তৃণভূমি পেরিয়ে: কাজাখস্তানের চলমান জীবনরেখা
মধ্য এশিয়ার বিশাল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, যেখানে শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায় এবং বসতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব কয়েক শ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে ইস্পাতের রেললাইনে চলাচল করে এক অসাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্র। এটি নির্দিষ্ট দেয়াল ও স্থায়ী ঠিকানার কোনো সাধারণ হাসপাতাল নয়। এটি চাকার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক, যা এমন সব জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়, যারা অন্যথায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে যেত। প্রতি বছর আট মাস ধরে কাজাখস্তানের মেডিকেল ট্রেনের চিকিৎসকেরা বিশেষভাবে রূপান্তরিত রেলবগিতে থাকেন, কাজ করেন ও ঘুমান। বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তাঁরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ১০০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন স্টেশনে পৌঁছান।
সূচিপত্র
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জের উদ্ভাবনী সমাধান এই উদ্যোগ: প্রচলিত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর আওতার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া। অনেক দেশেই ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে, তবে কাজাখস্তানের রেলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মতো পরিসর ও ধারাবাহিকতায় খুব কমই পরিচালিত হয়। এই ট্রেনগুলো শুধু রোগীদের দূরের হাসপাতালে নিয়ে যায় না; বরং পুরো রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাকেন্দ্রই প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছে দেয়। দাঁতের চিকিৎসা ও ছোট অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে জটিল হৃদ্রোগ পরীক্ষা এবং আইনি পরামর্শ পর্যন্ত সবকিছুই রোগীদের বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করা
এই রেলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার শুরু কাজাখস্তানের জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার একটি সংকটময় সময়ে। ২০১০-এর দশকের শুরুতে দেশটিতে শহর ও গ্রামের চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের বৈষম্য ছিল, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ২০১০ সালের স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানে বিস্তীর্ণ দেশজুড়ে চিকিৎসকের বণ্টনে গুরুতর অসমতা দেখা যায়। উত্তরাঞ্চলের কোস্তানাই অঞ্চলে প্রতি এক লাখ বাসিন্দার জন্য চিকিৎসক ছিলেন মাত্র ২৬৬ জন, যা জাতীয় গড়—প্রতি এক লাখে ৩৮৮ জনের—তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। চিকিৎসাকর্মীদের বণ্টনে এই ঘাটতি ছিল আরও বিস্তৃত এক প্রবণতার প্রতিফলন: বড় শহরগুলোতে চিকিৎসক কেন্দ্রীভূত, আর বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে যোগ্য চিকিৎসকের নাগাল সীমিত।
সরকার বুঝতে পারে, জনবিরল এলাকায় স্থায়ী ক্লিনিক নির্মাণের মতো প্রচলিত সমাধান অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হবে এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর চলাচলজনিত চাহিদাও মেটাতে পারবে না। তাই নীতিনির্ধারকেরা স্বাস্থ্যসেবার নতুন পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে দেশের বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর কথা ভাবেন, যা আগে থেকেই দূরবর্তী জনপদগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল। এই কৌশল ২০১১-২০১৫ সালের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কর্মসূচি ‘সালামাত্তি কাজাখস্তান’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কর্মসূচিটিতে জনস্বাস্থ্য এবং দেশের সব অঞ্চলে চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, জনস্বাস্থ্যের সমস্যার সমাধান হতে হবে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই।
বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে এই উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত স্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের বিপুল মূলধনী ব্যয় এড়াতে পেরেছে। ট্রেনগুলো দক্ষতার সঙ্গে বিশাল এলাকা পাড়ি দিতে পারে, এক যাত্রায় একাধিক জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে পারে এবং এমন উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম বহন করতে পারে, যা ছোট গ্রামের ক্লিনিকে স্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সেবা দিতে আগ্রহী চিকিৎসকদের জন্য আবাসন ও যাতায়াতের সুবিধাসহ আকর্ষণীয় কর্মপরিবেশ তৈরি করে এই পদ্ধতি জনবলসংকটও মোকাবিলা করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কাজাখস্তান তেমির ঝোল রেল কোম্পানির আন্তখাত সহযোগিতায় পরিবহনভিত্তিক চিকিৎসাসেবার এই ধারণা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
তিন ট্রেন, তিন অঞ্চল
কাজাখস্তানে একটি নয়, তিনটি পৃথক মেডিকেল ট্রেন রয়েছে। দেশের সর্বত্র সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ট্রেনকে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বহরে রয়েছে আলমাতিভিত্তিক ‘দেনসাউলিক’, যা দক্ষিণাঞ্চলে সেবা দেয়; আকতোবেভিত্তিক ‘জারদেম’, যা পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে চলে; এবং কারাগান্দাভিত্তিক ‘সালামাত্তি কাজাখস্তান’, যার দায়িত্ব উত্তরাঞ্চল। এই তিনটি ট্রেন মিলে এমন এক চলমান সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে, যা কঠোর শীতকালে সড়কপথে পৌঁছানো অসম্ভব এমন জনপদেও সেবা পৌঁছে দেয়। প্রতিটি ট্রেন আলাদা অঞ্চলে কাজ করে, ফলে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলই বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার নাগালের বাইরে থাকে না।
প্রতিটি ট্রেনে আটটি বগি রয়েছে এবং প্রায় ৮০ জন কর্মী কাজ করেন, যাঁদের প্রায় অর্ধেক চিকিৎসাকর্মী। দলে রয়েছেন সাধারণ চিকিৎসক, নার্স, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ এবং দন্তচিকিৎসক। চিকিৎসাকর্মীদের পাশাপাশি ট্রেনে থাকেন ব্যবস্থাপকেরা, যাঁরা নির্ধারিত সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলা এবং মাসব্যাপী যাত্রায় সরঞ্জাম ও রসদের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকেন। বগিগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোগনির্ণয়ের যন্ত্রপাতি এবং রেডিওলজি বিভাগ রয়েছে, যা শহর থেকে বহু দূরে জটিল স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্ভব করে। ট্রেনের উন্নত অবকাঠামো ছোটখাটো বহির্বিভাগীয় অস্ত্রোপচার ও দাঁতের চিকিৎসাসহ জটিল রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ দেয়।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৮৩২টি প্রত্যন্ত স্টেশনের পুরো যাত্রাপথ পাড়ি দিতে প্রায় ২০ দিন লাগে। ট্রেনগুলো পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি মেনে থামে, যার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবছর অপেক্ষা করেন। এসব বিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষ প্রায়ই ট্রেন আসার তারিখ ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত করে রাখেন। আঞ্চলিক রাজধানীতে কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল যাত্রা ছাড়াই পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়ার এটাই তাঁদের একমাত্র সুযোগ। নিয়মিত সফরের ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয়; একাধিক বছর ধরে আবার আসা রোগীদের চিকিৎসার নথি সংরক্ষণ করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ ইউনিটের সক্ষমতার বাইরে থাকা রোগীদের বিষয়ে পরামর্শের জন্য ট্রেনের চিকিৎসাকর্মীরা ভিডিও যোগাযোগে হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যুক্ত হন।
রেলপথে বসবাস ও কাজ
এই ট্রেনগুলোতে কাজ করা চিকিৎসাকর্মীদের জন্য দায়িত্বটি ব্যক্তিগত জীবনে বড় ত্যাগ ও মানিয়ে নেওয়ার দাবি রাখে। চিকিৎসকেরা বছরে আট মাস চলন্ত ক্লিনিকের ছোট আবাসনে থাকেন, পরিবার ও শহরের নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরে। এখানে চিকিৎসার প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে ট্রেনে বসবাসের নানা জটিলতা যুক্ত হয়: সীমিত জায়গা, চিকিৎসার সময় ট্রেনের দুলুনি এবং যাত্রার কম্পন থেকে সব সরঞ্জাম সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজন। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বগিগুলো জটিল চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী করে সাজানো হয়েছে।
ট্রেনের চিকিৎসাকেন্দ্রে ফ্লুরোগ্রাফি, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফি, আলট্রাসাউন্ড, গ্যাস্ট্রোস্কোপি এবং পূর্ণাঙ্গ রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কাজাখস্তানের বিনা মূল্যে চিকিৎসার নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত প্রচলিত তালিকার বাইরে থাকা ছোটখাটো বহির্বিভাগীয় অস্ত্রোপচার ও দাঁতের চিকিৎসাও ট্রেনের রোগীদের বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। সড়কপথে চলাচল অসম্ভব করে তোলা হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রাসহ যেকোনো আবহাওয়াতেই ট্রেনগুলো চলাচল করে। এই সক্ষমতার কারণে সবচেয়ে কঠোর শীতের মাসগুলোতেও স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত থাকে, যখন শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা ও হৃদ্রোগজনিত জরুরি ঘটনা প্রায়ই বেশি তীব্র হয়। তুষারজমা বা প্রবল বাতাসের মধ্যে ট্রেন থেমে থাকলেও চিকিৎসাকর্মীদের জীবাণুমুক্ত পরিবেশ ও নির্ভুলতা বজায় রাখতে হয়, যা তাঁদের উল্লেখযোগ্য কর্মদক্ষতার পরিচয় দেয়।
এই কর্মপরিবেশে চিকিৎসাকর্মীদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে দক্ষতার পাশাপাশি মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হয়। ট্রেনের চলাচলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরঞ্জাম সুরক্ষিত রাখতে হয় এবং নির্ধারিত স্টপেজের সময় অনুযায়ী চিকিৎসা কার্যক্রম পরিকল্পনা করতে হয়। অনেক চিকিৎসকের কাছে এই অভিজ্ঞতা অনন্য পেশাগত চ্যালেঞ্জ এবং বিকল্পহীন জনগোষ্ঠীর সেবা করার তৃপ্তি এনে দেয়। আবাসন ছোট হলেও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা বা যাতায়াত নিয়ে চিন্তা না করে দলগুলো পুরোপুরি রোগীর সেবায় মনোযোগ দিতে পারে।
চিকিৎসাসেবার বাইরেও
সাম্প্রতিক সময়ে মেডিকেল ট্রেন কর্মসূচির পরিধি বেড়ে প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবার বাইরের সহায়তাও যুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ‘সালামাত্তি কাজাখস্তান’ ট্রেনের সঙ্গে আইনজীবী ও মধ্যস্থতাকারীরা ভ্রমণ করছেন। তাঁরা শ্রমবিরোধ, সরকারি সুবিধা, পারিবারিক আইন এবং আদালতের কার্যক্রম নিয়ে পরামর্শ দেন। এই সংযোজন স্বীকার করে যে স্বাস্থ্য ও আইনি কল্যাণ প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত গ্রামীণ এলাকার নারী ও পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে, যাঁদের আইনি সুরক্ষা বা সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। সামরুক- কাজাইনা ট্রাস্ট দাতব্য ফাউন্ডেশন এই আইনি পরিষেবাগুলো সমন্বয় করে, যাতে গ্রামীণ বাসিন্দারা চিকিৎসা ও নাগরিক অধিকার-সংক্রান্ত উভয় বিষয়েই পূর্ণাঙ্গ সহায়তা পান।
এই উদ্যোগে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও শিশুদের বিভিন্ন রোগ জরুরি চিকিৎসার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই শনাক্ত করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। জাখসি স্টেশনে নথিভুক্ত একটি ঘটনায়, হৃদ্রোগের উপসর্গ নিয়ে আসা এক রোগীর ট্রেনেই তাৎক্ষণিকভাবে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন শনাক্ত হয়। দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হওয়ায় তাঁর প্রাণ বাঁচে। ট্রেনের সরঞ্জাম ব্যবহার করে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা দ্রুত বিপজ্জনক অবস্থাটি শনাক্ত করেন এবং জরুরি সহায়তা দেন। এসব ঘটনা দেখায়, ভ্রাম্যমাণ রোগনির্ণয় ব্যবস্থা শুধু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নয়, জরুরি সময়ে জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থাও হতে পারে।
রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু; প্রতি পাঁচজন রোগীর প্রায় একজনের বয়স ১৮ বছরের কম। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা শিশুদের বিকাশ মূল্যায়ন করেন, সাধারণ শৈশবকালীন রোগের চিকিৎসা দেন এবং বিশেষজ্ঞের মনোযোগ প্রয়োজন এমন সমস্যা শনাক্ত করেন। অনেক গ্রামীণ পরিবারের জন্য দূরের শহরে না গিয়ে সন্তানদের বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর একমাত্র সুযোগ এই ট্রেন। শিশুদের রোগ দ্রুত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রকল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছে; হাজার হাজার শিশুকে স্থানীয় পলিক্লিনিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যে পরিমাপযোগ্য প্রভাব
কাজাখস্তানের মেডিকেল ট্রেনগুলোর পরিসংখ্যানে জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাবের প্রমাণ মেলে। ২০১০ সালে কর্মসূচি শুরুর পর থেকে তিনটি ট্রেন মিলে আট লাখের বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছে। শুধু ২০২৩ সালেই ‘সালামাত্তি কাজাখস্তান’ ট্রেনটি প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার মানুষকে সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে ছয়টি অঞ্চলে ৩২ হাজার পরীক্ষা করা হয়েছে এবং ৯১ হাজারের বেশি পৃথক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ট্রেনটি নয়টি অঞ্চলের ৪৭টি প্রত্যন্ত স্টেশনে গিয়ে প্রায় ২৭ হাজার মানুষের রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়।
রোগনির্ণয়ের সাফল্যের হার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথম সাক্ষাতেই ৩০ শতাংশের বেশি রোগীর রোগ শনাক্ত হয়; এসব রোগনির্ণয়ের চারটির একটিতে এমন গুরুতর রোগ ধরা পড়ে, যার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। শনাক্ত হওয়া প্রায় সব রোগী, যাঁদের মধ্যে শত শত শিশু রয়েছে, স্থানীয় পলিক্লিনিকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হন। ফলে ট্রেন চলে যাওয়ার পরও চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। ২০২৪ সালের সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় ১১টি অঞ্চলের ১২৩টি প্রত্যন্ত গ্রামে সেবা দেওয়ার কথা রয়েছে, যার মাধ্যমে আরও ৯০ হাজারের বেশি গ্রামীণ বাসিন্দার কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বছর শেষ হওয়ার আগে ট্রেনটির আরও ৪৪টি স্টেশনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
প্রচলিত ক্লিনিকে সাক্ষাতের তুলনায় রোগীদের উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ, ট্রেনটি সরাসরি রোগীদের নিজ নিজ জনপদে পৌঁছায় এবং বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা নিতে গ্রামীণ বাসিন্দাদের পথে যে বাধাগুলো পেরোতে হয়, তা দূর করে। বয়স্ক রোগী এবং চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা আছে এমন ব্যক্তিদের জন্য এই ভৌগোলিক সুবিধা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁদের পক্ষে শহরের চিকিৎসাকেন্দ্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া কঠিন। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত করে যে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এমন জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, যারা অন্যথায় রোগ গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন।
জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্কারের সঙ্গে সমন্বয়
কাজাখস্তানের গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ হিসেবে মেডিকেল ট্রেন উদ্যোগটি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন’ জাতীয় প্রকল্পে ৬৫৫টি নতুন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ৩২টি বহুবিভাগীয় কেন্দ্রীয় জেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। স্থায়ী এসব প্রতিষ্ঠান একসময় ভ্রাম্যমাণ ইউনিটগুলোর পরিপূরক হবে। এতে তৈরি হবে স্তরভিত্তিক একটি ব্যবস্থা, যেখানে ট্রেনগুলো প্রত্যন্ত জনপদে সেবা দেবে এবং স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহত্তর গ্রামীণ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব নেবে। প্রকল্পটির জন্য ২১৭.৭ বিলিয়ন তেঙ্গে অর্থায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি ভর্তুকি বাড়ানো এবং স্নাতকদের জন্য বাধ্যতামূলক গ্রামীণ চাকরির মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাকর্মী আকৃষ্ট করার ব্যবস্থাও এতে রয়েছে।
২০২৩ সালে আলমা-আতা ঘোষণার ৪৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আস্তানা সম্মেলনে গুরুত্ব পাওয়া আন্তর্জাতিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নীতির সঙ্গে এই পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কাজাখস্তানের এনবেকশিকাজাখ জেলার পলিক্লিনিককে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উত্তম চর্চার প্রদর্শনীকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা দেশটির রোগীকেন্দ্রিক পদ্ধতির যথার্থতা প্রমাণ করে। জরুরি হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে ৩৩টি উড়োজাহাজ নিয়ে গঠিত মেডিকেল এভিয়েশন সেবা ট্রেনগুলোর পাশাপাশি কাজ করে। এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকায় চালু ৫৯৫টি অ্যাম্বুলেন্স দলের সঙ্গেও ট্রেনগুলো সমন্বয় করে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা মডেলকে সহায়তা করছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ৮৬ শতাংশের বেশি এখন ইন্টারনেট-সংযুক্ত, ফলে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শ দেওয়া যায় এবং ট্রেনভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সেবার পরিধি বাড়ে। ট্রেনের রিয়েল-টাইম ভিডিও যোগাযোগের মাধ্যমে অনবোর্ড চিকিৎসকেরা শহরের হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যুক্ত হন। এতে সরাসরি রোগীর কাছে যাওয়ার সুবিধার সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগ মিলিয়ে একটি সমন্বিত মডেল তৈরি হয়েছে। কাজাখস্তান গ্রামীণ এলাকায় ব্রডব্যান্ডের সুযোগ বাড়াতে থাকায় ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ও টেলিমেডিসিনের সমন্বয় প্রত্যন্ত রোগী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মধ্যকার দূরত্ব আরও কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মূল তথ্য
- কাজাখস্তানে তিনটি মেডিকেল ট্রেন রয়েছে: ‘দেনসাউলিক’ (দক্ষিণ), ‘জারদেম’ (পূর্ব-পশ্চিম) এবং ‘সালামাত্তি কাজাখস্তান’ (উত্তর); এগুলো প্রতিবছর ১০০টির বেশি প্রত্যন্ত জনপদে সেবা দেয়
- প্রতিটি ট্রেনে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞসহ ৮০ জন কর্মী থাকেন, যার মধ্যে ৪০ জন চিকিৎসাকর্মী; ট্রেনগুলো বছরে আট মাস চলে এবং প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়
- ২০১০ সাল থেকে কর্মসূচিটি আট লাখের বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছে; প্রথম সাক্ষাতে ৩০ শতাংশের বেশি রোগীর রোগ শনাক্ত হয় এবং প্রতি চারটি রোগনির্ণয়ের একটিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা প্রয়োজন এমন গুরুতর সমস্যা ধরা পড়ে
- সেবার মধ্যে রয়েছে বিনা মূল্যে রোগনির্ণয়, দাঁতের চিকিৎসা, ছোট অস্ত্রোপচার, শিশুরোগের চিকিৎসা এবং ২০২৩ সাল থেকে গ্রামীণ বাসিন্দাদের জন্য আইনি ও মধ্যস্থতা-সংক্রান্ত সহায়তা
- এই উদ্যোগ গ্রামীণ এলাকার চিকিৎসকসংকট মোকাবিলা করছে; আগে কিছু অঞ্চলে মাথাপিছু চিকিৎসকের সংখ্যা শহরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম ছিল
- ৬৫৫টি নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা এবং মেডিকেল এভিয়েশন ও টেলিমেডিসিন সেবার সঙ্গে সমন্বয়সহ বৃহত্তর গ্রামীণ স্বাস্থ্য আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে মেডিকেল ট্রেনগুলো পরিচালিত হয়






