা নৌবাহিনীর চলাচলের স্বাধীনতা ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গত মাসে হাওয়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৩য় মেরিন লিটোরাল রেজিমেন্ট যুদ্ধ-প্রস্তুতি মূল্যায়নের সময় দ্বীপশৃঙ্খলজুড়ে চলমান জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার মোতায়েনের মহড়া চালায়। রেজিমেন্টের ভবিষ্যৎ অভিযান পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও মূল্যায়ন মহড়ার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোশুয়া অ্যান্ডারসন এসব পরীক্ষায় দেখা কৌশলগত অর্জনের বর্ণনা দেন।

৩য় এলসিটির কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র পেরিয়ে নৌবাহিনীর সারফেস ফায়ারস টাস্ক এলিমেন্টকে কাউয়াইয়ের প্যাসিফিক মিসাইল রেঞ্জ ফ্যাসিলিটিতে ঢোকানো। উপকূলীয় সারফেস কানেক্টরের মাধ্যমে প্রায় একই সময়ে এনএসএমের পুনরায় সরবরাহ গ্রহণ, হুমকিদাতা দলগুলোর বিরুদ্ধে একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো, তারপর কার্যত অভিযানক্ষেত্রের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া।

মহড়ায় নেভি-মেরিন এক্সপেডিশনারি শিপ ইন্টারডিকশন সিস্টেম বা NMESIS ব্যবহার করা হয়। এতে চালকবিহীন লঞ্চার থেকে নেভাল স্ট্রাইক মিসাইল ছোড়া হয়, যার পাল্লা ১১৫ নটিক্যাল মাইল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েন ও সচল রাখার অনুশীলন করা হয়। সংঘাত বাধলে তাইওয়ানের বাহিনীকে ঠিক এমন পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হতে হবে।

একইভাবে, হাওয়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ২৫তম পদাতিক ডিভিশন সমুদ্রযান থেকে হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম মোতায়েনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এতে সমুদ্র থেকে নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। তাইওয়ান ইতিমধ্যে এসব ব্যবস্থা কিনেছে, যা এগিয়ে আসা নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে আরও দূরপাল্লার আঘাতের স্তর যোগ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দীর্ঘপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র ছুড়তে সক্ষম টাইফন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও মোতায়েন করেছে এবং অস্ট্রেলীয় বাহিনীর সঙ্গে মহড়ায় সেগুলো পরীক্ষা করেছে।

জাপানও নিজস্ব উপকূলীয় প্রতিরক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। এ মাসে টোকিও কিউশুর কেনগুন ক্যাম্পে উন্নত টাইপ-১২ সারফেস-টু-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। আগের ৬২ মাইল পাল্লার তুলনায় এগুলোর পাল্লা প্রায় ৬২০ মাইল। ওয়াশিংটন ডিসির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের প্রধান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা লুক কলিন এই মোতায়েনকে স্থিতিশীলতা জোরদারকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা জাপানের সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জাপান তার সংবিধানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য আত্মরক্ষা বাহিনী বজায় রাখার অনুমতি রয়েছে, আর এই সক্ষমতা তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই বর্ধিত পাল্লা চীনের উপকূলের কিছু অংশ এবং উত্তর দিক থেকে তাইওয়ানের দিকে আসার পথের ওপর নজর রাখতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রবাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বিত সক্ষমতা উন্নয়নের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ এই মোতায়েন, যার লক্ষ্য প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের যৌথ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল কাউন্টারটেররিজম কমিউনিকেশনস সেন্টারের সাবেক পরিচালক এবং টেম্পল ইউনিভার্সিটির জাপান ক্যাম্পাসের অধ্যাপক মার্ক ডেভিডসন ওয়াশিংটন ও ম্যানিলার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনকে “প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করেছেন। দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথে আরও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যোগ করে ফিলিপাইনের মেরিন কর্পসও ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা চালু করেছে।

বিজ্ঞাপন

ইলেকট্রনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

পিপলস লিবারেশন আর্মির অত্যাধুনিক পাল্টা ব্যবস্থার মুখে পড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র বৃদ্ধি। তাইওয়ানের কাছে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানগুলোতে চীনের উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে লক্ষ্য নির্ধারণকারী রাডার ও নির্দেশনা-ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর জন্য তৈরি জ্যামিং ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাইওয়ানের কাছে চলাচলরত টাইপ ০৫৫ ডেস্ট্রয়ার ইয়ানানের দৃশ্য প্রচার করে। ১১ হাজার টন ওজনের জাহাজটি অজ্ঞাতনামা উড়োজাহাজের মুখোমুখি হয়ে ইলেকট্রনিক জ্যামিং ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং উচ্চক্ষমতার রাডার চালু করেছে বলে খবর পাওয়া যায়। এসব ব্যবস্থা সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় পাল্টা ব্যবস্থার অংশ; এগুলো শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য সন্ধানী যন্ত্রকে বিভ্রান্ত করে কিংবা নির্দেশনাদানকারী ডেটা লিংকে বিঘ্ন ঘটিয়ে আসন্ন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি।

প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, উড়োজাহাজের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেস্ট্রয়ারটি রাডারের ক্ষমতা বাড়ায় এবং পরে সূত্রগুলোর ভাষায়, ইলেকট্রনিক জ্যামিং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এসব অস্ত্র সরাসরি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে না; বরং উৎক্ষেপণকারী জাহাজকে রক্ষার জন্য তড়িৎচুম্বকীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এ ঘটনা তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে যে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক পরিবেশ ভেদ করতে হবে, তা স্পষ্ট করেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত পিএলএর “জাস্টিস মিশন ২০২৫” মহড়াও ইলেকট্রনিক হুমকির পরিবেশ তুলে ধরে। তাইওয়ানকে ঘিরে বড় পরিসরের এই মহড়ায় চীনা সামরিক বাহিনী প্রচলিত আঘাত হানার ব্যবস্থার সঙ্গে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্ল্যাটফর্ম সমন্বিত করে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা দমন এবং কমান্ড নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা পরীক্ষা করে। মহড়ায় রেকর্ডসংখ্যক উড়োজাহাজের উড্ডয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে উন্নত জে-২০ স্টেলথ ফাইটার এবং সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত এইচ-৬কে বোমারু বিমানও ছিল।

মহড়া নিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচারে সর্বাত্মক আধিপত্য এবং সমন্বিত অবরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ধারণায় জোর দেওয়া হয়। বাস্তব সংকটের সময়সীমার অনুরূপ পরিস্থিতিতে যৌথ সমন্বয় পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছিল সামরিক আগ্রাসন ও বেসামরিক সামুদ্রিক প্রশাসনের মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট করতে কোস্ট গার্ডের জাহাজ ব্যবহার।

এই ইলেকট্রনিক হুমকি মোকাবিলায় তাইওয়ানের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে হসিয়ুং ফেং ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের চিপসেট উন্নত করা। নির্দেশনার নির্ভুলতা ও জ্যামিং প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়িয়ে, তীব্র ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মধ্যেও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর থাকবে বলে আশা করছেন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা। জ্যামিংয়ের চেষ্টা সত্ত্বেও লক্ষ্যবস্তুর ওপর নজর ধরে রাখার সক্ষমতা প্রকৃত যুদ্ধে নির্ণায়ক হতে পারে, যখন তড়িৎচুম্বকীয় পরিসর নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলবে।

বিজ্ঞাপন

সমন্বিত অভিযানের জন্য কমান্ড একীভূতকরণ

অস্ত্র কেনা তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের একটি অংশমাত্র। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সব জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ একীভূত করতে সামরিক বাহিনী একটি নতুন লিটোরাল কমব্যাট্যান্ট কমান্ড গঠন করবে। এই সাংগঠনিক পরিবর্তনের ফলে বিদ্যমান হাই ফেং ব্রিগেডগুলো নতুন হারপুন-সজ্জিত ইউনিটের সঙ্গে একটি একক পরিচালনব্যবস্থার অধীনে আসবে।

কমান্ড কাঠামোর লক্ষ্য হলো, আগে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনায় বাধা তৈরি করা সমন্বয়গত জটিলতা দূর করা। কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হলে তাইওয়ানের বাহিনী নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেদ করার জন্য প্রয়োজনীয় বহু দিক থেকে হামলা চালাতে পারবে। দেশীয় ও যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্রের মিশ্রণ পরিচালনা করে, এগিয়ে আসা নৌবহরের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কৌশলগত ফল পেতে উৎক্ষেপণ সমন্বয় করবে এই ব্যবস্থা।

এই একীভূতকরণ আঞ্চলিক মিত্রদের মহড়া থেকে পাওয়া শিক্ষার প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কর্পস ও সেনাবাহিনী উচ্চতর সদর দপ্তরের সীমিত তদারকিতে ছড়িয়ে থাকা ইউনিটের অভিযানকে গুরুত্ব দিয়েছে। সংঘাতের সময় যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যাহত হতে পারে বলেই এমন ব্যবস্থা। একইভাবে, তাইওয়ানের নতুন কমান্ড কাঠামোও এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেবে, যেখানে পৃথক ব্যাটারিগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তবে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় অবদান রাখবে।

এই পুনর্গঠনের ফলে প্রথমবারের মতো উপকূলীয় প্রতিরক্ষার সব জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট একক কমান্ডের অধীনে আসবে। এতে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির বিরুদ্ধে বহুস্তরীয় ব্যাপক হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়বে। একীভূত এই ব্যবস্থায় ১,৪০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিচ্ছিন্ন অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করবে।

বিজ্ঞাপন

মূল বিষয়গুলো

  • ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তাইওয়ান ১,৪০০টিরও বেশি জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ঘন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে
  • বছরের শেষ নাগাদ দেশীয়ভাবে ১,০০০টি হসিয়ুং ফেং II ও III ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন শেষ হবে
  • ২.৩৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা ৪০০টি হারপুন ব্লক II ক্ষেপণাস্ত্র ২০২৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে আসবে
  • একক নিয়ন্ত্রণে ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা একীভূত করতে জুলাইয়ে নতুন লিটোরাল কমব্যাট্যান্ট কমান্ড চালু হবে
  • উভচর অভিযানের জন্য চীনা নৌবাহিনীকে কাছে আসতে বাধা দিয়ে “মারাত্মক লাল রেখা” তৈরি করাই এই কৌশলের লক্ষ্য
  • উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র চিপসেট নির্দেশনার নির্ভুলতা ও চীনের ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াবে
  • সমন্বিত প্রতিরোধ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলজুড়ে একই ধরনের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করছে
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে