ভোরের আগেই গড়ে উঠল ভবন
মধ্য চীনের হুনান প্রদেশের রাজধানী ছাংশায় এক শান্ত সকালের ভোরের আগে নির্মাণস্থলজুড়ে চলছিল এমন কর্মযজ্ঞ, যা মাত্র কয়েক দশক আগেও অসম্ভব বলে মনে হতো। সূর্য দিগন্তের ওপরে উঠতেই ঘুমজড়ানো চোখে বাসিন্দারা দেখলেন, স্থাপত্য ও প্রকৌশলের প্রচলিত সময়সীমার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দ্রুত গড়ে উঠছে একটি ভবন। চীনা প্রতিষ্ঠান ব্রড গ্রুপ, যা ব্রড সাসটেইনেবল বিল্ডিং নামেও পরিচিত, ৩,০০০ শ্রমিক এবং একাধিক বিশাল ক্রেনের সমন্বয়ে মাত্র ২৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে ১০ তলা একটি হোটেল নির্মাণ করে।
সূচিপত্র
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল টাইমল্যাপস ভিডিওতে দেখা যায়, মডিউলার স্টেইনলেস স্টিলের ইউনিটগুলো বিশাল নির্মাণ ব্লকের মতো একটির ওপর আরেকটি বসানো হচ্ছে। প্রতিটি মডিউল কারখানা থেকে এসেছে বিদ্যুৎব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, জানালা, এমনকি আসবাবপত্রসহ সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায়। শ্রমিকেরা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বোল্ট দিয়ে ইউনিটগুলো আটকান, বিভিন্ন পরিষেবা-সংযোগ যুক্ত করেন এবং ইউনিটের দেয়ালের গায়ে সমতল করে পরিবহন করা বারান্দাগুলো খুলে দেন। এর ফলে তৈরি হয় ‘লিভিং বিল্ডিং’—কোম্পানির দাবি, এটি বড় ধরনের ভূমিকম্পেও টিকে থাকতে পারে, ১,০০০ বছর স্থায়ী হতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে খুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায়।
নির্মাণের এই বিস্ময় প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনপ্রযুক্তিতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের ফল। নিয়ন্ত্রিত কারখানার পরিবেশে নির্মাণ উপাদান তৈরি করে ঘটনাস্থলে জোড়া লাগানোর মাধ্যমে চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো অতি দ্রুত উন্নয়নের নতুন ধারা গড়ে তুলেছে। এই পদ্ধতি শহরে আবাসনের তীব্র সংকট, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের লক্ষ্যসহ দেশের জরুরি চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করে। একই সঙ্গে, বিশ্বজুড়ে নির্মাণ খাতের অদক্ষতা দূর করার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগও আকর্ষণ করছে।
গতির বিজ্ঞান
এই দ্রুত নির্মাণের পেছনে রয়েছে প্রিফ্যাব্রিকেটেড নির্মাণপদ্ধতি, যা প্রচলিত নির্মাণপ্রক্রিয়া থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। প্রচলিত পদ্ধতিতে কাঁচামাল খোলা নির্মাণস্থলে আনা হয়, তারপর সেখানেই সেগুলো কেটে, মিশিয়ে ও শুরু থেকে জোড়া লাগানো হয়। ব্রড গ্রুপ কারখানার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মানসম্মত, কনটেইনারের আকারের মডিউল তৈরি করে। প্রতিটি ইউনিট ১২.১৯ মিটার লম্বা, ২.৪৪ মিটার চওড়া এবং তিন মিটার উঁচু—আকারে মোটামুটি একটি শিপিং কনটেইনারের মতো, তবে স্থায়ী বসবাসের উপযোগী করে উচ্চমানের স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি।
এই প্রযুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে কোম্পানির ভাষায় ‘বি-কোর স্ল্যাব’, যা শত শত স্টেইনলেস স্টিলের নল দিয়ে আলাদা রাখা দুটি স্টেইনলেস স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি। ব্রড গ্রুপের দাবি, প্রচলিত কংক্রিটের মেঝের স্ল্যাবের তুলনায় এই স্ল্যাব ১০ গুণ হালকা এবং ১০০ গুণ বেশি মজবুত। ওজন কম হওয়ায় এগুলো সহজে পরিবহন ও দ্রুত জোড়া লাগানো যায়, অথচ কাঠামোগত দৃঢ়তা বজায় থাকে; কোম্পানির দাবি, এ ক্ষেত্রে এগুলো প্রচলিত নির্মাণপদ্ধতিকেও ছাড়িয়ে যায়। মডিউলার পদ্ধতিতে সমান্তরালে একাধিক কাজ করা যায়: নির্মাণ উপাদান তৈরি, পরিবহন এবং ভিত্তি নির্মাণ ধারাবাহিকভাবে না করে একই সময়ে চলে।
নির্মাণপ্রক্রিয়াটি চলে নিখুঁত সমন্বয়ে। জটলা ও সংরক্ষণের প্রয়োজন কমাতে মডিউলগুলো নির্ধারিত সময়ে ট্রাকে করে নির্মাণস্থলে পৌঁছায়। ক্রেন দিয়ে প্রতিটি ইউনিট নির্দিষ্ট স্থানে তোলা হয়; সেখানে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল বোল্ট শক্ত করে এবং পানির ও বিদ্যুতের সংযোগ জোড়ে। প্রতিটি ইউনিটের একটি দেয়াল নিচের দিকে ভাঁজ হয়ে মেঝের স্ল্যাবে পরিণত হয়, ফলে কলামবিহীন ১২ মিটার বাই ৪.৮ মিটারের অভ্যন্তরীণ জায়গা তৈরি হয়। ভবনটি ওপরের দিকে উঠতে থাকলে ইউনিটের জানালা ও বারান্দা খুলে বসবাসের জায়গা ঘিরে ফেলে, আর এভাবেই বাইরের আবরণ সম্পূর্ণ হয়।
অতিদ্রুত নির্মাণের ইতিহাস
রেকর্ড সময়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে ছাংশার এই হোটেলই ব্রড গ্রুপের প্রথম উদ্যোগ নয়। প্রচলিত নির্মাণসূচিকে চ্যালেঞ্জ জানানো ক্রমেই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের মাধ্যমে মডিউলার নির্মাণপদ্ধতি নিখুঁত করতে কোম্পানিটি এক দশকেরও বেশি সময় ব্যয় করেছে। ২০২১ সালে একই শহরে একই ২৮ ঘণ্টার সময়সীমায় প্রতিষ্ঠানটি ১১ তলা একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ করে, যা তাদের পদ্ধতির পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা দেখায়।
এর আগের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৫ তলা আর্ক হোটেল, যা ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে ছাংশায় ছয় দিনেরও কম সময়ে নির্মিত হয়। ২০০ শ্রমিকের সহায়তায় দলটি ৪৬.৫ ঘণ্টায় কাঠামোর কাঠামো দাঁড় করায়; বাইরের আবরণ ও ভেতরের কাজ শেষ করতে আরও ৯০ ঘণ্টা লাগে। প্রচলিতভাবে নির্মিত সমতুল্য ভবনের তুলনায় এতে এক-ষষ্ঠাংশ উপকরণ ব্যবহার করা হয়। কোম্পানির দাবি, এটি রিখটার স্কেলে ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারে এবং তিন স্তরের কাচের জানালা, তাপ নিরোধক ও এলইডি আলোকব্যবস্থার কারণে তুলনীয় ভবনের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী।
আরও সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্রড গ্রুপ হোলন হুনান প্রদেশের শিয়াংইন কাউন্টিতে মাত্র পাঁচ দিনে ২৬ তলা একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ করে। ১৪,০০০ বর্গমিটারের এই ভবনে বিশেষ সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে নিয়োগ করা প্রতিভাবান কর্মীরা থাকেন; বাসিন্দারা দুই বছর বিনা ভাড়ায় আবাসনের সুবিধা পান। কোম্পানির আরও দাবি, ভবনটি ১,০০০ বছরেরও বেশি স্থায়ী হওয়ার কথা এবং প্রয়োজন হলে খুলে অন্যত্র আবার নির্মাণ করা যাবে।
তবে কোম্পানির সব উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা সফল হয়নি। ২০১২ সালে ব্রড গ্রুপ মাত্র সাত মাসে মডিউলার উপাদান ব্যবহার করে ২২০ তলা একটি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে, যা হলে সেটিই হতো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও সরকারি অনুমোদন না থাকায় ভিত্তি নির্মাণ শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি থেমে যায়; পরে ভিত্তির জায়গাটি মাছের খামার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মানবিক দিক
প্রযুক্তি দ্রুত নির্মাণ সম্ভব করে, আর মানুষের সমন্বয় সেই গতি বাস্তবে আনে। ছাংশার প্রকল্পে সতর্ক পরিকল্পনায় সাজানো পালায় কাজ করা ৩,০০০ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়েছিল। প্রত্যেকের ছিল নির্ভুল প্রকৌশল, সমস্যা সমাধান এবং তীব্র সময়সীমার মধ্যে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার নির্দিষ্ট দক্ষতা। নির্মাণস্থলটি ছিল সমন্বিত কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র, যেখানে সময়ের সামান্য ভুলও ব্যয়বহুল বিলম্ব বা নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত। একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ মিলিমিটার-নির্ভুলতায় করার সময় প্রত্যেক শ্রমিককে চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হতো।
ব্রড গ্রুপের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থাপনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ: শ্রমিকদের শুধু বোল্ট শক্ত করে পরিষেবা-সংযোগ জুড়ে দিতে হয়। তবে এই শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। দ্রুত নির্মাণের সময় মনোযোগ ধরে রাখলে দুর্ঘটনা এড়ানো যায় এবং কাজের মান নিশ্চিত হয়। ভারী যন্ত্রপাতি, নিখুঁতভাবে মেলানো উপকরণ এবং জনসমক্ষে কাজ করার চাপ সামলে উচ্চতায় ও ভারী স্টিলের মডিউল নিয়ে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। শিল্প খাতের পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, কর্মীদের অতিরিক্ত ক্লান্তি এড়াতে এ ধরনের প্রকল্পে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা, ক্লান্তি পর্যবেক্ষণ এবং পালাক্রমে কাজের ব্যবস্থা জরুরি।
নিউজিল্যান্ডের মডিউলার ভবন বিশেষজ্ঞ টনি ফ্রস্ট ছাংশায় ব্রড গ্রুপের হোলন ভবনগুলোর একটিতে এক সপ্তাহ ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ভবনটি ‘খুব মজবুত ও পরিচ্ছন্ন এবং এতে রয়েছে বিশ্বমানের পানি পরিশোধন ব্যবস্থাসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নানা উপাদান’। ফ্রস্টের কাছে ভবনটি কংক্রিটের নির্মাণের মতোই দৃঢ় মনে হয়েছে। তবে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ নকশার কিছু উপকরণের বুনটে ছোটখাটো উন্নতি করলে বাসিন্দাদের বসবাসের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হতে পারে।
ছাংশায় নিরাপত্তার অন্ধকার দিক
ছাংশায় দ্রুত নির্মাণের উদ্যাপনের সঙ্গে একই শহরের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে ছাংশা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ব্যাক স্ট্রিট ওয়ানে স্বনির্মিত আটতলা একটি ভবন ধসে ৫৩ জন নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন। রেস্তোরাঁ, হোটেল ও সিনেমা হল থাকা ভবনটিতে যথাযথ অনুমতি বা কাঠামোগত মূল্যায়ন ছাড়াই বেআইনিভাবে আরও দুটি তলা যোগ করা হয়েছিল।
তদন্তে নিরাপত্তা তদারকিতে ব্যাপক গাফিলতির তথ্য উঠে আসে। ভবনটির মালিক উ ঝিয়ং কোনো যোগ্যতা বা যথাযথ প্রকৌশল পর্যালোচনা ছাড়াই অতিরিক্ত তলাগুলো নির্মাণ করেছিলেন। স্থানীয় পরিদর্শন প্রতিষ্ঠান শিয়াংদা ইনস্পেকশন কোং লিমিটেড ভবন ধসের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কাঠামোটিকে ‘মোটামুটি নিরাপদ’ আখ্যা দিয়ে জাল নিরাপত্তা নথি দেয়। পরের বছরের অক্টোবরে চীনের আদালত বিপর্যয়টিতে ভূমিকার জন্য ১৫ জনকে সাজা দেন। তাঁদের মধ্যে উকে ১১ বছরের কারাদণ্ড এবং দায়িত্বে অবহেলা ও ঘুষের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত সাবেক এক পৌর পানি কোম্পানির কর্মকর্তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ব্রড গ্রুপের প্রকৌশলসম্মত মডিউল ও ধসে পড়া স্বনির্মিত ভবনের এই বৈপরীত্য চীনের নির্মাণ খাতের দুই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। কারখানার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তৈরি প্রিফ্যাব্রিকেটেড ব্যবস্থায় মান নিয়ন্ত্রণ ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা যায়। অন্যদিকে, গ্রামীণ বাসিন্দাদের তৈরি অনানুষ্ঠানিক স্বনির্মিত ভবনে প্রায়ই যথাযথ প্রকৌশল তদারকি থাকে না। ২০২২ সালের ধসের পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেশজুড়ে স্বনির্মিত ভবন পরিদর্শনের নির্দেশ দেন; এতে স্কুল ও হাসপাতালের কাছে থাকা তিন বা তার বেশি তলাবিশিষ্ট ভবনগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভবনটির কাঠামো ভাড়াটিয়ারা পরিবর্তন করেছিলেন; পরে একটি লিফট যোগ করা হয়, যা ভবনের কাঠামোগত দৃঢ়তাকে প্রভাবিত করেছিল বলে ধারণা করা হয়। নকশায় নির্ধারিত ভারবহন ক্ষমতার চেয়ে উল্লম্ব চাপ বেড়ে যাওয়ায় এ বিপর্যয় ঘটে; ফলে ইটের দেয়াল ফুলে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত দেয়ালগুলো ধসে পড়ে। এ ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, দ্রুত নির্মাণের জন্য কখনোই নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যাবে না এবং নির্মাণপ্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নিয়মকানুন কার্যকর করাও জরুরি।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব ও পরিবেশবান্ধব সম্ভাবনা
দ্রুত নির্মাণের চমক ছাড়াও, মডিউলার নির্মাণ বিশ্বের জরুরি সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে পারে। প্রচলিত নির্মাণের তুলনায় এ পদ্ধতিতে নির্মাণবর্জ্য ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়। ব্রড গ্রুপের ইউনিটগুলোর জ্বালানি সাশ্রয়ী নকশা—চার স্তরের কাচের জানালা, তাপ নিরোধক এবং তাপ পুনরুদ্ধার বায়ু চলাচলব্যবস্থার মাধ্যমে—শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের খরচ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে বলেও কোম্পানির দাবি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকম্প, বন্যা বা সংঘাতের পর দ্রুত আবাসন নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি করে এই প্রযুক্তি। মডিউলগুলো বিধ্বস্ত এলাকায় নিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই অস্থায়ী বা স্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে জোড়া লাগানো যায়, যা জরুরি পরিস্থিতিতে সম্ভাব্যভাবে জীবন বাঁচাতে পারে। আবাসনসংকটে থাকা শহরাঞ্চলে প্রচলিত উন্নয়নের বহু বছরের সময়সীমা ছাড়াই প্রিফ্যাব্রিকেশন সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ ত্বরান্বিত করতে পারে। দ্রুত বেড়ে ওঠা শহরগুলোতে গৃহহীনতা ও জনসংখ্যার স্থানচ্যুতির সমস্যাও এতে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
চীনা মডিউলার নির্মাণপদ্ধতির প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো এ পদ্ধতির সম্ভাবনা দেখিয়েছে; লন্ডনের একটি টাওয়ার মডিউল ব্যবহার করে ৩০ শতাংশ কম সময়ে নির্মাণ করা হয়। তবে চীনের কারখানাভিত্তিক বৃহৎ পরিসরের উৎপাদনকে ভিন্ন নিয়ন্ত্রক পরিবেশ, নির্মাণবিধি ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। কারখানা স্থাপনের প্রাথমিক খরচ ছোট ডেভেলপারদের নিরুৎসাহিত করে। আবার অনেক দেশের নির্মাণ বিভাগে প্রিফ্যাব্রিকেটেড বহুতল ভবনের অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো নেই।
ব্রড গ্রুপের মতে, তাদের ব্যবস্থায় ২০০ তলা আকাশচুম্বী ভবনও নির্মাণ করা সম্ভব, যা শহরের আকাশরেখায় বিপ্লব আনতে পারে। কোম্পানিটি বিলাসবহুল আবাসন, সরকারি ভবন এবং উচ্চঘনত্বের আবাসন—সব ক্ষেত্রেই মডিউলার পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন চীনের নির্মাণ উদ্ভাবন টেকসই ও দ্রুত উন্নয়নের একটি আদর্শ হতে পারে—যদি নিরাপত্তার মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মূল বিষয়গুলো
- চীনের ছাংশায় ব্রড গ্রুপ ৩,০০০ শ্রমিক এবং নির্মাণস্থলের বাইরে তৈরি স্টেইনলেস স্টিলের প্রিফ্যাব্রিকেটেড ইউনিট ব্যবহার করে ২৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে ১০ তলা একটি মডিউলার হোটেল নির্মাণ করেছে।
- ‘লিভিং বিল্ডিং’-এ রয়েছে বি-কোর স্ল্যাব প্রযুক্তি, যা প্রচলিত কংক্রিটের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি মজবুত ও ১০ গুণ হালকা বলে দাবি করা হয়; ভবনটির সম্ভাব্য স্থায়িত্বকাল ১,০০০ বছর এবং এটি ভূমিকম্প-সহনশীল বলে দাবি করা হয়েছে।
- প্রতিটি মডিউল কারখানা থেকে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাসহ আসে। নির্মাণস্থলে শুধু বোল্ট লাগানো ও পরিষেবা-সংযোগ জুড়ে দিলেই হয়, ফলে বর্জ্য ও ঘটনাস্থলে শ্রমের প্রয়োজন কমে।
- একই কোম্পানির আগের দ্রুত নির্মাণ প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতায় এসেছে এ প্রকল্প; এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ দিনে তৈরি ২৬ তলা ভবন এবং ছয় দিনেরও কম সময়ে নির্মিত ১৫ তলা হোটেল।
- ২০২২ সালে ছাংশায় একটি ভবন ধসে ৫৩ জন নিহত হওয়ার পরও এ অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ঘটনাটি প্রকৌশলসম্মত প্রিফ্যাব্রিকেটেড নির্মাণ ও বেআইনি স্বনির্মিত সম্প্রসারণের পার্থক্য তুলে ধরে।
- মডিউলার নির্মাণে পরিবেশগত সুবিধা রয়েছে; এতে বর্জ্য ৯০ শতাংশ কম হয় এবং উল্লেখযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ মোকাবিলা ও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণে এ পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।






